মঙ্গলবার ১১ই ডিসেম্বর ২০১৮ |

জেরুসালেমের ওপর ইসরাইলি দাবির খণ্ডন

গালফ বাংলা |  সোমবার ২৫শে ডিসেম্বর ২০১৭ দুপুর ১২:৪৪:৩৭
জেরুসালেমের

ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল ধাপে ধাপে তার লক্ষ্য পূরণে অগ্রসর হচ্ছে।

ফিলিস্তিনে ইহুদিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে তারা প্রধানত দুটি যুক্তি উপস্থাপন করে। একটি ধর্মতাত্ত্বিক; অপরটি নৃতাত্ত্বিক। এক. এটি তাদের পিতৃপুরুষদের ভূখণ্ড, যা ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে তারা জয় করতে পেরেছিল। প্রায় দুই হাজার বছর আগে তারা ফিলিস্তিন হতে বিতাড়িত হয়। এই দীর্ঘ সময়ে তারা ‘প্রমিজ ল্যান্ডে’র কথা ভুলেনি। দুই. ইহুদি জাতি অবিমিশ্র মানবগোষ্ঠী। তারা যেখানেই গমন করেছে নিজেদের স্বকীয়তা ও বংশধারার বিশুদ্ধতা রক্ষা করেছে। ইহুদিবাদ অত্যন্ত রক্ষণশীল ধর্ম; তাই ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের এই ধর্মে প্রবেশের প্রবণতা কম ছিল। অতএব, ফিলিস্তিনের আদি বাসিন্দাদের অবিমিশ্র উত্তরসূরি হিসেবে ওখানে বসবাসের অধিকার তাদেরই বেশি।

ইহুদিরা নিজেদের ইতিহাস নাবী ইবরাহিম আ:-এর সাথে সম্পর্কিত করে। মহান এই নবীর জন্ম প্রাচীন ইরাক তথা ব্যাবিলনে। ইবরাহিম আ:-এর গোত্র তো বটেই, তার পিতাও মূর্তিপূজক ছিলেন। ব্যাবিলনের লোকেরা তার দাওয়াতে সাড়া তো দেয়নি, উল্টো তাকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। মহান আল্লাহ তার নবীকে আগুন হতে রক্ষা করেন। আল্লাহর নির্দেশ ইবরাহিম আ: হিজরত করে আরো কেলদানিন হয়ে মিসরে উপনীত হন। বহু ঘটনার পর তিনি মিসর হতে প্রত্যাবর্তন করেন। তার এক স্ত্রী হাজেরকে পুত্র ইসমাঈলসহ মক্কার তৃণহীন মরুভূমিতে বসবাস করান। ইসমাইল আ: ও তার মাকে কেন্দ্র করে সেখানে একটি জনবসতি গড়ে ওঠে। আরবের জুরহাম গোত্রে বিয়ে করেন ইসমাঈল আ:। তার উত্তর পুরুষ হলেন মহানবী মুহাম্মদ সা:।

ইবরাহিম আ: তার অপর স্ত্রী সারাসহ বসবাস করেন আরবের উত্তরে কেনআন নামক এলাকায়। এই অঞ্চলটি পরবর্তীতে ফিলিস্তিন নামে পরিচিতি লাভ করে। সেখানে তার অপর পুত্র ইসহাক আ:-এর জন্ম। তারা যে গ্রামে বসবাস করতেন সেটি বর্তমানে হেবরন নামে পরিচিত। ইসহাক আ:-এর পুত্র ইয়াকুব আ:ও নবী ছিলেন। তার অপর নাম ইসরাঈল। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে ইবরাহিম আ:-এর পরিবার এই অঞ্চলে অভিবাসী ছিলেন। এখানকার আদি জনগোষ্ঠী ছিল কেনআনি (বা কনআনি) গোত্রভুক্ত, যাদের আদি নিবাস ছিল আরবে। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের প্রারম্ভে তারা আরবের বেদুইন জীবন ছেড়ে ফিলিস্তিনে গিয়ে থিতু হয়। অর্থাৎ ফিলিস্তিনের আদি অধিবাসীরা আরব জাতিভুক্ত ছিল।

