দেশজুড়ে ইমোর মাধ্যমে প্রতারণা কেন্দ্র লালপুর

ইতালিপ্রবাসী যুবক রেজুয়ান কবির শাকিবের মা-বাবা থাকেন রাজধানীর দক্ষিণ কাফরুলের বাসায়। গত বছরের ডিসেম্বরে তাঁর মায়ের নম্বরে ফোন আসে ছেলে শাকিবের ‘ইমো’ অ্যাপ থেকে। ফোন করা যুবক তাঁকে জানান, আপনার ছেলেকে ইতালি পুলিশ আটক করেছে।

দেড় লাখ টাকা না দিলে জেলে পাঠাবে। টাকা পাঠানোর জন্য পাঁচটি নম্বরও দেওয়া হয়। ছেলের বিপদ দেখে শাকিবের বাবা মুনসুর রহমান ধারদেনা করে দেড় লাখ টাকা পাঠিয়ে দেন সেই সব নম্বরে। পরে ছেলের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, তিনি ডিজিটাল প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন।

শাকিবের বাবা মুনসুর রহমান অবশ্য হাল ছাড়েননি। রাজধানীর কাফরুল থানায় তিনি মামলা করেন। সে মামলার তদন্তে নেমে ডিবির সাইবার ক্রাইম শাখার কর্মকর্তারা অপরাধীকে শনাক্ত করেন। এরপর ৮ জুন পুলিশ নাটোরের লালপুর থেকে মাসুদ রানা নামের সেই যুবককে গ্রেপ্তার করে।

ঘটনা আরও আছে। সৌদি আরবের একটি কোম্পানির কর্মচারী মিজানুর রহমানের পরিবার থাকে মৌলভীবাজারের গ্রামের বাড়িতে। জুলাই মাসে মিজানের ইমো নম্বর থেকে ফোন আসে স্ত্রী লিপি আক্তারের ইমো নম্বরে। অপরিচিত লোকটি তাঁকে জানান, মিজান সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। দ্রুত টাকা লাগবে। লিপি আক্তার সঙ্গে সঙ্গে ১০ হাজার পাঠিয়ে দেন।

প্রতারকেরা একইভাবে মিজানের আরও কয়েকজন আত্মীয়ের কাছ থেকে আরও ৫০ হাজার হাতিয়ে নেন। জানতে চাইলে নাটোরের পুলিশ সুপার (এসপি) লিটন কুমার সাহা বলেন, আত্মীয়স্বজনের নামে ইমোতে বিপদের কথা বলে টাকা চাইলে যাচাই-বাছাই করা উচিত। যারা এ ব্যাপারে সচেতন নয়, তারাই বিপদে পড়ছে।

তবে এ মামলার তদন্তে নেমে ডিবির সাইবার অপরাধ শাখা গত ২৫ আগস্ট নাটোরের লালপুর থেকে পলাশ আলী ও সাব্বির হোসেন নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করে। এদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, ইমো অ্যাপ হ্যাকিং করা এক বিশাল চক্রের হদিস। এই চক্রের মূল কেন্দ্র নাটোরের লালপুর উপজেলা। সেখানকার শতাধিক যুবক নিজেদের এই অপরাধে যুক্ত করে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। সারা দেশে তাঁদের রয়েছে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। এই দলে যেমন আছেন প্রকৌশলী, তেমনটি আছেন সাধারণ মুদিদোকানি-দিনমজুরও।

নাটোরের পুলিশ কর্মকর্তারাও এ তথ্য স্বীকার করেছেন। তাঁরা বলেছেন, গত এক বছরে শুধু লালপুর উপজেলা থেকেই ইমো অ্যাপ হ্যাক করে প্রতারণা করার অভিযোগে ৪৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ সময় চক্রের সদস্যরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফজলুর রহমান বলেছেন, বিষয়টি বেশ ভয়াবহ। এটা লালপুর থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। সেপ্টেম্বরে নাটোর জেলার মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভায়ও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সবার সহযোগিতায় এই চক্রের মূল উৎপাটনে পুলিশ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

