সোমবার ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০১৯ |

সৌদি ফেরত নারী কর্মীদের কান্না শোনার কেউ নেই

দেড় বছরে সৌদি থেকে ২ হাজারের বেশি নির্যাতিত নারী দেশে ফিরেছেন |  মঙ্গলবার ৩রা সেপ্টেম্বর ২০১৯ রাত ১২:৩২:৩৬
সৌদি

সংসারের অভাব মোচন কিংবা স্বজনদের মুখে হাসি ফোটাতে সৌদি আরবে কাজ করতে  যাচ্ছেন দেশের এক শ্রেণির জীবন সংগ্রামী নারীরা। কিন্তু সেখানে গিয়ে ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অধিকাংশ নারী কর্মী। বিভৎস-বিকৃত নির্যাতনের ফলে এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে দেশে ফিরছেন অনেকেই। কিন্তু ফিরে এসে পাচ্ছেন না সমাজ, সংসার এমনকি রাষ্ট্রের তেমন কোনো সহযোগিতা। বরং রেখে যাওয়া সাজানো সুখের সংসার, স্বামী-সন্তান এমনকি জন্মদাতা মা-বাবার কাছ থেকেও বিতাড়িত হচ্ছেন নির্যাতিতা নারী কর্মী। চিরচেনা প্রিয় মানুষগুলোও অচেনা হয়ে যাচ্ছে। কাটাতে হচ্ছে মানবেতর বা যাযাবর জীবন। অবস্থা এমন যে নির্যাতিত এই নারীদের কান্না শোনারও যেন কেউ নেই।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে দীর্ঘদিন ধরেই সৌদিতে বাংলাদেশি নারী কর্মীরা নির্যাতনের শিকার হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে অনেকটা উদাসীন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে এ পর্যন্ত হাজারের ওপরে নির্যাতনের অভিযোগ দায়ের হলেও কোনোটারই সুরাহা হয়নি। বন্ধ হয়নি নির্যাতন। এ কারণে সৌদিতে সিরিজ নির্যাতনের ঘটনাও বাড়ছে।

সৌদি ফেরত নির্যাতিত বেশ কয়েকজন নারী কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তারা সবাই গৃহকর্মী হিসেবে গিয়েছিলেন। কথা ছিল বাসাবাড়িতে কাজ করবেন। বিনিময়ে পাবেন টাকা। কিন্তু টাকা তো ভাগ্যে জোটেইনি উল্টো যৌন নির্যাতন, মারধর, মানসিক শাস্তির শিকার হয়েছেন তারা। জীবনের সর্বস্ব হারিয়ে তাদের অভিজ্ঞতা এতটাই তীক্ত যে, এই নারীরা দেশটিতে (সৌদি আরব) আর কখনই যেতে চান না। দেশে ফিরলেই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচেন। অনেক গৃহকর্মী নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথও বেছে নিয়েছেন।  কেউ কেউ অবিবাহিত হিসেবে গেলেও গর্ভে সন্তান নিয়ে দেশে ফিরেছেন। দেশে ফিরে ঠাঁই হচ্ছে না সমাজ-সংসারে। গত বছর এক নারী বিমানবন্দরে ফিরে টয়লেটে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। পরে জানা যায়, ওই নারীকে সৌদির বাংলাদেশ দূতাবাসের সেভহোমে রাখার সময় সেখানকার কয়েকজন কর্মচারী ধর্ষণ করে। কিন্তু সেই ঘটনা এখন চাপা পড়ে গেছে। সেই নির্যাতিতা নারীরও খোঁজ রাখেনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। এখনও দেশটির বাংলাদেশ দূতাবাসের ক্যাম্পে দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন কয়েকশ নারী।

প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব রৌনক জাহান বলেন, ফিরে আসা নারীদের কর্মসংস্থান তৈরি, চিকিৎসা ও তাদের সাহায্যের জন্য যা যা দরকার তা বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তারপরও কারও অভিযোগ থাকলে তারা আমাদের কাছে আসতে পারে। তা ছাড়া আমরা প্রতিনিয়ত সৌদি সরকারের সঙ্গে এই নির্যাতন বন্ধের জন্য কথা বলছি, তাদের চিঠি পাঠাচ্ছি। সম্প্রতি মন্ত্রী যাবেন এবং বিষয়টি নিয়ে আবারও কথা বলবেন।

