কোয়ারেন্টাইন হোটেল নিয়ে প্রতারণা, স্বেচ্ছাচারিতা

বিদেশে বসে অনলাইনে ভাড়ার টাকা পরিশোধ করেও ঢাকায় নেমে হোটেল পাননি সৌদি আরব ফেরত- আনোয়ার, শিপন ও মাসুদ। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর তারা তিনজনই হোটেলে ফোন করেন। কিন্তু কেউ ফোনে সাড়া দেননি। বাধ্য হয়েই তাদের যেতে হয়েছে আশকোনা হজ ক্যাম্পে।

কোয়ারেন্টাইনের মাধ্যমে এভাবেই প্রতারণার শিকার হয়েছেন তারা। শুধু তারাই নয়- এমন আরও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে প্রতিদিন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। আবার অনেক বিদেশ ফেরত যাত্রী ঢাকায় এসে কোয়ারেন্টাইনে না কাটিয়ে টাকার বিনিময়ে ছাড়পত্র নিয়ে চলে গেছেন নিজ বাড়িতে।

করোনা মহামারীতে কঠিন বিধিনিষেধের কোয়ারেন্টাইন যেখানে বাধ্যতামূলক করা করেছে সরকার, সেখানে এমন স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়ম জালিয়াতির অভিযোগ ওঠেছে। অথচ এসব হোটেলে কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা দেখভাল করার দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হলেও তারা সে দায়িত্ব পালন করছে না।

মূলত স্বাস্থ্য অধিদফতরের দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতার জন্যই এমন পরিস্থিতি। এসব নির্ধারিত হোটেলের তালিকা প্রকাশ না করা, ভাড়া নির্ধারণ না করা, হোটেলের বুকিং অনলাইনে করতে না পারাসহ বিভিন্ন জটিলতার মধ্যে পড়ছেন প্রবাসীরা। প্রবাসীকর্মীদের সঙ্গে প্রতারণারও অভিযোগ রয়েছে কোন কোন হোটেলের বিরুদ্ধে।

এসব অভিযোগ তদন্ত করা কিংবা দেখারও যেন কেউ নেই। জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ারভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বলেন, দায় নিতে হবে স্বাস্থ্য বিভাগকেই।

তারা যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করত তাহলে তো এমনটি হওয়ার সুযোগ ছিল না। এ নিয়ে পরবর্তী বৈঠকে আলোচনা করা হবে।

বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে, করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ধাক্কা শুরুর আগেই বিদেশ ফেরত যাত্রীদের জন্য বিভিন্ন মেয়াদের কোয়রেন্টাইন ব্যবস্থা নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য বিভাগ। দ্বিতীয় ধাক্কা শুরুর পর সেটা আরও কড়াকড়ি করে সবাইকে সতর্ক করা হয়। এ জন্য বিদেশ ফেরত যাত্রীদের চাপ বাড়ায় হোটেলের সংখ্যা বাড়ানো হয়।

শুরুতে ২১ হোটেল নির্ধারিত করে এ যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে মোট ৭২টি হোটেলকে কোয়ারেন্টাইন যাত্রী রাখার অনুমতি দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর তথা মন্ত্রণালয়। মধ্যমমান থেকে শুরু করে পাঁচ তারকা মানের হোটেলও নির্ধারিত করে দেয়া হয়। এসব হোটেলের বেশিরভাগই উত্তরায় অবস্থিত।

জানা গেছে, দু’সপ্তাহ আন্তর্জাতিক সিডিউল ফ্লাইট বন্ধ থাকার পর গত শনিবার থেকে তা চালু হয়। আপাতত ৩৮টি দেশ থেকে কেউ বাংলাদেশে আসলে তারজন্য প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে বেশিরভাগ দেশের ক্ষেত্রে আগতদের হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, যদি আগে থেকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রবাসীদের উদ্দেশে এসব সরকার নির্ধারিত হোটেলের নামসহ তালিকা প্রকাশ করত তাহলে এমন সঙ্কট হতো না।

