মঙ্গলবার ১১ই ডিসেম্বর ২০১৮ |

আল-আকসার কান্না এবং বাগদাদের একজন কাঠমিস্ত্রী

 মঙ্গলবার ১২ই ডিসেম্বর ২০১৭ দুপুর ০১:৪৫:১৮
আল-আকসার

৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে হযরত উমার রা. এর খেলাফত আমলে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রা এর নেতৃত্বে মুসলমানরা কুদস জয় করে। ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ক্রুসেড যুদ্ধে ক্রুসেডারদের হাতে কুদসের পতন ঘটে। এর মধ্য দিয়ে কুদসে মুসলমানদের ৪৬২ বছরের শাসনের বিলুপ্তি ঘটে। তার পর দীর্ঘ ৮২ বছর এটি খ্রিষ্টানদের দখলে থাকে। ১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দে হিত্তিনের যুদ্ধে সালাহুদ্দিন আইয়ুবী ক্রুসেডারদের সম্মিলিত শক্তিকে পরাজিত করে কুদসকে শত্রুমুক্ত করেন। ১৯৪৮ সালে বিশ্বমোড়লদের চক্রান্তের ফসল স্বরূপ মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া ইসরাইল নামক জারজ রাষ্ট্রটির জন্ম হলে পশ্চিম কুদস মুসলমানদের হাতছাড়া হয়। কিন্তু পূর্ব কুদসে অবস্থিত হওয়ার কারণে আল-আকসা তখন আপাতত রক্ষা পায়। ১৯৬৭ এর জুন মাসে মাত্র ৬ দিনের যুদ্ধে মিসর, সিরিয়া, জর্ডান এবং ইরাকের মতো চারটি আরব রাষ্ট্রের প্রতিরোধ বুহ্য ধ্বংস করে দিয়ে ইসরাইল পূর্বকুদস, পশ্চিমতীর, গাজা এবং গোলান মালভূমি দখল করে নেয়। দীর্ঘ ৭৮০ বছর পর পবিত্র আকসা থেকে আবারও হেলালী নিশান খসে পড়ে। উমার এবং আইয়ুবীর আমানত আবারও মুসলমানদের হাতছাড়া হয়। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে আল-আকসা কেঁদে চলেছে এবং আরেকজন আইয়ুবীর জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছে।

ইনশা আল্লাহ আল আকসা একদিন মুক্ত হবে। নিশ্চয়ই হবে। ইতিহাসের অমোঘ বিধানও তা-ই বলে। কিন্তু দুশ্চিন্তার জায়গাও অনেক। আশেপাশে যখন চোখ মেলে তাকাই তখন সেখানে কোন আলোই দেখতে পাইনা। ১৯২০ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে ফরাসী জেনারেল Henri Gouraud দামেস্ক দখল করে সালাহুদ্দীনের কবরে লাথি মেরে বলেছিল- “সালাহুদ্দীন, দেখো আমরা ফিরে এসেছি। ২য় আর কোন সালাহুদ্দীন জন্ম নিতে পারবে না।” ১০০ বছর পর্যন্ত পশ্চিমারা জেনারেল হেনরির কথাকে সত্য প্রমাণ করে দেখিয়েছে। তাদের চ্যালাঞ্জকে মিথ্যা প্রমাণ করতে আমাদের আর কতোদিন লাগবে? আদৌ পারবো কি?

হিত্তীন আর কুদস বিজয়ের কথা উঠলে আমাদের চোখে সালাহুদ্দীনের চেহারা ভেসে উঠে। কিন্তু ইতিহাসবিদরা বলছেন অন্য কথা। তাদের মতে- কুদস বিজয়ের ক্ষেত্রে সালাহুদ্দীনের যতোটুকু অবদান ঠিক ততোটুকু অবদান সেই ৬০ হাজার যোদ্ধাদের যারা নিজেদেরকে সালাহুদ্দীনের সেনাবাহিনীর গর্বিত সদস্য হওয়ার মতো যোগ্য করে গড়ে তুলেছিলেন। ওইসব মায়েদের অবদান যারা তাদের শিশুদেরকে আরব্য-রজনীর রূপকথার গল্পের পরিবর্তে খালিদ-মুসান্নার বীরত্বের কাহিনী শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন। ওইসব শিশু-কিশোরদের মধ্য থেকেই সালাহুদ্দীন উঠে এসেছিলেন, ঘোড়সওারী, তেগচালনা, তিরান্দাজী, নেযাবাজীই ছিল যাদের বিনোদনের মাধ্যম। তারপরও আল্লাহ তায়ালা ৮৮ বছর ধরে তাদের পরীক্ষা নিয়েছিলেন। তারপর তাদেরকে কাঙ্খিত বিজয় দান করেছিলেন।

