বুধবার ২১শে নভেম্বর ২০১৮ |
প্রকৃতির সান্নিধ্যে

সাগরদুহিতা সন্দ্বীপে এক সকাল

তামীম রায়হান |  বৃহঃস্পতিবার ২২শে মার্চ ২০১৮ সকাল ০৯:১১:০৫
সাগরদুহিতা

সন্দ্বীপে লেখক

কাতারে আমার কর্মস্থলে এবং কর্মস্থলের বাইরে সন্দ্বীপের বেশ কয়েকজন মানুষের সঙ্গে আমার চেনাজানা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথাবার্তায় কিংবা বন্ধুত্বের আড্ডায় এঁদের মুখে কেবলই সন্দ্বীপের গল্প শুনি। গত দু বছর ধরে তাই ভাবছি, ছুটিতে দেশে গেলে এক ফাঁকে দেখে আসবো সন্দ্বীপের রূপ-সৌন্দর্য, যাতে নিজেদের অঞ্চল নিয়ে সন্দ্বীপিরা যে বড়াই করে, এর বাস্তবতা বা অসাড়তা দেখে আসতে পারি।

২০১৮ সালের জানুয়ারি যখন শুরু, বার্ষিক ছুটির অবসরে তখন আমি বাংলাদেশে। বন্ধু রানার আমন্ত্রণে ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামে বেড়াতে যাই এবং হুট করে সিদ্ধান্ত নিই, পরদিন সন্দ্বীপ যাবো। আমার এই ইচ্ছায় রানা কাঁচুমাচু করলেও প্রবল উৎসাহে সায় দেয় মেরাজ এবং আনোয়ার শাহাদাত মাসুম।

পরদিন ৬ জানুয়ারি। তখনও সকাল হয়নি খুব, সূর্য ওঠা ভোরে চট্টগ্রাম শহরজুড়ে কুয়াশা- এরই মধ্যে আমরা হালিশহর থেকে যাত্রা শুরু করি কুমিরাঘাটের উদ্দেশে। 

সেখান থেকে আমরা যাবো বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্ব উপকূলে, বঙ্গোপসাগরে মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত দ্বীপ- সন্দ্বীপে। সন্দ্বীপের অবস্থানগত সৌন্দর্য বোঝাতে বলা হয়ে থাকে, ‘মেঘনার ললাটে সাগরের টিপ- সন্দ্বীপ’।

বাংলাদেশের অত্যন্ত প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ উপজেলা সন্দ্বীপ। এর উত্তরে বামনী নদী এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর রয়েছে। পূর্ব দিকে সন্দ্বীপ চ্যানেল এবং চ্যানের পূর্ব পাড়ে চট্টগ্রাম আর পশ্চিমে মেঘনা নদী এবং তৎপশ্চিমে হাতিয়া দ্বীপ অবস্থিত। 

এই অঞ্চলের ভৌগলিক সৌন্দর্য বোঝাতে এটিকে সাগরকন্যা, সাগরদুহিতাসহ নানা নামে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।

আমি এবং হারিছ বাদে বাকি তিন ভ্রমণসঙ্গী- আবু হানিফ রানা, মেরাজ এবং আনোয়ার শাহাদাত মাসুম- এঁদের বাড়ি সন্দ্বীপে। ফলে সন্দ্বীপ কীভাবে যাবো, কোথায় ঘুরবো, সেসব নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ নেই। 

কুমিরাঘাট থেকে দ্রুতগামী নৌযান আমাদের নিয়ে যাত্রা শুরু করলো সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাটের উদ্দেশে। শান্ত মেঘনার বুকে দ্রুতগামী নৌযানের যাত্রা শুরু হতেই মন প্রফুল্ল হয়ে উঠলো।

মাত্র বিশ মিনিটে আমরা প্রায় ৫০ মাইল দূরত্ব অতিক্রম করে সন্দ্বীপ পৌছাই। নৌযান থেকে নেমে কিছুদূর গিয়ে আমরা দুটি মোটর সাইকেল ভাড়া নিই। 

সন্দ্বীপজুড়ে শ শ মোটর সাইকেলের ছড়াছড়ি। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব মোটর সাইকেলের কোনো বৈধ কাগজপত্র বা লাইসেন্স নেই। বরং পুলিশকে মাসোহারা দিয়ে স্বাধীনভাবে সন্দ্বীপ দাপিয়ে বেড়ায় অসংখ্য মোটরসাইকেল।

ঘাটে পৌঁছে দেখি, কয়েকজন লোক ধরাধরি করে কফিন বাক্স নামাচ্ছেন আরেকটি নৌযান থেকে। কফিনের সঙ্গে এসেছেন শোকার্ত স্বজনরা। 

