অস্ট্রেলিয়ান মাস্টারশেফ মাতিয়ে দিলেন বাংলাদেশী কিশোয়ার

ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন

পান্তা ভাত, আলু ভর্তা আর মাছের ঝোল যে মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার রান্না ঘরে দেখবো তা কখনো ভাবিনি। আবহমান কাল ধরে বাঙালী হেঁশেলে আমাদের মায়েরা যেসব খাবার রাধতেন, মেলবোর্নের বাংলাদেশী মেয়ে কিশোয়ার সে সব রান্না দিয়েই মাতিয়ে দিলেন অস্ট্রেলিয়ান মাষ্টারশেফ।

বিদেশের মাটিতে স্বদেশের সুস্বাদু এবং মুখরোচক খাবারগুরোকে যত্ন করে তুলে ধরে মাস্টারশেফের বাঘা বাঘা বিচারকদের মন জয় করে তিনি হয়েছেন দ্বিতীয় রানার-আপ। প্রতিযোগীতায় বিজয়ী না হলেও আবহমান বাঙলার হাঁড়ির খাবারগুলোকে উপস্থাপন করে বিশে^র লক্ষ কোটি বাঙালির কাছে বিজয়ী হয়েছেন কিশোয়ার।

‘মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া’ হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় রান্না বিষয়ক রিয়েলিটি শো। সেখানে সারা অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের সেরা রাঁধুনিরা রান্না প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কিশোয়ার চৌধুরী (নূপুর) ছিলেন এবারের মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার ত্রয়োদশ আসরের একজন প্রতিযোগী।

লাউ-চিংড়ি, কালি জিরা/যাউ ভাত, পান্তা ভাত.আলু ভর্তা ও পোড়া মরিচ

তবে কিশোয়ারের বৈশিষ্ট হচ্ছে, তিনি প্রতিযোগীতার শুরু থেকেই বাংলাদেশের সব ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশন করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন পদের খাবারগুলো বিশ^মঞ্চে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্যই তিনি মাস্টারশেফে অংশ নিয়েছেন। এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি শতভাগ সফল। বেগুন ভর্তা, কালি জিরা মাখা যাউ ভাত নিয়েও যে একটি বিশ^মানের রান্নার রিয়েলিটি শোতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো যায়, গর্ব করা যায়, সেটা প্রমান করে দিয়েছেন কিশোয়ার।

অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের বাসিন্দা কামরুল চৌধুরী ও লায়লা চৌধুরীর মেয়ে হলেন কিশোয়ার চৌধুরী। মেলবোর্ন শহরেই কিশোয়ার চৌধুরীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। পেশায় কিশোয়ার একজন বিজনেস ডেভেলপার। সাথে পারিবারিক প্রিন্টিং ব্যবসাও তিনি দেখভাল করেন। দুই সন্তানের মা কিশোয়ার হলেন একজন সখের রাধুঁনি। পেশাদার রান্নার কোনো কোর্স করেননি। মা-বাবার কাছ থেকেই শিখেছেন নানা পদের দেশীয় রান্না।

কিশোয়ার অস্ট্রেলিয়াতে বেড়ে উঠলেও তিনি সাবলীল বাংলায় কথা বলতে পারেন। ছোটোবেলা থেকে তিনি মেলবোর্র্নের বাংলাদেশ সমিতির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নিতেন। স্থানীয় বাংলাদেশী নাট্যদলের একটি নাটকেও তিনি অভিনয় করেছেন। এভাবে কিশোয়ার হৃদয়ে ধারণ করেছেন বাংলাদেশ।

অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও আমেরিকার বড় বড় শহরের বহু বাঙালি রেস্তোরাঁ থাকলেও সেখানে সচরাচর দেশীয় খাবার পরিবশেন করা হয়না। ওইসব দেশের মূল ধারার ভোজন রসিকরা দক্ষিণ এশিয়ার দেশের খাবারগুলোকে ‘ইন্ডিয়ার ফুড’ বলেই জানে। এভাবে প্রবাসে ইন্ডিয়ান ফুডের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার খাদ্য সংস্কৃতি।

কিশোয়ার অস্ট্রেলিয়াতে বেড়ে উঠলেও তিনি সাবলীল বাংলায় কতা বলতে পারেন

২০০৮ সালে জীবিকার তাগিদে কাতারে আগনের পর দোহা শহরের বাঙালি হোটেলের সাদা ভাত, ডাল, ও নানা পদের ভর্তাই ছিলো আমার জন্য প্রধান আকর্ষণ। কারন ওই সময় সিডনী শহরের বাঙালি রেস্তোরাঁর এসব খাবার পরিবেশিত হতনা। ইদানিং সিডনীর বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় বেশ কিছুু বাংলাদেশী রেস্তারাঁ চালু হয়েছে যেখানে ভর্তা, খিচুড়ি, তেহারী ও আন্নি বিরাণীও পরিবেশিত হয়।

কিন্তু এসব রেস্তারাঁর খদ্দের হলেন মূলত প্রবাসী বাংলাদেশী। মূলধারার অস্ট্রেলিয়ানদের এসব রেস্তোরাঁয় খুঁজে পাওয়া যায়না। তবে মাস্টারশেফে কিশোয়ারের বাংলাদেশী খাবারের দু:সাহসিক পরিবেশনা পাল্টে দিয়েছে সেই চিত্র। আশা করছি এখন অস্ট্রেলিয়ার মূল ধারার ভোজন রসিকরাও বাঙালি রান্নার স্বাদ নিতে এসব রেস্তারাঁয় ঢু মারবেন।

