কোভিডের দীর্ঘসূত্রতায় হজ নির্ভর অর্থনীতি পুনরায় বিপর্যস্ত

দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে সৌদি আরবে হজ এবং উমরাহ পরিষেবা নিশ্চিত করছেন ভ্রমণ সংস্থা আত-তাইয়ারা ট্রাভেলস ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মো. আকবর আলী।

প্রতি বছর সংস্থাটির মাধ্যমে ৫০০ থেকে ৬০০ জন মুসল্লি সৌদি আরবে হজ পালন করেন।

কোভিড-১৯ মহামারির কারণে গত বছর সংস্থাটির ৪০০ যাত্রীর হজযাত্রা বাতিল হয়।

“হজ এবং উমরাহ যাত্রার ব্যবসা থেকে আমার বার্ষিক টার্নওভার ছিল প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা। গত বছর ও চলতি বছরে হজযাত্রা থেকে আমার আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া, গত বছর উমরাহ যাত্রীদের ভ্রমণের আয়ও ৫০ শতাংশ কমে যায়,” দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন আকবর আলী।

প্রতি মৌসুমে উমরাহ পালনে সংস্থাটিতে এক হাজার থেকে বারোশ জন যাত্রী নিবন্ধন করান। তবে, চলতি বছরের জুন মাসের আগ অবধি তিনি একজন মুসল্লিকেও উমরাহ পালনে পাঠাতে পারেননি।

“মহামারির মাঝে গত বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি আমাকে সাময়িকভাবে আমার অফিস বন্ধ রাখতে হয়। আমার ধারণা এই খাত স্বাভাবিক হতে কয়েক বছর সময় লাগবে। তাই আমি গত বছর মে মাসে রাজশাহীতে ফলের বাগান শুরু করি,” বলেন তিনি।

বাগানে এখনও বিনিয়োগ করে চলেছেন বলে জানান তিনি। ২০২৩ সালে বাগানের বিনিয়োগ থেকে মুনাফা নিয়ে তিনি আশাবাদী।

হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) তথ্যানুসারে, আকবরের মতো ২৫ শতাংশ হজ সংস্থার মালিক চলমান পরিস্থিতিতে জীবিকা নির্বাহের জন্য বিকল্প পথ বেছে নিয়েছেন।

টানা দু’বছর ধরে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে দেশের হজ এবং উমরাহ সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা।

শুধু বাংলাদেশের ভ্রমণ সংস্থার মালিকরাই নন। সৌদিতে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের অনেকেই মক্কা ও মদিনায় হজ ও উমরাহ সেবাদানের সাথে জড়িত ছিলেন। বৈশ্বিক মহামারির কারণে তারাও কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।

গত বছরের ন্যায় এবারও সৌদি আরবের বহিরাগত যাত্রীরা হজ পালন করতে পারবেন না। চলতি বছর দেশটি ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী টিকা গ্রহণকারী সর্বোচ্চ ৬০ হাজার নাগরিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের হজ পালনের সুযোগ দিচ্ছে।

গত বছর, ১০ হাজার সৌদি নাগরিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের হজ পালনের অনুমতি দেওয়া হয়।

সৌদি গ্যাজেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর ১৮ জুলাই থেকে শুরু হয়ে ২২ জুলাই শেষ হবে পবিত্র হজ উদযাপন।

বহিরাগত ভ্রমণার্থীদের হজ পালনের সুযোগ না দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রায় এক হাজার ২৩৮টি হজ সংস্থা ভোগান্তির সম্মুখীন। হাবের সূত্রানুসারে, দু’বছরে টার্নওভার হিসেবে সংস্থাগুলোর ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।

একই সময়ে উমরাহ যাত্রা ব্যাহত হওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ চার হাজার ১৭৫ কোটি টাকা।

গত বছর ২৬ ফেব্রুয়ারি মহামারির কারণে সৌদি কর্তৃপক্ষ উমরাহ পালন স্থগিত ঘোষণা করে।

বাংলাদেশের হজ এবং উমরাহ সংস্থাগুলো বিমান টিকিটের মতো অন্যান্য ভ্রমণ সুবিধাও দিয়ে থাকে।

কিন্তু, বারবার ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় টিকিট বিক্রির কাজও স্বাভাবিক গতি হারিয়েছে।           

“আমার আগে ২০ জন কর্মচারী থাকলেও এখন মাত্র সাতজন আছেন। তারা ভ্রমণ পরিষেবা দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু, মহামারি পূর্ব সময়ের তুলনায় আমার ব্যবসা প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।”                             

যদিও উমরাহ সারা বছর পালন করা যায়, অধিকাংশ বাংলাদেশি যাত্রী নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাসে সৌদিতে উমরাহ পালন করতে যান, বলে জানায় হাব।

ইসলামী হিজরি বর্ষপঞ্জী অনুসারে সারা বছর উমরাহ পালন করা গেলেও হজের জন্য রয়েছে নির্ধারিত সময়সূচী।

হজ সপ্তাহব্যাপী পালন করা হয়ে থাকে। আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান সকল মুসলিমের জন্য জীবনে অন্তত একবার হজ পালন করা ফরজ।

ক্ষতির মুখে হজ ও উমরাহ ব্যবস্থাপনা সংস্থা

গত বছর এক লাখ ৩৭ হাজার বাংলাদেশির হজ পালনের কথা ছিল।

হাব জানায়, গত বছর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সাধারণ প্যাকেজে হজের খরচ নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ লাখ ৬১ হাজার ৮০০ টাকা। অন্যদিকে, সাশ্রয়ী প্যাকেজের অধীনে খরচ তিন লাখ ১৭ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, সরকার গত বছর ৩ লাখ ১৫ হাজার থেকে শুরু করে ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকার তিনটি হজ প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল।

