আমার দেখা সিডনি স্থানীয় সরকার নির্বাচন

ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন

সাবেক কাতার প্রবাসী ও বর্তমান অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী লেখক, শিল্পী, গীতিকার ও সুরকার

নিউ সাউথ ওয়েল্স রাজ্যের স্থানীয় সরকারের নির্বাচন শেষ হয়েছে ক’দিন আগে। সিডনী শহরে যে নির্বাচন হচ্ছে তা চারপাশ দেখে বুঝার জো নেই।

এখানে নেই উত্তপ্ত শ্লোগান, নেই মাইকে নির্বাচনী প্রচারণা, কিংবা প্রতিযোগী দলগুলোর মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে ভোট গ্রহন পর্ব বলতে একবারেই নিরুত্তাপ।

এখানে দেয়ালে পোস্টার লাগানো কিংবা চিকা মারা নিষিদ্ধ। তাই নির্বাচনের সময় রাস্তা ঘাটে নির্বাচনী পোস্টার চোখেই পড়েনা ।

বাড়ীর উঠানে পোস্টার

অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকারের নির্বাচন প্রক্রিয়া অনেকটা বাংলাদেশের সিটি মেয়র ও ওয়ার্ড কমিশনারের সাথে তুলনীয় হলেও এখানকার নির্বাচনী প্রচারণা অনেকটা নি:শব্দেই চলে।

অধিকাংশ প্রার্থীরা ট্রেন কিংবা বাস-স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ভোটারদের হাসিমুখে স্বাগত জানান আর হ্যান্ডবিল বিলি করেন। অনেক প্রার্থী সমর্থকদের বাড়ীর উঠোনো পোস্টার লাগিয়ে রাখেন।

এছাড়া অনেকে স্থানীয় টাউন হল কিংবা কমিউনিটি হলে সীমিত আকারে নির্বাচনী প্রচারণা সভার আয়োজন করেন। তবে অধিকাংশ প্রার্থী নিজস্ব কমিউনিটির মধ্যেই মূলত গনসংযোগ করেন।

ভোটারদের লাইন

নির্বাচনের দিন পোলিং সেন্টারের বাইরে দেখা যায় প্রার্থীদের রং-বেরংয়ের পোস্টার। ভোটিং সেন্টারে ঢোকার মুখে এজন্টরা ভোটারদের হাতে গুঁজে দেন প্রার্থীদের পরিচিতি। এই হল অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচনী প্রচারণার সামগ্রিক চিত্র। 

মনে পড়ছে আশির দশকে দেশের ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচনের কথা । কমিশনার পদপ্রার্থী পাড়ার এক বড় ভাইয়ের জন্য মাইকে দীর্ঘক্ষণ একটানা শ্লোগান দিতে গিয়ে বেশ কিছুদিন গলার স্বরই হারিয়ে ফেলেছিলাম। তখনকার নির্বাচনী পরিবশে ছিল উৎসব মুখর।

জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে টানা দু’দিন ধরে বাংলাদেশ টেলিভিশনে বাংলা ছায়াছবি দেখানো হতো। নির্বাচনী ফলাফল ও ছায়াছবি দেখার জন্য আমরা সবাই মুখিয়ে থাকতাম।  তবে পরবর্তীতে নির্বাচনী সহিংসতার  কারণে খুনোখুনির খবর শুনলে খুব কষ্ট হত।

ফেডারেল (কেন্দ্রিয় সরকার), স্টেট (রাজ্য সরকার) এবং লোকাল গর্ভনমেন্ট (স্থানীয় সরকার ) এই তিনটি স্তরের সরকার দিয়ে পরিচালিত হয় অস্ট্রেলিয়ার গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা। আর এলাকা ভিত্তিক কাউন্সিলর ও শায়ার কাউন্সিল পরিচালনা করে স্থানীয় সরকার।  কাউন্সিল প্রধান হলেন মেয়র/প্রেসিডেন্ট ও ওয়ার্ড ভিত্তিক প্রতিনিধিদের বলা হয় কাউন্সিলর। এরা সবাই জনগনের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন।

কাউন্সিলর পদের মেয়াদ সাধারণত চার বছর হয়ে থাকে।  তবে কভিডের কারণে নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ায় এবারের স্থানীয় সরকারের মেয়াদ হবে ৩ বছর। তাই ২০২৪ সালে হবে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন।  

