শুক্রবার ১৮ই অক্টোবর ২০১৯ |

কাতারসহ সাত দেশে শ্রমিক রপ্তানি কমছে

 রবিবার ৬ই অক্টোবর ২০১৯ সকাল ১০:৪৫:১৯
কাতারসহ

বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দ্বিতীয় প্রধান মাধ্যম প্রবাসী আয়। প্রবাসী আয়ে আশানুরূপ ফলাফল দেখা গেলেও মধ্যপ্রাচ্যসহ কয়েকটি দেশে শ্রমিক রপ্তানিতে আশঙ্কাজনক চিত্র দেখা গেছে। 

উলিস্নখিত কয়েকটি দেশে শ্রমিক রপ্তানির হার কমে গেলেও দেশে মোট প্রবাসী আয়ের চিত্র আনুপাতিক হারে বাড়ছে। ফলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়ছে। সম্প্রতি ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রবাসী আয় নিয়ে প্রকাশিক ত্রৈমাসিক প্রতিবদেনে (এপ্রিল-জুন) উঠে এসেছে এমন তথ্য। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রবাসী আয়ের অন্যতম দেশ মালয়েশিয়ায় গত এক বছরের জনশক্তি রপ্তানি সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। উলিস্নখিত প্রান্তিকে মালয়েশিয়ায় রপ্তানি হয়েছে ১১৮ জন শ্রমিক। অথচ গত বছরের একই প্রান্তিকে অর্থাৎ ২০১৮ সালের এপ্রিল-জুনে মালয়েশিয়ায় গমন করেছিলেন ৫২ হাজার ৫১৩ জন শ্রমিক। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় দেশটিতে এবার রপ্তানি কমেছে ৯৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ। আরব দেশগুলোর মধ্যে বাহরাইনেও প্রায় একই চিত্র। আলোচিত্র প্রান্তিকে সে দেশে শ্রমিক গিয়েছেন মাত্র ৬ জন। অথচ গত বছরের একই সময়ে দেশটিতে শ্রমিকের গমনের সংখ্যা ছিল ২৮৮ জন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় দেশটিতে শ্রমিক গমনের সংখ্যা কমেছে ৯৭ দশমিক ৯২ শতাংশ।

অন্য আরেক আরব দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতেও আনুপাতিক হারে নারী জনশক্তি রপ্তানি কমেছে। আলোচিত প্রান্তিকে দেশটিতে গিয়েছেন ৭৫২ জন। অথচ গত বছরের একই সময়ে ৯১৭ জন শ্রমিক গিয়েছিলেন দেশটিতে। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে দেশটিতে রপ্তানি কমেছে ১৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ। কুয়েতেও জনশক্তি রপ্তানি ক্রমেই অবনতির দিকে। জুন প্রান্তিকে দেশটিতে জনবল পাঠানো হয়েছে ২ হাজার ২৩৩ জন। অথচ গত বছরের একই সময়ে দেশটিতে জনবল পাঠানো হয়েছিল ৮ হাজার ৬৯১ জন। বছরের ব্যবধানে দেশটিতে জনশক্তি রপ্তানি কমেছে ৭৪ দশমিক ৩১ শতাংশ। জনশক্তি রপ্তানিতে ভরসা ছিল, মধ্যপ্রাচ্যের এমন আরেক দেশ কাতার। দেশটিতে আলোচিত প্রান্তিকে মোট গিয়েছেন ১২ হাজার ৫২৩ জন শ্রমিক। গত বছরের একই সময়ে যার সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ৮৩৩ জন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশটিতে শ্রমিক রপ্তানি কমেছে ৩৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। ওমানেও অবনতির দিকে। আলোচিত সময়ে দেশটিতে ১৭ হাজার ৮৯ জন শ্রমিক গিয়েছেন, গতবার একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ২৯১ জন। অর্থাৎ গত বছরের চেয়ে এবার কমেছে ১ দশমিক ১৭ শতাংশ।