এসব হোটেল যে সরকারী তালিকাভুক্ত সেটার তথ্য সরকারী কোন সংস্থার ওয়েবসাইটেও নেই। ফলে কোন হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে সে সম্পর্কে অজ্ঞ প্রবাসীরা। তাছাড়া এসব হোটেলের ভাড়া কত কিংবা কোন নাম্বারে যোগাযোগ করতে হবে সেটারও কোন তথ্য নেই। অথচ বিদেশ থেকে দেশে ফিরতে হলে টিকেট থাকার সময় প্রথম শর্তই হচ্ছে হোটেলের নাম ঠিকানা ও বুকিং রেফারেন্স প্রদর্শন।

এছাড়া বিদেশ থেকে টিকেট কাটাও যায় না। এসব শর্ত মেনেই প্রবাসীরা বিদেশের বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে হোটেল বুক করছেন। সেক্ষেত্রে একই হোটেলের জন্য ভাড়া চাওয়া হচ্ছে এক একজনের কাছে এক একরকম। বুকিং করার জন্য হোটেল ভাড়ার সঙ্গে অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছে এজেন্টগুলো।

যারা সরাসরি হোটেলের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন তাদের আন্তর্জাতিক পেমেন্ট কার্ড অথবা বিকাশের মাধ্যমে অগ্রিম টাকা পাঠানোর কথা বলা হচ্ছে।

কিন্তু প্রবাসীকর্মীদের বেশিরভাগেরই আন্তর্জাতিক পেমেন্ট কার্ড নেই। এছাড়া বিদেশে মোবাইল ব্যাংকিং নিষিদ্ধ হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাদের। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের সহযোহিতায় অবৈধভাবে বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠাচ্ছেন। দেশে আসার পর হোটেলগুলোর সেবা ও খাবারের মান নিয়েও অভিযোগ প্রবাসীকর্মীদের। এমন অভিযোগ করেন সৌদি প্রবাসী মার্জিয়া।

তিনি গত ২৯ এপ্রিল ঢাকায় নেমে ইমিগ্রেশনের আগেই হেল্থ কাউন্টার থেকে ফোন করেন উত্তরার একটি হোটেলে। তার ফোন কেউ না ধরায় শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই তাকে যেতে হয়েছে হজ ক্যাম্পের সরকারী কোয়ারেন্টাইনে।

তার মতোই ভুক্তভোগী দুবাই প্রবাসী খোরশেদ আলম জানান, দুবাই থেকে হোটেল বুক করতে না পেরে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে উত্তরায় ব্লু ক্যাসেল হোটেলে রুম বুক করেন। কিন্তু ২৯ এপ্রিল বিমানবন্দর থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সী শেল হোটেলে।

যদিও সরকার অনুমোদিত ৫২টি হোটেলের তালিকায় নেই সী শেলের নাম। ওই হোটেলে গিয়ে খোরশেদ আলম দেখতে পান তার রুমে আরেকজন গেস্ট আছেন। অথচ প্রতিদিন ৩ হাজার ৫০০ টাকা করে সিঙ্গেল রুম ভাড়া নিয়েছিলেন খোরশেদ। এহেন অরাজকতায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন- এটা ভাবতেও কষ্ট লাগে।

এই করোনা গজবের সময়ও মানুষের স্বভাব ও চরিত্র ভাল হয়নি। এখনও চলে চিট বাটপাড়ি। ঢাকায় নামার পর কোয়ারেন্টাইনের কথা বলে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো সী শেল হোটেলে।

অথচ সরকার নির্ধারিত ৫২টি হোটেলের তালিকায় আমি এই হোটেলের নাম দেখিনি। সিঙ্গেল ভাড়া নিয়েছিলাম- অথচ হোটেলে প্রবেশ করে দেখি অন্য মানুষের সঙ্গে রুম শেয়ার করতে হবে।

ওই হোটেলে সবার একই রকম অবস্থা। রুম শেয়ার করলেও সবার কাছ থেকেই তারা দিনপ্রতি ৩৫০০ টাকা করে ভাড়া নিচ্ছে। কেন এমনটি হবে। এসব দেখার দায়িত্ব কার?

