রবিবার ২৪শে জুন ২০১৮ |

নকশি কাঁথার মাঠ : গ্রামীণ জীবনের নান্দনিক বয়ান

গালফ বাংলা |  শনিবার ২৩শে ডিসেম্বর ২০১৭ দুপুর ০২:৪৯:৫৩
নকশি

কবিতা। এই একটিমাত্র শব্দে আটকে যায় অনেক কিছু। আটকে যায় পৃথিবীর সব  প্রেম, সব ভালোবাসা। সব আনন্দানুভূতি ও নন্দনদৃশ্য। কবিতা ফুটিয়ে তুলে  হৃদয়ের অতল থেকে অধরা ভাষা, অব্যক্ত আশা।
প্রেম ও কবিতা মানুষের জীবনে  মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। পৃথিবীর কোনো ভাষা কবি ও কবিতাহীন বাঁচতে পারে না। আর  প্রেমহীন কবিতা প্রায় শ্রীহীন হয়ে পড়ে। ইচ্ছে হয় বলি, প্রেমকে স্বার্থকভাবে  ফুটিয়ে তোলার জন্যই কবিতার জন্ম। প্রেমহীন কবিতা আর কবিতাহীন প্রেম দু'টোই  নিষ্প্রাণ।
বাংলা কবিতায় প্রেমের ইতিহাস অনেক পুরনো। রোমান্টিক  কাব্যধারায় যে-সব উল্লেখযোগ্য কবি তাদের প্রতিভার নিদর্শন রেখে গেছেন তার  একটা তালিকা এরূপ হতে পারে--
পনের শতকের শাহ মুহম্মদ সগীর লিখেছেন ‘ইউসুফ জোলেখা।'
 ষোল শতকের দৌলত উজির বাহরাম খান ‘লাইলি মজন,’ মুহম্মদ কবির ‘মধুমালতি,'  সাবিরিদ খান ‘হানিফা-কয়রাপরী’ ও ‘বিদ্যাসুন্দর’, দোনাগাজি চৌধুরী  ‘সয়ফুল-মুলুক বদিউজ্জামান।' সতের শতকের দৌলত কাজী লিখেছেন  ‘সতীময়না-লোরচন্দ্রানী’, আলাওল ‘পদ্মাবতী’ ও ‘সপ্তয়কর’, কোরেশী মাগন ঠাকুর  ‘লালমতী সয়ফুল মুলুক’, নওয়াজিস খান ‘গুলে বকাওলী’, মঙ্গল চাঁদ ‘শাহজালাল  মধুমালা’, সৈয়দ মুহম্মদ আকবর ‘জেবলমুলুক শামারোখ’।
আঠার শতকের মুহম্মদ মুকিম লিখেছেন ‘মৃগাবতী’ আর শেখ সাদী রচনা করেছেন ‘গদামল্লিকা’।
 এ সংক্ষিপ্ত প্রণয়োপাখ্যানেতিহাসের পর অত্যন্ত প্রতাপ, প্রভাব এবং  শক্তহাতে সফলতার সাথে যিনি প্রেমোপাখ্যান আমাদেরকে উপহার দিয়েছেন, তিনি  পল্লিকবি জসীম উদদীন। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ হচ্ছে তাঁর ‘নকশি কাঁথার মাঠ’  কাব্যগ্রন্থ।
জসিম উদদীনের কবিতায় সাধারণত গ্রামবাংলার চিত্রই ফুটে  ওঠে। ভাষা পায় গ্রামীণ মানুষের চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা। গ্রামের প্রতি  তাঁর আকর্ষণও ছিল প্রবাদতুল্য। এ বিষয়ে হাসান হাফিজুর রাহমানের ভাষ্য--  “জসীম উদদীন স্বতন্ত্র এক ব্যক্তিত্ব হতে পেরেছেন এই জন্য যে, গ্রাম তাঁর  কাছে এক পরিপূর্ণ বিশ্ব, তার নিজস্ব শেকড় এর মধ্যে প্রোথিত। এক বিস্তৃত  পারস্পেকটিভের মধ্যে লোকজীবনের তাৎপর্য তিনি বিধৃত করেছেন, এর বর্তমান, এর  আবহমান ঐতিহ্যের সূত্রে তিনি গেঁথে তুলতে পেরেছেন এবং তিনিই প্রথম কবি যিনি  গ্রামীণ উপকরণ শুধু নয়, এর ভাষা ও ভাব প্রকাশের মেজাজ, কল্পনা-প্রবণতা ও  ভঙ্গিকে বাংলা কাব্যে ইতিমধ্যে সুগঠিত ও অগ্রসর শিল্প-সভ্যতার  আত্মমর্যাদাসহ সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।”
আর জসীম উদদীনের অমর কীর্তি ‘নকশি কাঁথার মাঠ’ সম্পর্কে ড. দীনেশচন্দ্র সেন মন্তব্য করেন--
