শুক্রবার ২১শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ |

কাশ্মিরে জনসংখ্যার চিত্র পাল্টে দেয়ার ষড়যন্ত্র

গালফ বাংলা |  রবিবার ২৪শে ডিসেম্বর ২০১৭ বিকাল ০৩:৫৭:৫৭
কাশ্মিরে

ভারতশাসিত কাশ্মির ১৯৮৯ সালে ভারতের কাছ থেকে স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার জন্য সশস্ত্র বিদ্রোহে ফেটে পড়েছিল। ২০০৮ সাল থেকে সেখানে ‘কাশ্মিরি ইনতিফাদা’ নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত একটি বেসামরিক প্রতিরোধের পুনরুত্থান ঘটে। ভারতের সামরিক হামলায় এ পর্যন্ত সামরিক-বেসামরিক মিলিয়ে ৮০ হাজারেরও বেশি কাশ্মিরি জীবন দিয়েছে। এখন ভারতীয় সংবিধানের একটি ধারা বিলুপ্ত করার মাধ্যমে কাশ্মিরিরা তাদের স্বায়ত্তশাসনের শেষ চিহ্নটুকুও হারাতে যাচ্ছে বলে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

২০১৫ সালে ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ (আরএলএস) সুপ্রিম কোর্টের কাছে সংবিধানের ৩৫ নম্বর ধারা বাতিল চেয়ে কথিত জনস্বার্থে করা (পিআইএল) একটি মামলার প্রতি সমর্থন দান করেছে। আদালত ছয় সপ্তাহের মধ্যে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

সংবিধানের এই ধারায় জম্মু ও কাশ্মির রাজ্যের যারা জন্মগত নাগরিক নয়, তাদের সেখানে স্থাবর সম্পত্তির মালিক হওয়ার অথবা রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার বা ভোটাধিকারের ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয়, ধারাটি অগ্রাধিকারমূলক এবং এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। সংবিধানের ধারা ৩৫৩ হচ্ছে- ধারা ৩৭০ এর চাবি। আর ৩৭০ ধারা হচ্ছে- দলিলের মূল আইন বা অনুবিধি, যেটাতে ভারতের সাথে কাশ্মিরের আপাতদৃষ্টিতে স্বায়ত্তশাসনের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিজেপি ঐতিহাসিকভাবে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন বিষয়ক মর্যাদার বিরুদ্ধে মারমুখো অবস্থানে রয়েছে আরআরএসএস সুস্পষ্টভাবে দাবি করছে- কাশ্মিরের ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ’ মুসলিমরা হলো ‘অত্যাচারী’ এবং দেশের জন্য ‘মাথাব্যথা’। ৩৫এ ধারা সরিয়ে ফেলার মাধ্যমে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। কাশ্মির ভূখণ্ডকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বিজেপি এসংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ বা নির্দেশ জারি করার বিষয় বিবেচনা করছে। কাশ্মিরিরা তাদের ভাষায় বিজেপির ‘ইসরাইলি মডেল’ কাশ্মিরে ভারতীয় শাসন প্রতিষ্ঠার পক্ষে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। উল্লেখ্য, ইসরাইলি মডেল বলতে কাশ্মিরের বাইরের লোকদের কাশ্মিরে এনে বসতি স্থাপনের সুযোগ করে দেয়ার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

বিভাজনের শিকার

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ কর্তৃক ভারত বিভক্তি বা বিভাজনের পর থেকে আজ পর্যন্ত কাশ্মির অঞ্চল একটি ক্ষত হয়ে আছে। মুসলিমপ্রধান কাশ্মিরের হিন্দু মহারাজা হরিসিং প্রথমে কাশ্মির ভারতের সাথে, না পাকিস্তানের সাথে যোগ দেবে সে ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিষয়টিকে অমীমাংসিত অবস্থায় রেখে দিয়েছিলেন। এমনকি সেখানে তার বিরুদ্ধে রাজতন্ত্রবিরোধী গণ-আন্দোলন দানা বেঁধে উঠলেও মহারাজা স্বাধীন থাকতে পারবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। কাশ্মিরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যখন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠল, তখন বিভাজনের বিষয় বিবেচনা করে তাদের হয় ভারত অথবা পাকিস্তানে যোগ দিতে হতো। মহারাজার সিদ্ধান্তহীনতা অব্যাহত থাকায় বিভাজনের কারণে সৃষ্ট সহিংসতা গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। রাজা পালিয়ে যেতে বাধ্য হন এবং কাশ্মিরকে ভারতের সাথে সংযুক্তির ঘোষণা দেন। কিন্তু একটি গণভোট অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত এই সংযুক্তি শর্তসাপেক্ষ ও ক্ষণস্থায়ী।

