শুক্রবার ১৮ই অক্টোবর ২০১৯ |

ঢাকা যেভাবে ৪২ বছর আগে জাপানি বিমান ছিনতাইয়ের অবসান ঘটিয়েছিল

 রবিবার ২৪শে ফেব্রুয়ারি ২০১৯ রাত ০৮:৫৮:২০
ঢাকা

বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা হলো রবিবার (২৪ ফেব্রুয়ারি)। তবে ১৯৭৭ সালে ভারত থেকে জাপান এয়ারলাইন্সের বিমান ছিনতাই করে ঢাকা নিয়ে আসা হয়েছিল। আর এই ছিনতাইয়ের অবসানে ভূমিকা রেখেছিলেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা। এ জন্য জাপান সরকার তাদের সম্মাননাও জানিয়েছিল।

সে সময় যশোর বিমানঘাঁটি থেকে জরুরি কাজে ঢাকায় এসেছিলেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী। এয়ার কন্ট্রোল রুমেও ছিলেন তিনি।

ইশফাক চৌধুরী স্মৃতি থেকে জানান, ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৭। জাপান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৮৭২-এর ডিসি-৮ বিমানটি ভারতের মুম্বাই বিমানবন্দর থেকে ছিনতাই করে তৎকালীন ঢাকা তেজগাঁও বিমানবন্দরে নিয়ে আসে জাপানের সশস্ত্র বাম সংগঠন রেড আর্মির সদস্যরা।

মুম্বাই থেকে ওড়ার ১২ মিনিটের মাথায় ছিনতাই হয় বিমানটি। ঘটনার ১২ দিনের মাথায় ৫ অক্টোবর রেড আর্মির সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে জিম্মিদের অক্ষত উদ্ধারের মধ্য দিয়ে ওই ঘটনার অবসান হয়। ১৪ জন ক্রু ও ১৩৭ জন যাত্রী ছিলেন বিমানটিতে। যাত্রীবাহী ওই বিমানটি ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস থেকে মুম্বাই হয়ে ব্যাংক যাচ্ছিল।

                         

কারারুদ্ধ নয়জনের মুক্তি ও ৬০ লাখ মার্কিন ডলার মুক্তিপণের দাবিতে রেড আর্মি এই বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়েছিল। ’৭০-এর দশকে জাপানে সক্রিয় রেড আর্মির লক্ষ্য ছিল কমিউনিস্ট বিপ্লব সংঘটিত করা।

এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী জানান, রেড আর্মির সদস্যরা ফ্লাইট ম্যাপ দেখতে দেখতে পাইলটদের জানিয়েছিল কত উচ্চতায় কোন রুট দিয়ে কোথায় যেতে হবে। ম্যাপে লাল কালি দিয়ে ঢাকা বিমানবন্দর পর্যন্ত পথ দেখিয়ে রেড আর্মির সদস্যরা রুট দেখিয়ে দেয়। তারা জানায়, ঢাকার বিমানবন্দরের রানওয়ে দক্ষিণ থেকে উত্তরে বিস্তৃত এবং দৈর্ঘ্যে ৯ হাজার ফুট। সকাল ১০টায় ছিনতাই হওয়া বিমানটি ঢাকার আকাশে পৌঁছায় এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পেয়ে এক ঘণ্টা আকাশে চক্কর দেয়। সাড়ে ১১টার দিকে নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের আদেশ উপক্ষো করে রানওয়েতে নামে বিমানটি। এসময় বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়া হয়। নিরাপত্তার জন্য সশস্ত্রবাহিনী ও পুলিশ সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।

ইশফাক ইলাহী চৌধুরী জানান, বিমান ঢাকায় অবতরণের পরপরই রেড আর্মির বিবৃতিতে জানায়, তাদের কমান্ডোরা বিমান ছিনতাই করে ঢাকায় অবতরণ করেছে। ৮০ হাজার পাউন্ডের পেট্রল সরবরাহের দাবি জানানো হয় বিবৃতিতে।

