মঙ্গলবার ১১ই ডিসেম্বর ২০১৮ |

ফিলিস্তিনের আগুনকন্যা

হামমাদ রাগিব |  রবিবার ১০ই ডিসেম্বর ২০১৭ বিকাল ০৩:৫৫:১৫
ফিলিস্তিনের

সুন্দর একহারা গড়নের সৌম্য-কঠিন মেয়েটির নাম ওফা। লালচে চুল কাঁধ ছাড়িয়ে গেছে। চেহারায় কেমন একটা কাঠিন্য ভাব। ইসরায়েলের রামলে শহরে ছিল তাঁর পৈত্রিক নিবাস। ১৯৪৮ সালে দখলদার ইসরায়েল জোর করে ওফার পিতামাতাকে বাস্তুচ্যুত করে। সে ইতিহাস সবার জানা।

ওফার মা-বাবা আরো লাখো বাস্তুচ্যুত মানুষের সাথে এসে আশ্রয় নেন ফিলিস্তিনের পশ্চিম জেরুজালেমের আল-আমারি শরণার্থী শিবিরে। আশির দশকে এখানেই জন্ম হয় ওফার। শিবিরের ঘিঞ্জি পরিবেশ, চারদিকে দরিদ্রতার প্রকট চিহ্ন, মানবতের জীবনযাপন-- এসবের ভেতরই তার বেড়ে ওঠা। জীর্ণশীর্ণ দুটো মাত্র কামরা নিয়ে তাদের বসতি ছিল।

মা-বাবা আর তিন ভাইকে নিয়ে এখানেই কেটেছে ওফার শৈশব-কৈশোর। বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের শরণার্থী ক্যাম্পকে ইসরায়েলি সৈন্যরা  খুব ভয় পেত। আশির দশকে ওফা যখন বেড়ে উঠছিল, তখন ফিলিস্তিনিদের অসহযোগ আন্দোলন ইনতিফাদার যুগ। ইনতিফাদার মূল চালিকা শক্তি ছিল ওফার মতো কিশোর-কিশোরীরা। এরা প্রত্যকেই যেন একেকটা বারুদ। ইসরায়েলি কোনো সৈন্যকে কেবল দেখলেই হলো, তাদের ভেতরের সুপ্ত আগুন মুহূর্তেই জ্বলে উঠত দাউ দাউ করে। ইট-পাটকেল কিংবা পাথর-- হাতের কাছে যা পেত ছুঁড়ে মারত ইসরায়েলি ওই সৈন্যের দিকে। পরিণতি কী হবে, একবার ভেবেও দেখত না তারা।

এই সব সৈন্যের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা কাজ করত ফিলিস্তিনি শিশু-কিশোরদের ভেতর। তারা ভালো করেই জানত, এদের কারণেই আজ তারা শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এরাই বাস্তুচ্যুত করে দেশান্তর করেছে তাদের পিতৃপুরুষদের। কেড়ে নিয়েছে তাদের শান্ত-স্বাভাবিক সমৃদ্ধির জীবনযাপন।

অন্যান্য কিশোর-কিশোরীর মতো ওফাও নিয়মিত শরিক হত ইন্তিফাদায়। স্কুলে যাবার পথে সুযোগ পেলেই লেগে যেত ইসরায়েলি সৈন্যদের লক্ষ করে ইটপাটকেল ছুঁড়তে। ইনতিফাদা যখন জোরেশোরে শুরু হলো তখন স্কুল বাদ দিয়ে রোজ রোজ সে মিছিলে চলে যায় দেখে মা-বাবা তার স্কুল যাওয়া বন্ধ করে দেন। তারপরও লুকিয়ে-চাপিয়ে মা-বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সে চলে যেত মিছিলে। স্কুল আর মা-বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে এভাবে আন্দোলনে যাওয়ার কারণে ওফাকে এক ক্লাসে টানা তিন বছর কাটাতে হয়েছিল। কিশোরী ওফার চোখে তাঁর মাতৃভূমি ফিলিস্তিন স্বাধীন করার স্বপ্ন জ্বলজ্বল করত সারাক্ষণ। ইহুদিদের নাপাক পদচারণা থেকে পবিত্রভূমি আল-কুদস রক্ষা করার প্রত্যয় তাঁকে হরদম তাড়া করে ফিরত।