আলাপকালে জানা যায় নওগাঁর সুমা আক্তারের (ছদ্মনাম) রিকশাচালক স্বামী ও এক সন্তানকে নিয়ে সংসার জীবন ভালোই কাটছিল। বাড়তি আয়ের জন্য সৌদি গিয়েছিলেন সুমা। কিন্তু সেখানে গিয়ে ভয়ঙ্কর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি। বাসার গৃহকর্তার অশালীন আচরণে বাধা দেওয়ায় তার হাতে গরম পানি ঢেলে দেওয়া হয়। এতে তার হাত ঝলসে গেলেও ওই সৌদি গৃহকর্তা চিকিৎসকও দেখাননি। এমনকি ওষুধও খেতে দেননি। ফলে বাধ্য হয়েই ওই বাসা থেকে পালিয়ে যান। দেশে ফিরে এখন স্বামীর হাতে টাকা না থাকায় যথাযথ চিকিৎসাও করাতে পারছেন না তিনি। এদিকে মুন্সীগঞ্জ সদরের মলি আক্তার (ছদ্মনাম) সৌদিতে গিয়ে এক মাস ভালোই ছিলেন। কিন্তু পরের মাস থেকেই অত্যাচার শুরু হয়। বাসার গৃহকর্তার হাত-পা টিপে দিতে বলতেন। কথামতো কাজ না করলেই মারধর করা হতো। সেই সময়টুকুতে মলির মনে হতো, তিনি মনে হয় আর বাঁচবেন না। পিঠে এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন মারপিটের সেই ক্ষতের দাগ। কেবল সুমা কিংবা মলি নয়, সৌদিতে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরা প্রায় সব নারী কর্মীর করুণ অভিজ্ঞতা প্রায় একই রকম।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন প্রোগ্রাম জানিয়েছে, সৌদি থেকে গত বছর ফেরত আসা ১ হাজার ৩৬৫ জন ও চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৯১০ জন নারী গৃহকর্মীকে বিমানবন্দরে বিভিন্নভাবে জরুরি সহায়তা দিয়েছেন তারা। গত বছর ফেরত আসা ১৩ জন মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে চিকিৎসা সেবা ও অর্থ সহায়তাও দেওয়া হয়েছে ব্র্যাক ও আইওএমের প্রত্যাশার প্রকল্পের মাধ্যমে। ফেরত আসাদের ডাটাসহ তথ্য সংস্থাটির কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। তবে এর বাইরেও বিদেশ ফেরত থাকতে পারে বলছে ব্র্যাক।

ব্র্যাক ও প্রবাসী ডেস্কের তথ্য বলছে, গত তিন বছরে বিদেশে গিয়ে বিভিন্নভাবে ৩৩১ জন নারী মারা গেছেন। এর মধ্যে ৪৪ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। চলতি বছরে গত ছয় মাসে ৬০ জন নারীর লাশ দেশে এসেছে। এর মধ্যে খোদ সৌদি থেকেই এসেছে ২৬ জন।  

তথ্য আরও বলছে, শুধু সৌদি আরব থেকেই এখন পর্যন্ত ১১২ জন নারীর লাশ এসেছে।  বাকিগুলো জর্ডান, লেবানন, আরব আমিরাত, ওমান ও বিভিন্ন দেশ থেকে। কিন্তু কেন তারা আত্মহত্যা করেছেন সেই প্রশ্নের উত্তর মিলছে না প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কাছে। এমনকি দুই যুগ ধরে বিদেশে নারী শ্রমিক পাঠানো শুরু হলেও সৌদিতে কতজন নারী এ পর্যন্ত পাঠানো হয়েছে তার পরিসংখ্যানও নেই মন্ত্রণালয়ের কাছে।

ঘরে ঢুকতে পারছেন না রেশমা : 

নরসিংদী সদর উপজেলার রেশমার (ছদ্মনাম) স্বামী থাকেন ওমানে। কিন্তু ঠিকমতো বাড়িতে টাকা-পয়সা পাঠাতেন না। এ কারণে সংসারে ছিল টানাপোড়েন ও ঋণের বোঝা। নিরুপায় হয়ে কাউকে না বলেই একদিন সৌদিতে পাড়ি জমান রেশমা। সৌদিতে গিয়ে মাত্র তিন মাস কাজ করে তাকে দেশে ফিরে আসতে হয়েছে। তিন মাস কাজ করেও রেশমা এক টাকাও পাননি। উল্টো ওই বাসার গৃহকর্তা, তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২৬ ও ২৭ আগস্ট দেশে ফিরেছেন ১১০ জন নারী গৃহকর্মী। যাদের মধ্যে ছিলেন রেশমাও। কিন্তু দেশে ফিরলেও গ্রামে তার ঘরে ঢুকতে পারেনি। তার সৌদি থেকে আসার কথা শোনার পরই ছেলে ঘরে তালা মেরে দিয়েছেন। এরপর তিনি পাশের বাড়ির এক বান্ধবীর বাসায় আশ্রয় নেন। সেখানে তিন দিন ছিলেন। এখন তিনি তার বাবার বাড়িতে অবস্থান করছেন। বাবা-মা বেঁচে নেই। একমাত্র ভাইও দরিদ্র। এই অবস্থায় রেশমা কোথায় যাবেন, কি করবেন ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছেন না। তার ছেলেমেয়ে ও স্বামী বলছেন, রেশমা সৌদিতে গিয়ে খারাপ কাজ করেছে বলে তাকে তারা ঘরে তুলবেন না। প্রতিবেশীরা তার বিদেশে থাকা স্বামী ও গ্রামের ছেলেমেয়েকে নানাভাবে বোঝাচ্ছেন কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। এসব কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে রেশমা বলেন, ‘কি করে আমার স্বামী ও বাচ্চাদের বোঝাই আমি তো কাজ করতে গেছিলাম, অন্য কিছুর লাইগা যাই নাই।’