রেড আর্মির বিবৃতির পরদিনই জাপান সরকার ঘোষণা দেয়, ৯ ব্যক্তিকে মুক্তি ও মুক্তিপণের দাবি পূরণ করতে হবে। এ তথ্য জানার পর রেড আর্মির সদস্যরা ১৮ ঘণ্টার মধ্যে তাদের হাতে টাকা ও বন্দিদের তুলে দেওয়ার দাবি জানায়।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে রেড আর্মির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনার দায়িত্বে ছিলেন বিমানবাহিনীর তৎকালীন প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ। বাংলাদেশ সরকারের নীতি ছিল রক্তপাত এড়িয়ে জিম্মিদের উদ্ধার করা। জাপান থেকে সেদেশের নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের বাংলাদেশে পাঠানোর প্রস্তাব প্রত্যাখান করা হয়।

                                           ইশফাক ইলাহি চৌধুরী  

১ অক্টোবর ঢাকায় আসে জাপানের প্রতিনিধি দল। রেড আর্মির দাবি করা ৯ বন্দির ছয়জনকে নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। তারা তিনটি বস্তায় নিয়ে ৬০ লাখ ডলার নিয়ে আসে।

জিম্মিদের ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে শুরু করে রেড আর্মির সদস্যরা।

এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী জানান, জাপানের প্রতিনিধিদলের ঢাকায় আসার খবর পেয়ে ছিনতাইকারীরা আলোচনায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রথম দফায় তারা ৫৩ জন জিম্মিকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে কথা বলে। পরে ৮২ জনকে ছেড়ে দিতে রাজি হয়। আলোচনা চলতে থাকে। ঘটনার পর থেকে ৭০ ঘণ্টা ধরে দর-কষাকষি চলে। রেড আর্মি শেষ গন্তব্যে পৌঁছানোর পর অবশিষ্ট জিম্মিদের ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

তিনি জানান, জাপান সরকার মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকাসহ ২১টি দেশ ও যাত্রীদের নিজ নিজ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিমানটি গ্রহণের অনুরোধ করলেও কোনও দেশই ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। রেড আর্মির সদস্যরা জিম্মিদের মেরে ফেলার ঘোষণা দিয়েছিল।

একপর্যায়ে জাপানের প্রতিনিধি দলের প্রধান হাজিমে ইশি নিজেই রেড আর্মির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেন। বলেন, ‘বিমানের ভেতরে থাকা সব যাত্রীর বিনিময়ে আমাকে জিম্মি হিসেবে গ্রহণ করুন।’ কিন্তু তার প্রস্তাব প্রত্যাখান হয়। বিমানের ককপিটের জানালা খুলে পিস্তল দিয়ে গুলি চালায় রেড আর্মির এক সদস্য। এতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুই সদস্য নিহত হন।

                                 এ জি মাহমুদ

পরে অবশ্য আবার আলোচনা শুরু হয়। ১ অক্টোবর রাতে ২০ লাখ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ১০ নারীকে উদ্ধার করা হয়। পরে কয়েক দফায় ৬১ জন যাত্রী মুক্তি পায়।

এর মধ্যেই বাংলাদেশে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটে। ওই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের বিমানবাহিনীর সদস্যরা জড়িত ছিল।

ফলে জিম্মি সংকট উত্তরণের চেষ্টা বিলম্বিত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে ৪২ জন যাত্রী ও পাঁচজন ক্রুকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

সেসময় কারফিউ অবস্থা জারি ছিল। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সামরিক আইন শাসক হিসেবে রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করেছিলেন। তিনি আদেশ দিয়েছিলেন, ছিনতাই করে নিয়ে আসা বিমানটিকে অবিলম্বে ঢাকা ত্যাগ করানোর।

এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী, জাপানের প্রতিনিধি দলের প্রধান হাজিমে ইশিই সরকারি আদেশের কথা শুনে তিনি ভেঙে পড়েন। তখনও বিমানে ২৯ জন আরোহী ছিল। পরে বিমানটি আলজেরিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়। রেড আর্মির সদস্যরা বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে ‘ধন্যবাদ’ জানিয়ে বলে তাদের মিশন সফল হয়েছে। ৩ অক্টোবর বিমানটি কুয়েত পৌঁছায়। সেখান থেকে ৬০ হাজার পাউন্ডের তেল নেওয়ার পর আবারও রওনা হয় বিমান। সিরিয়ায় পৌঁছানোর পর ১০ জিম্মিকে মুক্তি দেয় রেড আর্মি। ৫ অক্টোবর আলেজিরয়ায় পৌঁছানোর পর অন্যদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

কাতার ডেস্ক

সংশ্লিষ্ট খবর