কাশ্মিরের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পর জাতিসঙ্ঘের মধ্যস্থতায় কাশ্মিরকে অস্থায়ীভাবে দুই ভাগে বিভক্ত করে শান্তি স্থাপন করা হয়েছিল। সেই বিভক্তি অনুসারে আজাদ কাশ্মিরকে পাকিস্তানের অধীনে একটি আধা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এবং কাশ্মির উপত্যকা এবং জম্মু ও লাদাখ প্রদেশকে ভারতের নিয়ন্ত্রণে দেয়া হয়।

জাতিসঙ্ঘ কাশ্মিরের জনগণের ভাগ্য চূড়ান্তভাবে নির্ধারণের জন্য গণভোট অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

এর এক বছর আগে ভারতের সাংবিধানিক পরিষদের কাছে প্রতিনিধি পাঠানোর জন্য কাশ্মিরসহ সব রাজাশাসিত রাজ্যকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। উল্লেখ্য, সাংবিধানিক পরিষদ গোটা ভারতের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন করেছিল। কাশ্মিরকে ভারতভুক্ত করায় মহারাজার ঘোষণার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পার্লামেন্টে কাশ্মিরের প্রতিনিধিরা নতুন সংবিধানের ৩৭০ ধারা অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে ভারত সরকারের সাথে আলোচনা করেন। ৩৭০ ধারায় কাশ্মিরকে প্রতিরক্ষা, মুদ্রা ও পররাষ্ট্র ছাড়া সব বিষয়ে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দেয়া হয়। এতে একটি পৃথক সংবিধান ও একটি পৃথক পতাকাও প্রতিষ্ঠিত হয়।

এ ধারার ফলে ভারতীয় সংবিধানের সব অনুবিধি কাশ্মিরে প্রয়োগযোগ্য হবে না এবং স্থানীয় সরকারের সাথে ঐকমত্যের প্রয়োজন হবে। এখন পর্যন্ত বহু কাশ্মিরি এটাকে গণভোটের স্থানে একটি দুর্বল ও অন্যায় প্রতিস্থাপন হিসেবে দেখে থাকেন। তারা এটাকে কাশ্মির ভূখণ্ডে অনধিকার প্রবেশের জন্য ভারতের প্রথম কৌশলী তৎপরতা বলে মনে করে।

৩৭০ ধারার মতো না হলেও ভারতীয় সংবিধানের ৩৫এ ধারার একটি ইতিহাস আছে ১৯৪৭ সালের আগের। ১৯৪৭ সালের আগে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে কাশ্মির ছিল একটি রাজকীয় রাজ্য। আর সেখানে বসবাসরত জনগণ ব্রিটিশ উপনিবেশের প্রজা নন- তারা ছিলেন ‘রাষ্ট্রের প্রজা’।

কাশ্মিরের মহারাজা ১৯২৭ সালে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত স্টেট সাবজেক্ট অর্ডার ঘোষণা করেছিলেন। ওই ঘোষণায় রাষ্ট্রীয় প্রজাদের সরকারি অফিসের অধিকার এবং জমি ব্যবস্থার ও মালিকানার অধিকার দেখা হয়। এই অধিকার অরাষ্ট্রীয় প্রজারা পাবে না। জন্মগত বা স্থানীয় শাসক দলীয় এলিটদের স্বার্থরক্ষা, বেশির ভাগ কাশ্মিরি হিন্দু পণ্ডিত জন্মগত না হলে এবং যারা প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করে আছেন ও কাশ্মিরে জমি ক্রয়-বিক্রয় করে থাকেন তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়। ভারতের সাথে স্বায়ত্তশাসন-সংক্রান্ত আলোচনায় রাষ্ট্রীয় প্রজা আইন অব্যাহত রাখার বিষয়টি একটি প্রধান বিষয় হিসেবে আলোচনায় স্থান পায়।

১৯৫৪ সালে ৩৫এ ধারার মাধ্যমে কাশ্মিরি আইন পরিষদ ‘স্থায়ী বাসিন্দা’র সংজ্ঞা নির্ধারণের জন্য প্রেসিডেন্টের একটি নির্দেশের অনুমোদন দেয়া হয়। ৩৫এ ধারার মাধ্যমে তাদের সুযোগ সুবিধার ব্যাপারেও নিরাপত্তা বিধান করা হয়। বেশির ভাগ কাশ্মিরি যারা ক্রমবর্ধমান ভারতীয় কর্তৃত্বকে ঘৃণা করেন তাদের কাছে এই আইনের অর্থ হচ্ছে, সম্পদ তুলনামূলকভাবে রক্ষা পাবে।