হাবের সূত্রানুসারে, প্রতি বছর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আড়াই লাখ বাংলাদেশি উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি ভ্রমণ করেন।

তিন তারকা হোটেলে থাকার সুযোগসহ উমরাহ পালনের খরচ প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা।                      

উমরাহ পালন স্থগিত হওয়ায় গত মৌসুমে সংস্থাগুলোর ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় এক হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। হাবের তথ্যানুসারে, নিষেধাজ্ঞা আসার আগে সংস্থাগুলো যাত্রীদের মাত্র একটি দলকে পাঠাতে পেরেছিলো।   

চলতি বছর লোকসানের পরিমাণ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা।          

হাব সভাপতি এম শাহাদাত হোসেইন তাসলিম বলেন, সংগঠনটির অধীনে সংস্থাগুলোতে প্রায় ২০ হাজার মানুষ কাজ করেন।

বাংলাদেশ এবং সৌদি আরবের প্রায় এক লাখ মানুষ পরোক্ষভাবে এই খাতের সাথে জড়িত বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, বেসরকারি সংস্থাগুলো পূর্ণাঙ্গ উমরাহ সেবা প্রদানের পাশাপাশি অধিকাংশ হজ সেবার ব্যবস্থা করে থাকে।

“হাবের সদস্যরা হজ ও উমরাহ যাত্রীদের সেবাদানে অভিজ্ঞ। সংস্থাগুলোর টিকে থাকার জন্য সংকটের এই মুহূর্তে সহায়তা প্রদান খুব জরুরি,” বলেন তিনি।

গত বছর দাবি উত্থাপনের পরেও হজ সংস্থাগুলো কোনো সরকারি প্রণোদনা পায়নি বলেও জানান তিনি।

সংস্থাগুলোর সংকট বিবেচনায় ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালনা খরচ বহনে জামানতের টাকার (প্রতি সংস্থার জন্য ১০ লাখ) ৫০ শতাংশ পর্যন্ত উত্তোলনের সুযোগ দেয়।

বাংলাদেশি হজ ও উমরাহ যাত্রীদের প্রায় অর্ধেক জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে ভ্রমণ করে থাকেন। আর তাই লোকসানের মুখে রয়েছে দেশের এই সরকারি বিমান পরিবহন সংস্থা।

৬৩ হাজার পূণ্যার্থীর বিপরীতে গত বছর প্রতিষ্ঠানটি ৮০৬ কোটি টাকার আয় হারায় বলে জানায় বিমান সংশ্লিষ্ট সূত্র।

গত বছর হজ যাত্রীদের বিমান ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল এক লাখ ৩৮ হাজার টাকা।

বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিরা

তেল নির্ভর সৌদিতে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীরাও এই পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন।

“মক্কা ও মদিনায় ভ্রমণকারীদের খাবারের ব্যবস্থা করে থাকে এরকম হোটেল ও রেস্টুরেন্টসহ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে বহু বাংলাদেশি কাজ করে থাকেন। কিন্তু সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে হজ ও উমরাহ যাত্রীরা ভ্রমণ করতে না পারায় নিয়োগদাতারা কর্মী ছাঁটাই করেছেন,” জানান সৌদিতে অবস্থানরত বাংলাদেশি সাংবাদিক তাজউদ্দীন তারেক।

“নিয়োগদাতারা চাকরিচ্যুত এসব প্রবাসীদের ইকামা (সৌদিতে বসবাসের অনুমতি) নবায়ন করেনি। বহু কর্মী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় অন্যান্য শহরে চলে গেছেন। বর্তমানে তারা কাজ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন,” বলেন তিনি।

ধর্মীয় পর্যটন খাতে সৌদি আরবের লোকসান

সৌদি আরবের সম্পদের মূল অংশ জ্বালানি তেল থেকে আসলেও মক্কা এবং মদিনায় হজ ও উমরাহ পালন দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২০১৯ সালে দেশটিতে এক কোটি ৯০ লাখের বেশি যাত্রী উমরাহ পালন করেন। অন্যদিকে, ২০১৯ সালে হজযাত্রীর সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ।   

সংবাদ মাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদন অনুসারে, সৌদির মোট জিডিপির ৭ শতাংশ এবং তেল-বহির্ভূত জিডিপির ২০ শতাংশ এসে থাকে ধর্ম-নির্ভর পর্যটন খাত থেকে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমটির প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৯ সালে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত ২৫ লাখ হজযাত্রীর পরিবর্তে চলতি বছর স্থানীয় মাত্র ৬০ হাজার বাসিন্দাকে হজের অনুমতি দেওয়ায় দেশটি বড় ধরনের আয় হারিয়েছে।

গত বছর অক্টোবর মাসে কোভিড পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় সৌদি আরব সাত মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রার্থনার জন্য গ্র্যান্ড মসজিদের প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত করে। একইসঙ্গে, সীমিত পরিসরে উমরাহ পালনের সুযোগ দেওয়া হয়।

তবে, আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুসারে, পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ার পর চলতি বছরের ৫ এপ্রিল সৌদি আরবের হজ ও উমরাহ মন্ত্রণালয় কেবলমাত্র কোভিডের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ও টিকা গ্রহণকারীদের উমরাহ পালনের অনুমতি দেয়।

উমরাহ যাত্রীদের ৪৩ শতাংশই হিজরি সনের রজব, শাবান ও রমজান মাসে সৌদি আরব ভ্রমণ করেন। টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদন অনুসারে, ধর্মীয় পর্যটনের ওপর আর্থিকভাবে নির্ভর সংস্থাগুলোর জন্য হজের পর এটাই সবথেকে ব্যস্ত মৌসুম থাকে।

,