রবিবার ২৪শে জুন ২০১৮ |
মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

শীত-গ্রীষ্মের শিক্ষা ও আল কুদস সংকট

 বৃহঃস্পতিবার ১৪ই ডিসেম্বর ২০১৭ সকাল ১১:৪৭:৪৪
শীত-গ্রীষ্মের

শায়খ ড. আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমান বুয়াঈজান

যুগের ধারাবাহিক আবর্তন, ঋতুর পালাবদল, মাসের পর মাসের আগমন ও দিন-রাতের পরিবর্তনে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টিতে, দিবস ও রাত্রির পরিবর্তনে বোধশক্তিসম্পন্ন লোকদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৯০)।

বছরের ঋতুগুলোর পালাবদল হয়। তীব্র শীতের আগমনে গ্রীষ্মের প্রচ- তাপপ্রবাহ চলে যায়। এসবই হয় একটি প্রজ্ঞা, পরিমিতি ও নির্ধারিত পরিসীমায়। আপনারা এখন শীত মৌসুমের মুখোমুখি, যা মোমিন লোকদের বসন্ত, ইবাদতকারীদের সুবর্ণ সুযোগ, পরহেজগারদের উদ্যান ও সাধনাকারীদের ময়দান হিসেবে বিবেচিত হয়। আবেদ বান্দাদের জন্য আল্লাহ রাতকে দীর্ঘ করে দিয়েছেন। তাদের অবস্থা হলো, ‘রাতে তারা অল্পই নিদ্রায় কাটায় এবং রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করে।’ (সূরা জারিয়াত : ১৭-১৮)। ‘আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তারা তাদের প্রতিপালককে ডাকার জন্য শয্যাত্যাগ করে।’ (সূরা সিজদা : ১৬)।

আল্লাহ রোজাদারদের কষ্ট লাঘব করতে দিনকে সংক্ষিপ্ত ও ছোট করে দিয়েছেন। তাই প্রকৃতপক্ষে শীতকাল সফলদের জন্য গনিমত ও প্রতিযোগীদের ময়দানে পরিণত হয়। ‘তিনিই রাত্রি ও দিবসকে পরস্পরের অনুগামী করেছেন, তার জন্য যে উপদেশ গ্রহণ করতে ও কৃতজ্ঞ হতে চায়।’ (সূরা ফুরকান : ৬২)।

তাই আপনারা নিজেদের জন্য ভালো কিছু করুন, আল্লাহকে ভয় করুন, যাতে আপনারা রহমত লাভ করতে পারেন। আপনারা সুযোগ নষ্ট করবেন না, আপনাদের জবাবদিহিতা করতে হবে।

মানুষ যে সময় গ্রীষ্মের প্রচ- তাপ থেকে আত্মরক্ষা করে এবং কনকনে শীত থেকে বাঁচতে প্রস্তুতি নেয়, গরম চাদর ও পোশাক পরিধান করেÑ এ উভয় পরিস্থিতিতেই বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য অনেক বড় উপদেশ ও সতর্কবার্তা রয়েছে। কেননা শীত ও গ্রীষ্মের তীব্রতা জাহান্নামের দুইটি নিশ্বাস। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তীব্র গরম পড়লে তোমরা নামাজের মাধ্যমে তা শীতল করে নাও, কেননা গরমের তীব্রতা জাহান্নামের উত্তাপ থেকে আসে।’

‘জাহান্নামের আগুন তার প্রতিপালকের কাছে অভিযোগ করে বলে, হে প্রতিপালক, আমার এক অংশ অন্য অংশকে গ্রাস করে নিয়েছে। তখন তিনি তাকে দুইটি নিশ্বাস ফেলার অনুমতি দেন। একটি শীতকালে আরেকটি গ্রীষ্মকালে। তোমরা যে তীব্র তাপ পেয়ে থাক, তা জাহান্নামের নিশ্বাস থেকেই আসে।’ (বোখারি ও মুসলিম)।