আল-কুরআন ও বাইবেলের বিবরণ অনুসারে ইয়াকুব আ:-এর এক পুত্র ইউসুফ তার ভাইদের ষড়যন্ত্রে মিসরে নীত হন (খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ১৬০০)। সেখানে এক অমাত্যের স্ত্রীর চক্রান্তে তিনি কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। কয়েক বছর পর মিসরের বাদশাহের স্বপ্নের ব্যাখ্যার সূত্রে তিনি কারাগার হতে মুক্তিলাভ করেন। রাজা তাকে খাদ্যব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত করেন। ওই দিকে মিসর ও পার্শ্ববর্তী দেশ কেনআনে দুর্ভিক্ষ শুরু হলে ইউসুফ আ:-এর ভায়েরা খাদ্যের সন্ধানে মিসরে গমন করেন। তারপর ইউসুফ আ:-এর অনুরোধে তার পিতামাতা ও বাকি এগারো ভাই মিসরে স্থানান্তÍরিত হন (ইউসুফ আ:-এর মিসর গমনের ২৭ বছর পর)। এভাবে ইয়াকুব (আ:) বা ইসরাইলের পুত্ররা অর্থাৎ বনি ইসরাইল কেনআন হতে মিসরে স্থানান্তরিত হন। এটি ছিল স্বৈচ্ছিক স্থানান্তর, কেউ তাদেরকে বিতাড়িত করেনি।

মিসরে বনি ইসরাইলের বংশবৃদ্ধি হয়। এ সময় বনি ইসরাইলের সাথে স্থানীয় কিবতিদের বংশধারার মিশ্রণ হয়নি এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ আমাদের কাছে নেই, ইহুদিদের কাছেও নেই। প্রায় সাড়ে তিন শ’ বছর পর ইয়াকুব বংশে জন্মগ্রহণ করেন নবী মুসা আ:। ওই সময় মিসরে বনি ইসরাইলের ওপর ফেরাউন বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন চলছিল। নবুওয়াতপ্রাপ্তির পর মুসা আ: দীর্ঘ দিন দাওয়াতি কাজ পরিচালনা করেন। কিন্তু কোনো ফল এলো না। ফেরাউন তো বটেই; বনি ইসরাইলের অনেকেই মুসা আ:-এর ওপর ঈমান আনল না। আল্লাহর নির্দেশে মুসা আ: তার অনুসারীদের নিয়ে লোহিত সাগর পার হয়ে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে চলে এলেন। এটি ১২২১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ঘটনা।

জেরুসালেমে প্রবেশের পর ইহুদিদের মাঝে চরম বিভক্তি ছড়িয়ে পড়ে। তাদের বারো গোত্র একক নেতৃত্বের অধীনে বসবাস করতে অস্বীকার করে। ফলে বারো গোত্রে বারো জন বিচারক নিয়োগ করা হয়। এ ব্যবস্থায় তারা প্রায় সাড়ে তিন শত বছর শাসিত হয়। এ সময় ইহুদিদের নৈতিক অবস্থারও অবনতি হয়। মুশরিক জাতিগুলোর নানা আকিদা-বিশ্বাস ও পাপাচার ও সংস্কৃতি ইহুদিদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। অপর দিকে অইহুদি রাষ্ট্রগুলোর মোর্চা ইহুদিদের কাছ থেকে তাদের ভূমি কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এমতাবস্থায় বনি ইসরাইল একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এবং তারা নবী শামুয়েলকে একজন রাজা নিয়োগ দেয়ার জন্য অনুরোধ করে। রাজা হিসেবে তালুতকে নিয়োগ দিলেন শামুয়েল। তারপর তিনজন পরাক্রমশালী রাজা তালুত, দাউদ আ: ও সুলায়মান আ:-এর নেতৃত্বে ইহুদিরা ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। তবে ফিলিস্তিনে যেসব জাতিগোষ্ঠীর লোক প্রাচীনকাল থেকে বসবাস করে আসছিল তাদেরকে পদানত করা হলেও বিতাড়িত করা হয়নি বা ধ্বংস করা হয়নি।

