কুয়েতের শ্রমবাজারে স্বস্তি

মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ দেশ কুয়েতের শ্রমবাজারে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ দেড় বছর পর গত বৃহস্পতিবার থেকে ঢাকা-কুয়েত সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়েছে।

এতে আটকে পড়া প্রবাসী কর্মীদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

দীর্ঘদিন কুয়েতের সঙ্গে বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশের সরাসরি বিমান চলাচল বন্ধ ছিল করোনা মহামারির কারণে। বর্তমানে ঢাকা-কুয়েত ওয়ানওয়ে টিকিটের চড়া মূল্য যোগাতে হিমসিম খাচ্ছে কুয়েতগামী প্রবাসী কর্মীরা।

নতুন ভিসাপ্রাপ্ত কর্মীরাও দেশটিতে যাওয়া শুরু করছেন। দেশটিতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ বাংলাদেশি কর্মী কঠোর পরিশ্রম করে প্রচুর রেমিট্যান্স দেশে পাঠাচ্ছেন।

করনা (কোভিড-১৯) পরিস্থিতি উন্নতির সাথে সাথে কুয়েতের অবকাঠামো নির্মাণযজ্ঞ আবার পুরোদমে শুরু হয়েছে। করোনা মহামারি পরিস্থিতির উন্নতি ঘটায় ও বিধিনিষেধে শীতিলতা এনেছে দেশটির সরকার।

ফলে, কুয়েতে প্রচুর বাংলাদেশি কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। গতকাল কুয়েত থেকে কুয়েত পেইজ ফর বাংলাদেশি-এর কন্ট্রোলার ইকরাম হোসাইন এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী ইকরাম হোসাইন বলেন, দেশটির কৃষিখাত, নির্মাণখাত, শিল্পখাত, গৃহস্থালিখাত ও আইটিখাতে প্রচুর বাংলাদেশি কর্মীর চাহিদা রয়েছে। তার মতে, কুয়েতের সাথে ব্যাপক কূটনৈতিক সর্ম্পক গড়ে তোলা সম্ভব হলে দেশটিতে প্রচুর নতুন বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

কুয়েতে শ্রমবাজার সম্প্রসারণে উচ্চ পর্যায়ে জোর তৎপরতা চালানো জরুরি হয়ে পড়েছে। কুয়েতের নিয়োগকারী কোম্পানিগুলো বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে বেশি আগ্রহী। কারণ বাংলাদেশি কর্মীরা কঠোর পরিশ্রমি।

প্রবাসী ইকরাম হোসাইন বলেন, কুয়েতের কৃষিখাতে একচেটিয়াভাবে বাংলাদেশি কর্মীদের দখলে নেয়ার সুযোগ রয়েছে। করোনাকালে অনেক কর্মী কুয়েত ত্যাগ করায় ও সাধারণ ক্ষমার সুযোগ গ্রহণ করে প্রচুর পরিমাণ কৃষি কর্মী কুয়েত ত্যাগ করায় এই খাতে ও প্রচুর কর্মসংস্থান খালি রয়েছে।

এদিকে, কুয়েতগামী ফ্লাইট চালু হলেও করোনা মহামারির টিকা দেয়ার জন্য প্রবাসী কর্মীরা নাম রেজিস্ট্রেশন করে দেড় দু’মাস অপেক্ষা করেও টিকা দেয়ার মেসেজ পাচ্ছেন না। এতে কুয়েতগামী প্রবাসী কর্মীরা চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন।

