কুয়েতি দিনারের বিনিময় হার ৩৩৩ টাকা, রিয়াল ২৭ টাকা

এক মাস আগেও এক দিনারের বিপরীতে কুয়েত প্রবাসী বাংলাদেশীরা ২৮০ টাকা পেতেন। গতকাল প্রতি দিনারের বিনিময় হার ৩৩৩ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

এক মাসের ব্যবধানে কুয়েতি দিনারের দাম বেড়েছে প্রায় ৫৩ টাকা। এ নিয়ে কুয়েত প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস চলছে।

একই উদ্দীপনা রয়েছে সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যেও। চলতি বছরের এপ্রিলেও প্রতি রিয়ালের বিপরীতে ২২-২৩ টাকা পেতেন সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশীরা। আর গতকাল প্রবাসী বাংলাদেশীরা মানি এক্সচেঞ্জ হাউজের কাছ থেকে রিয়ালপ্রতি ২৭ টাকা পর্যন্ত পেয়েছেন।

দিনার, রিয়ালের মতোই আরব আমিরাতের দিরহাম, কাতারি রিয়াল, ওমানি রিয়ালসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মুদ্রার দাম বেড়েছে।

ওইসব দেশে অভিবাসী বাংলাদেশীরা আগের তুলনায় বেশি মূল্যে মানি এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর কাছে মুদ্রা বিক্রি করতে পারছেন।

একই পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠালেও দুই মাস আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা পাচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীরা। এতে বৈধ চ্যানেলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়তে শুরু করেছে।

গত দুই মাসে ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশী মুদ্রার রেকর্ড অবমূল্যায়ন হয়েছে। মে মাসের শুরুতেও প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ৮৬ টাকা।

আর গত বৃহস্পতিবার প্রতি ডলার প্রায় ৯৪ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ডলারের এ দামের হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকের। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষিত এ দামে দেশের কোথাও ডলার পাওয়া যাচ্ছে না।

মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ১০৪ টাকা দামেও ডলার কিনছে দেশের অনেক ব্যাংক। দেশের সর্ববৃহৎ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডও ১০৩ টাকায় রেমিট্যান্সের ডলার কিনছে। স্বল্প সময়ে টাকার এত বড় অবমূল্যায়ন বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম।

বাংলাদেশী মুদ্রার রেকর্ড অবমূল্যায়নের সময়ে ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মুদ্রা। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এ দেশগুলোর জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।

রেকর্ড দামে তেল রফতানি করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ওমান, আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মুদ্রা আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে।

বিপরীতে ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ইউরো ও ব্রিটিশ পাউন্ডের দাম কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসকারী বাংলাদেশীরা উপকৃত হলেও ক্ষতির মুখে পড়েছেন যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপ প্রবাসীরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবেই এক বছর আগে প্রতি ইউরোর বিনিময় মূল্য ছিল ১০২ টাকা। চলতি মাসে ইউরোর মূল্য ৯৪ টাকায় নেমে গিয়েছিল। ব্রিটিশ পাউন্ডের দাম কমতে কমতে নেমে গিয়েছিল ১০৫ টাকায়। বর্তমানে কিছুটা বেড়ে ১১২ টাকায় উন্নীত হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি সিঙ্গাপুরি ডলার, মালয়েশিয়ার রিঙ্গিতের বিপরীতেও বাড়তি অর্থ পাচ্ছেন দেশ দুটিতে বসবাসকারী বাংলাদেশী অভিবাসীরা।

গত মে মাসে প্রতি রিঙ্গিতের বিপরীতে ১৯ টাকা পেতেন প্রবাসী বাংলাদেশীরা। বর্তমানে রিঙ্গিতপ্রতি প্রবাসীরা ২২-২৩ টাকা পাচ্ছেন। দুই মাস আগে সিঙ্গাপুরি ডলারের দাম ছিল ৬২ টাকা। বর্তমানে ডলারপ্রতি ৬৭-৬৮ টাকা পাচ্ছেন সিঙ্গাপুর প্রবাসীরা।

কুয়েত প্রবাসী ইকবাল আহমেদ বণিক বার্তাকে জানান, কিছু দিনার বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য মানি এক্সচেঞ্জ হাউজে গিয়েছিলাম।

মানি এক্সচেঞ্জ দিনারপ্রতি ৩৩৩ টাকা ২০ পয়সা দিতে চেয়েছে। দিনারের এ মূল্য দেখে নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল।

দুই মাস আগে ২৮০ টাকায় প্রতি দিনার দেশে পাঠিয়েছি। দিনারের বিপরীতে বেশি টাকা পাওয়ায় ভালো লাগছে। তবে সমস্যা হলো, কুয়েতে প্রতিটি পণ্যের দামই অনেক বেড়ে গিয়েছে।