১৫ বছর বয়েসেই ওফার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের কিছুদিনের মাথায় গর্ভবতী হয় সে, কিন্তু সন্তানের মা হতে পারে না। কোনো সমস্যার কারণে গর্ভপাত হয়ে যায়। সেই সঙ্গে তাঁর মা হবার সুযোগটিও চিরদিনের জন্য নষ্ট হয়ে যায়।

একে তো সন্তান না পাওয়া এবং চিরদিনের জন্য বন্ধ্যা হয়ে যাবার কষ্ট, তার উপর গর্ভপাতের কারণে স্বামীর পক্ষ থেকে নানা প্রকারের বাজে ব্যবহার-- সব মিলিয়ে মানসিকভাবে খুব বড় রকমের একটা বিপর্যয় ঘটে ওফার জীবনে। স্বামীর সঙ্গে কোনোভাবেই আর বনিবনা করতে পারে না সে। একসময় নিজ থেকেই ডিভোর্স দিয়ে স্বামীর অধিকার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে আনে।

তারপর শুরু হয় ওফার উদ্দাম জীবনযাপন। একজন মুসলিম রমণী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার চেয়ে পশ্চিমা ধাচে সাজিয়ে নেয়ার প্রয়াসটাই তার বেশি ছিল। ধর্মীয় বিধি-নিষেধের খুব একটা তোয়াক্কা করত না ওফা, এই শিক্ষাটা পরিস্থিতির কারণে হোক কিংবা গাফলতির কারণে, তাঁর বেড়ে ওঠার সময়টাতে সে পায়নি। পশ্চিমা স্টাইলের পোষাক পরত সে, বোরকা কিংবা হিজাব গায়ে জড়াত না খুব একটা। তারুণ্যের সময়টাতে ধর্ম এবং রাজনীতি দুটো থেকেই নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। ছোটবেলার সেই আন্দোলনমুখর মনমানসিকতা বিয়ে-বিচ্ছেদ এবং সন্তান না পাবার হতাশার কারণে স্তিমিত হয়ে যায়। কেমন একটা বিতৃষ্ণা চলে আসে এসবের প্রতি। বরং নিজের জীবনের প্রতিই সে আর খুব একটা আগ্রহবোধ করে না। তবে তাঁর সহোদর তিন ভাই ফিলিস্তিনিদের প্রাণের সংগঠন ফাতাহর সাথে জড়িত ছিল।

ধর্ম এবং রাজনীতি থেকে বিমুখ থাকলেও ওফা আর্ত-সামাজিক সেবার প্রতি ছিল খুবই উৎসাহপ্রবণ। এ অভ্যাসটা তাঁর ছোটোবেলা থেকেই ছিল। বিবাহ-বিচ্ছেদের পর দিনের একটা সময় সে বিনা পারিশ্রমিকে আমারি শরণার্থী শিবিরের মূক ও বধির ছেলে-মেয়েদের পড়াত। পাশাপাশি খণ্ডকালীন একটা প্যারামেডিক চাকরি জুটিয়ে নিয়েছিল। চাকরি আর সমাজসেবা এই দুইয়ের মধ্যে নিজের জীবনটাকে সীমাবদ্ধ করে ওফা তার অতীতটা ভুলে থাকার চেষ্টা করছিল। ফিলিস্তিনের দুঃসহ বাস্তবতা সম্পর্কে তখন খুব একটা ভাবনা কাজ করত না তাঁর ভেতর।

২.

