সোমবার ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০১৯ |

যেভাবে বাংলাদেশ হয়ে সৌদি আরব যায় রোহিঙ্গারা

 রবিবার ১লা সেপ্টেম্বর ২০১৯ রাত ১২:১০:১৩
যেভাবে

মিয়ানমারের রাখাইনে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দেশটির নাগরিকত্ব হারিয়ে রাষ্ট্রহীন। কিছুদিন পরপরই মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের নিপীড়নের শিকার হতে হয় তাদের। জাতিগত নিধনযজ্ঞ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড এড়াতে রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। বাংলাদেশের পাশাপাশি সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের আরও কয়েকটি  দেশে আশ্রয় নিয়েছে রোহিঙ্গারা। আবার অনেকে উন্নত জীবনের আশায় রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করে সৌদি আরব গমন করছে। এক সময় সৌদি আরব রোহিঙ্গাদের অনেক অধিকার দিলেও সৌদি যুবরাজ সেই অধিকারগুলো কেড়ে নিয়েছেন। ফলে এখন সৌদি আরবে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক ধরপাকড় চলছে। বন্দি রাখা হচ্ছে আটককেন্দ্রে। এসব আটককেন্দ্র থেকে মুক্তি পেতে রোহিঙ্গারা আবারও বাংলাদেশ দূতাবাসের দ্বারস্থ হচ্ছে। ঘুষের বিনিময়ে নথিপত্র তৈরি করে ফিরে আসছে বাংলাদেশে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভুয়া পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরব যাওয়া ও ঘুষের বিনিময়ে সেখানে পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে আসা নিয়ে এক দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই। পাঠকদের তিন পর্বে সেই প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরা হলো। ভাষান্তর করেছেন মাহাদী হাসান।

সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে আসার পর আটক কয়েকজন রোহিঙ্গা

প্রথম পর্ব

২০১৮ সালের জানুয়ারি,কোনও এক সকালে সাদাত নামে একজন হিসাবরক্ষক এমন এক সংবাদ শুনলেন যা অনেকদিন ধরেই শুনতে চাচ্ছিলেন। কক্সবাজারের বালুখালি রোহিঙ্গা শিবির তখন জেগে উঠতে শুরু করেছে। দিনের প্রথম চায়ের আশায় দোকানের সামনে জড়ো হয়েছেন পুরুষরা। আর কাঁধে ভারি ব্যাগের বোঝা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে শিশুরা। সেই সকালেই গায়ে চাদর জড়িয়ে ঘর থেকে বের হন সাদাত।

শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গাদের জীবন চলমান, তবে তা খুবই ধীরগতির। ৫০ বছরের সাদাতের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। সেখানে একটি টয়লেট ব্যবহার করতে হয় বেশ কয়েকটি পরিবারকে। তাদের শিবিরে ২০ হাজার রোহিঙ্গার বসবাস। তিনি বলেন,  ‘বালুখালি শিবিরে প্রবেশ করা সহজ, কিন্তু বের হওয়া অনেক কঠিন। কুতুপালংয়ের মতো এখানেও রাস্তায় রাস্তায় সামরিক চৌকি বসানো’। 

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসেন সাদাত। এরপর থেকে শরণার্থী শিবিরে আছেন তিনি। সেদিন সকালে যখন তাঁবুর দিকে ফিরে যাচ্ছিলেন তখন একটি  ফোন আসে তার কাছে। নম্বারটি চিনতেন না, কিন্তু সেই কণ্ঠ তার পরিচিত। সবকিছু ফেলে তিনি ত্রাণ সরবরাহকেন্দ্র ছাড়িয়ে দৌঁড় দেন মূল প্রবেশ পথে। সেখানে ২৫ বছরের এক যুবকের দেখা পান তিনি। তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তারই ছেলে আবু রশিদ, যাকে ২০১২ সালের পর থেকে আর দেখেননি। তবে আবু রশিদ মিয়ানমার থেকে নয়, এসেছেন সৌদি আরব থেকে।

গত বছর রশিদের মতো হাজার হাজার রোহিঙ্গা মধ্যপ্রাচ্য থেকে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে যায়। তাদের কথা প্রায়ই পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দুর্দশার মধ্যে চাপা পড়ে যায়। দীর্ঘদিন রাখাইন রাজ্যে বসবাস করলেও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে মিয়ানমার। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে  রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযান জোরালো করলে জনগোষ্ঠীটির সাত লাখেরও বেশি সদস্য বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এছাড়াও জনগোষ্ঠীটির অনেক সদস্য নিরাপত্তার  আশায় পাচারকারীদের সহায়তায় সমুদ্র পথ পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে  পৌঁছানোর চেষ্টা করে থাকে।

