আয়োজক হয়েও যেসব কারণে সবার আগে ছিটকে গেল কাতার

দুই দশক পর এশিয়ার মাটিতে বসেছে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর। নিজ মহাদেশে আয়োজিত বিশ্বকাপের এবারের আসরে এশিয়ান দেশগুলো তুলনামূলক শক্তিশালী দলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লড়াই করছে। তবে এশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে হতাশ করেছে স্বাগতিক কাতার।

উদ্বোধনী ম্যাচে ইকুয়েডরের কাছে ০-২ গোলের হার দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হয় আয়োজক কাতারের।

কাতারের সব খবর হোয়াটসঅ্যাপে পেতে এখানে ক্লিক করুন

এই পরাজয়ের মাধ্যমে বিশ্বকাপের ৯২ বছরের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে হারের স্বাদ পায় কোনো আয়োজক দল।

পরের ম্যাচে সেনেগালের কাছে ১-৩ গোলে পরাজিত হয়ে ঘরের মাটিতে আয়োজিত বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটির দর্শক বনে যাওয়া নিশ্চিত হয়ে যায়।

এখানে ক্লিক করুন এবং পছন্দের চাকরি বেছে নিন

প্রথম দুই ম্যাচে হারের ফলে ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকার পর দ্বিতীয় স্বাগতিক হিসেবে গ্রুপপর্ব থেকেই ছিটকে যাওয়ার রেকর্ড গড়লো কাতার।

সেই সঙ্গে তাদের সঙ্গী হিয়েছে একটি অপ্রিয় রেকর্ডও। ম্যাচ এবং দিনের হিসেবে বিশ্বকাপের কোনো আসরের স্বাগতিক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি টুর্নামেন্ট থেকে দ্রুততম বিদায়ের অপ্রিয় কীর্তি গড়েছে।

এবারের আসর আয়োজনের মাধ্যমে ১৯৩৪ সালে ইতালির পর প্রথম স্বাগতিক দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের মঞ্চে অভিষেক হয় কাতারের।

তবে এবারের আসরের অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে কাতারের পার্থক্য গড়ে দিয়েছে ফুটবলীয় ঐতিহ্য। এ কারণে এশিয়া কাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হলেও বিশ্বকাপের মঞ্চে হতাশাজনক পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি।

দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সৌদি আরব, ইরানের মতো এশিয়ান দলগুলো অন্তত পাঁচবার বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলেছে।

ইরান ব্যতিত বাকি তিন দল তো কমপক্ষে গ্রুপপর্বও পার হয়েছে কখনও কখনও। তবে কাতারের ক্ষেত্রে সেসবের কিছুই ছিল না।

অর্থের মাধ্যমে টেকসই অবকাঠামো তৈরির পাশাপাশি খেলোয়াড়দের জন্য উন্নত কোচিং স্টাফ এবং প্রশিক্ষণ সুবিধা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেও দেশটি রাতারাতি ফুটবলীয় জ্ঞান কিনতে পারেনি।

এবারের আসরে কাতারের গ্রুপসঙ্গী হওয়া বাকি তিন দলই স্বাগতিকদের চেয়ে সর্বশেষ ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে অবস্থানের দিক দিয়ে এগিয়ে।

পাশাপাশি নেদারল্যান্ডস, ইকুয়েডর এবং সেনেগালের রয়েছে একাধিক বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতাও, যেটি কি-না কাতারের জন্য এবারই প্রথম।

কাতারের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারতো মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ সৌদি আরব। যদিও ১৯৯৪ বিশ্বকাপে তারা কাতারের মতো আয়োজক ছিল না, তবে বিশ্বকাপ অভিষেকেই সবাইকে চমকে দিয়ে গ্রুপপর্বের বাধা ডিঙিয়ে নকআউট পর্বে পা রেখেছিল।

তিন বছর আগে এশিয়ান কাপ জয়ের মাধ্যমে এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করলেও বিশ্বকাপের মঞ্চ ছিল কাতারের জন্য সম্পূর্ণ অপরিচিত এক জগত।