মাস্টারশেফ প্রতিযোগীতার শুরুতে তিনি তৈরি করেছিলেন আম দিয়ে মাছের ঝোল আর বেগুনের ভর্তা। এরপর পরিবশেন করেন খিচুড়ী, লাউ-চিংড়ি, কুমড়া ভাজি, মাছ ভূনা, যাউ ভাত, ফুচ্কা, চটপটি, আলুর দম, খাসির রেজালা ও পরোটা মত একের পর এক মুখরোচক খাবার। কিশোয়ারের মাছের ঝোল, মাষ্টারশেফ বিচারকদের চেটে পুটে খাওয়াটাই প্রমান করে দেয় আমাদের শেকড়ের খাবারগুলোও বিশ্বমানের।

প্রতিযোগীতার সেমি ফাইনালে কিশোয়ার রেঁধেছেন নেহারীর মত ঐতিহ্যবাহী জটিল পদ। তবে শেষে পানের মোড়কে তৈরী ডেজার্ট ছিল কিশোয়ারের মাস্টার স্ট্রোক, যা তাঁকে নিয়ে যায় গ্র্রান্ড ফাইনালে।

পানের সাথে আইসক্রীম মিশিয়ে কিশোয়ারের তৈরী অভিনব ডেজর্টি “দি বেঙ্গলি আফটার ডিনার মিন্ট

পানের সাথে আইসক্রীম মিশিয়ে কিশোয়ারের তৈরী অভিনব ডেজর্টি “দি বেঙ্গলি আফটার ডিনার মিন্ট” দেখে চমকে উঠেছিলাম। বিচারকদের অদ্ভ‚ত ভঙ্গীমায় পান খাওয়া দেখে মনে পড়ে যাচ্ছিল শেফারী ঘোষের গাওয়া বিখ্যাত গান – বক্সির হাটের পানের খিলি তারে বানাই খওয়াইতাম!!!!

এরপর গ্রান্ডফাইনালের প্রথম দিনে মারাত্মক ঝুঁকি নিলেন কিশোয়ার। পরিবেশন করলেন আমাদের প্রানের উৎসব বৈশাখের প্রতীকি খাবার পোড়া মরিচ দিয়ে পান্তা ভাত, যা তিনটি বিচারকের কাছেই পেলো দশে দশ। পান্তা ভাতকে আমরা কৃষকের খাবার বলে অনেকেই অবজ্ঞা করি।

আমারা ভুলে যাই এই পান্তা খেয়েই আমাদের কৃষক সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী, ফসল ফলাচ্ছে মাঠে। কিন্তু ইংলিশ, ইটালি, ফরাসি, পশ্চিম এশীয় কুইজিনের ভিড়ে একটি আন্তর্জাতিক রান্নার প্রতিযোগিতায় পান্তা ভাতও যে জায়গা করে নিতে পারে, তা আমাদের শেখালেন কিশেয়ার। এ চাট্টিখানি কথা নয়। এজন্য প্রয়োজন আত্মবিশ^াস, অদম্য সাহস ও স্বদেশী সংস্কৃতির জন্য নির্ভেজাল ভালোবাসা।

যে বিষয়টা আমার ভালো লেগেছে তা হল, পুরো প্রতিযোগীতায় বাংলা ও বাংলাদেশ এই শব্দগুলো কিশোয়ারে মুখে উচ্চারিত হয়েছে বারবার। তাঁর সাথে বিদেশী বিচারকদের মুখেও বাংলাদেশের বন্দনা শুনে নিজেকে ভীষণ অহংকারী মনে হয়েছে।

কিশোয়ার এখন বিশে^র বাঙালির একটি প্রিয় এবং সাড়া জাগানো নাম

কিশোয়ার এখন বিশে^র বাঙালির একটি প্রিয় এবং সাড়া জাগানো নাম। অস্ট্রেলিয়ায় বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের যেসব ছেলে-মেয়েরা বাঙালি খাবার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল, শুনলাম তারাই এখন লাউ-চিংড়ি ও আলু ভর্তা খেতে মায়ের কাছে বায়না ধরছে। নতুন প্রজন্মকে স্বদেশমুখী করার এই কৃতিত্ব কেবল কিশোয়ারের। এ অনেক বড় অর্জন।

কিশোয়ার অস্ট্রেলিয়াতে বাংলাদেশের খাবারের প্রচলন করতে চান আর বাংলাদেশি খাবারের উপর একটা বই লিখতে চান যাতে করে সহজেই যে কেউ বাংলা খাবার তৈরি করতে পারেন। অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশী হোটেল ব্যবসায়ীরা কিশোয়ারের এই সাফল্যের উপর ভর করে বাংলাদেশী খাবারের একটা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারেন।

আমাদের হাজার বছরের লালিত বাংলা খাদ্য সংস্কৃতির অন্যতম ব্র্যান্ড অ্যাম্বেসেডর হলেন কিশেয়ার। মাস্টারশেফ শিরোপা পাননি তাতে কি, কিশোয়ারই আমাদের আসল মাস্টারশেফ।

(লেখক: সিডনী প্রবাসী প্রকৌশলী, লেখক ও সঙ্গীত শিল্পী)

,