ইমো হ্যাকার চক্রের ফাঁদে ১৮০০ প্রবাসী নারী

ইমোর ওটিপি নম্বর নিয়ে ইমো হ্যাক করে প্রতারণার জাল ফেলেছে একটি চক্র। তারা কৌশলে ইমো ব্যবহারকারী নারীর বিভিন্ন ছবি নিয়ে এবং কণ্ঠ রেকর্ড করে টাকা আদায় ও ব্ল্যাকমেইল করছে।

চক্রটির টার্গেট হচ্ছে প্রবাসে থাকা নারীরা। চক্রটির ফাঁদে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১৮০০ প্রবাসী নারী ব্ল্যাক মেইলের শিকার হয়েছেন।

ইমোর গোপন ছবি ও রেকর্ডকৃত কণ্ঠকে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে এ চক্রটি তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে কষ্টার্জিত অর্থ। অনেকেই সংসার বাঁচানো, বিয়ে ভাঙা ঠেকানো ও মানসম্মানের ভয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অভিযোগ দিতে যান না।

দেশের দু’টি অঞ্চলে এ চক্র সক্রিয়। নাটোরের লালপুরের বিলমারি এলাকা।

আরেকটি হচ্ছে রাজশাহীর চারঘাট। এ চক্রের সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৫০ জন। চক্রের সদস্যরা মোবাইলের ইমো এবং হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাকিংয়ে অনেক দক্ষ। তারা অধিকাংশই মাদকাসক্ত। কেউ কেউ স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য।

অল্প পড়াশোনা করেই বখে গেছে। তারা সিআইডিকে জানিয়েছে যে, তারা মাদকের টাকা এবং ব্যক্তিগত খরচের টাকা জোগাড় করার জন্য এ হ্যাকিং পেশাকে বেছে নিয়েছে। তাদের দেখাদেখি অন্যরা এ কাজে উদ্বুদ্ধ হয়েছে এবং তাদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

এ বিষয়ে সিআইডির সদর দপ্তরের এডিশনাল ডিআইজি (সাইবার পুলিশ সেন্টার) মো. কামরুল আহসান মানবজমিনকে জানান, ‘ইমো হ্যাক করার একটি চক্র গড়ে উঠেছে। দেশের দুই অঞ্চলে এ দৌরাত্ম্য আছে। এরা প্রবাসীদের টার্গেট করে। তাদের দমনে সিআইডি কাজ করছে।’

সিআইডি সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ইমো হ্যাকার চক্রটি প্রথমে বিভিন্ন পরিচয় দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে আইডি খোলে এবং বিভিন্ন ছবি আপলোড করে যার অধিকাংশই ভুয়া। তারা ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জারে বিদেশি নারী প্রবাসী শ্রমিকদের টার্গেট করে বিভিন্ন কথা বলে সখ্য গড়ে তোলে।

সূত্র জানায়, হ্যাকারদের প্রবাসী শ্রমিকদের টার্গেটের কারণ হচ্ছে তাদের কাছে অর্থ থাকে। ব্ল্যাক মেইল করে দ্রুত টাকা আদায় করা হয়। ম্যাসেঞ্জারে তারা ইমো নম্বর নিয়ে বিভিন্ন কথা বলে ভাব জমিয়ে ইমোর ওটিপি নম্বর সংগ্রহ করে। তাদের কথা শুনে অপর প্রান্তে থাকা নারীরা অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে তারা প্রতারণার শিকার হতে যাচ্ছেন।

সূত্র জানায়, এক পর্যায়ে তারা ইমোতে বিভিন্ন ছবি আদান প্রদান করেন। ২ থেকে ৩ মাস কথা বলার পর হ্যাকার চক্রের সদস্যরা ওই নারীর কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। নইলে ছবি ইন্টারনেটে ছেড়ে দিয়ে ব্ল্যাকমেইলের হুমকি দেয়। পরে বাধ্য হয়ে তারা বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে থাকে। হ্যাকাররা কখনো কখনো ভিকটিমদের কাছ থেকে ১ থেকে ২ লাখ টাকাও আদায় করেছে।

সূত্র জানায়, এ চক্রের সদস্যরা শুধু রাজশাহীর চারঘাট এবং নাটোরের লালপুর এলাকায় নয়, তারা এখন ঢাকার আশেপাশের এলাকায় এসে এই হ্যাকিংয়ের কাজে সক্রিয় হয়েছে। সাভার থেকে একটি চক্রকে কিছুদিন আগে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। তারা একটি বাসা ভাড়া করে এই অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিল।

সূত্র জানায়, চক্রের সদস্যরা অনেকেই ইন্টারনেট ব্যবহারে এবং ইমোর বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ। তারা সিআইডিকে জানিয়েছে যে, তারা এই হ্যাকিং পেশা কারও কাছ থেকে শেখেনি। একজন হ্যাকার অন্যজনকে হাতে-কলমে বলে দক্ষ করেছে।

হ্যাকিং করতে করতে তারা দক্ষ হয়েছে। এ চক্রের সদস্য সংখ্যা তারা নিজেরাই বাড়িয়েছে। যাতে তাদের দল ভারী হয়। এদের মধ্যে আবার একজন দলনেতা থাকে। সে প্রতারণার টাকার বড় অংশ ভাগ পেয়ে থাকে।

চক্রটির প্রবাসী নারী শ্রমিকদের টার্গেটের কারণ হচ্ছে যে, অনেক নারী শ্রমিক দিনের বেলায় কাজ করে রাতে তারা অবসর থাকে। চক্রটি এ সময়টিকে বেছে নেয়। যে সব নারী শ্রমিকরা এ চক্রটির সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহ দেখায় তারাই মূলত চক্রটির ফাঁদে পড়ে থাকে।

সূত্র জানায়, চক্রটি প্রবাসী নারীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে তাদের নম্বর ব্লক করে দেয়। যাতে তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চিহ্নিত করতে না পারে। আবার অনেক ভিকটিম নিজের সামাজিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে যান না।

মানবজমিন

Loading...
,