অফারের নামে ফাঁদ, হুমকিতে ই-কমার্স

কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কারণে এ ধরনের গোটা ব্যবসাটাই হুমকির মুখে পড়তে চলেছে। নানাভাবে প্রতারিত গ্রাহকেরাও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারাচ্ছে।

অথচ করোনার এই মহামারির সময়ে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ছিল বাড়বাড়ন্ত। সম্প্রতি ইভ্যালি, ধামাকাসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এবং তদন্ত শুরু হওয়ায় এই ব্যবসা বড় ধাক্কা খেয়েছে।

ডাবল ভাউচার, সিগনেচার কার্ড কিংবা বিগ বিলিয়ন রিটার্নসসহ হরেক রকম মূল্যছাড়ের টোপ দিয়ে গ্রাহকদের শত শত কোটি টাকা নিয়ে নিয়েছে বেশ কয়েককটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান।

তদন্তকারী সংস্থাগুলো বলছে, এরা ১০ শতাংশ গ্রাহকের পণ্য সরবরাহ করে বাকিদের অর্থ আত্মসাৎ করছে অথবা দিনের পর দিন ঘোরাচ্ছে। আর এ সুযোগে এ ধরনের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা দেশ ছাড়ছেন, সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন বিপুল অর্থ।

আবার অনেকেই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের আড়ালে নিষিদ্ধ এমএলএম ব্যবসা করছেন বলে সম্প্রতি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি তদন্তে উঠে এসেছে। সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবীর আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ইভ্যালিসহ অন্য সব ই-কমার্স সাইটের ব্যাপারে বেশ কিছু অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত শুরু করেছি।’

সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগের একটি ছায়া তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক প্রতিষ্ঠান ই-কমার্সের নিবন্ধন নিয়ে নতুন কৌশলে এমএলএম ব্যবসা শুরু করেছে।

বেশ কিছু ই-কমার্স পণ্য না দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকাও নিচ্ছে।

সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের অতিরিক্ত ডিআইজি কামরুল আহসান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো সাইবার স্পেস ব্যবহার করে কাস্টমারের সঙ্গে যে প্রতারণা করছে, তার ছায়া তদন্ত করছে সিআইডি। সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারও এসব ঘটনার কিছু অংশের তদন্ত করছে। আমরা তদন্ত করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করব।’ তিনি বলেন, ‘ধামাকা শপিংয়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করতে গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়েছে সিআইডি।’

সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রাহকদের অর্থ অবৈধভাবে দেশের বাইরে পাঠানো হচ্ছে। কয়েকজন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মালিক দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। এর মধ্যে ধামাকা শপিং নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক গ্রাহকদের টাকা নিয়ে তিন মাস আগে আমেরিকায় চলে যান। গ্রাহকদের প্রায় আট কোটি টাকা আত্মসাৎ করে আত্মগোপন করেন নিরাপদ ডটকম নামের একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সিইও শাহরিয়ার খান। পরে গত সোমবার তাঁকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, গ্রাহকদের টাকা নিয়ে আরও অনেকে পালিয়ে যেতে পারেন।

সোহেল মাহমুদ নামে এক ব্যক্তি ধামাকা শপিংয়ে ফ্রিজ অর্ডার করেছিলেন। তাঁর অর্ডার নম্বর ৩৬৭১১৪৫৬৪৫৬১। ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ডেলিভারি দেওয়ার কথা থাকলেও দুই মাসেও তাঁর ফ্রিজটি দেওয়া হয়নি। সোহেল মাহমুদ জানান, ধামাকায় যোগাযোগ করার পর তাঁকে জানানো হয়, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাদের ডেলিভারি কার্যক্রম কিছুটা শিথিল রয়েছে। ঈদের পর পণ্যটি দেওয়া হবে বলে তারা জানায়।

শুক্রবার সন্ধ্যায় দীর্ঘ সময় ধরে ধামাকা শপিংয়ের হটলাইন নম্বরে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু প্রতিবারই সব লাইন ব্যস্ত আছে বলে একটি রেকর্ড করা ভয়েস শোনানো হয়। কয়েকজন গ্রাহক আজকের পত্রিকাকে জানিয়েছেন, তাঁরা টাকা দিয়ে পণ্য পাচ্ছেন না। আবার প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারছেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ধামাকার শপিংয়ের একজন কর্মকর্তা আজকের পত্রিকাকে বলেন, প্রতিষ্ঠানের মালিক গত রমজানে আমেরিকায় গেছেন। আর ফেরেননি। মালিক দেশের বাইরে থাকায় এবং একটি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে না করায় তাঁরা কিছুটা সমস্যায় পড়েছেন।

আলোচিত ই-কমার্স সাইট ইভ্যালির বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগ। তদন্তকারী একজন কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন অফারের মাধ্যমে ইভ্যালির টাকা নেওয়ার প্রমাণ রয়েছে। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে গ্রাহক হয়রানির প্রমাণ পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, ৪ জুলাই গ্রাহক ও মার্চেন্টদের কাছ থেকে অগ্রিম নেওয়া ৩৩৮ কোটি টাকা সরিয়ে ফেলার আশঙ্কা করে ইভ্যালি ডট কমের বিরুদ্ধে মামলা করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে ইভ্যালির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাওয়া আর্থিক অনিয়মগুলো তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে দুদককে আলাদা চিঠি পাঠায় মন্ত্রণালয়।