ফলে মাঠের পাশাপাশি স্নায়ুর লড়াইয়েও প্রতিপক্ষের কাছে হেরে গেছে। প্রথম ম্যাচে ইকুয়েডরের কাছে হারের পর কাতার কোচ ফেলিক্স সানচেজও একই কথাই বলেছিলেন।

বিশ্বকাপ শুরুর মাস দুয়েক আগে খেলোয়াড়দের নিয়মিত খেলার মধ্যে না থাকাটাও কাতারের বিদায়ে প্রভাব রেখেছে।

কাতার দলের সব খেলোয়াড়ই ক্লাব ফুটবলে দেশের ঘরোয়া লিগে খেলে থাকেন।  জাতীয় দলের নিবিড় প্রাক-টুর্নামেন্ট প্রশিক্ষণ ক্যাম্পর জন্য গত সেপ্টেম্বর থেকে কাতার স্টারস লিগ বন্ধ ছিল।

অন্যদিকে, কাতারের প্রথম দুই প্রতিপক্ষ ইকুয়েডর ও সেনেগালের খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপের আগের সপ্তাহেও ইউরোপ ও এমএলএসের মতো ঘরোয়া লিগে খেলে এসেছিল।

এছাড়া, কাতারের খেলোয়াড়দের মধ্যে দলীয় সমন্বয়ও ভালোভাবে গড়ে ওঠেনি। ইকুয়েডর ও সেনেগালের বিরুদ্ধে ম্যাচে খেলোয়াড়রাও কিছু কিছু ভুল করেছেন।

কোচ ফেলিক্স সানচেজও সৌদি আরবের হার্ভে রেনার্ডের মতো কোনো ট্যাকটিকাল ব্রিলিয়ান্স দেখাতে পারেননি। শুধুমাত্র মাঠের লড়াইয়েই না, বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতেও মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ সৌদি আরবকে অনুসরণ করতে পারতো কাতার।

কাতারের মতো সৌদি আরবের খেলোয়াড়রাও ক্লাব ফুটবলে দেশের ঘরোয়া লিগে খেলে থাকেন। তবে বিশ্বকাপকে সামনে রেখে সৌদি আরব তাদের ঘরোয়া লিগ বন্ধ করেনি।

তাছাড়া, আর্জেন্টিনার মতো দলের মুখোমুখি হওয়ার কথা মাথায় রেখে তারা কলম্বিয়া, ইকুয়েডর ও ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচ খেলেছে।

অন্যদিকে, কাতারের প্রস্তুতি বলতে ছিল শুধু চিলির বিরুদ্ধে একটি প্রীতি ম্যাচ। অবশ্য বলিভিয়ার বিপক্ষে কাতারের একটি প্রীতি ম্যাচ খেলার কথা থাকলেও সেটি পরে বাতিল হয়ে যায়।

শুধু লাতিন আমেরিকান অঞ্চলই না, আফ্রিকান এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে সৌদি আরব এবং কাতারের প্রস্তুতির পার্থক্য ছিল চোখে পড়ার মতো।

সৌদি আরব বিশ্বকাপের আগে মরক্কো এবং ঘানার মতো দলের সঙ্গে প্রীতি ম্যাচ খেললেও কাতার সেরকম কিছুই করেনি।

বিশ্বকাপের কয়েকদিন আগেও ক্রোয়েশিয়া এবং আইসল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে খেলেছে সৌদি আরব। অন্যদিকে, কাতার সর্বশেষ কোনো ইউরোপীয় দলের বিরুদ্ধে খেলেছে সেই মার্চে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে ছিল বুলগেরিয়া এবং স্লোভেনিয়া।

গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় ঘরের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ থেকে আর কিছুই পাওয়ার নেই কাতারের। নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধ প্রথম রাউন্ডের শেষ ম্যাচের আগে দলের কোচ ফেলিক্স সানচেজ বড় কোনো আশা না রেখে বলেন, আমরা জানি আরও একটি কঠিন ম্যাচ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

আরও খবর পড়ুন

ঢাকা ট্রিবিউন

Loading...
,