গড়ে প্রতিদিন ১০ প্রবাসীর লাশ আসে দেশে

ঠাকুরগাঁওয়ের ‍যুবক আনোয়ার হোসেন (৩২) কাজ করতে গিয়েছিলেন সৌদি আরবে। কিন্তু এক মাসের মাথায় গত বছরের ৩০ জুলাই ঘুমের মাঝে তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসকের সনদপত্রে লেখা হয়—হার্ট অ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়েছে।

কাতারের সব খবর হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন

এর পাঁচ মাস পর তার লাশ দেশে আসে এবং গত ১১ জানুয়ারি তার মৃতদেহ দাফন করা হয়। পরিবারে সচ্ছলতা ফিরবে, এমন আশায় খুলনার আব্দুস সাত্তার (২৮) গিয়েছিলেন কাতারে।

একই স্বপ্ন নিয়ে কুমিল্লার আলমগীর (২৬) সৌদি আরবে ও নারায়ণগঞ্জের ফারুক (৩১) গিয়েছিলেন দুবাই। কিন্তু গত বছরের ডিসেম্বরে তিন জনই দেশে ফিরেছেন লাশ হয়ে। একজন দুর্ঘটনায়, বাকি দুজনের মৃত্যু স্ট্রোক ও হৃদরোগে।

শুধু এই চার জনই নন, গত বছর বিদেশ থেকে প্রবাসী কর্মীর লাশ এসেছে তিন হাজার ৮৬০ জনের। যা এযাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

গত ৩১ বছরে প্রবাসীর লাশ এসেছে ৪৮ হাজার ১৩৩টি।

১৯৯৩ সাল থেকে ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত এই লাশগুলো দেশে আসে।

কাতারে চাকরি খুঁজছেন? এখানে ক্লিক করুন

বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৮-১০টি করে লাশ বিমানবন্দরে আসে। এই লাশগুলো গ্রহণ করেন মৃত প্রবাসীদের পরিবার।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২১ সালে মোট লাশ এসেছে তিন হাজার ৮০৩টি, ২০২০ সালে দুই হাজার ৮৮৪টি, ২০১৯ সালে তিন হাজার ৬৫৮টি, ২০১৮ সালে তিন হাজার ৬৭৬টি।

পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছরই লাশের সংখ্যা বাড়ছে। শুধু ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে ফ্লাইট বন্ধ থাকায় অনেক লাশই দেশে পৌঁছাতে পারেনি। সেগুলো প্রবাসেই দাফন করা হয়।

এছাড়া সরকারি এই হিসাবের বাইরেও অনেক লাশ প্রবাসে স্থানীয়ভাবে দাফন করা হয়ে থাকে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কোনও রোগে মারা গেলে সেটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে ধরা হয়। এর বাইরে প্রবাসীদের বেশিরভাগ মৃত্যুর কারণ হচ্ছে দুর্ঘটনা।

প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর কারণ জানতে সরকারিভাবে কোনও গবেষণা করা হয়নি। তবে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা যায়, প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা যান মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত বা ব্রেইন স্ট্রোকের কারণে।

আবার এদের একটা বড় অংশই মধ্যবয়সী কিংবা তরুণ। এ ছাড়াও হৃদরোগসহ বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, কিংবা প্রতিপক্ষের হাতেও খুন হন বাংলাদেশিরা।

এসব মৃত্যু পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বেশিরভাগই মারা গেছেন ৩৮ থেকে ৪২ বছরের মধ্যে এবং কাজে যোগদান করার অল্প সময়ের মধ্যে।

২০২২ সালের প্রথম ১১ মাসে ৩ হাজার ২২২ জনের লাশ দেশে এসেছে। এরমধ্যে ২ হাজার ৪২২ জনের বয়স ১৯ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে।

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে আসা ৩০৭ জন প্রবাসীর লাশের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ মারা গেছেন স্ট্রোকে—যারা তরুণ কিংবা মধ্যবয়সী।

এরপর ২০ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বা কারও স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে বা বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১৮ শতাংশ, এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১২ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন তিন জন।

আর এসব লাশের বেশিরভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য মূলত মরু আবহাওয়ার দেশ। প্রচণ্ড গরমে প্রতিকূল পরিবেশে অদক্ষ এই বাংলাদেশিরা ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকেন।

একদিকে প্রতিকূল পরিবেশ, আরেকদিকে অমানুষিক পরিশ্রম, ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকা, দীর্ঘদিন স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং সব মিলিয়ে মানসিক চাপের কারণেই সাধারণত স্ট্রোক বা হৃদরোগের মতো ঘটনা ঘটে।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘আমরা সবসময় বলি প্রবাসীদের এসব মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করতে।

কারণ, আমরা যদি কিছু লাশ স্যাম্পল ধরে গবেষণা করি, তাতে বুঝা যায় যে কী কারণে মারা গেলো। আমরা দেখেছি যে মধ্যপ্রাচ্যে যেসব কর্মী মারা যান, তার বড় কারণ হচ্ছে—আমাদের কর্মীরা স্বাস্থ্যগত বিষয়গুলো জানেন না।

১৮-২০ ঘণ্টা পরিশ্রম করে, অবৈধভাবে যাওয়ার ফলে চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন না। আবার সস্তায় মাংস ও সিগারেট খেতে পায়, গাদাগাদি করে থাকে। অনেক বিষয়ে কর্মীদের কিন্তু যাওয়ার আগেই সচেতন করা যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিদেশে গিয়ে জীবনটা কেমন হবে, চিকিৎসকের কাছে পরামর্শ কীভাবে নেবে, কীভাবে থাকবে— এসব বিষয়ে যদি সচেতনতা তৈরি করা যায়, তাতেও এই অস্বাভাবিক মৃত্যু অনেকখানি কমিয়ে আনা যায়।

রাষ্ট্রীয়ভাবে আমরা এত মৃত্যুর যে কারণ খুঁজবো, সেরকম কিছু এখনও পর্যন্ত হয়নি। অনুসন্ধান করলে কিছু পরামর্শ তৈরি করা যেতো।’

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহিন জানান, প্রবাসী কর্মীদের অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই বিষয়ে যা যা করার আমরা করবো।

আরো পড়ুন

BanglaTribune

Loading...
,