প্যারামেডিক চাকরির সূত্র ধরে ২০০০ সালে ওফার পরিচয় হয় রেড ক্রিসেন্টের সঙ্গে। বিভিন্ন কাজে রেড ক্রিসেন্টের কাছে তখন তাঁর ঘনঘন যাতায়াত শুরু হয়। অই সময়টাতে ফিলিস্তিনিদের অসহযোগ আন্দোলন ইন্তিফাদা আবার চাঙ্গা হয়ে ওঠে। গাজা এবং পশ্চিম তীর তখন ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর। অন্যান্য জায়গার মতো রামাল্লার কাছাকাছি ত্রয়োশ জংশনে প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর মুসল্লিরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করত। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বিক্ষোভ দমনের নামে সাধারণ মুসল্লিদের ওপর চালাত নৃশংস আক্রমণ। প্রতি সপ্তাহেই হতাহতের সংখ্যা মাত্রা ছাড়িয়ে যেত। আহতদের সেবা-শুশ্রূষা, ঘটনাস্থল থেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি কাজে রেড ক্রিসেন্টের হয়ে ওফাকে জড়িয়ে পড়তে হয়। এই সময়টাতেই ওফার ভেতরে কৈশোরের ঘুমিয়ে পড়া সেই বিদ্রোহী চরিত্র আবার জেগে ওঠে। মজলুম ফিলিস্তিনিদের ওপর নৃশংস এসব আচরণ তাঁকে প্রচণ্ড রকম ভাবিয়ে তোলে।

অন্যান্য সব ব্যস্ততা বাদ দিয়ে ওফা তখন থেকে কেবল ইসরায়েলিদের নৃশংসতার শিকার ফিলিস্তিনি আহতদের সেবা-শুশ্রূষায় নিজেকে শপে দেয়। যেখানেই ইসরায়েলিরা আক্রমণ করেছে শুনতে পায়, সেখানেই সে ছুটে যায়। বিক্ষোভের ভেতর থেকে আহতদের বের করে এনে হসপিটালে নিয়ে যায়। ইসরায়েলিদের গুলি চলাকালেও সে ঢুকে পড়ে ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভের ভেতর, কেউ আহত হলেই তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

একদিন এক বিক্ষোভে ফিলিস্তিনি এক কিশোর মারাত্মক আহত হয়। ওফা তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে হসপিটালে নিয়ে আসে।

কিশোরটিকে দেখে তাঁর ভেতরের ভুভুক্ষ মা সত্তাটি জেগে ওঠে।

কেবলই মনে হতে থাকে, তাঁর সন্তানটি যদি পৃথিবীতে আসতে পারত তবে এই কিশোরটির মতোই হত।

টানা এক সপ্তাহ অবধি ওফা আহত কিশোরটিকে মাতৃঅাদরে শুশ্রূষা দেয়। কিন্তু কুদরতের ফয়সালা তো ভিন্ন, এক সপ্তাহের মাথায় ছেলেটি মারা যায়।

ছেলেটির মৃত্যুতে প্রচণ্ড শক খায় ওফা। আহত কিশোরটিকে হয়ত নিজের সন্তানের জায়গায় কল্পনা করার কারণেই এমনটা হলো। হানাদার ইসরায়েলিদের ওপর তাঁর আক্রোশটা বেড়ে গেল বহুগুণে। কৈশোরের প্রতিশোধোন্মুখ সত্তাটা হৈ হৈ করে উঠল ওফার ভেতর। এর প্রতিশোধ নেবে ওফা। শক্ত প্রতিশোধ!

৩.

