বুধবার ২১শে নভেম্বর ২০১৮ |

ইয়েমেন ও সোমালিয়ায় সামরিক সম্পৃক্ততা বেড়েছে আরব আমিরাতের

 শনিবার ১২ই মে ২০১৮ দুপুর ০২:৪৫:১৫
ইয়েমেন

আরব আমিরাত লোহিত সাগরে তার প্রভাব বাড়াতে ইয়েমেনে স্থানীয়ভাবে সেনা দল তৈরি করেছে

সোমালিয়া ও ইয়েমেনে সামরিক আধিপত্য বিস্তারে কাজ করছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। গত সপ্তাহে দেশটির সামরিক যানবাহী বিমান ইয়েমেনের সোকোত্রা দ্বীপে অবতরণ করে। বাড়ানো হয় সামরিক উপস্থিতি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইয়েমেনের সমুদ্র অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে আগ্রহী আমিরাত। অন্যদিকে সোমালিয়ার স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলেও প্রভাব বেড়েছে আমিরাতের। সোমালীয় সরকারের অসন্তোষ থাকলেও স্থানীয় নেতারা ‘বহিঃশক্তি’ আমিরাতের সামরিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতিকে স্বাগত জানিয়েছেন।  পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ওই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে  মাধ্যমে জঙ্গিবাদ বিস্তারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করছে আমিরাত। তবে এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বার্থও যুক্ত রয়েছে। কেউ কেউ সোমালিয়ায় দেশটির উপস্থিতিকে ‘ঔপনিবেশিকতা’ হিসেবে দেখছেন।

আমিরাতের দাবি, সোকোত্রা  দ্বীপে তাদের অবস্থানের বিষয়ে ইয়েমেনের বৈধ সরকারের অনুমোদন রয়েছে। তারা দ্বীপটির বাসিন্দাদের জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন করবে। সেখানকার শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে কাজ করবে।

রয়টার্স লিখেছে, আরব আমিরাত লোহিত সাগরে তার প্রভাব বাড়াতে ইয়েমেনে স্থানীয়ভাবে সেনা দল তৈরি করেছে। কিন্তু এতে ক্রমেই দেশটির সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে ইয়েমেনের নির্বাসিত সরকারের।

ইয়েমেন সরকারের অভিযোগ,  বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তাজনিত বিষয়গুলোতে শক্তি প্রদর্শনের জন্য আমিরাত তাদের সোকোত্রা দ্বীপের নৌ ও বিমানবন্দর দখল করে নিয়েছে।  রয়টার্সকে একটি ইয়েমেনি একটি সূত্র বলেছে, ‘ইয়েমেনিরা দরিদ্র কিন্তু তারা নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় লড়াই করবে।’ দেশটির মানুষ মনে করে,  আমিরাত আদতে তাদের উপনিবেশ বানাতে চাইছে।

ইয়েমেনই শেষ নয়। বাব এল মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পেতে হর্ন অব আফ্রিকায়ও নিজের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে আমিরাত। এ প্রণালি দিয়েই বিশ্বের সিংহভাগ তেলবাহী জাহাজ যাতায়াত করে। সেখানে আমিরাত বাণিজ্যিক বন্দর স্থাপন করেছে। দেশটির সামরিক বাহিনী ওই অঞ্চলে সামরিক অভিযান ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করে।

রয়টার্স জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাতটি আমিরাতের মধ্যে আবুধাবি স্থিতিশীল, উদার ও সহনশীল মুসলিম হিসেবে পরিচিত হতে চায়। তাই আল কায়েদার মতো জঙ্গি সংগঠনের বিষয়ে তারা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে উদগ্রীব হয়ে কাজ করছে। সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নে তারা এমনকি বিদেশি সেনা কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার স্পেশাল ফোর্সেসের জেনারেল মাইক হিন্দমার্শে এমনই একজন। তিনি সরাসরি আবুধাবির যুবরাজ শেখ মোহাম্মেদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ানের নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন। এই জেনারেল হিন্দমার্শই প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ডের সেনাদের তত্ত্বাবধান করেন, যারা ইয়েমেন অভিযানে রয়েছে।

ইয়েমেনিদের অসন্তোষ থাকলেও আমিরাতের ভূমিকাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে পশ্চিমারা। পশ্চিমা একজন কূটনীতিক রয়টার্সকে বলেছেন, ‘তারা শত্রুর ঘরে গিয়ে যুদ্ধ করছে।’ সুর মিলিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি সূত্র, আরব আমিরাত একদিকে ওই অঞ্চলে তার নিজের স্বার্থ রক্ষায় চেষ্টা করছে, অন্যদিকে উন্নয়নের মাধ্যমে আইএসের বিস্তার রোধে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করছে।

ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ইয়েমেন সরকারকে সহায়তা করতে সৌদি আরবের সহযোগী আমিরাত। তিন বছর ধরে চলা ওই যুদ্ধে দেশটির শখানেক সেনা নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে তাদের ভালো অবস্থান থাকার কথা জানিয়ে রয়টার্স লিখেছে, ওই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমিরাত নতুন কৌশল যেমন গ্রহণ করেছে, তেমনি ওই কৌশলের কারণে নতুন বন্ধুও পেয়েছে দেশটি।

ইয়েমেন যুদ্ধে একমাত্র আমিরাতের অর্জনই দৃষ্টিগ্রাহ্য।  ইরানের কাছ থেকে এক সময় গেরিলা প্রশিক্ষণ পাওয়া দক্ষিণ ইয়ামেনের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতারা আরব আমিরাতের সঙ্গে কাজ করা শুরু করেছেন। ইরান সমর্থিত হুথিরা দক্ষিণ ইয়েমেনের দিকে অগ্রসর হলে, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেয়েছিল দক্ষিণ ইয়েমেনের ওই অংশ। আমিরাতের সঙ্গে একযোগে কাজ করার ফলে একদিকে যেমন ২০১৫ সালে তারা এডেন বন্দর উদ্ধার করতে পেরেছে, অন্যদিকে দক্ষিণ ইয়েমেনি বাহিনী আল কায়েদার নিয়ন্ত্রণ থেকে উদ্ধার করতে পেরেছিল মুকাল্লা নৌ বন্দর। মুকাল্লায় বিমানবন্দরও রয়েছে। সেখানে আমিরাতি হেলিপকপ্টারের পাশাপাশি তাদের নিজস্ব বন্দিশালা বা ডিটেনশন সেন্টারও রয়েছে। আছে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। তাদের সাহায্য করছে মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি ছোট দল।

ইয়েমেনের পাশাপাশি সোমালিয়াতেও আমিরাতের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। সোমালিয়ার জলদস্যুদের দস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অগ্রসর হয়েছিল দেশটি। সোমালিয়ায় বহু বছর ধরে আল কায়েদার সঙ্গে যোগসূত্র থাকা শাবাব জঙ্গি গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে।

সোমালিয়ার সীমিত স্বায়ত্তশাসন পাওয়া অঞ্চল সোমালিল্যান্ড ও পুন্টল্যান্ডে আমিরাতের ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’ এবং ‘পি অ্যান্ড ও’ নৌ বন্দর চালু করার চুক্তি রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় সেখানে হাজির হয়েছে আমিরাতের সেনাবাহিনী। সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আমিরাত সফরে গিয়ে এ বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও জঙ্গি দমনের ক্ষেত্রে আমিরাতের উপস্থিতি নিশ্চয়তা তৈরি করবে। কেননা, আমাদের চেয়ে তাদের জ্ঞান ও সক্ষমতা বেশি।’

সোমালিল্যান্ডের অবকাঠামোগত উন্নয়নে আমিরাত কোটি কোটি ডলার ঢেলেছে। ইথিওপিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে মহাসড়ক থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত তৈরি হচ্ছে আমিরাতি অর্থায়নে। কিন্তু দেশটির এমন প্রভাবে ক্ষিপ্ত সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার। এর জের ধরে মোগাদিসুতে আমিরাতের কর্তৃত্ব ও অর্থায়নে চলা সামরিক প্রশিক্ষণ বন্ধ করে দিয়েছে তারা।

অন্যদিকে সোমালিয়ার স্বায়ত্তশাসিত পুন্টাল্যান্ড অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট আব্দিওয়েলি মোহাম্মদ আলি বলেছেন, আরব আমিরাতের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে যাতে তারা জলদস্যু ও জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করতে পারে। আমিরাত উপনিবেশ তৈরি করছে, এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি দ্বিমত পোষণ করেছেন। তার ভাষ্য, ‘তারা আমাদের দেশ দখল করছে না। এটা অসম্ভব। আমরা দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। সেটা আমরা কোনওভাবেই হতে দেবো না।’

 
 

বাংলা ট্রিবিউন

সংশ্লিষ্ট খবর