বৃহঃস্পতিবার ৫ই ডিসেম্বর ২০১৯ |

জাদুকরহীন সাত বছর

 শুক্রবার ১৯শে জুলাই ২০১৯ বিকাল ০৩:৩৬:১২
জাদুকরহীন

বাংলা সাহিত্যের বরপুত্র নন্দিত কথাশিল্পী  হুমায়ূন আহমেদ। মাত্র ৬৪ বছরের জীবনে হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যের অঙ্গনে, টেলিভিশন নাটক আর চলচ্চিত্রাঙ্গনে এমন জনপ্রিয়তায় নিজেকে  প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন, যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।
আশ্চর্য এই কথার জাদুকরের ৭ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই করে মারা যান বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তম লেখক হুমায়ূন আহমেদ।

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার  কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। তার ডাক নাম ছিল কাজল। বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ও মা আয়েশা ফয়েজের তিনি ছিলেন প্রথম সন্তান। বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। মা ছিলেন গৃহিনী। তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়।
শাহ্জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল তার ছোটভাই। সবার ছোট ভাই আহসান হাবীব নামকরা কার্টুনিস্ট ও রম্যলেখক।

হুমায়ূন আহমেদ ১৯৬৫ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন শাস্ত্রে স্নাতক ও ১৯৭২ সালে স্নাতকোত্তর পাশ করেন। ১৯৮২ সালে যুক্তরাস্ট্রের নর্থ ডাকোটা ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি গ্রহণ করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ৯০ দশকের মাঝামাঝি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করে লেখালেখিতে পুরোপুরি মনোযোগ দেন।

১৯৭৩ সালে প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁর নাতনি গুলতেকিন খানের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন এবং গুলতেকিন দম্পতির চার ছেলেমেয়ে। তিন মেয়ে নোভা, শীলা ও বিপাশা আহমেদ এবং ছেলে নুহাশ হুমায়ূন। দীর্ঘ ৩২ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটিয়ে ২০০৫ সালে ডিভোর্সের মাধ্যমে তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। এরপর হুমায়ূন  আহমেদ অভিনেত্রী ও কন্ঠশিল্পী মেহের আফরোজ শাওনকে বিয়ে করেন। এ দম্পতির দুই  ছেলে- নিষাদ ও নিনিত হুমায়ূন।         

মাত্র  ৬৪ বছরের জীবনে হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যের অঙ্গনে, টেলিভিশন নাটক আর চলচ্চিত্রাঙ্গনে এমন জনপ্রিয়তায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন, যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। তার মতো অতুলনীয় পাঠকপ্রিয় ঔপন্যাসিক, ছোট গল্পকার, নাট্যকারের শূন্যতা যে কখনও পূরণ হবে না-তা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়।
অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশকরা যে বিপুলসংখ্যক বই প্রকাশ করেন, সব বই মিলিয়ে যা বিক্রি হতো, একা হুমায়ূন আহমেদের লেখা বই তার প্রায় সমান বিক্রি হতো। তার প্রয়াণের এত বছর পরও চিত্র প্রায় একই। এখনও তার বই কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন পাঠক-সাধারন।

হুমায়ূন আহমেদ এদেশের সৃজনশীল সাহিত্য প্রকাশনাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন বিপুল পাঠকপ্রিয়তা সৃষ্টির মাধ্যমে। ভারতীয় বাংলা গল্প, উপন্যাসে নিমগ্ন পাঠকদের বাংলাদেশি লেখকদের বই পড়তে বাধ্য করেছিলেন তার আশ্চর্য জাদুকরি গল্পের জালে জড়িয়ে। মোহাবিষ্ট পাঠক হুমায়ূন আহমেদের রচনায় মধ্যবিত্ত জীবনের হাসি-কান্নার এমন নিবিড় পরিচয় পেয়েছেন, যেখানে তাদের নিজেদেরই জীবনের ছবি প্রতিবিম্বিত।

কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ৭তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নানা কর্মসূচি  পালন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার নেত্রকোনা হিমু পাঠক আড্ডার উদ্যোগে স্মরণ অনুষ্ঠান ও লেখকের নিজের হাতে গড়া নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর  গ্রামের শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠের উদ্যোগে কর্মসূচি পালন করা হয়।

কর্মসূচির মধ্যে ছিলো শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপিঠ প্রাঙ্গণে পবিত্র কোরআন  তেলাওয়াত, কালো ব্যাজধারণ, লেখকের প্রতিকৃতিতে পুস্পস্তবক অর্পণ,  শোকর‌্যালি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল।

প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ তার বাবার স্মৃতি রক্ষার্থে গ্রামের বাড়ি কেন্দুয়া  উপজেলার কুতুবপুরে ২০০৬ সালে তিন একর জমির নির্মাণ করেন এই শহীদ স্মৃতি  বিদ্যাপীঠ। বর্তমানে স্কুলটিতে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া হচ্ছে। ১৫ জন  শিক্ষক ও প্রায় সাড়ে তিন শত শিক্ষার্থীর এই স্কুলটি ফলাফলও ভালো করে আসছে।

এদিকে হুমায়ূন আহমেদের জন্মস্থান নানার বাড়ি মোহনগঞ্জের শেখ বাড়িতেও পালিত হয়েছে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। 

সংশ্লিষ্ট খবর