রবিবার ২৪শে জুন ২০১৮ |
ছোটগল্প

ধূসর বিকেল

গালফ বাংলা |  সোমবার ২৫শে ডিসেম্বর ২০১৭ দুপুর ১২:২২:০৭
ধূসর

শরীরটা বেশ ভালো যাচ্ছে না তার। বয়সের ভারে সব কিছুই যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। রোদমাখা ঠনঠনা দিনেও ঝাপসা ঝাপসা ঠেকে দৃষ্টিসীমার আশপাশের পরিবেশ-প্রকৃতি আর আপন মানুষজনের চেহারাগুলো। শ্রবণক্ষমতাও চক্রবৃদ্ধিহারে হ্রাস পাচ্ছে দিন দিন।

আসরের নামায পড়ে দাওয়ায় বসে তাসবিহ জপছিলেন আনমনে। জীবনের শেষবিকেলে এসে সবার মতো তারও ইবাদত-বন্দিগিতে অসম্ভব রকম ঝোঁক বেড়েছে। সুবহে কাযিবেই ফজরের নামাযের তৈয়ারি শুরু করে দেন রীতিমতো। ছেলের বউ এসবে বিরক্ত হয়ে নাক ঝাড়ে। অযু করার সময় ইচ্ছের বিরুদ্ধে খকখকে কাশি শুরু হয় তার। ছেলেবউর ঘুম ভাঙবে বলে অযু করতে বারান্দা ছেড়ে উঠোনে যান তিনি। নিশুতি রাতে বাতাসে ভেসে যায় কাশির শব্দ। পাতাঝরা কাশির শব্দও সহ্য হয় না ছেলেবউ— আঁকশির।

দিনের বেলা ফুটফরমাশ করলে এই আক্ষরিক শব্দের তোড় ধরে বউ তাকে অভিধানের অশ্রাব্য সব বাক্যে শক্তগলায় বকতে থাকে। নিরূপায় বশির মিয়ার তখন অপরাধী বালকের মতো সব শুনে যেতে হয় বাক্যহীনভাবে। চোখের পানিতে পরনের পাঞ্জাবিটা ভিজে জবজব হয়ে যায় তার। বুকের ভেতর অনুভব করেন—মহা সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ। মনে মনে ভাবেন— রাফিদের মা-রাবেয়া মরে গিয়ে সুখেই আছে। বেচারী আজ বেঁচে থাকলে বউটা ভীষণ পীড়া দিতো তাকে।‌ বুকফাটা কান্নায় হাউমাউ জুড়ে নীরব পল্লিকে মাতিয়ে তুলতো সে।

জীবনের ধূসর এই বিকেলে নিঃসঙ্গ একাকিত্বের বিষাদমালা এখন আকাশ ছুঁয়ে আছড়ে পড়ে তার বুকের মধ্যিখানে। দীর্ণ করে পাঁজরের হাড়পাটি। স্ববীর্যের একমাত্র ছেলেটাও আজকাল বেশ পাত্তা দিচ্ছে না তাকে। কিছু বলতে গেলেই ধমকের সুরে বলে উঠে-

'বাবা! রাখো তোমার গ্যানগ্যানানি আর ফ্যানফ্যানানি। দিনভর ড্রাইব করে কার ভাল্লাগে এসব? শুধু শুধু...।'

অগত্যা দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে ব্যর্থ জীবনের গলিপথে হাঁটা শুরু করেন তখন। স্মৃতিচোখে ভেসে উঠে অতীতজীবনের কর্মমুখর সুদীপ্ত ক্যানভাস।

এই ক’বছর আগেও বিমানগতিতে রিক্সা চালিয়েছেন তিনি। পাঁজরভাঙা ভীষণ অসুস্থতায়ও ঘরে রাখতে পারেনি তাকে। অশান্ত সাগরের মাতাল ঢেউয়ের মতো দেহের পরতে পরতে লাফালাফি করা যৌবনের সমস্ত শক্তি আর সময়টা রাফিদের জীবন রাঙাতে স্বপ্ন দেখে দেখে কাটিয়ে দিয়েছেন। রাবেয়ার তাহাজ্জুদের ফসল এই ছেলেটাকে নিউমোনিয়ার ধকল থেকে বাঁচাতে ক্ষুধার্ত বুকে প্যাডেল মেরেছেন- চৈত্রের খাঁ খাঁ রোদ আর পৌষের হাড়কাঁপা তীব্র শীতেও। ঔষুধপত্র আর পারিবারিক খরচ মেটাতে সারা দিন রিক্সা চালিয়ে রাতের বেলা পাহারাদারির মতো নির্ঘুম কাজটাও করেছেন জীবনের শক্তিময় দীর্ঘ দশটি বছর। স্ত্রীর বুকফাটা কান্নায় ছেলেটা রোগমুক্তি পেলেও রোজগারে অলসতার ছাপ পড়েনি তার। মা-মরা ছেলেটাকে সমাজের উচ্চাসনে দেখার স্বপ্নে বিশ্রামহীন কর্মযুদ্ধ চালিয়ে গেছেন তিনি।