সারাবিশ্বে সেবিকা ও গৃহস্থালি কর্মী নিয়োগের সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশের নারী জনশক্তি রপ্তানি সে বিবেচনায় আশাব্যঞ্জক। দেশে কাজের ব্যবস্থা করতে না পেরে অর্থ উপার্জনের জন্য বিদেশে যাচ্ছেন দেশের নারী শ্রমিকরা। এ সংখ্যা প্রতি মাসেই বাড়ছে। তবে ৩ দেশে নারী শ্রমিক রপ্তানিতে আশঙ্কাজনক চিত্র দেখা গেছে। এ তিন দেশ হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মালয়েশিয়া। উলিস্নখিত তিন দেশেই গত বছরের একই সময়ের তুলনায় নারী শ্রমিক গমনের সংখ্যা আনুপাতিক হারে কমেছে। 

প্রবাসী আয় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিক এই তিন মাসে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারী জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে ৩০ হাজার ৬১ জন। অথচ এর আগের প্রান্তিকেও নারী জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে ৩২ হাজার ৫৭৭ জন। আর তিন দেশে গত এক বছরের নারী শ্রমিক রপ্তানির চিত্র আশঙ্কাজনক। 

এর মধ্যে মালয়েশিয়ায় গত এক বছরের নারী শ্রমিক রপ্তানি সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। উলিস্নখিত প্রান্তিকে মালয়েশিয়ায় রপ্তানি হয়েছে ৪ জন নারী শ্রমিক। অথচ গত বছরের একই প্রান্তিকে অর্থাৎ ২০১৮ সালের এপ্রিল-জুনে মালয়েশিয়ায় গমন করেছিলেন ১৭ জন নারী শ্রমিক। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় দেশটিতে এবার নারী শ্রমিক রপ্তানি কমেছে ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ। আরব দেশগুলোর মধ্যে বাহরাইনেও প্রায় একই চিত্র। আলোচিত্র প্রান্তিকে সে দেশে যেতে পারেননি একজনও নারী শ্রমিক। অথচ গত বছরের একই সময়ে দেশটিতে নারী শ্রমিকের গমনের সংখ্যা ছিল ২ জন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় দেশটিতে নারী শ্রমিক গমনের সংখ্যা কমেছে ১০০ শতাংশ।

অন্য আরেক আরব দেশ সৌদি আরবেও আনুপাতিক হারে নারী জনশক্তি রপ্তানি কমেছে। আলোচিত প্রান্তিকে দেশটিতে গিয়েছেন ১৯ হাজার ৫০৮ জন। অথচ গত বছরের একই সময়ে ২১ হাজার ৩৯৪ জন নারী শ্রমিক গিয়েছিলেন দেশটিতে। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে দেশটিতে নারী শ্রমিক রপ্তানি কমেছে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই প্রতিবেদন বলছে, ১৯৯১ থেকে নারী শ্রমিক রপ্তানি শুরু হওয়ার পর ২০১৮ পর্যন্ত সময়ে ৭ লাখ ৭৭ হাজার জন নারী কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশ গমন করেছেন। এর মধ্যে বেশিরভাগই সেবিকা ও গৃহস্থালির কাজে গিয়েছেন। জুন প্রান্তিক পর্যন্ত সময়ে বিদেশ যাওয়া নারীদের ৬৪ দশমিক ৮৯ শতাংশই গিয়েছেন সৌদি আরবে। আর বাকি দেশগুলোর মধ্যে জন্য ১৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ, ওমানে ১০ শতাংশ, কাতারে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২ দশমিক ২৫ শতাংশ, লেবাননে ১ দশমিক ৬০ শতাংশ ও বাকি দেশগুলোতে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ নারী শ্রমিক গমন করেছিলেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে আরও উলেস্নখ করা হয়েছে, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন দেশে অদক্ষ শ্রমিক রপ্তানি করা হয়েছে ১৬ লাখ ২৯ হাজার জন। অবশ্য একই সময়ে দক্ষ শ্রমিক গিয়েছেন ১৫ লাখ ৬৭ হাজার। ২০১৮ সালে মোট জনশক্তির ৪৩ দশমিক ২৫ শতাংশই দক্ষ এবং ৩৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ অদক্ষ। বাংলাদেশ থেকে বিদেশ যাওয়া শ্রমিকদের সাধারণত চারভাগে ভাগ করা হয়। যার মধ্যে রয়েছে- পেশাগত, দক্ষ, আধা-দক্ষ, অদক্ষ। ২০১৮ সালে মোট জনশক্তি রপ্তানির মাত্র দশমিক ৩৬ শতাংশ পেশাগত কাজে গিয়েছেন, আর আধা-দক্ষ শ্রমিক গিয়েছেন ১৬ শতাংশ।