ভূমি গ্রাসের আশঙ্কা

১৯৯১ সাল থেকে কাশ্মির অঞ্চলকে সাত লাখ ভারতীয় সৈন্য মোতায়েনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের জন্য সশস্ত্রবাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন অপরিহার্য হয়ে ওঠে। বর্তমানে সেখানকার সৈন্য ও বেসামরিক লোকের অনুপাত হচ্ছে ১:৮; এর মাধ্যমে কাশ্মিরকে বিশ্বের অত্যধিক সামরিকীকৃত অঞ্চলের অন্যতম অঞ্চলে পরিণত করা হয়েছে। ৩৫এ ধারা বাতিল করা হলে কাশ্মিরিদের অবস্থা আরো ভয়ানক ও দুঃখজনক হবে।

কাশ্মিরে ভারতীয় বসতি স্থাপনকারীদের প্রবাহ বা স্রোতের যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা ওই অঞ্চলে ভারতের পক্ষে জনসংখ্যার পরিমাপকে বদলে দেবে। কাশ্মিরিদের এই আশঙ্কা সত্য। সম্প্রতি কাশ্মির রাজ্যসভার নির্বাচনের জন্য বিজেপি তাদের যে ম্যানিফেস্টো বা নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে তাতে বিজেপি অবসরপ্রাপ্ত সৈন্যদের জন্য কলোনি নির্মাণের লক্ষ্যে স্বল্পমূল্যে জমি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জুলাই মাসে পণ্য ও সেবা কর চূড়ান্তভাবে কাশ্মিরে আরোপ করা হলো। অথচ এই একক করব্যবস্থা গোটা ভারতে আরোপ করা হলেও কাশ্মির এর আওতাবহির্ভূত ছিল। কাশ্মিরে এই করারোপের কারণে জনগণ ও সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে প্রতিরোধস্পৃহা জাগ্রত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাশ্মির রাজ্যের আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের নিশ্চিতভাবে অবসান ঘটেছে।

ভূমি-জমি গ্রাস বা জবরদখল যেটাকে কাশ্মিরের রাজনৈতিক বিশ্লেষক শওকত হোসাইন ‘জনসংখ্যাগত সন্ত্রাসবাদ’ নামে আখ্যায়িত করেছিলেন- এই ভূমি গ্রাসের আশঙ্কায় ২০০৮ সালে কাশ্মিরে নতুন করে ইনতিফাদা শুরু হয়েছিল। ওই বছর কাশ্মির সরকার ৪০ হেক্টর বনভূমি অমরনাথ তীর্থ মন্দিরের জন্য ছেড়ে দিতে সম্মত হয়। অমরনাথ হিমালয় অঞ্চলের একটি হিন্দু তীর্থস্থান। ওই প্রস্তাবে তীর্থযাত্রীদের জন্য নতুন আবাসিক সুবিধাদানের জন্য গৃহনির্মাণও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কাশ্মিরের জনগণ সেখানে পৃথক বসতি স্থাপনের আশঙ্কায় এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমে আসে। প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতারা এটাকে ‘রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার’ তৎপরতা বলে আখ্যায়িত করেন। ২০০৫ সালে পূর্ব জেরুসালেমের হার হোমায় নতুন নির্মাণকাজ শুরু করার মাধ্যমে ইসরাইলি ভূমি কর্তৃপক্ষ একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিল।

হিন্দু উগ্রবাদী দলগুলো এই দিনগুলোতে জাতীয়তাবাদী আগুন জ্বালানো অব্যাহত রেখেছে। তারা ধর্মের সাথে রাজনীতিকে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করেছে। হিন্দু তীর্থযাত্রীরা তাদের আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় প্রচারকাজের চাইতে অধিকতর দেশপ্রেমিক কর্তব্য গণ্য করে কাশ্মিরে হিন্দু তীর্থস্থানে জমায়েত হচ্ছে। ১৯৬৩ সালে প্রায় চার হাজার তীর্থযাত্রী অমর নাথ পরিদর্শন করলেও ২০১৫ সালে ওই সংখ্যা দুই লাখে পৌঁছে যায়।

২০১৫ সালে কাশ্মিরের হাইকোর্ট ৩৭০ ধারাকে সংবিধানের ‘স্থায়ী’ ধারা হিসেবে উল্লেখ করে একটি ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিল। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করেছেন- পার্লামেন্টই কেবল এই ধারা অপসারণ করতে বা বাদ দিতে পারবে। তা সত্ত্বেও বিজেপি সব সময় দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলছে, তারা প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ৩৭০ ধারা বাতিল করে দেবে। ভারতে বিজেপির বর্তমান শক্তিমত্তা ও কাশ্মিরের কোয়ালিশন সরকারে তাদের প্রভাব-পতিপত্তিকে কাজে লাগিয়ে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল করতে বিজেপির তৎপরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ জন্য তাদের প্রথম অগ্রাধিকার হচ্ছে সংবিধানের ৩৫এ ধারা।