তাদের অনেকেই ইহুদি ধর্মমত গ্রহণ করেন, কেউ কেউ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় পদও গ্রহণ করেন। এর প্রমাণ হলো, নবী দাউদ আ:-এর স্ত্রী বৎশেবার পূর্বস্বামী উরিয়া, যিনি ইহুদি রাষ্ট্রের পক্ষে সামনের সারিতে যুদ্ধ করতে গিয়ে সীমান্তে মারা যান, তিনি ছিলেন হিত্তিয় বংশোদ্ভূত। আবার নবী সুলায়মান আ: হায়কাল নির্মাণের জমিটি ক্রয় করেছিলেন ইয়াবুসি জাতির এক লোকের কাছ থেকে।

সে যাই হোক, বনি ইসরাইলের দুর্ভাগ্য এই যে, তাদের ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র সত্তর বছরের বেশি স্থায়ী হলো না। সুলায়মান রা:-এর মৃত্যুর পরই ফিলিস্তিন দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সামেরিয়াকে রাজধানী করে উত্তরে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসরাইল রাষ্ট্র, জেরুসালেমকেন্দ্রিক দক্ষিণ রাষ্ট্রের নাম দেয়া হয় ইয়াহুদিয়া। অচিরেই পূর্বপুরুষের রোগ তাদেরকে পেয়ে বসে। মুশরিকি জাতিগুলোর আকিদা-বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও পাপাচার তাদেরকে গ্রাস করে। একপর্যায়ে অ্যাসিরিয়ার রাজা সারগুণ ৭২১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ইসরাইল রাষ্ট্রের অবসান ঘটান। ২৭ হাজার ইহুদিকে অ্যাসিরিয়ার পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয়া হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯৮ অব্দে ব্যাবিলনের রাজা বখতে নসর (নেবুচাদ নেজার) জেরুসালেম দখল করেন। ইহুদিরা বিরোধিতা অব্যাহত রাখলে ৫৮৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে রাজা বখতে নসর ইয়াহুদিয়া রাজ্য সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেন। এ সময় জেরুসালেম নগরীও সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। বহুসংখ্যক ইয়াহুদিকে দেশ-বিদেশে নির্বাসনে দেয়া হয়।

খুব সম্ভবত এটিই সেই প্রথম মহাবিপর্যয় আল-কুরআনের সূরা বনি ইসরাইলে যেদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের মধ্যভাগে ইহুদিদের অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে। ৫৩৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে পারস্যরাজ সাইরাসের হাতে ব্যাবিলনের পতন হয়। রাজা ইহুদিদের প্রতি সদয় হন। তাদেরকে ফিলিস্তিনে প্রত্যাবর্তনের অনুমতি দেয়া হয়। নানা দেশে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা ইহুদিরা ইয়াহুদিয়ায় প্রত্যাবর্তন করে।

৪৫৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে নবী উযাইর ইয়াহুদিয়ায় প্রত্যাবর্তন করেন। এভাবে প্রথম বিপর্যয়ের প্রায় দেড় শত বছর পর ইহুদিরা আবার ফিলিস্তিনে ফেরার সুযোগ লাভ করে। পরবর্তীতে ফিলিস্তিনে গ্রিকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৬৩ সালে রোমান বিজয়ী পম্পেইকে আহ্বান করে ইহুদিরা। তিনি ফিলিস্তিন দখল করেন, তবে সরাসরি শাসন কায়েম না করে সেখানে করদ রাজা নিয়োগ দেন। এ সুযোগ নিয়ে হেরোদ নামে এক চতুর ইহুদি ফিলিস্তিনের রাজা হন। হেরোদের আমলে ঈসা আ: জন্মগ্রহণ করেন। এ মহান নবীর যুগে ইহুদিদের নৈতিক মান কোন পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল সেটি বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দেয়াই যথেষ্ট। ঈসা আ:-এর বিরুদ্ধে ব্লাসফেমির অভিযোগ তোলা হলে তাকে গ্রেফতার করে শাসক পিলাতের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। পিলাত তাকে শাস্তি প্রদানে ইচ্ছুক ছিলেন না। কিন্তু ইহুদি রাব্বিরা একযোগে তার শাস্তি দাবি করে। শাস্তি প্রদান এড়াতে না পেরে পিলাত বলেন, ‘আজ উৎসবের দিন, এদিন আমি একজন বন্দী মুক্তি দিয়ে থাকি। তোমরা কী বল, ডাকাত বারাব্বাকে মুক্তি দিব না যিশুকে।’ উপস্থিত লোকেরা সমস্বরে বলে, ‘বারাব্বাকে মুক্তি দিন’। শেষ পর্যন্ত যিশুকে শূলিতে চড়ানো হয় (খ্রিষ্টান বিশ্বাস মতে)।