কোভিড-১৯ লকডাউনের জন্য নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক বছর পর অবশেষে রাজ্য জুড়ে ১২৪টি কাউন্সিলের বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাউন্সিলর এবং ৩৫টি সিটি কাউন্সিলে মেয়র নির্বাচনের ভোটগ্রহন অনুষ্ঠিত হল। পোলিং সেন্টারে ভোটগ্রহন শেষ হলেও পোস্টাল ভোট গ্রহনের শেষ তারিখ হচ্ছে ১৭ ডিসেম্বর। তার মানে অনলাইন ও পোস্টাল ভোট গননা শেষ করে পুরো নির্বাচনী ফলাফল হাতে আসতে আরো দু’সপ্তাহ লেগে যাবে।

অস্ট্রেলিয়ায় ভোট দেয়া বাধ্যতামূলক। কোনো যুক্তিসিদ্ধ কারণ ছাড়া ভোট দিতে ব্যর্থ হলে ৫৫ ডলার জরিমানা গুনতে হয়। তবে অস্ট্রেলিয়ায় ভোট দেয়ার পদ্ধতি তেমন একটা সহজ নয়। ব্যালট পেপারে নিজের পছন্দের প্রার্থী কিংবা দলকে চিহিৃত করার সঠিক পদ্ধতি জানা না থাকলে ভোটারের জন্য বিষয়টা দুরূহ মনে হতে পারে। যার ফলে ক্যাম্বেলটাউন এলাকায় এবার প্রায় ১৮ শতাংশ ভোট বাতিল বলে গন্য হয়েছে।

নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মূল আকর্ষণ হচ্ছে সিডনীর লর্ড মেয়র নির্বাচন। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এবার পঞ্চম বারের মতো সিডনীর লর্ড মেয়র র্নিবাচিত হয়েছেন ক্লভার মূর। তিনি হলেন সিডনীর প্রথম নারী লর্ড মেয়র।

২০০৪ সাল থেকে টানা ১৭ বছর ধরে তিনি এই মেয়রের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ১৮৪২ সালে সিডনী সিটি কাউন্সিল গঠনের পর থেকে এতোটা লম্বা সময় ধরে কেউ এই পদে থাকতে পারেননি। সিডনী শহরকে সবুজীকরণ ও অধিকতর বাসযোগ্য করে তোলার জন্য  নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ এই নারী লর্ড মেয়রকে জনগনের খুব কাছাকাছি নিয়ে গেছে।

এবারের স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে প্রায় ৩০ জনেরও বেশী প্রবাসী বাংলাদেশী কাউন্সিলর পদপ্রার্থী হয়েছেন। কয়েকজন অষ্ট্রেলিয়ার প্রধান দু’টো রাজনৈতিক দল লিবারেল এবং লেবার পার্টির মনোনয়নও যেমন পেয়েছেন তেমনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবেও লড়ছেন অনেকে। পুরুষদের পাশাপাশি বেশ ক’জন বাংলাদেশি নারীরাও অংশ নিয়েছেন নির্বাচনে।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৫ জন বাংলাদেশী কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন । এর মধ্যে দু’জন নারী। সিডনীর দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত বাংলাদেশী অধ্যুষিত ক্যাম্বেলটাউন এলাকায় কাউন্সিলর পদে লেবার পার্টির মনোনয়ন প্রাপ্ত বর্তমান কাউন্সিলর মাসুদ চৌধুরী পুন: নির্বাচিত হয়েছেন।

সাজেদা আক্তার সানজিদা ও সাবরিন ফারুকী অস্ট্রেলিয়ার প্রথম বাংলাদেশি নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন| কাম্বারল্যান্ড সিটি কাউন্সিল থেকে পুন:নির্বাচিত হয়েছেন সুমন সাহা। ডাব্বো সিটি কাউন্সিল সাউথ ওয়ার্ড থেকে নির্বাচিত হয়েছেন শিবলি চৌধুরী ৷

এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশিদের বিজয় নতুন প্রজন্মের প্রবাসী বাংলাদেশীদেরও উজ্জ্বীবিত করেছে। তারা এদেশের মূলধারার রাজনীতির সাথে সংযুক্ত হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়।  কয়েকজন তরুণ বাংলাদেশীদের সাথে কথা বলে সেই বার্তাই পেলাম।

লেখকের আরও লেখা

Loading...
,