 কবরদেশে পাড়ি জমাবার নির্ধারিত বয়স পার হয়েছে আরো দশ বছর আগেই। এখন কেবল আজরাইলের আগমণ কামনা করেই কাটাচ্ছেন রাতদিন। বউছেলের ধমকের এই বজ্রাঘাত তার ভঙ্গুর জীবনের ভেতর ঠেলে দেয় আরেক জীবন। যেখানে গৌণের মৌনতা অবলম্বন করে চলতে হয় সকাল-বিকেল।

সহসা একটা কাক করুণ সুরে কা কা করে উড়ে যায় উঠোনে দাঁড়ানো নারিকেল গাছের চূড়া থেকে। এই কাকটা দেখে তার মনে পড়ে যায় বিয়েপূর্ব রাবেয়াময় জীবনকথা। গ্রামের পুবপাড়ায় রাবেয়াদের  বাড়ি। রাবেয়ার মা হাঁস পোষতেন। একদিন রাবেয়াদের হাঁসের ছা নিয়ে উড়ে যায় একটা ফাজিল কাক। সেদিন এই কাকটারে তাড়া করে স্কুলমাঠ পর্যন্ত দৌড়ে আসে রাবেয়া। বশির তখন ছবুর মোল্লার গরু রাখাল। স্কুলমাঠের পরেই ছিলো বিজনা নদী। ব্যর্থ হয়ে কাকের চৌদ্দগোষ্ঠিরে গালি দিয়ে ফিরে যাচ্ছিলো সে। তার মেয়েলিকণ্ঠের গালি শুনে বড় মায়া লাগে বশিরের । ওর অসহায় মুখের দিকে একবার তাকিয়ে খাঁটি মাইমালের মতো লুঙ্গিটা পট্টি করে ঝাঁপ দেয় নদীতে। প্রতিযোগীর মতো সাঁতার কেটে মুহূর্তেই পার হয়ে যায় আষাঢ়-ঢলে থৈ থৈ করা এই বিশাল নদী। ওপারের বটগাছটায় বসেছিলো দুষ্টু  কাকটা। মুক্তিবাহিনীর মতো সুনিপুণ কৌশলে ঢিল ছুঁড়ে রীতিমতো চকিয়ে দেয় বজ্জাতটারে। হাঁসের বাচ্চাটি ফেরত পেয়ে অসম্ভব রককমের খুশি হয় রাবেয়া। এর কদিন পরেই ওর চাচা বিয়ের আলাপ নিয়ে আসেন বশিরের মার কাছে।

এসব ভাবতে ভাবতে বশির মিয়া দেখেন, ক্লান্ত সূর্যটা সুবোধ বালকের মতো নিজেকে সঁপে দিচ্ছে পশ্চিমের পাঁশুটে আঁচলে। কষ্টচাপা একটা দীর্ঘশ্বাসের সাথে ষাট বছরের বৃদ্ধ বশির মিয়ার মুখে বেরিয়ে আসে ব্যর্থ প্রেমিকের কবিতা-

বাগান উজাড় করে

রাতদিন ফুল ছিটালাম

প্রেয়সী হে

তোমার চুলে

সময়ভেলা চড়ে

কাঁটাবিক্ষত এই

আমাকেই আজ

গেছিস ভুলে?!

মৃত্যুর তিন বছর আগে একরাতে হঠাৎ রাবেয়া বলে উঠে-

'নদীপারের  কথাডা তোমার কি মনে আইচ্ছে? হেইদিন তুমি এই কামডাটা না কইরলে তোমার আমার ইয়ে অইতো না। জানো...'

এভাবে একদিন মধ্যরাতে সাংসারিক দিনলিপি পাঠের প্রেমাসরে রাফিদের মা বলেছিলো—

‘ও রাফিদেরর বাপ, এহন রিক্সা চালানো বাদ দেও! রাফিদের বেতুন দিয়া তো আমাগো কোনো রহম চইল্লা যাইবো। কী দরহার এতো মেন্নতের (?) শইলডার দিহে একঢু তাহায়া দেহেন, কী ছিলো আর কী হোইছে?

: তা তো ঠিক। কিন্তু বালা একডা সংসারের মাইয়্যারে ছেলেবউ কইরতে  অইলে তো মেলা পয়াসার দরহার রাবেয়া। তুমি কি চাওনা, ভালো একডা মাইয়্যারে ছেলেবউ কইরতে?’

মুতিউল মুরসালিন

মুতিউল মুরসালিন

তরুণ গল্পকার, সিলেট

সংশ্লিষ্ট খবর