‘জেন্ডার বিচার’ বিতর্ক

সংবিধানের এ দু’টি ধারাকে বাতিল করে দেয়ার লক্ষ্যে এই দুটো ধারাকে নিয়ে ব্যাপকভাবে ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিজেপি নেতৃবৃন্দ প্রায়ই একটি যুক্তি হিসেবে জেন্ডার-বিষয়ক বিচারে সাহায্য প্রার্থনা করেন। সেটাকে সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞরা ভ্রমাত্মক ও বিপথগামী করার প্রয়াস বলে উল্লেখ করেন।

সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে কাশ্মিরের একজন হিন্দু নারী ৩৫এ ধারাকে ভোটাধিকার হরণ বলে দাবি করে মামলা দায়ের করেছেন; এটা অবশ্য বিশেষভাবে তারা একজন অনাবাসিক লোককে বিয়ে করলে। ২০০২ সালে কাশ্মিরে হাইকোর্টের একটি রুলিংয়ে এটা স্পষ্ট করা হয়েছে, কাশ্মিরের নারীরা কোনো অবস্থায় তাদের আবাসিক মর্যাদা হারাবেন না। এ ছাড়াও রাজতান্ত্রিক আইন অথবা নিউ স্টেট সাবজেক্ট ল-তে কখনো কোনো জেন্ডার বৈষম্য করা হয়নি। কিন্তু ৩৫এ ধারাকে বাদ দেয়ার জন্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দায়ের করা মামলায় এই সত্যকে গৌণ বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে।

এটা সত্য যে, ১৯৬০-এর দশকে কাশ্মিরের রাজস্ব মন্ত্রণালয় নারীদের জন্য আবাসিক সার্টিফিকেট ইস্যু করতে শুরু করে। এই সার্টিফিকেট কেবল বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত বৈধ বলে উল্লেখ করা হয়। যেসব কাশ্মিরি মহিলা অনাবাসিক লোকদের বিয়ে করে, তাদের আবাসিক স্ট্যাটাস নবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানায় মন্ত্রণালয়। কিন্তু আইনবিশেষজ্ঞরা জানান, ওই অন্যায় ঘোষণার কোনো ভিত্তি সংবিধানে নেই এবং এটাকে সমুন্নত করা উচিত নয়।

অধিকন্তু ২০০২ সালের রায়ে কাশ্মিরের নারীদের আবাসিক অধিকারকে স্পষ্ট করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারের একমাত্র ফাঁকের ব্যাপারে উদ্বেগ হচ্ছে, যেসব কাশ্মিরি নারী অনাবাসিক লোকদের বিয়ে করেছেন, তাদের শিশুদের অধিকার নিয়ে। কিন্তু এই অধিকারের ব্যাপারে ওই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছিল। তা সত্ত্বেও কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসনের বিরুদ্ধে জেন্ডার বৈষম্যকে ইস্যু বানিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

৩৫এ ধারার বিলুপ্তির আবেদন-সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের ডেটলাইনের ব্যাপারে উভয় পক্ষের সংবিধান বিশেষজ্ঞদের কাছে ইস্যুটি এখনো দুঃস্বপ্নের মতো। কয়েকজন আইন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ৩৫এ ধারাটি অপসারণ বা বাতিল করা যায় না। আবার অন্যরা এর সাথে দ্বিমত পোষণ করেন। অনেকে মনে করেন, কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসনের ব্যাপারে কারসাজি করা হলে পরিস্থিতি ১৯৪৭ সালের অবস্থানে গিয়ে পৌঁছবে; এমনকি গণভোট অনুষ্ঠান অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়তে পারে।

অপর দিকে কাশ্মিরি স্বাধীনতাকামীরা ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে ‘ডু অর ডাই’ নীতিতে অটল রয়েছেন এবং তাদের আন্দোলন আরো শক্তিশালী ও তীব্র হচ্ছে। এখন আন্দোলন কেবল স্বায়ত্তশাসনের জন্য নয়- ‘আজাদি’র জন্য। দশকের পর দশক ধরে ভারতের অন্যায্য রাজনৈতিক ও বর্বরোচিত সামরিক নীতির মোকাবেলা করে কাশ্মিরিরা এখন সব ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে। এমনকি জাতিসঙ্ঘ প্রস্তাব ও সাংবিধানিক আইন তাদের পক্ষে থাকা সত্ত্বেও তারা সবচেয়ে খারাপ পরিণতির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।


লিখেছেন : এথার জিরা

কবি ও রাজনৈতিক অ্যানথ্রোপলোজিস্ট

আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

নয়া দিগন্ত

সংশ্লিষ্ট খবর