গত মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ইভ্যালির মোট দায় ৪০৭ দশমিক ১৮ কোটি টাকা। গ্রাহকের কাছ থেকে অগ্রিম ২১৩ দশমিক ৯৪ কোটি টাকা এবং মার্চেন্টদের থেকে ১৮৯ দশমিক ৮৫ কোটি টাকার মালামাল বাকিতে নিয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিষ্ঠানটির কাছে কমপক্ষে ৪০৩ দশমিক ৮০ কোটি টাকার চলতি সম্পদ থাকার কথা থাকলেও আছে মাত্র ৬৫ দশমিক ১৭ কোটি টাকা।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সহসভাপতি সাহাব উদ্দিন শিপন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের ১ হাজার ৬০০ সদস্য রয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ উঠছে, তাদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৫০টি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যারা ই-কমার্সের নিবন্ধন নিয়ে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসা করছে, তাদের বাদ দেওয়া হচ্ছে। আমরা সরকারের সঙ্গে মিলে কাজ করছি। সরকার যেভাবে বলবে, আমরা সেভাবে করব। ই-কমার্সে গ্রাহক হয়রানি বন্ধ এবং গ্রাহকের আস্থা ফেরানোই আমাদের এখন প্রধান লক্ষ্য।’

ডাবল ভাউচারে গ্রাহক প্রতারণা

ডাবল ভাউচার অফারের আওতায় এক লাখ টাকার ভাউচার কিনলে গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ২ লাখ টাকার ব্যালান্স দেখায়। কিন্তু তা কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ব্যালান্সের মতো না। প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রকৃত টাকা না থাকলেও তারা গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ইচ্ছামতো ব্যালান্স দেখাতে পারে। এই ব্যালান্স নিয়ে গ্রাহক অন্য কোথাও কিছু কিনতে পারবে না। গ্রাহক তার ডাবল ভাউচারের টাকা দিয়ে নির্দিষ্ট দোকান থেকে নির্দিষ্ট পণ্য কিনতে পারবে।

সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, নির্দিষ্ট দোকানের মালিক ৫ শতাংশ গ্রাহককে পণ্য সরবরাহ করে। প্রভাবশালী গ্রাহকদের পণ্য না দিয়ে টাকা দিয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে ১৫–২০ শতাংশ গ্রাহক তার টাকা ফেরত পায়। বাকি ৮০–৮৫ শতাংশ গ্রাহক কোনো ধরনের পণ্যসামগ্রী বা টাকা ফেরত পাচ্ছে না।

গত বুধবার পোশাকের ব্র্যান্ড ‘রঙ বাংলাদেশ’ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে, ইভ্যালি যে গিফট ভাউচারগুলো কিনেছিল, সিংহভাগ ক্ষেত্রেই তারা টাকা পরিশোধ করেনি। অনেকবার যোগাযোগ করলেও ইভ্যালি এ ব্যাপারে সন্তোষজনক উত্তর দেয়নি। তাই ইভ্যালির এই ভাউচার ব্যবহার করে এখন কেনাকাটা করতে দিতে পারছে না তারা।

সিগনেচার কার্ডের নামে প্রতারণা

সিগনেচার কার্ডের অফারের আওতায় ৩৫ হাজার টাকার সিগনেচার কার্ড কিনলে গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ৫২ হাজার ৮০০ টাকার ব্যালান্স দেখায়। প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ইচ্ছামতো ব্যালান্স দেখাতে পারে। এই ব্যালান্স দিয়ে গ্রাহক অন্য কোথাও কোনো কিছু কেনাকাটা করতে পারবে না। এই অফারের আওতায় হাজার হাজার গ্রাহক কোটি কোটি টাকা এ ধরনের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিচ্ছে।

সিআইডির অনুসন্ধান বলছে, দোকানে গেলে ৫ শতাংশ গ্রাহককে পণ্য দেওয়া হয়। আর ১০ শতাংশ প্রভাবশালী গ্রাহককে ৩৫ হাজার টাকার বিপরীতে পণ্য না দিয়ে ৫২ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে দেয় প্রতিষ্ঠান। বাকি গ্রাহকেরা পণ্য ও টাকা কোনোটাই ফেরত পায় না। কিছু গ্রাহকের টাকা ও পণ্য পাওয়া দেখে নতুন করে হাজার হাজার গ্রাহক টাকা জমা দিচ্ছে। গ্রাহকেরাই নতুন গ্রাহক তৈরি করছে। তারপর প্রতারণার ফাঁদে পড়ছে।

বিগ বিলিয়ন রিটার্নসে প্রতারণা

বিগ বিলিয়ন রিটার্নস অফারের ৫০-৭৫ শতাংশ মূল্য ছাড় দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়। একটি মোটরসাইকেলের দাম যদি সাড়ে ৩ লাখ হয়, সেখানে গ্রাহককে দিতে হবে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বা তার চেয়ে কম। ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বিগ বিলিয়ন রিটার্নস অফারে জমা করলে গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে সাড়ে ৩ লাখ টাকার ব্যালান্স দেখায়। এই ব্যালান্স দিয়ে গ্রাহক অন্য কোথায়ও কিছু কিনতে পারে না। সিআইডি বলছে, এই মূল্য ছাড়ের অফারের ক্ষেত্রেও ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ গ্রাহক তার টাকা কিংবা পণ্য ফেরত পাচ্ছে না।

,