 “নকশি কাঁথার মাঠে এমন অনেক কথা আছে, যা বাংলার আর কোনো কবি এভাবে লিখিতে  পারিতেন কিনা সন্দেহ। নকশি কাঁথার মাঠে কবি দেশের পুরাতন রত্ন-ভাণ্ডারকে  নূতন নূতনভাবে উদ্ধার করিয়াছেন। সঙ্গে সঙ্গে আগত রাজ্যের বার্তা বহিয়া  আনিয়াছেন। ‘রাখালী’ নামক কাব্যে ইহার প্রতিভার যে পরিচয় পাইয়াছিলাম, নকশি  কাঁথার মাঠে তাহার পূর্ণ বিকাশ দেখিতে পাইতেছি।”
জসীম উদদীনের ‘নকশি কাঁথার মাঠ’ পড়ে প্রভাবিত হন নি উভয়-বাংলায় এমন কবির সন্ধান পাওয়া কঠিন।
 এ কাহিনীকাব্য গ্রামের দুই কিশোর-কিশোরীর প্রেমাখ্যান অবলম্বনে রচিত।  চৌদ্দটি ছোট ছোট দৃশ্যপটে কবিতাটি সাজানো। প্রত্যেক দৃশ্যপটে বাংলার  গ্রামীণ-জীবনের অপরূপ ছবি তিনি এঁকেছেন। বলেছেন তাদের জীবন-যাত্রার কথা।  পাশাপাশি থাকা দু’টি গ্রামের বর্ণনা দিচ্ছেন কবি--
“এ-গাঁও ও-গাঁও মধ্যে ত দূর-- শুধুই জলের ডাক,
তবু যেন এ-গাঁয় ও-গাঁয় নাইকো কোনো ফাঁক।
ও-গাঁর বধূ ঘট ভরিতে যে ঢেউ জলে জাগে,
কখন কখন দোলা তাহার এ-গাঁয় এসে লাগে,
এ-গাঁর চাষী নিঘুম রাতে বাঁশের বাঁশীর সুরে,
ওইনা গাঁয়ের মেয়ের সাথে গহন ব্যথায় ঝুরে!
এ-গাঁও হতে ভাটীর সুরে কাঁদে যখন গান,
ও-গাঁর মেয়ে বেড়ার ফাঁকে বাড়ায় তখন কান।
এ-গাঁও ও-গাঁও মেশামেশি কেবল সুরে সুরে,
অনেক কাজে এরা ওরা অনেকখানি দূরে।”
 এভাবে ছত্রে ছত্রে ভেসে ওঠেছে গ্রামের নান্দনিক দৃশ্য। ফুটে ওঠেছে তাদের  চাল-চলন, ওঠা-বসা, আহার-নিদ্রাসহ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনেক চিত্র। ঝরে পড়েছে  একের তরে অন্যের প্রেম-ভালোবাসা, অনুরাগ-প্রীতি। স্পষ্ট হয়েছে গ্রামের  মাঠ-ঘাট, নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-ঝিলসহ প্রাকৃতিক নানান দৃশ্য। ছন্দের এমন  নিপুণ গাঁথুনিতে গ্রামকে কেবল জসীম উদদীনই উপস্থাপন করতে পারেন। কারণ তিনি  গ্রামকে পরিপূর্ণ বিশ্ব হিসেবে দেখেছেন।
‘ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড়  ছোট ছোট গ্রামগুলি’-কে যারা জসীম উদদীনের মতো অন্তরের দরদ ও ভালোবাসা  মাখিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখেছেন কেবল তারা পারেন গ্রামকে এমন হৃদয়কাড়া করে  উপস্থাপন করতে।
এ কাহিনীকাব্যের মূল বক্তব্য হচ্ছে রুপা ও সাজুর  প্রেম। কৈশোরিক দূরন্তপনায় লুকিয়ে লুকিয়ে প্রথমে প্রেম। তারপর পারিবারিক  সম্মতিতে ধুমধাম করে বিয়ে। অতঃপর লাঠিযুদ্ধ থেকে ফিরে রুপার নিরুদ্দেশ  হওয়া। রুপার বিয়োগে সাজুর নকশি কাঁথা তৈরি। অবশেষে তার মৃত্যু।
(বই নিয়ে ২)
 এই বিবরণ দিতে কবির লেগেছে শ’য়ের কাছাকাছি পৃষ্ঠা। উদাহরণের মাধ্যমে  কিছুটা সামনে আসুক। বিভিন্ন গ্রাম্য উপমার সাহায্যে কবির ভাষায় রুপার  পরিচয়--
“এই গাঁয়ের এক চাষার ছেলে লম্বা মাথার চুল
কালো মুখেই কালো ভ্রমর, কিসের রঙিন ফুল!
কাঁচা ধানের পাতার মতো কচি-মুখের মায়া,
তার সাথে কে মাখিয়ে দেছে নবীন তৃণের ছায়া।
জালি লাউয়ের ডগার মতো বাহু দুখান সরু,
গা খানি তার শাঙন মাসের যেমন তমাল তরু।
বাদল-ধোয়া মেঘে কেগো মাখিয়ে দেছে তেল,