ইসরায়েলের দখলকৃত পশ্চিম তীরের ছোট্ট একটি শহর তাইবে। অধিকার বঞ্চিত ফিলিস্তিনিদের প্রতিবাদী মিছিল-বিক্ষোভ এখানটায় চাঙ্গা থাকে সবসময়। ইসরায়েলি সেনাদের উপস্থিতি তাই একটু বেশিই থাকে শহরটিতে।

দিনটি ছিল ২০০২ সালের ২৭ জানুয়ারি। মুক্তিকামী জনগণ তাইবে শহরে বিক্ষোভ করছিল অন্যান্য দিনের মতো। ইসরায়েলি সেনারা বিক্ষোভ দমনের জন্য নিজেদের গোছগাছ করে নিচ্ছিল। একটি ব্রিজের গোড়ায় তাদের বড় একটি অংশ অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিক্ষোভটা এদিকে এলেই শুরু হবে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ।

প্রতিবাদী জনতা বিক্ষোভ করতে করতে এ দিকেই আসছিল। আর কিছু দূর এগোলেই ব্রিজের গোড়া। যেখানটায় দাঁড়িয়ে আছে ইসরায়েলিরা। বিকটা আওয়াজে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে বিস্ফোরণটা ঘটল ঠিক তখনই, একদম ইসরায়েলি সৈন্যদের নাকের ডগায়। শিকারের জন্য প্রস্তুত সেনারা মুহূর্তেই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। বিস্ফোরণের আঘাতে এক ইসরায়েলির দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। শ' খানেক হয় গুরুতর আহত। ইসরায়েলি সেনাশিবিরে তুমুল আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এই ঘটনায়।

বিস্ফোরণটা ছিল আত্মঘাতী। যে লোক বিস্ফোরক বহন করে নিয়ে এসেছিল, তার দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। ছিন্নভিন্ন দেহ একত্রিত করে এতটুকু বোঝা যায়, বিস্ফোরক বহনকারী একজন ফিলিস্তিনি তরুণী। কিন্তু তাঁর নামধাম-পরিচয় শনাক্ত করা মুশকিল হয়ে পড়ে।

৪.

২০০২ সালের ৩১ জানুয়ারি। তাইবে শহরে আত্মঘাতী হামলার চতুর্থ দিন। আল-আমারি শরণার্থী শিবিরের সরু গলিপথ ধরে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে কয়েক হাজার মানুষের একটি মিছিল এগিয়ে চলছে ধীর গতিতে। মিছিলের সম্মুখভাগে কয়েক তরুণের কাঁধে ফিলিস্তিনের পতাকা মোড়ানো একটি কফিন। সবাই জানে কফিনটি ফাঁকা। কারো লাশ নেই কফিনে। কফিনের সামনের দিকে সৌম্য-কঠিন চেহারার এক তরুণীর ছবি সাঁটা। চোখ দুটো থেকে যেন আগুন টিকরে পড়ছে। তরুণীটি আর কেউ নয়, ওফা। চারদিন আগে তাইবে শহরের আত্মঘাতী বিস্ফোরণটা সে-ই ঘটিয়েছে। পবিত্র ভূমি আল-কুদস উদ্ধারের জন্য তাঁর আত্মদানকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতেই আলা-আমারি ক্যাম্পের শরণার্থীরা এ প্রতীকী শবযাত্রার আয়োজন করেছে।

ওফাই প্রথম নারী, পবিত্র ভূমি আল-কুদস রক্ষা করতে যে আত্মহুতি দিয়েছে। ইহুদিদের নাপাক দখলদারিত্ব থেকে ফিলিস্তিনকে মুক্ত করার জন্য আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে সে প্রমাণ করেছে, মৃত্যুও প্রতিবাদের অন্যতম একটা মাধ্যম।

ওফার এ আত্মদান মুক্তিকামী ফিলিস্তিনিদের আজও প্রেরণা যোগায়। তার নামটা উচ্চারিত হবার সাথে সাথে ভক্তি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার ঝলক খেলে যায় প্রতিটা ফিলিস্তিনির চেহারায়।

আল্লাহ তাঁর ভুল-ত্রুটিগুলো ক্ষমা করে তাঁর আত্মদানকে কবুল করুন।

হামমাদ রাগিব

সহকারী সম্পাদক, মাসিক নবধ্বনি

সংশ্লিষ্ট খবর