রিয়ালের বিপরীতে ২৭ টাকা পাওয়ায় উচ্ছ্বসিত সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশী সাইফুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, এক সপ্তাহ আগে মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান থেকে রিয়ালপ্রতি ২৫ টাকা দিতে চেয়েছে।

কিন্তু মাত্র তিন-চারদিনের ব্যবধানে মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানেই রিয়ালের দাম ২৭ টাকা উঠেছে। হুন্ডি তত্পরতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা এর চেয়েও বেশি দামে রিয়াল কিনতে চাচ্ছেন। পরিস্থিতি এত দ্রুত পাল্টে গেল কীভাবে, সেটিই বুঝতে পারছি না।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মুদ্রার বিপরীতে বেশি টাকা পাওয়ায় প্রবাসীরা বৈধ পথে আগের চেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মে মাসের তুলনায় জুনে সৌদি আরব প্রবাসীরা বেশি অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন।

মে মাসে সৌদি প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন ৩২ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। জুনে সৌদি আরব থেকে ৩৪ কোটি ৯৬ লাখ ডলার দেশে এসেছে। কুয়েত থেকে গত মে মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

দেশটি থেকে জুনে ১৫ কোটি ৭৭ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। কাতার থেকে জুনে এসেছে ১১ কোটি ৪৩ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স, যা মে মাসে ছিল ১০ কোটি ৫১ লাখ ডলার।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স আহরণে একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের। ব্যাংকটির মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বেড়েছে।

রেমিট্যান্স আনার ক্ষেত্রে ডলারপ্রতি ১০৩ টাকা দিচ্ছে দেশের বৃহৎ এ ব্যাংকটি। এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা বণিক বার্তাকে বলেন, বাস্তবতার কারণেই বাড়তি দামে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও আগের মতো কঠোর অবস্থানে নেই। রেমিট্যান্স আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছুটা স্বাধীনতা দিয়েছে। আগে ব্যাংকগুলোর মধ্যে রেমিট্যান্স সংগ্রহে অসুস্থ প্রতিযোগিতা ছিল।

এখন কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরেছে। বাড়তি দাম পাওয়ায় প্রবাসীরাও বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত হচ্ছেন। ইসলামী ব্যাংকের রেমিট্যান্স আহরণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক বেড়েছে।

ব্যাংকিং চ্যানেলে রিয়ালের দাম ২৭ টাকা উঠে গেলেও দেশের কার্ব মার্কেটে (খুচরা বাজার) বিক্রি হচ্ছে তার চেয়ে কম দামে। গত বৃহস্পতিবার মতিঝিলের মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি রিয়াল ২৬ টাকা ১০ থেকে ২০ পয়সায় কেনাবেচা করেছে। দেশের কার্ব মার্কেটে কুয়েতি দিনার বেচাকেনা হচ্ছে ২৭৮-২৮০ টাকার মধ্যে।

সাধারণত ব্যাংকিং চ্যানেলের তুলনায় কার্ব মার্কেটে যেকোনো মুদ্রার দাম বেশি থাকে। কিন্তু রিয়াল, দিনারসহ বিদেশী অন্য মুদ্রাগুলোর ক্ষেত্রে কার্ব মার্কেটে বিপরীত চিত্র কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশের কার্ব মার্কেটে সবসময়ই ডলারের চাহিদা বেশি থাকে। রিয়াল, দিনারের মতো অন্য মুদ্রাগুলোর প্রত্যক্ষ চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকিং চ্যানেলের তুলনায় কার্ব মার্কেটে দাম কম।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, ঋণপত্রের (এলসি) দায়ের পাশাপাশি বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। এজন্য বাধ্য হয়ে ব্যাংকগুলো বেশি দামে ডলার কিনছে।

কোনো ব্যাংক এলসি দায় পরিশোধে ব্যর্থ হলে সেটি কালো তালিকাভুক্ত হয়ে যাবে। এ কারণে নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই ব্যাংকগুলো যেকোনো মূল্যে ডলার সংগ্রহ করছে।

স্বনামধন্য বিদেশী ব্যাংকগুলোরও এখন দেশী ব্যাংকের কাছে ডলার কেনার প্রস্তাব পাঠাচ্ছে। যে পরিমাণ এলসি দায় ব্যাংকগুলোতে তৈরি হয়েছে, তাতে সহসা ডলারের চাহিদা ও দাম কমার সম্ভাবনা নেই।

গালফ বাংলার হোয়াটসঅ্যাপে এড হোন এখানে ক্লিক করে

কাতারের আরও খবর

বণিক বার্তা

Loading...
,