রবিবার ২৪শে জুন ২০১৮ |
আইনি পরামর্শ

কাতারে কাজ করে বেতন না পেলে কী করবেন?

গালফ বাংলা |  শুক্রবার ১৬ই ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সকাল ১০:০৮:১৮
কাতারে

কাতারে একটি প্রকল্পে কাজ করছেন শ্রমিকরা

সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ঘটনায় দেখা গেছে, কাতারে কাজ করার পরও মজুরি বা বেতন পাচ্ছেন না অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মী। এদের মধ্যে নির্মাণখাতের শ্রমিকদের সংখ্যা বেশি। বিভিন্ন সাপ্লাই কোম্পানির মাধ্যমে কাজ পেয়ে যারা একেক সময় একেক প্রকল্পে কাজ করছেন অস্থায়ী ভিত্তিতে, তাদের অনেকেই কাজ শেষে মজুরি পাচ্ছেন না। যারা পান, তারাও অনেক দেরিতে পান। এমনও দেখা গেছে, কয়েক বছর ধরে মজুরির জন্য অপেক্ষায় থাকলেও কন্ট্রাক্টর বা দায়িত্বশীল কেবলই দেব দেব করে দিন পার করছেন।

সময়মতো বা কাজ অনুযায়ী পুরো প্রাপ্য বেতন না পাওয়ার এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে আইনের আশ্রয় নিতে পারছেন না প্রতারিতরা। এর কারণ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কাজের কোনো প্রমাণ রাখেননি কোনো কর্মী বা শ্রমিক। অধিকাংশ বেলায় প্রতিদিনের হাজিরা খাতাও থাকেনা কর্মী যোগানদাতা (সাপ্লাই কোম্পানী) প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। ফলে মুখের দাবি ছাড়া আর কিছুই থাকে না প্রতারিত বা বঞ্চিত শ্রমিকদের। আর এতে আইনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রবাসী কর্মীরা।

মনে রাখতে হবে, আপনি যে প্রতিষ্ঠানের ভিসায় কাতারে এসেছেন, ওই প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোথাও কাজ করা কাতারের আইনে দন্ডনীয় অপরাধ। আর যদি আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী কফিলের অনুমিত সাপেক্ষে আপনি বাইরে অন্য কোনো প্রকল্পে কাজ করে থাকেন, তবে অবশ্যই কাজের সময় কফিলের অনুমতিপত্র সঙ্গে রাখবেন। নইলে আপনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গ্রেফতারের সম্মুখীন হবেন। এরপর জরিামানা বা অন্যান্য শাস্তিও হতে পারে আপনার।

এতো গেল অনুমতিপত্রের বিষয়। এরপর আপনি যখন অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পে কাজ করবেন, তখন অবশ্য্ই আপনার কাজের প্রমাণ হিসেবে টাকা গ্রহণের রশিদ অথবা হাজিরাখাতার অনুলিপি আপনার সঙ্গে রাখুন। দেখা গেল, আপনি দিনের পর দিন কয়েক মাস কাজ করছেন, সেক্ষেত্রে প্রতি মাসের শেষ দিন স্বাক্ষর করার সময় পুরো একমাসের হাজিরা পাতাটির কপি আপনি চেয়ে নিতে পারেন। যদি মনে করেন, ওই প্রতিষ্ঠান আপনাকে সেটি দিতে অস্বীকৃতি জানাবে, তবে অন্তত নিজের মোবাইলে সেই পাতার ছবি তুলে রাখুন।

এই কপি বা ছবি সংরক্ষণের গুরুত্ব অনেক। ধরুন, এক মাস কাজের পর যদি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি আপনার কাজের পারিশ্রমিক দিতে দেরি করে অথবা চাহিদামতো পারিশ্রমিক না দেয়, অথবা ত্রিশ দিনের কাজের বিনিময়ে ১৫ দিনের মজুরি দেয় অথবা কাজের বিষয়টি অস্বীকার করে বসে, সেক্ষেত্রে আপনি আদালতের দ্বারস্থ হলে এই হাজিরাপত্রটি আপনাকে অনেক সহায়তা দেবে। আপনার কাজের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে এটি আপনার দাবি আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

শুধু বেতনের বেলায় নয়, ওভারটাইম বা অতিরিক্ত কাজের বেলায়ও আপনার সচেতনতা বিশেষভাবে কাম্য। প্রতিষ্ঠান বা নিয়োগকারী যদি আপনাকে অতিরিক্ত কাজের প্রস্তাব দেয় এবং সেই বাবদ আপনাকে অতিরিক্ত বেতন দেওয়ার কথা বলে, কিন্তু অতিরিক্ত কাজের বিষয়টি আপনার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের চুক্তিপত্রে উল্লেখিত ছিল না, তবে প্রথমেই আপনি দাবি করতে পারেন, এই অতিরিক্ত কাজের জন্য নতুন করে চুক্তি করার। অন্তত যদি সেটি না হয়, তবে আপনি যে অতিরিক্ত সময় বেশি কাজ করছেন, এর যে কোনো প্রমাণ আপনি সংরক্ষণ করুন। সময়মতো এই অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক পেলেও তা সংরক্ষণ করুন।

মনে রাখবেন, বিদেশে কাজের বেলায় আপনার পেশাদারিত্ব এবং সচেতনতাই আপনার আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। স্বদেশী কিংবা বিদেশি, যে কারও মুখের মিষ্টি কথায় কখনো নিশ্চিন্ত হয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণের ব্যাপারে উদাসীন হবেন না। এমন উদাসীনতা আপনার বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

এরপর এই প্রমাণপত্র দিয়ে আপনি কাতার শ্রম মন্ত্রণালয়ের শ্রম সম্পর্ক শাখা বা শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবেন। তখন পাওনা মজুরি পাওয়ার ব্যাপারে কাতারের আইন পুরোপুরি আপনাকে সহায়তা দেবে। এসব মামলা দায়েরে কোনো ফি লাগে না।

কাতারে বসবাসরত সর্বসাধারণ প্রবাসীদের মধ্যে এ ধরণের সচেতনতা একেবারে নেই বললেই চলে। এমনকি লাখ লাখ টাকা খরচ করে যারা ভিসা কেনেন, তারাও কোনো ধরণের কাগজপত্র সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। ফলে কেবলই দিনদিন বাড়ছে বঞ্চিত মানুষের অভিযোগ, কিন্তু প্রতিকারের সুযোগ পাচ্ছেন না তাদের অনেকে।

তামীম রায়হান

কাতারপ্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক

সংশ্লিষ্ট খবর