স্থানীয়রা জানালেন, সুদূর আমেরিকাসহ পৃথিবীর নানা দেশ থেকে কফিনে কাফনমোড়ানো লাশ আসে এই সন্দ্বীপে। জীবিকার তাগিদে যে সন্দ্বীপ ছেড়ে অনেক দূরে চলে যান প্রবাসীরা, জীবন ফুরিয়ে গেলে সেখানেই যেন তাদের সমাহিত করা হয়, সেই আকুতি রেখে যান তারা।

আমরা মোটর সাইকেলে চড়ে সন্দ্বীপ ঘোরা শুরু করি। দু পাশে সবুজ গাছপালায় সাজানো ছবির মতো সুন্দর গ্রামীণ পরিবেশে যানবাহন চলাচলের জন্য পাকা সড়ক ছড়িয়ে আছে পুরো সন্দ্বীপে।

দ্বীপজুড়ে নয়নাভিরাম নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মুগ্ধকর ছড়াছড়ি প্রাণ জুড়িয়ে দেয়। কিছুদূর পেরিয়ে আমরা পৌঁছে যাই ‘আজিম গোমস্তা’র বাড়ি নামে প্রসিদ্ধ রানাদের বাড়িতে।

মিশুর বাবা আমাদের পেয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এই প্রবীণ মানুষটির তারুণ্যভরা মন আর প্রাণখোলা হাসি এবং মমতাময় আচরণে মুগ্ধতার সীমা রইলো না আমাদের।  সবাই মিলে খেজুরের রস আর গ্রামীণ খাবারে সাজানো সকালের নাস্তায় তৃপ্ত হলাম।

মোটরসা্ইকেলে কয়েক ঘন্টার ঘোরাঘুরিতে সন্দ্বীপ দেখে আমি মুগ্ধ এবং অভিভূত হয়েছি। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জের চিরচেনা দৃশ্য ছোট ছোট হাট বাজার আর দিগন্ত বিস্তৃত ক্ষেতখামারের চেয়ে সন্দ্বীপ আমার কাছে ভিন্নরকম লেগেছে। যদিও মেজবান রানার তাড়াহুড়োর কারণে পুরো সন্দ্বীপ ঘুরে দেখার ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে গেল। 

মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপ যুগ যুগ ধরে স্থানীয়রা গড়ে তুলেছেন আপন মমতায়। থানা-আদালত, ব্যাংক, আধুনিক বিপণিবিতান, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদরাসা, পুকুর-দীঘি, মাঠ-খামার থেকে শুরু করে কী নেই সন্দ্বীপে! পাকা ভবনে কয়েক তলাবিশিষ্ট মুরগির খামার যেমন দেখেছি, তেমনি দেখেছি নয়নাভিরাম গাছগাছালিঘেরা সারি সারি পুকুর। 

স্বচ্ছ সবুজ টলটলে পানিতে চিরশান্ত নারকেল গাছের প্রতিচ্ছবি আর মন ভালো করে দেওয়া নিঝুম প্রকৃতি, যেন গা এলিয়ে দিয়ে এখনই ঘুমিয়ে পড়া যায় সেখানে। এমন প্রাণকাড়া সুন্দর শ্যামল প্রকৃতি নগরে আমরা কতোদিন দেখিনি!

সন্দ্বীপের পশ্চিমে জেগে ওঠা নতুন চর দেখতে যাই। নবজাতক শিশুর মতো ভেজাবালির নরম শরীরে নতুন এই চর যেন অপার সম্ভাবনা নিয়ে জন্ম নিয়েছে। সন্দ্বীপের লোকজন আশায় বুক বেঁধে আছেন, এই চরে তারা এসে ঘর বাঁধবেন, ফিরে আসবে কয়েক দশক আগের ফেলে যাওয়া সেই সুবর্ণ দিনগুলো তাদের। 

সরকারি উদ্যোগে পরিকল্পিত উপায়ে এই নতুন চর রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন করলে এটি দশর্নীয় জায়গা হিসেবে দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটককে আকৃষ্ট করবে। বিশেষ করে শীতকালে তাঁবু খাটিয়ে দিন কয়েক সপরিবারে বসবাসের জন্য সন্দ্বীপ হতে পারে ভালো লাগার অন্যতম গন্তব্যস্থল।

একসময় বেলা বাড়তে থাকে। আমাদেরও ফেরার সময় ঘনিয়ে আসে। ঘাটে এসে দেখি, শ শ মানুষ অপেক্ষা করছেন। সন্দ্বীপে যাতায়াতের ভোগান্তি নিয়ে খবরাখবর পড়লেও এবার তা সরাসরি দেখতে পেলাম। 