দুবাই ফেরত অপর প্রবাসী সাইদুর সোহান ঢাকায় নেমে হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন। দেশে থাকা তার ভাইয়ের মাধ্যমে মতিঝিল এলাকায় হোটেল রহমানিয়া ইন্টারন্যাশনালে তিনদিনের জন্য রুম বুকড করেছিলেন। ২৭ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ছিলেন সেই হোটেলে। তিনি বলেন, রমজান মাস, তাই সকালের খাবার না দেয়াটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু রাতের খাবারে তারা দিয়েছে ১টি কলা, ১ পিস কেক। বাধ্য হয়ে আমাকে রাতে বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হয়েছে। তাদের হোটেলে মানের তুলনায় ভাড়া অনেক বেশি। ওয়ান স্টার মানের হোটেলের মধ্যেও তারা পড়বে বলে মনে হয় না। অথচ ভাড়া তিনদিনের জন্য ২২ হাজার ৫০০ টাকা। কোয়ারেন্টাইনের নামে চলছে রীতিমতো স্বেচ্ছারিতা ও জুলুম।

কাতার প্রবাসী রবিউল ইসলাম, মোহাম্মদ হাসান, শামিম আহমেদ, শফিকুল ইসলাম, নাহিদুল ইসলাম একসঙ্গে এই ৫ জনের গত ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশে আসার কথা ছিল। হোটেল বুকিংয়ের জটিলতায় তারা আসতে পারেননি সেদিন। এ জন্য হোটেলের ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন তারা।

একইসঙ্গে তারা উত্তরায় এ্যাফোর্ড ইন নামের একটি হোটেলের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ করেছেন। হোটেল কর্তৃপক্ষ যদি সঠিক মতো দায়িত্ব পালন করত তাহলে এমন হতো না। কাতার প্রবাসী অপর যাত্রী কাজী জাহিদুল ইসলাম দেশে আসার আগেই তারিক ট্রাভেলস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনদিনের জন্য হোটেল বুকিং করেন।

সে জন্য তাকে দিতে হয় ৮২০ কাতারের রিয়াল যা বাংলাদেশী টাকায় ১৯ হাজার ১৮০ টাকা। মাত্র তিনদিনের জন্য এত টাকা ভাড়া নেয়া হয়েছে। অথচ হোটেলের মানও সে তুলনায় তেমন নয়।

আরও গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে কাতার প্রবাসী নাহিদুল ইসলামের কাছ থেকে। তিনি দোহা থেকে বন্ধুদের মাধ্যমে ঢাকায় এ্যাফোর্ড ইন নামের একটি হোটেলে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয়, ৫ জন এক রুমে শেয়ার করে থাকার জন্য দিনে ১২ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হবে।

সে হিসেবে তারা ২০ হাজার টাকা বিকাশ করে দেয়। তিনি বলেন- এরপর আর হোটেলের লোকজনের কোন খবর নেই। তারা ফোনও ধরেনি। পরে সকাল ৮টা ২৯ মিনিটের দিকে তারা আমাদের হোটেল বুকিংয়ের কাগজ পাঠায়। কিন্তু সেই কাগজ পাওয়ার পর দেখতে পাই ফ্লাইটের বোর্ডিং শেষ। আমরা আর যেতে পারব না।

বোর্ডিং কাউন্টার বন্ধ হয়ে গেছে। হোটেল কর্তৃপক্ষ বুকিংয়ের কাগজ পাঠাতে দেরি করায় আমরা ফ্লাইট মিস করলাম। তখন আমরা টাকা ফেরত চেয়ে যোগাযোগ করলে হোটেলের কেউ আর ফোন ধরে না। আবার কল ধরলেও তা কেটে দেয়। এই হচ্ছে প্রতারণা ও বাটপাড়ির চিত্র।

,