খ্রিষ্টিয় ৬৪-৬৬ সনে ইহুদিরা রোমানদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিদ্রোহ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় রোমান সেনাপতি টিটুস অত্যন্ত কঠোরভাবে ইহুদি বিদ্রোহ দমন করেন। ৬৭ হাজার ইহুদিকে ক্রীতদাস বানানো হয়। অনেককে আফ্রিকায় নির্বাসন দেয়া হয়। বহু ইহুদিকে রোমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ইহুদিরা ইউরোপের নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আল-কুরআনে ইহুদিদের দ্বিতীয় বিপর্যয় বলে খুব সম্ভবত এ ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এ ঘটনার পরও ফিলিস্তিন ইহুদিশূন্য হয়নি। তবে ফিলিস্তিন তো বটেই, দুনিয়ার কোথাও রাষ্ট্রশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে তাদের দুই হাজার বছর লেগে যায়।

প্রথম মহাবিপর্যয়ের ১৫০ বছর পর ইহুদিরা ফিলিস্তিনে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু দ্বিতীয় মহাবিপর্যয়ের পর ফিলিস্তিনে ফিরে আসতে তাদের দুই হাজার বছর লেগে যায়। তবে দীর্ঘ দুই সহস্রাব্দব্যাপী তারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ফিলিস্তিনে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন লালন করেছে। অবশেষে উসমানীয় খেলাফতের অবসানের পর ফিলিস্তিন ব্রিটিশ কর্তৃত্বে নিত হলে পৃথিবীর নানা প্রান্ত হতে দলে দলে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে আগমন করে এবং ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ শাসন অবসানের সাথে সাথে ইসরাইল রাষ্ট্র ঘোষণা করে।

ইহুদিদের প্রধান যুক্তি হলো ফিলিস্তিন তাদের পূর্বপুরুষের ভূমি। ইহুদিদের যুক্তির জবাবে প্রথমেই জিনোম গবেষণার ফলাফল উল্লেখ করা প্রয়োজন। অতি সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরের জনস হপকিন্স ইন্সটিটিউটের গবেষক অ্যারন হায়েক জিনোম গবেষণার এক ফলাফলে দেখিয়েছেন যে, ইউরোপীয় ইহুদিরা (বিশ্বের ৯০% ইহুদিই হলো ইউরোপীয় ইহুদি) বংশধারার দিক থেকে ফিলিস্তিনি নয়। অর্থাৎ তাদের পূর্বপুরুষের বসবাস ফিলিস্তিনে ছিল না। ইউরোপীয় ইহুদিদের অধিকাংশের রক্তে বইছে ককেশাসের রক্তধারা। বাকিরা গ্রিক ও রোমান বংশোদ্ভূত। খুব অল্পসংখ্যক ইউরোপীয় ইহুদির শোনিতে বইছে প্রাচীন ফিলিস্তিনিদের বংশধারা। অন্য ভাষায় বলা যায়, আধুনিক ইসরাইল রাষ্ট্রের ইহুদি অধিবাসীদের খুব সামান্য অংশই ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত বা সেমেটিক জাতির অংশ।