তাহলে জাহান্নামের আগুন সম্পর্কে আপনাদের কী ধারণা? ‘এটি আল্লাহর প্রজ্বলিত লেলিহান আগুন, যা হৃদয়কে গ্রাস করবে।’ (সূরা হুমাজা : ৬)। ‘এটি অট্টালিকাতুল্য বৃহৎ স্ফুলিঙ্গ উৎক্ষেপণ করবে। তা পীতবর্ণ উষ্ট্রশ্রেণী সদৃশ।’ (সূরা মুরসালাত : ৩২-৩৩)। ‘তা শরীরের চামড়া দগ্ধ করবে।’ (সূরা মুদ্দাসসির : ২৯)।

জাহান্নামের আগুনকে ১ হাজার বছর জ্বালানো হয়েছে, ফলে তা লালবর্ণ ধারণ করেছে। তারপর আরও ১ হাজার বছর জ্বালানো হয়েছে, ফলে তা শুভ্রবর্ণ ধারণ করেছে। তারপর আরও ১ হাজার বছর জ্বালানোর ফলে তা কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। তাই তা ঘনকালো অন্ধকারময়। তার স্ফুলিঙ্গ আলোকিত হয় না। তার শিখা নিভেও না।’ তা আপনারা সেই আগুনকে ভয় করুন, যার জ্বালানি মানুষ ও পাথর।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘তোমাদের এ আগুন, যা বনি আদম প্রজ্বলিত করে, তা জাহান্নামের উত্তাপের সত্তর ভাগের এক ভাগ মাত্র।’ লোকরা বলল, ইয়া রাসুল (সা.), আল্লাহর কসম! এতটুকু হলেই তো যথেষ্ট হতো! তিনি বলেন, ‘এর চেয়ে আরও ৬৯ গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে, সবগুলোর উত্তাপ একই সমান।’ আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।

মহাজাগতিক সব নীতিমালা একটি নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খলা, বিধান ও আল্লাহর স্বীকৃত নির্দেশে পরিচালিত হয়। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন তার প্রতি দয়া করেন, ফলে সেগুলো তার উপকারে আসে। যাকে ইচ্ছা বিপদগ্রস্ত করেন, ফলে সেগুলো তার ক্ষতি করে। এসবকিছুই আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। এদের নিজস্ব কোনো অধিকার ও নিয়ন্ত্রণক্ষমতা নেই। ‘তিনিই আল্লাহ, তোমাদের পালনকর্তা। আধিপত্য তাঁরই। তোমরা তাঁকে ছাড়া যাদের ডাক তারা তো খেজুরের আঁটির আবরণেরও অধিকারী নয়।’ (সূরা ফাতির : ১৩)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ক্ষুধা-তৃষ্ণার পাশাপাশি গরম ও শীতের তীব্রতার সময় সাহাবায়ে কেরামকে ধৈর্য ধরতে উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি জোর দিয়ে বলতেন, কষ্ট অনুপাতে আকাক্সক্ষা পূরণ হয়। ক্লেশ ছাড়া গৌরব অর্জন করা যায় না। জান্নাত অপ্রীতিকর বিষয় দ্বারা আবৃত আর জাহান্নাম আবৃত কামনা-বাসনা দ্বারা। সুখ দ্বারা সুখ পাওয়া যায় না। আল্লাহর রাসুল আমাদের সুখে-দুঃখে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করতে ও দ্বীনের জন্য ত্যাগ ও কোরবানির শিক্ষা দিয়েছেন।

ভালো কাজ ও সৎকর্ম অনিষ্টের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। বিপদ ও সংকট দূর করতে এবং উন্নতি ও সমৃদ্ধি ঘটাতে সবচেয়ে বড় উপায় হলো দুস্থ-দরিদ্রকে সহযোগিতা করা। বিশেষ করে শীতের প্রকোপের সময়। আপনারা অভাবীদের খোঁজখবর নেবেন। তাদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করবেন।


২০ রবিউল আওয়াল ১৪৩৯ হিজরি মসজিদে নববির জুমায় শায়খ ড. আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমান বুয়াঈজান প্রদত্ত খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন মাহমুদুল হাসান জুনাইদ




কৃতজ্ঞতা : আলোকিত বাংলাদেশ

সংশ্লিষ্ট খবর