প্রবাসীয় আয় নিয়ে ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রবাসী আয় বেড়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৩৩৯ কোটি ৮৩ লাখ ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। যা মোট প্রবাসী আয়ের ৭৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ। যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। আর আলোচিক তিন মাসে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমেই এসেছে ৮৬ কোটি ডলার। যা ওই সময়ে মোট প্রবাসী আয়ের ১৮ দশমিক ৯১ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের করা সম্প্রতি আরেক জরিপে দেখা গেছে, সরকার নির্ধারিত খরচে বিদেশে কাজ করতে যেতে পারছেন না শ্রমিকরা। বরং কোনো দেশের ক্ষেত্রে প্রায় চারগুণ পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে বিদেশ গমনেচ্ছুদের। বাড়তি খরচ মেটাতে জমি বিক্রি কিংবা ব্যাংক, এনজিও ও সুদের কারবারিদের থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে অনেককে। এরপর বিদেশ গিয়ে ভালো আয় করতে না পারায় সেই ঋণও সময়মতো শোধ করতে পারছেন না এক-তৃতীয়াংশ প্রবাসী শ্রমিক। অভিবাসী ঋণের ব্যবহার ও প্রভাবের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংক অভিবাসন খাতে ঋণ বিতরণ করে। 

এ দুই ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশ গেছেন এমন ব্যক্তির সুবিধাভোগীদের সঙ্গে কথা বলে ওই জরিপটি করা হয়েছে। দেশের ৪০ জেলায় ব্যাংক দুটির ৮০ শাখা এবং ৪০০ পরিবারের সদস্যদের থেকে তথ্য নিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

জরিপে দেখা গেছে, প্রবাসে থাকা শ্রম জনশক্তির ৬৫ শতাংশের বিদেশ যেতে তিন লাখ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। ২৩ শতাংশের খরচ হয়েছে পাঁচ লাখ টাকার বেশি। অন্যদিকে, এক থেকে দুই লাখ টাকা খরচ করে বিদেশ যেতে পারছেন মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশে যেতে ইচ্ছুক শ্রমিকদের অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে প্রয়োজনীয় খরচ জোগাড় করাই অন্যতম। প্রাথমিকভাবে পরিবারের সঞ্চয় থেকে অর্থ জোগাড়ের চেষ্টা হয়। তা না হলে আত্মীয়স্বজনদের থেকে ধার নেওয়া হয়। অভিবাসীদের বিদেশ যাওয়ার খরচের ৩২ শতাংশের উৎস ব্যাংক। ৫ শতাংশের বেশি এসেছে এনজিও এবং স্থানীয় সুদের কারবারিদের থেকে এবং ১১ শতাংশ অর্থ এসেছে জমি বিক্রি করে। তবে ব্যাংক ঋণগ্রহীতাদের ৬৯ শতাংশ সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। এর কারণ তাদের চাকরি অনিয়মিত, অপ্রত্যাশিত কাজের পরিবেশ, অন্য উৎস থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধের চাপ, অসুস্থতা, চাকরি পেতে দেরি হওয়া এবং বেতন কমে যাওয়া। এভাবে ধারকর্জ করে যাওয়ার পর চাকরি না পেয়ে যারা ফিরে আসতে বাধ্য হন, তাদের বেশিরভাগই আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক চাপে থাকেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

যায় যায় দিন

সংশ্লিষ্ট খবর