ইহুদি অপপ্রচারে চাপা পড়া ভিন্নচিত্রটিও উপস্থাপন করা দরকার। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইবরাহিম আ:-এর আগমনের শত শত বছর আগে থেকে কেনআন জনগোষ্ঠীর বসবাস। এরা আরব জাতির একটি শাখা। আর তাই ফিলিস্তিনে ইহুদিদের চেয়ে আরবদের অধিকার অগ্রগণ্য। পরবর্তীতে বনি ইসরাইলের মিসর হতে প্রত্যাবর্তনের পূর্বে আরো বহু জাতিগোষ্ঠীর বসবাস শুরু হয় ফিলিস্তিনে। এ জাতিসমূহের মাঝে বংশধারার সংমিস্রণ হয়, যাদের উত্তরপুরুষ হলো বর্তমান ফিলিস্তিনিরা। ফিলিস্তিনের খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীও বহিরাগত নয়। আগেই ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, ঈসা আ: বনি ইসরাইলের নবী ছিলেন। তিনি ইহুদিদের মাঝেই ধর্মপ্রচার করেন। প্রাথমিস যুগের খ্রিষ্টানদের প্রায় সবাই ইহুদি বিশ্বাস হতে ধর্মান্তরিত হয়েছেন। সেই সময় হতে তারা পুরুষানুক্রমে পবিত্র ভূখণ্ডে বসবাস করে আসছে। উমার ইবনুল খাত্তাব যখন সন্ধিচুক্তির মাধ্যমে জেরুসালেম জয় করেন তখন শহরটি ইহুদিপ্রধান এলাকা ছিল না। আর তাই পবিত্র শহর হতে ব্যাপক ইহুদি বিতাড়নের জন্য কোনোভাবেই মুসলমান ও আরবদের দায়ী করা যায় না। প্রায় ছয় শতক আগে রোমানরাই ইহুদিদের বিতাড়িত করেছিল।

বিগত চার হাজার বছরের ইতিহাসে মাত্র সত্তর বছর (তালুত, দাউদ ও সুলায়মানের আমলে) ফিলিস্তিন একচ্ছত্র ইহুদি শাসনের অধীনে ছিল। আবার এ কৃতিত্বের দাবিদার কেবল ইহুদিরা হতে পারে না। কেননা ওই তিন শাসকের মধ্যে দুইজনকে তথা দাউদ ও সুলায়মান আ:-কে খ্রিষ্টান এবং মুসলমানরাও নবী বলে স্বীকার করেন। এই মহান বাদশাহদের শাসনাবসানের পর বিংশ শতকের মধ্যভাগে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত আর কখনো ইহুদিরা এককভাবে ফিলিস্তিন শাসন করতে পারেনি। পক্ষান্তরে ৬৩৬ সাল হতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি পর্যন্ত প্রায় চৌদ্দশত বছর মুসলমানরা এক নাগাড়ে (ক্রুসেডের সংক্ষিপ্ত ইনটেরেগনাম বাদ দিয়ে) ফিলিস্তিনে রাজত্ব করেছে। অতএব রাজত্বের বিচারেও ফিলিস্তিনে আরব মুসলমানদের অধিকার অগ্রগণ্য।

আরবরা অশান্তি চায় না। ইসরাইলের অধিকাংশ বাসিন্দা বহিরাগত হলেও ফিলিস্তিনিরা তাদেরকে মেনে নিয়েছে। তারা চায় ১৯৬৭ সালের পূর্বের সীমানার আলোকে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র, যাতে আরব ও ইহুদিরা পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি বিসর্জন দিয়ে ইসরাইল একতরফাভাবে জেরুসালেমকে তাদের রাজধানী ঘোষণা করেছিল। একই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রও জেরুসালেমকে ইসরাইলি রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিলো। ফিলিস্তিনের ভূমিপুত্র আরব নাগরিকদের ওপর সীমাহীন জুলুম নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। কে জানে, বাড়াবাড়ির চূড়ান্তপর্যায়ে উপনীত ইসরাইলের জন্য হয়তো তৃতীয় মহাবিপর্যয় অপেক্ষা করছে।

ড. এহসান যুবাইর

সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নিয়া দিগন্ত

সংশ্লিষ্ট খবর