বিজলী মেয়ে পিছলে পড়ে ছড়িয়ে আলোর খেল।”
এর পরপরই জসীম উদদীন সাজুকে তুলে ধরেন পাঠকের সামনে--
“সেইখানে এক চাষীর মেয়ে নামটি তাহার সোনা,
সাজু বলেই ডাকে সবে নাম নিতে যে গোনা।
লাল মোরগের পাখার মতো উড়ে তাহার শাড়ী,
ভোরের হাওয়া যায় যেন গো প্রভাতী মেঘ নাড়ি।
মুখখানি তার ঢলঢল ঢলেই যেত পড়ে,
রাঙা ঠোঁটের লাল বাঁধনে না রাখলে তা ধরে।”
 উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি রুপা ও সাজুর প্রেম, ঘটকালি,  বিয়ে, বাসর, ঘর-সংসার ও তাদের বিচ্ছিন্ন হওয়া প্রতিটি ক্ষেত্রকেই  বৈচিত্র্যময় নিপুণতার সাথে বর্ণনা করেছেন।
এ ক্ষেত্রে সৈয়দ আলী আহসান সুন্দর মন্তব্য করেছেন-
 “গ্রাম্য-জীবন ও গ্রাম্য-পরিবেশ তার কাব্যের উপাদান যুগিয়েছে এবং কবিতার  কলা-কৌশলের মধ্যেও গ্রাম্য আবহকে আমরা মূর্ত হতে দেখি। কিন্তু তাই বলে তিনি  পরিপূর্ণভাবে গ্রাম্য কবি নন। তাঁর কারণ উপমা ও রূপক প্রয়োগে তিনি যথেষ্ট  অনুশীলনের পরিচয় দিয়েছেন এবং কাব্যকাহিনী নির্মাণে উপন্যাসের গঠনপ্রকৃতিকে  অবলম্বন করেছেন।”
প্রসঙ্গত এখানে আল মাহমুদের বক্তব্যও উল্লেখ করা যায়--
 “কথার পরতে পরতে তিনি রঙিন আবীর ঢোকাতে থাকেন। আমাদের চোখের সামনে কাঁপতে  থাকে নদী, সাদা বকটি তার পা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে, ভরা কলসী ভারে বাঁকা হয়ে  হেঁটে যায় গ্রামের মেয়েরা, উতল বাতাস কৃষাণীর বুকের কাপড় উড়িয়ে নেয়। এইসব  জসীম উদদীনের কবিতার অতি পরিচিত বহু ব্যবহৃত পটভূমি। বাংলার মুসলমান চাষী  পরিবারের কারুময় ঝুলন্ত শিকা থেকে আরম্ভ করে এক অপরূপ নকশি কাঁথা তিনিই  প্রথম আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেন।”
উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্প  হচ্ছে কবিতার প্রাণ। শব্দ যতই উপযুক্ত হোক, বাক্যবন্ধন যতই উৎকৃষ্ট হোক  তাতে যদি উক্ত উপাদানগুলো না থাকে, তাহলে কবিতার আয়ু থাকে স্বল্প। অক্কা  পায় অতি শীঘ্রই।
‘নকশি কাঁথার মাঠ’ কালোত্তীর্ণ হওয়ার পেছনে  মর্মস্পর্শী কাহিনীর সাথে এ উপাদানগুলোরও ব্যাপক অবদান রয়েছে। কাব্যের  সৌন্দর্যবর্ধক বিপুল উপাদানের উপস্থিতি ‘নকশি কাঁথার মাঠ’ গ্রন্থে আমরা  লক্ষ্য করি।
উপমা, রূপক, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প, যথাযথ শব্দচয়ন, উপযুক্ত বাক্যবন্ধন জসীম উদদীনের কবিতাকে করেছে ঋদ্ধ। দিয়েছে সমৃদ্ধি।
 পল্লিকবি জসীম উদদীন আমাদের জন্য যে অমূল্য সম্পদ রেখে গেছেন তা যুগ যুগ  ধরে ব্যবহার করলেও বাসি হবার নয়। শহরের থাবায় আজকাল গ্রামগুলো মরে যাচ্ছে।  মরছে না কেবল জসীম উদদীন ও তাঁর সোনার গ্রামগুলি। গ্রামের চাহিদা যেমন  চিরন্তন পল্লিকবির কবিতার আবেদনও তেম্নি চিরায়ত। আমাদের সোনার গ্রামগুলো  হারাবে না। বেঁচে থাকবে যুগ-যুগান্তর। ইচ্ছে হলেই নকশি কাঁথা গায়ে জড়িয়ে  গ্রাম বেড়িয়ে আসব বারবার।


আলী আহমদ

নবধ্বনি, মার্চ ২০১৭

সংশ্লিষ্ট খবর