বিদেশ গিয়েই সন্তান হারালেন লাকী : 

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার লাকী আক্তার (ছদ্মনাম)। দুই সন্তান ও তাকে রেখে স্বামী একদিন হঠাৎ করেই উধাও হয়ে যান। দুই সন্তানকে নিয়ে বাকিটা জীবন বাঁচতে চলতি বছরের ২৫ জুন সৌদি আরবে যান। সেখানে গিয়ে রাতে বিভিন্নভাবে বাসার গৃহকর্তার নির্যাতন সইতে হয়েছে। সেই রাতগুলোর কথা মনে হলে এখনও আঁতকে ওঠেন সৌদি ফেরত এই নারী। লাকী দেশে ফিরেছেন ঠিকই কিন্তু আদরের সন্তানকে হারিয়েছেন। লাকী দেশে ফেরার দুদিন আগে তার আট বছরের ছেলেটি এক আত্মীয়ের বাসা থেকে হারিয়ে যায়। এখনও ছেলেকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন জায়গায়। লাকী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘সব হারাইলাম। সংসার আগেই হারাইছি, স্বামী চইলা গ্যাছে। এখন সন্তান হারিয়ে গেল।’

বিদেশের নাম মুখে লইতাম না : 

সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার আসমা বেগম (ছদ্মনাম)। বাবা মায়ের কষ্টের সংসারে পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট হিসেবে তার বেড়ে ওঠা। মাত্র ১৮ বছর বয়সে চলতি বছরের এপ্রিলে পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরবে। কিন্তু ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি। বাসার গৃহকর্তা তাকে ভাতে মারতে শুরু করে। প্রতিদিন এক বেলা করে খেয়েই তার দিন কেটেছে। সইতে না পেরে একদিন বাসা থেকে পালিয়ে আসেন আসমা। পালিয়ে আসায় দেশটিতে আসমাকে তিন মাসের জেলও খাটতে হয়। পরে সৌদিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের শেলটার ক্যাম্পে থাকার পর দেশে ফিরেছেন। কিন্তু নির্যাতিত হওয়ার বিচার পাননি। সৌদিতে আর কখনই যেতে চান না এই নারী। আসমা বলেন, ‘বিদ্যাশ যাইতাম না। কাজের লাইগা গেছিলাম। দেইখা আসলাম বিদেশের কষ্ট ক্যামন। যত দিন বাইচা আছি বিদেশের নাম মুখে লইতাম না।’

সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন : 

সৌদিতে বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীদের ওপর চলা নির্যাতন বন্ধ না হওয়ার জন্য অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম প্রবাসী মন্ত্রণালয়য়ের উদাসীনতাকেই দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, প্রথমত এটি হচ্ছে একটি উদাসীনতা। প্রথম দিকে এটিকে তো নজরেই নেওয়া হয়নি। তারা (প্রবাসী মন্ত্রণালয়) ধরেই নিয়েছে যেখানে ৭০-৮০ হাজার লোক যাচ্ছে সেখানে কয়েক হাজার নির্যাতিত হতেই পারে। ফলে বিষয়টিতে উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি বড় বাধা হয়েছিল।

ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের হেড অব প্রোগ্রাম শরীফুল হাসান বলেন, যারা বিদেশ থেকে ফেরত আসছে তাদের জন্য আমাদের অনেক কিছুই করার আছে। সেটা চাইলেই সম্ভব। তাদের বিদেশ পাঠানোর সময় ঠিকই কদর করছি কিন্তু ফিরে আসার সময় আর কোনো খোঁজখবর রাখছি না। যেসব নারী নির্যাতিত হয়ে দেশে ফেরছে তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তারা যেন বাকিটা জীবন স্বাচ্ছন্দে কাটাতে পারেন তার ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে। যারা ইউরোপ থেকে ফিরছেন তারা যেমন স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য অর্থ পাচ্ছেন ঠিকই একইভাবে যারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফিরছেন তাদেরও যেন এই প্রকল্পের আওতায় এনে সহায়তা করার ব্যবস্থা করা হয়। তাতে সব বিদেশ ফেরতরাই উপকৃত হবেন।

প্রবাসী ডেস্ক

সংশ্লিষ্ট খবর