দীর্ঘ সারিতে নবজাতক কোলে মা যেমন আছেন, তেমনিভাবে আরও অনেক নারী, অসুস্থ এবং প্রবীণদের চোখেমুখে অপেক্ষার ক্লান্তিকর বিরক্তি দেখে বোঝা গেল, কেন এখানকার অনেকে এই চিরচেনা আপন অঞ্চল ছেড়ে শহরে চলে যান একটু নিশ্চিন্তে জীবন কাটাতে।

চট্টগ্রাম থেকে সন্দ্বীপ যাতায়াতে নৌযাত্রার দুর্ভোগ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে এবং হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে এটিকে আরও জনবান্ধব এবং সময়োপযোগী করে তুলতে পারে। এতে সন্দ্বীপবাসী যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি দূর দূরান্তের পর্যটক ও ভ্রমণপ্রেমীরা সন্দ্বীপে আসতে উৎসাহী হবেন। 

সবচেয়ে বড় বিষয়, চিকিৎসা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে চট্টগ্রাম শহরে যেতে দুর্ভোগ পোহাতে হবে না কোনো অসুস্থ কিংবা বিপদগ্রস্ত কাউকে।

৮০ বর্গমাইল আয়তনের সন্দ্বীপে বর্তমানে বাস করেন প্রায় চার লাখ মানুষ। এখানকার বিপুলসংখ্যক মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাস করেন। তাদের উপার্জিত অর্থে সন্দ্বীপবাসীর মুখে ফুটছে প্রাচুর্যের হাসি, রেমিট্যান্সে শক্তিশালী হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। 

স্থানীয় ঘরবাড়িগুলোর দিকে তাকালেও এর নজির মেলে। প্রচুর দোকানপাটে সমৃদ্ধ বাজারে পাওয়া যায় সব সন্দ্বীপে জেগে ওঠা নতুন চরধরণের পণ্যসামগ্রী। এক কথায়, সন্দ্বীপ যাওয়ার আগে এটিকে অনুন্নত গাঁওগেরাম ভেবে কল্পনায় যে চিত্র এঁকেছি, এর পুরোপুরি বিপরীত অবস্থা দেখে নিজে অবাক হয়েছি।

চলতি বছরের জুন মাস থেকে সন্দ্বীপ বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবে। ইতিমধ্যে সাগরের তলদেশ দিয়ে সীতাকুন্ড থেকে সন্দ্বীপ পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। 

এর ফলে সন্দ্বীপবাসীর একমাত্র দুঃখ ঘুঁচে যাবে। বর্তমানের তুলনায় সন্দ্বীপ হয়ে উঠবে আরও জমজমাট ও সমৃদ্ধ দ্বীপনগর। দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা ছুটে আসবেন সন্দ্বীপের সৌন্দর্য দেখার জন্য, স্থানীয়দের আশা এমনই।

১৩৪৫ সালে ঐতিহাসিক পর্যটক ইবনে বতুতা সন্দ্বীপ ভ্রমণ করেছেন। এতে সেকালে সন্দ্বীপের পরিচিতি এবং সমৃদ্ধির ইঙ্গিত বোঝা যায়। ১৯২৯ সালে ২৮ জানুয়ারি সন্দ্বীপ ঘুরে বেড়িয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এমন অনেক বিখ্যাত পর্যটক, কবি, সাহিত্যিকের পদচারণায় হয়েছে সন্দ্বীপের জনপদ।  

ইতিহাস বলে, এক সময় লবণ শিল্প, বস্ত্র শিল্প এবং জাহাজ নির্মাণ কর্মকান্ডের জন্য বিখ্যাত ছিল এই সন্দ্বীপ। তবে এখন এসবের কোনো আলামত নেই, এসব গৌরব তুলে ধরার কোনো উদ্যোগও নেই।

চারপাশে নদী ও সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মোহনায় গড়ে ওঠা এই দ্বীপ একদিকে যেমন প্রকৃতির রুদ্রমুর্তি দেখে দেখে অভ্যস্ত, অন্যদিকে প্রকৃতির মমতাময় ছোঁয়ায় সতেজ সমৃদ্ধ। প্রকৃতির সোহাগ ও শাসনের এমন প্রতিপালন সন্দ্বীপবাসীকে হৃদয়বান এবং সাহসী করে তোলে নিঃসন্দেহে।

বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর আমরা দ্রুতগামী নৌযানে চড়ে সন্দ্বীপ ত্যাগ করি। প্রকৃতির মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার একরাশ আনন্দময় তৃপ্তি এবং সতেজ অনুভূতি অবচেতন মনে আমায় বলছিল, কোনো এক অবসরে আবারও আসতে হবে এই সন্দ্বীপে।

তামীম রায়হান

কাতারপ্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক

সংশ্লিষ্ট খবর