২০১৫ সালে ২৫ বছরের মধ্যে মিয়ানমারে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের পূর্বে রোহিঙ্গাদের নাগরিক তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে জাতিসংঘের শরণার্থী কমিশনের এক প্রতিবেদনে দেশটির সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানে বর্বরতার চিত্র ‍উঠে এসেছে। জাতিগত নিধন ও গণহত্যার অভিপ্রায়ে এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে বলে আখ্যা দেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সহিংসতার শিকার এই রোহিঙ্গারা  বাংলাদেশ,মালয়েশিয়াসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে পালিয়ে যাচ্ছে। তবে সৌদি আরবেও প্রচুর রোহিঙ্গা রয়েছে। এখনও অন্তত আড়াই লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে দেশটিতে। বাংলাদেশের পর সৌদি আরবই সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে।  দেশটিতে ১৯৫০ সাল থেকে রোহিঙ্গারা বসবাস করছে। অনেকেই হজ করতে গিয়ে থেকে গেছেন। ৭০ দশকের প্রথম দিকে মিয়ানমারে সহিংসতা শুরু হলে বাদশাহ ফয়সাল রোহিঙ্গাদের থাকার, কাজের ও দেশ-বিদেশ চলাচলের অনুমতি দেন। 

রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন রেস্টলেস বিইংস এর পরিচালক মাবরুর আহমেদ বলেন, রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই মক্কা ও মদিনায় বাস করছে। বাদশাহ ফয়সালের  দেওয়া অনুমতিকে নাগরিকত্বের মতো করেই দেখা হয়। মিয়ানমারে এই স্বীকৃতি থেকেই বঞ্চিত তারা। তিনি আরও বলেন, সৌদি আরবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন রোহিঙ্গারা। এর মাধ্যমে তারা তাদের অন্য আত্মীয়দের সৌদি ভিসা পাওয়ার জন্য সহায়তা করেন।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কঠোর নিরাপত্তা

তবে এখন আর দেশটিতে রোহিঙ্গারা যেতে পারেন না। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন-২০৩০ এর আওতায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। ভুয়া কাগজপত্র নিয়ে দেশটিতে যাওয়া অনেক রোহিঙ্গা দেশটিতে আটক রয়েছে তারা। এখন তারা আফসোস করছেন কেন সেখানে গেলেন।

বালুখালিতে নিজের অস্থায়ী বাড়িতে বসে আছে রশিদ। গাড়ির ব্যাটারি সঙ্গে যুক্ত তার ফোনটি খুললেন। বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা এভাবেই তাদের মোবাইল চার্জ দেন। এরপর মিয়ানমার থেকে সৌদি আরবে যাওয়ার গল্প শোনালেন। বললেন বিগত পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার কথা।

ছোট থেকেই রশিদের স্বপ্ন ছিল শিক্ষক হবেন। আশা ছিল পরবর্তী প্রজন্মকে নতুন কিছু দেবেন। মংডুতে পরিবারের সঙ্গেই থাকতেন তিনি। শহরটির ৫ লাখ ১০ হাজরের মধ্যে ৪ লাখ ৮০ হাজার মানুষই রোহিঙ্গা। রাখাইনের অন্যান্য অঞ্চলের  মতো এখানেও দারিদ্র ও অপুষ্টি বিদ্যমান। স্থানীয়রা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। 

রশিদ বলেন, আমাদের বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষেধ ছিল। আমাদের বাইরে দেখা গেলে গ্রেফতার করা হতো। ফলে উপার্জনের সুযোগ ছিল না। এটাই ছিল আমাদের বাস্তবতা। আমাদের পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আরও কোনও উপায় ছিল না।

তাই ২০১২ সালে ২০ বছর বয়সে আরও কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে পালিয়ে যান রশিদ। প্রথমে ছয় মাইল হেঁটে মিয়ানমার সীমান্তে পৌঁছান। এরপর নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসেন। সেখান থেকে ৮০ কিলোমিটার হেঁটে পৌঁছান।

কক্সবাজার আগে পর্যটন প্রিয় থাকলেও এখন পরিস্থিতি অনেকটা ভিন্ন। রোহিঙ্গা সংকটে পাল্টে গেছে সেখানকার চিত্র। আন্তর্জাতিক সংস্থা পুলিশের সহায়তায় সেখানে দোকান ও হোটেল খুলেছে। ফলে ব্যয় বেড়েছে স্থানীয়দের। তবে রোহিঙ্গাদের অনেকেই পাচারকারীদের ফাঁদে পা দিচ্ছেন। পাসপোর্ট না থাকায় তাদের ছাড়া সৌদি আরব যাওয়া অসম্ভব তাদের পক্ষে।

কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম জানান,এই পাচারকারীরা রোহিঙ্গাদের মধ্যপ্রাচ্য পাঠাতে আড়াই লাখ ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করেছে।

কক্সবাজারে পাসপোর্ট বিতরণ কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক আবু নাইম। তিনি জানান, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকটের পর তার কাজ অনেক বেড়ে গেছে। তিনি জানান, সৌদি যেতে চাওয়া বেশিরভাগ রোহিঙ্গাই নারী। তারা স্বামীর কাছে যেতে চাইছিলেন। তিনি বলেন, একজন রোহিঙ্গা নারী পাসপোর্ট নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে আমাদের জিজ্ঞসাবাদে তিনি ধরা পড়ে যান। বাংলাদেশের জাতির জনকের নামটাও বলতে পারেননি তিনি। 

এদিকে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে রশিদও বুঝতে পারেন পরিবারের জন্য তার উপার্জন যথেষ্ট নয়। তখন তার এক বাংলাদেশি বন্ধু তাকে সৌদি আরব যাওয়ার পরামর্শ দেয়। প্রথমদিকে দ্বিধায় থাকলেও পরে রাজি হন। পাচারকারীকে ৩৫৪ ডলার দিতে রাজি হয়। এই অর্থের বেশিরভাগই চলে যায় একজন বাংলাদেশির কাছে। তিনি বলেন, ‘ওই দালাল আমাকে একটি ভুল ঠিকানা মুখস্ত করতে বলে। পাসপোর্ট অফিসে যেনও আমি পুরো নাম এবং গ্রামের নাম সঠিক বলতে পারি।’

এর তিনমাস পর তিনি পাসপোর্টও পেয়ে যান।

প্রায় এক বছর কাজ করে পাচারকারীদের অর্থ যোগাড় করেন রশিদ। এরপর ২০১৩ সালের নভেম্বর তিনি চট্টগ্রাম চলে যান। সেখান থেকে সৌদি আরবে। তবে জেদ্দায় অবতরণের পরই বাধে বিপত্তি। ওই দালাল তাকে উমারহ ভিসা দিয়েছিলেন। কর্তৃপক্ষ যেনও রোহিঙ্গাদের সন্দেহ না করে এটা সেজন্যই করা।

তবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশি পাসপোর্ট সৌদিতে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে রেখে দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষের দাবি, কেউ যেনও থেকে না যায় সেজন্যই এই ব্যবস্থা। এতে করে সেখানে কোনও পরিচয়পত্র ছাড়া ঘুরতে থাকে রোহিঙ্গারা। ফলে অন্ধকারে বাস করতে হয় তাদের। ভালো অর্থ পান না। সবসময় পুলিশের কাছে আটক হওয়ার ভয় থাকে।

রশিদ বলেন, সেখানে প্রত্যেকটা দিনই অভিশাপময় ছিল। সবসময় আতঙ্কে থাকতাম কী হবে, এই বুঝি আমাদের শেষ দিন। আমরা একই ঘরে সারাদিন কাজ করতাম, রাতে সেই ঘরেই ঘুমাতাম। এটা কোনও জীবন ছিল না।

এরপর হঠাৎ ২০১৫ সালের এপ্রিলে সৌদি পুলিশ ফ্যাক্টরিতে হানা দেয়। রশিদ বলেন, সবাই পালাচ্ছিল। আমরা চমকে গিয়েছিলাম। সৌদি যুবরাজ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রায়ই এমন অভিযান চালানো হয়।

মিডল ইস্ট আই জানায়, তারা সৌদি আরবে বসবাস করা রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে প্রমাণ পেয়েছেন যে দেশটির অভিবাসী পুলিশ ছদ্মবেশেও রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযান চালিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী বলেন, সৌদি অভিবাসন পুলিশ গত কয়েক বছরে তাদের অভিযান জোরালো করেছে। ছদ্মবেশেও তারা অনিবন্ধিত অভিবাসীদের আটক করছে। অনেক রোহিঙ্গাই ধরা পড়েছে কিংবা পালিয়ে গেছে। অ্যাক্টিভিস্টরা সেখানে হোয়াটসঅ্যাপের মতো অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করে।

রশিদ বলেন, কেউ বুঝতে পারেনি এমন কিছু ঘটবে। তাকে হাতকড়া পড়িয়ে যখন পুলিশের গাড়িতে তোলা হচ্ছিল তখন মনে হচ্ছিল তিনি যেনও ডুবে যাচ্ছেন। সৌদি আরবে আসতে ও আসার পর যে কষ্ট তিনি করেছেন সব বৃথা হয়ে গেলো। মনে প্রশ্ন এখন কীভাবে পরিবারকে সহায়তা করবেন?
চলবে...

মিডল ইস্ট আই

সংশ্লিষ্ট খবর