কিন্তু আজকের মায়েরা তাদের সন্তানের চেহারায় বিলগেটস আর এঞ্জেলিনা জোলির ছবি দেখে। আজকের কিশোররা মেসি-রোনালদো আর রিয়াল-বার্সায় বুঁদ হয়ে আছে। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা লাগাতে গিয়ে আমরা বৈদ্যুতিক তারে জীবন দিতে পারি। এখন যদি আল্লহ দয়া করে সালাহুদ্দীনকে কবর থেকে উঠিয়ে আমাদের মাঝে ফিরিয়েও দেন তখনও আমাদের উত্তর হবে বনী ইসরাইলের মতো- “আপনি এবং আপনার খোদা দুইজনে মিলে লড়াই করেন গিয়ে। আমাদের আমোদফুর্তিতে ডিস্টার্ব করবেন না প্লীজ।” তাই সালাহুদ্দীনের জন্য অপেক্ষা নয়, তার সৈনিক হতে পারার মতো নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তোলাই হচ্ছে আজকের আল-আকসার দাবী।

১৯৬৯ সালে এক অস্ট্রেলীয় ইহুদী নাগরিক আল আকসা মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন বেশ বড় আকার ধারণ করেছিলো। যার ফলে মসজিদের পূর্বপাশটা পুরোপুরি পুড়ে যায়। ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গোল্ডামায়ার ওইদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন- “ওই দিন সারা রাত আমার ঘুম হয় নি। আমার কেবলই মনে হচ্ছিলো আজকে ইসরাইলের শেষ দিন। এখনি আরবরা চতুর্দিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু যখন সকাল হল এবং আমার কোন আশংকাই বাস্তব হলো না তখন আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে, এখন থেকে ইসরাইল নিরাপদ। আরবরা এখন ঘুমন্ত জাতি। আমরা তাদের এই ঘুম আর ভাঙতে দেব না”।

গত ১৪ই জুলাই ঘটনা শুরু হওয়ার পর লাগাতার ৬ দিন আকসায় আযান, নামায সব বন্ধ ছিল। প্রথম ৩ দিন কোন ফিলিস্তিনিকেই আকসায় ঢুকতে দেয়া হয় নি। সেখানে ইসরাইলী সেনা এবং বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদলের প্রতিনিয়ত আনাগোনা ছিল। তারা সেখানে তিন দিন ধরে কী করেছে তা কেউ জানে না। আল-আকসার ওয়াকফ সম্পত্তি এবং কুদসের মুসলমানদের সব ডেমোগ্রাফিক ডকুমেন্ট সেখানে রক্ষিত থাকে। সেগুলো এখনও সংরক্ষিত আছে কি না সে ব্যাপারে চরম দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে।

৬৯ সালের ঘটনাটির পর এটিই হচ্ছে মসজিদে আকসায় ইসরাইলের সবচেয়ে বড় হামলা। কাতার, তুরস্ক, জর্ডান ছাড়া আর কোন রাষ্ট্র এই ঘটনার নিন্দা জানায় নি। যারা সন্ত্রাসের দোহায় দিয়ে একটি মুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাদের মুখ দিয়ে আকসার জন্য একটি বাক্যও বের হয় নি। মুসলমানদেরকে তাদের সন্ত্রাসী মনে হয়। হামাসকে তাদের সন্ত্রাসী মনে হয়। কিন্তু ইসরাইলী বর্বরতাকে তাদের বৈধ আধিকার চর্চা মনে করে। গত জুমার দিনটি ছিল আকসার জন্য জীবন দেয়ার দিন। গোটা কুদস এবং তার আসে পাশের শহরগুলোতে ওইদিন জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয় নি। সবাইকে আকসায় এসে জুমা পড়তে বলা হয়েছে। জুমার আগে ও পরে পুরা আকসা প্রাঙ্গণ যুদ্ধক্ষেত্রের রূপ ধারণ করে। তিনজন ফিলিস্তিনি ভাই শাহাদাত বরণ করেন। তুরস্কসহ দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে ওই সময় ফিলিস্তিনীদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে মিছিল সমাবেশ করা হয়। ঠিক ওইদিন মসজিদুল হারামে শায়খ শুরাইম জুমার খুতবা দেন। ২০ মিনিটের খুতবায় তিনি প্রচ্ছন্নভাবে কাতারের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে গেছেন এবং উম্মাহর ঐক্যের মাঝে ফাটল ধরাচ্ছে বলে কাতারের ব্যাপারে মানুষদেরকে সতর্ক করেছেন। একদম শেষে দোয়ার অংশে এসে আকসার জন্য দুটি দোয়া বাক্য ব্যায় করলেন। আরেক সৌদি সালাফী শায়খ ফতওয়া দিয়েছেন- এখন ফিলিস্তিনীদের আল আকসার দাবী ছেড়ে দেয়া দরকার। কারণ, সেটি এখন ইহুদীদের দখলে। আর ইহুদীরা হচ্ছে এখন শক্তিশালী। তাই তাদের সাথে সংঘাতে জড়ানো “হেকমতের খেলাফ” হবে। ইসলামে বিজয়ী শক্তির আনুগত্য করার বিধান আছে, যাকে আরবিতে (إطاعة الحاكم المتغلب) বলা হয়।” এসব **মারানীর হেকমতগুলো শুধু সৌদিদের মাথায় কীভাবে আসে তা-ই এখন এক বিশাল গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আল্লাহ না করুন কাল যদি হারামাইনও আল আকসার পরিণতি বরণ করে তখনও তারা ঠিক কোন একটি হেকমত বের করে নিবে। যারা আকসার ব্যাপারে নির্লিপ্ত আছে, আল্লাহর কসম, তারা হারামাইনের ব্যাপারেও নির্লিপ্ত থাকবে।

