বুধবার ১লা এপ্রিল ২০২০ |

অসমাপ্ত আত্মজীবনী : একজন সম্পূর্ণ শেখ মুজিব

 শুক্রবার ২৩শে মার্চ ২০১৮ সকাল ০৭:১৩:৩২
অসমাপ্ত

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

২০০৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা চারটি খাতা আকস্মিকভাবে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার হস্তগত হয়। খাতাগুলি ছিলো অতি পুরানো, পাতাগুলি জীর্ণপ্রায় এবং লেখা প্রায়শ অস্পষ্ট। সেই খাতায় শেখ মুজিব ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগাওে অন্তরীণ অবস্থায় লেখা শুরু করেছিলেন। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের সম্পাদনায় এই আত্মজীবনীমূলক লেখাকে গ্রন্থে রূপান্তরিত করা হয়। প্রকাশিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনীগ্রন্থ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী।’ ২০৯ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে তুলে নিয়ে বইয়ের শুরুতেই যেকথা লেখাÑ

একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাচু ও কামাল নিচে খেলছিলো। হাচু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকে। কামাল চেয়ে থাকে। এক সময় কামাল হাচিনাকে বলছে, ‘হাচু আপা, হাচু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি?’ আমি আর রেণু দু’জনই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে যেয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, ‘আমি তো তোমারও আব্বা।’ কামাল আমার কাছে আসতে চাইত না। আজ গলা ধরে পড়ে রইলো। বুঝতে পারলাম, এখন আর ও সহ্য করতে পারছে না। নিজের ছেলেও অনেক দিন না দেখলে ভুলে যায়! আমি যখন জেলে যাই তখন ওর বয়স মাত্র কয়েক মাস। রাজনৈতিক কারণে একজনকে বিনা বিচারে বন্দি করে রাখা আর তার আত্মীয়-স্বজন ছেলে-মেয়েদের কাছ থেকে দূরে রাখা যে কত বড় জঘন্য কাজ তা কে বুঝবে? মানুষ স্বার্থের জন্য অন্ধ হয়ে যায়।

স্বাধীন বাংলাদেশ জন্ম নেওয়ার রাজপথের সফল কারিগর হিশেবে একজন শেখ মুজিব, নেতা হিশেবে একজন শেখ মুজিব, আন্দোলনে ফুঁসতে থাকা দিকনির্দেশনাহীন একটি জাতির আশাভরসার কেন্দ্রবিন্দু হিশেবে অবস্থান করা একজন শেখ মুজিব, প্রধানমন্ত্রী হিশেবে একজন শেখ মুজিব ইত্যাদি ইত্যাদি এক বিশাল বর্ণাঢ্য জীবনের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা সাদামাটা জগত সংসারের আবেগী একজন মানুষ হিশেবে শেখ মুজিব কেমন ছিলেন সেই ছবিটাই ভেসে ওঠে অসমাপ্ত আত্মজীবনীর এই কয়েক লাইনে। বইটির প্রচারণাতেও এই লাইনগুলো আমাদেরকে তীব্র আকর্ষণ করে তোলে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার আত্মজীবনী এদেশের ইতিহাসের একটি নথিপত্র বলা যায়। নিজের মুখে স্বীকার করেছেনÑ আমি তো লিখতে জানি না, আমার জীবন আর এমন কি যে তা লিখে যেতে হবে! Ñএসব সরল স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়ে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বেপরোয়া ও একচেটিয়া শাসনব্যবস্থাকে পুরোপুরি টলিয়ে দিলেন যেই ব্যক্তি আমরা তাকে একজন সাধারণ দেশপ্রেমী আবেগী নাগরিক হিশেবে আবিষ্কার করি। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়Ñ সহকর্মীরা বলে, রাজনৈতিক জীবনের ঘটনাগুলি লিখে রাখো, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বললো, বসেই তো আছো, লিখো তোমার জীবনের কাহিনি। বললাম, লিখতে যে পারি না; আর এমন কী করেছি যা লেখা যায়! আমার জীবনের ঘটনাগুলি জেনে জনসাধারণের কি কোনো কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এইটুকু বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।