রিক্রুটিং এজেন্সি সোহাগ এয়ার ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী জাফর ইকবাল সোহাগ গতকাল সোমবার রাতে ইনকিলাবের সাথে আলাপকালে কুয়েতের ফ্লাইট চালু হওয়ায় কুয়েত সরকারকে আন্তরিক মোবারকবাদ জানিয়েছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কুয়েতের বিভিন্ন সেক্টরে প্রচুর বাংলাদেশি কর্মীর চাহিদা রয়েছে। তিনি বলেন, কুয়েতগামী বিমানের টিকিটের দাম কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রবাসী কর্মীদের হিমসিম খেতে হচ্ছে। ঢাকা-কুয়েত ওয়ানওয়ে টিকিটের দাম ৮৫ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে। তিনি বলেন, কুয়েতগামী প্রবাসী কর্মীরা করোনা মহামারির টিকা দেয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন করে দেড় দু’মাসেও টিকার মেসেজ পাচ্ছে না। ফলে অনেকেরই ভিসা ও মেডিক্যালের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি কুয়েতের শ্রমবাজার ধরে রাখার স্বার্থে কুয়েতগামীসহ সকল প্রবাসী কর্মীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করোনার টিকা দেয়ার জোর দাবি জানান। ফকিরাপুলের হেভেন ওভারসীজের স্বত্বাধিকারী দিদারুল আলম বলেন, কুয়েতগামী ফ্লাইট চালু হওয়ায় অপেক্ষমান কর্মীরা খুবই খুশি। তিনি কুয়েতগামী ফ্লাইটের টিকিটের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এদিকে, কুয়েত এয়ারওয়েজের ওয়েব সাইটে জানানো হয়েছে এখন থেকে ঢাকা-কুয়েত ফ্লাইট পরিচালনা করবে সপ্তাহে ৫ দিন। সিডিউল অনুসারে ৯ সেপ্টেম্বর ভোরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কুয়েতের উদ্দেশ্য ছেড়ে গেছে কুয়েত এয়ারওয়েজের প্রথম ফ্লাইটটি। ছুটিতে দেশে এসে আটকে পড়া কর্মীরা করোনা টিকা দিয়ে দেশটিতে যাওয়ার জন্য চড়া দামে বিমানের টিকিট কিনতে হিমসিম খাচ্ছে। কুয়েতগামী কর্মীরা বিমানের টিকিটের দাম সহনীয় পর্যায়ে কমিয়ে আনতে জোর দাবি জানিয়েছেন।

করোনা মহামারি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর বন্ধ থাকা নিষিদ্ধ দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি বিমান চলাচলের অনুমতি দিয়েছিল কুয়েত মন্ত্রিসভা। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি নির্দেশনা এবং বিমানবন্দরের যাত্রী উঠা নামার ধারণ ক্ষমতা সীমিত থাকায় পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল নিষিদ্ধ পাঁচ দেশের সঙ্গে বিমান চলাচল। ফলে ছুটিতে আটকে পড়া প্রবাসী কর্মী ও নতুন কর্মীরা দেশটিতে যেতে না পেরে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছিলেন। দেশটির সাথে সরাসরি ফ্লাইট চালু হওয়ায় কুয়েতগামী কর্মীদের মাঝে আনন্দের বন্যা বইছে। কুয়েতগামী একাধিক প্রবাসী কর্মী এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

গত ৫ সেপ্টেম্বর মিসর এবং ৭ সেপ্টেম্বর ভারত থেকে কুয়েতে সরাসরি ফ্লাইট এসে পৌঁছেছে। কুয়েত মন্ত্রিসভা বিমানবন্দরের যাত্রী ক্ষমতা প্রতিদিন ১০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১৫ হাজার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ফ্লাইটের টিকিটের উচ্চমূল্যের কারণে টাকা যোগাতে চরম দুর্ভোগে প্রবাসীরা। সরাসরি ফ্লাইট প্রতি গুনতে হচ্ছে লাখ টাকার উপরে। অনেক প্রবাসী তুর্কি, সউদী, বাহরাইন হয়ে ট্রানজিটের রুটে কুয়েত ফিরছেন।

কুয়েতের শ্রমবাজার সম্প্রসারণে সরকারি প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি দক্ষ জনশক্তি গ্রহণে কুয়েতের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। গত ১৮ জুলাই উজবেকিস্তান সফররত কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আহমেদ নাসের আল-মোহাম্মেদ আল-সাবাহ’র সঙ্গে তাসখন্দে এক বৈঠকে মন্ত্রী এ অনুরোধ জানান। তাসখন্দে অনুষ্ঠিত ‘সেন্ট্রাল অ্যান্ড সাউথ এশিয়া : রিজিওনাল কানেক্টিভিটি, চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অপরচুনিটি’ বিষয়ক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের সাইডলাইনে ওই বৈঠক হয়েছে। ঐ বৈঠকে কুয়েতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিয়েছিলেন আব্দুল মোমেন। এ ছাড়া শান্তিরক্ষা বাহিনী ও সাউথ-সাউথ অর্থায়ন উন্নয়ন ফোরাম গঠনের বিষয়ে কথা বলেন বাংলাদেশের মন্ত্রী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে নিয়মিত আলোচনায় একটি যৌথ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন কুয়েতের মন্ত্রী। এ ছাড়া কুয়েতের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য বাংলাদেশের সহায়তাও চেয়েছেন সাবাহ।

,