আকসার ঘটনার পরে ফিলিস্তিনের টিভি চ্যানাল “আল- আকসা”র একজন সাংবাদিক ৩০ জন সৌদি আলেমের সাথে যোগাযোগ করে চলমান ঘটনা সম্পর্কে কিছু বলার জন্য তাদেরকে অনুরোধ করেন। তাদের মধ্যে একজনও সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হয় নি। তারা আল্লাহর চেয়ে তাদের শাসকদেরকে বেশী ভয় করে। তাদের আনুগত্য করাকে বেশী প্রাধান্য দেয়। গতকাল ইসরাইলী পত্রিকা “মাআরিফ” লিখেছে- “ইসরাইল হচ্ছে সৌদি আরবের গোপন প্রেমিকা। এখন আর গোপন অভিসার নয়, প্রকাশ্যেই মৈত্রী করতে চায়”। ওইদিন ইউটিউবে একটি ভিডিও দেখছিলাম। ফিলিস্তিনের আল খলীল শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে এক ইহুদী ফিলিস্তিনিদেরকে চরমভাবে গালি দিচ্ছে আর বলছে- তোদের মাথা থেকে ফিলিস্তিনের ভুত এখনও নামে নি? দেখ, মিসর, জর্ডান। সৌদি আরব সব আমাদের পক্ষে এখন। জাহান্নামে যাক তোদের ফিলিস্তিন।”

একটি ঘটনা বলে শেষ করছি-

১০৯৯ সালের পরের কোন এক সময়। তখন কুদস খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের দখলে। বাগদাদ শহরে একজন কাঠমিস্ত্রি থাকতো। লোকটি একদিন খুব সুন্দর একটি মিম্বার বানালেন। চারিদিক থেকে লোকেরা দলে দলে এসে মুগ্ধ হয়ে মিম্বারটি দেখছে। ক্রেতারা বেশ চড়া মুল্য দিয়ে হলেও মিম্বারটি কিনতে চায়। কিন্তু বুড়োর এক কথা- তিনি এটি বিক্রি করবেন না। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো- তা হলে আপনি এতো কষ্ট করে এটি বানালেন কেন? তখন মিস্ত্রি উত্তর দিলেন- এটি বানিয়েছি মসজিদে আকসায় লাগানোর জন্য। লোকেরা তার কথা শুনে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। আকসা এখনও খ্রিষ্টানদের দখলে আর এই বুড়ো বাগদাদে বসে তার জন্য মিম্বার বানাচ্ছে। কেউ কেউ তাকে পাগলও ঠাওরাল। তখন বৃদ্ধ কাঠমিস্ত্রি বললেন- এটিই তো আমার পেশা। আমি তো আর যোদ্ধা নই। তার উপর আবার বৃদ্ধ। তো আমার যা সাধ্যে আছে তা-ই মসজিদে আকসার জন্য ব্যায় করছি। আমার কাজ মিম্বারটি বানানো। সেটি আকসায় বসানোর লোক আল্লাহ ঠিক করে দেবেন। ওইদিন একটি শিশুও তার বাবার হাত ধরে ওই কাঠমিস্ত্রির মিম্বারটি দেখতে গিয়েছিল। ঠিক একদিন ওই শিশুটির হাতে কুদস বিজয় হয়, এবং তিনি মিম্বারটি সংগ্রহ করে নিজ হাতে তা মসজিদে আকসায় লাগিয়ে দেন। শিশুটির নাম ছিল সালাহুদ্দীন!

যার যা আছে তা-ই ফিলিস্তীনের জন্য ব্যায় করুন। যেভাবে পারেন। যেখানে পারেন। কোন প্রচেষ্টাকেই খাটো করে দেখবেন না। বাগদাদের কাঠমিস্ত্রি যদি একটি শিশুর মনে কুদস বিজয়ের নেশা ধরিয়ে দিতে পারে আপনার আমার প্রচেষ্টার মাধ্যমেও ইনশা আল্লাহ অনেক কিছু হবে। তা যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন।

আল্লাহ, ‘মুক্ত আকসাকে’ দেখার আগে তুমি এই দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিও না।


বি: দ্র: ‘কুদস’ বলুন, ‘জেরুজালেম’ নয়।




মুহাম্মদ নোমান

আলোর কাফেলা.কম

সংশ্লিষ্ট খবর