পরিবার স্বজন ছেড়ে জেলে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন শেখ মুজিব, আর জেলখানায় অল্পসময়ের জন্য চোখের দেখা দেখতে এসেও জীবনসঙ্গিনী আত্মজীবনীর কথা জিজ্ঞেস করেছেন বারবার, তাগাদা দিয়েছেন লেখার জন্য। সহধর্মিণী বুঝে নিয়েছেন, এই পাহাড়সম জীবনে শুধু তাঁর একারই অধিকার নেই, লক্ষ জীবন বরং গোটা একটি জাতির ভবিষ্যত জড়িয়ে আছে যার জীবনের সাথে তার জীবনের গল্পগুচ্ছ সংরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। শেখ মুজিবও লিখেছেন গল্প বলার ঢঙে, সুখপাঠ্য হয়েছে পুরো আত্মজীবনীটি। বাংলাদেশ ও বাঙালির অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলে যায় অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে। দেশ বিভাগের বহু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন নিজের জীবনের গল্পে। শেখ মুজিব তাঁর জন্ম, শৈশব, বাল্য জীবন, পারিবারিক ঐতিহ্য, স্কুল ও কলেজের শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকা-, দুর্ভিক্ষ, বিহার ও কলকাতার দাঙ্গা, দেশভাগ,  তৎকালীন সামাজিক বন্ধন, মানুষের জীবন চরিত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের এক সাথে বসবাসের ইতিহাস, রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু সোহরাওয়ার্দি সাহেবের সংস্পর্শে আসার ঘটনা বলেছেন স্পষ্ট ভাষায়। হাশিম সাহেবের রাজনৈতিক ক্লাসের ছাত্র, মওলানা আকরাম খাঁ, ভাসানী, নাজিমুদ্দীন প্রমূখ সমসাময়িক রাজনৈতিক নেতাদের চারিত্রিক বিশেষণের জন্যও বইটি গুরুত্বপূর্ণ। কর্মব্যস্ত এক জীবনের সময় ও সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতি, দেশ বিভাগের পরবর্তী সময় থেকে ১৯৫৪ সাল অবধি পূর্ব বাংলার রাজনীতি, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকারের অপশাসন, ভাষা আন্দোলন, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা, যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন, আদমজীর দাঙ্গা, পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক শাসন ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বিস্তৃত বিবরণ উল্লেখ করেছেন বইটিতে। এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম বলে পুরো জাতির স্বাধীনতা আন্দোলনে জলোচ্ছ্বাসের গতি এনে দেওয়া মানুষটির জীবনের না বলা কথাগুলোর পাশাপাশি আমাদের জাতীয় জীবনের গুরুতর অসংখ্য ঘটনার সরল মূল্যায়ন করেছেন তিনি বইটিতে। কারাজীবন, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি  ও সর্বোপরি সর্বংসহা সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেসার কথা বলে গেছেন অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে। এই বইয়ের আলোতেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ পরিবারের ভূমিকার গল্পে আমরা দেখি একজন বাঙালি নারী বেগম ফজিলাতুন্নেসাকে, যিনি নিজের সাংসারিক জীবনের অপূরণীয় আক্ষেপের কথা ভুলে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে সহায়ক শক্তি হিশেবে সকল দুঃসময়ে অবিচল পাশে ছিলেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী বলে, মিটিং মিছিল শেষ করে পথেঘাটে বক্তৃতা দিতে দিতে রাত চারটার সময় যখন ঘরে ফিরে আসি, দেখি, রেণু ভাত নিয়ে আমার জন্য বসে আছে।

বাংলাদেশের রাজনীতির এই চরম দুঃসময়ে অসমাপ্ত আত্মজীবনী কথা বলে ওঠে। শেখ মুজিবের অন্ধ বিরোধিতা যারা করেন তারা তো অবশ্যই , এমনকি বঙ্গবন্ধুর নাম ভাঙিয়ে রাজনৈতিক সুবিধাবাদী, স্বার্থান্বেষী চাটুকারদের চোখেও আঙুল দিতে পারে অসমাপ্ত আত্মজীবনীর একটি গভীর পাঠ।

বঙ্গবন্ধুর সঠিক আদর্শ এই অসমাপ্ত আত্মজীবনীর স্বচ্ছ আয়নাতেই আমরা দেখতে পাই, জেলের আইবি কর্মকর্তাকে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিচ্ছেনÑ সরকারকেই বন্ড দিতে বলবেন, ভবিষ্যতে আর এই রকম অন্যায় কাজ যেন না করে। আর বিনা বিচারেও যেন কাউকে বন্দি করে না রাখে।

জুবায়ের মহিউদ্দীন

মাসিক নবধ্বনির সৌজন্যে

সংশ্লিষ্ট খবর