বৃহঃস্পতিবার ২০শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ |

বড়দের চেয়ে শিশুরা বড়

 মঙ্গলবার ১৯শে ডিসেম্বর ২০১৭ সকাল ১১:০৪:১৬
বড়দের

পৃথিবীর সব শিশুই সুন্দর। কিন্তু এ কথা বলা যাবে না যে সব বড় (বয়স্ক অর্থে) মানুষই সুন্দর। সব বয়স্ক মানুষ যদি সুন্দর হতো, তাহলে পৃথিবীতে কোনো হানাহানি-কাটাকাটি থাকত না। মানুষের হাতে মানুষ মারা যেত না।

আজ মঙ্গলবার প্রথম আলোয় ‘লাল মাফলারে ট্রেন রক্ষা’ শিরোনামের খবরটি পড়ে এত ভালো লাগল যে সেই অনুভূতি পাঠকদের সঙ্গে শরিক করতে চাই। খবরটি পাঠিয়েছেন প্রথম আলোর রাজশাহী প্রতিনিধি আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ। তিনি বিখ্যাত মানুষকে নিয়ে বেশি রিপোর্ট করেননি। তবে তাঁর রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর অনেকে বিখ্যাত হয়েছেন। পলান সরকার নামের একজন মহৎ মানুষকে দেশবাসীর কাছে তুলে ধরেছেন আজাদ। সেই পলান সরকারের খ্যাতি দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে পৌঁছেছে। তিনি বিনে পয়সায় সবার মধ্যে বই বিলান। নিজের বাড়িতে পাঠাগার গড়ে তুলেছেন। আজাদ আরেক মহৎ মানুষকে নিয়ে রিপোর্ট করেছিলেন, যিনি শত শত তালের আঁটি কুড়িয়ে সড়কের পাশে লাগিয়েছিলেন।

এবারে আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ রিপোর্ট করেছেন দুই শিশুকে নিয়ে। তারা হলো ঝিনা গ্রামের শিহাবুর রহমান ও টিটোন আলী। বয়স ছয় ও সাত বছর। রেললাইনের পাশেই বাড়ি। গতকাল সোমবার সকাল আটটার দিকে একটি ট্রেন যেতেই ঝিনা রেলগেটের কাছে তারা বিকট শব্দ শুনতে পায়। সেখানে গিয়ে শিশু দুটি দেখতে পায়, রেললাইনের কিছু অংশ ভাঙা। এর কিছুক্ষণ পর একই দিক দিয়ে আরেকটি ট্রেন আসছিল। তখনই তারা বুদ্ধি করে গলায় থাকা মাফলার নাড়িয়ে ট্রেনটিকে থামানোর চেষ্টা করে। প্রথমে ট্রেনচালক ভ্রুক্ষেপ না করলেও পরে ট্রেনের গতি কমিয়ে দেন। ট্রেনটি পুরোপুরি থামালে দুর্ঘটনা থেকে রেহাই পায়। সেটি ছিল একটি মালবাহী ট্রেন। ট্রেনটি যখন আসে, তখন লাইনম্যান গরহাজির থাকেন। কেননা, তিনি ছিলেন বড়।

শিশু দুটির উপস্থিত বুদ্ধিতে ট্রেনটি রক্ষা পায়। স্থানীয় সাংসদ ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম দুই শিশুকে পড়াশোনার জন্য প্রতি মাসে এক হাজার টাকা করে বৃত্তি দেওয়ার ঘোষণা দেন। বলেছেন, স্কুলের পাঠ শেষে তারা যদি উচ্চশিক্ষা নিতে চায়, সেই দায়িত্বও তিনি নেবেন।

এই ঘটনা থেকে আমরা কী শিক্ষা পেলাম? শিক্ষা পেলাম যে বড়দের অনেকেই দায়িত্বশীল নয়। ছোটরাই দায়িত্বশীল। তারা যখন মনে করেছে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, সেটি বন্ধ করতে নিজেদের উপস্থিত বুদ্ধি কাজে লাগিয়েছে। আর শিক্ষা পেলাম, যাঁর দায়িত্ব ছিল দুর্ঘটনা রোধে ট্রেনচালককে সংকেত দেবেন, তিনি সেখানে উপস্থিতই ছিলেন না। শিশু দুটি চালককে সংকেত না দিলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। ট্রেনটি যাত্রীবাহী না হলেও দুর্ঘটনা ঘটলে চালকের প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল। শিশু দুটি আমাদের শিক্ষা দিল যে কারও অপেক্ষায় না থেকে মানুষের বিপদে এগিয়ে আসতে হয়।

এই প্রসঙ্গে একটি কথা মনে হলো। যদি ওই দুটি শিশুর স্থলে বড় কেউ থাকত, তাহলে দুর্ঘটনা রোধ করার আগে হয়তো ব্যক্তিগত লাভালাভ নিয়ে বেশি চিন্তা করত। আর দুজন লোকের মধ্যে যদি একজন আওয়ামী লীগের, আরেকজন বিএনপির সমর্থক হতেন, তাহলে তাঁরা কোনো অবস্থায় একমত হতে পারতেন না। একজন ট্রেন থামাতে চাইলে আরেকজন তার ভেতর রাষ্ট্রদ্রোহ কিছু দেখতেন। আবার দুজন যদি ট্রেন থামানোর চেষ্টাও করে থাকেন, কে আগে করেছেন, কার রুমাল বেশি লাল ছিল, সেটি নিয়ে মহাবিতর্কে লিপ্ত হতেন।

এ কারণেই বলছি, বড়দের চেয়ে ছোটরা ভালো। ছোটরা এখনো নিষ্পাপ। কোনো কালিমা তাদের স্পর্শ করেনি। প্রাণের গভীর থেকে ওই দুটি শিশুকে অভিনন্দন। তাদের জন্য রইল ভালোবাসা, শুভকামনা।

এ প্রসঙ্গে রুশ লেখকের সেই বিখ্যাত গল্পের কথা মনে পড়ে। দুই শিশুর মধ্যে ঝগড়া বেধেছে। সেই ঝগড়ায় শামিল হয়েছে দুই শিশুর বাবা-মাও। তাদের মধ্যে বাদানুবাদ একপর্যায়ে সংঘাতে রূপ নেয়। তারপর যখন দুই পক্ষই মারামারি করে পরিশ্রান্ত, তখন দেখতে পায় ঝগড়া করা শিশু দুটি আবার মিলে গেছে। তারা একসঙ্গে বসে গল্প করছে।

আমাদের বড় মানুষেরা রুশ গল্পের কিংবা মাফলার উড়িয়ে ট্রেন থামানো দুই শিশুর কাছ থেকে শিক্ষা নিলে দেশে হানাহানি অনেকাংশে কমে যেত। আমরা বড়রা শিশুদের মতো বড় না হতে পারি, অন্তত তাদের ভুল শিক্ষা না দিই। প্রশ্নপত্র ফাঁস করে তাদের জীবনটাকে ফাঁদে না ফেলি।

কৃতজ্ঞতা : প্রথম আলো


সোহরাব হাসান

কবি ও সাংবাদিক।

সংশ্লিষ্ট খবর