কেন লালপুরে এই অপরাধ:

স্থানীয় লোকজন জানান, লালপুরের কোনো এক ব্যক্তি ২০১৮ সালে এক প্রবাসীর ইমো নম্বরের দখল নিয়ে প্রতারণা করে বেশ কিছু টাকা আদায় করে নেন। এরপর তিনি দল ভারী করে এ কাজে নেমে পড়েন। তাঁর দেখাদেখি শুরু হয় প্রতারণার কাজ। এখন লালপুরের পাশের অনেক তরুণ-যুবকও এ কাজে নেমে পড়েছেন। র‍্যাব-৫-এর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইমো অ্যাপ হ্যাকিংয়ের অভিযোগে যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের বাড়ি লালপুরের মোহরকয়া, চকবাদকয়া, পাইকপাড়া, বিলমাড়িয়া ভাঙাপাড়া, পুরোনো বাজার, রামকৃষ্ণপুরের মোহরকয়া নতুনপাড়া, মনিহারপুর, বিলমাড়িয়া, নাগশোষা, মোহরকয়া পূর্বপাড়া, রামপাড়া, নওপাড়া গ্রামে। এই গ্রামগুলো পাশাপাশি।

সাইবার অপরাধ সম্পর্কে জানেন এমন একজন পুলিশ কর্মকর্তা আজকের পত্রিকাকে বলেন, ইমো প্রতারণার আগে জিনের বাদশার নামে যে প্রতারণা হতো, তার কেন্দ্র ছিল গাইবান্ধার ঘাঘট উপজেলা। আর মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণার কেন্দ্র ছিল মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলা। সেই ধারায় এখন ইমো হ্যাকিং হচ্ছে লালপুরে। 

কীভাবে হ্যাক হয়:

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইমো হলো কম শিক্ষিত মানুষের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী শ্রমিকদের প্রায় সবাই এই অ্যাপ ব্যবহার করে পরিবারের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এই অ্যাপে কম ব্যান্ডউইথড লাগে, আবার একসঙ্গে একাধিক ডিভাইসে ব্যবহার করা যায়। এতে একজনের নম্বর সেভ করলেই অনেকের নম্বর পাওয়া যায়। যাঁরা ব্যবহার করেন, তাঁরা কম শিক্ষিত বলে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে তাঁদের মাথাব্যথা কম। হ্যাকাররা সেই সুযোগই নেন।

সিআইডির সাইবার পুলিশ কেন্দ্রের বিশেষ পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলাম বলেন, ইমো হ্যাক করা অনেক কঠিন কাজ। এখানে যেটা হয়, টার্গেট ব্যক্তির কাছে ওটিপি কোড পাঠানো হয়। পরে ফুসলিয়ে সেই কোড নিয়ে নেন প্রতারক চক্র। সেটা দিয়েই ইমো আইডির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন তাঁরা।

চক্র যেভাবে কাজ করে:

লালপুরের যেসব গ্রাম থেকে ৪৯ জন যুবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেসব গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, ওই সব গ্রামের শিক্ষিত-অশিক্ষিত, এমনকি গৃহিণীরাও ইমো প্রতারণার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। গ্রামে আগে যাঁরা দিনমজুর ছিলেন, প্রতারণার আয়ে তাঁদের জীবন বদলে গেছে।

গ্রেপ্তার হওয়া যুবকেরা স্বীকার করেছেন, এ কাজে বিভিন্ন স্তরে লোক রয়েছে। প্রতিটি দলে ৮-১০ জন করে সদস্য আছেন। এর প্রথম দলটি ‘সার্ভিল্যান্স লেয়ার’ নামে পরিচিত। তারা শিকারের জন্য লোকের খোঁজ করে। এরপর আছে দ্বিতীয় দল। তারা অ্যাপটি শুধু হ্যাক করে দেয়। এদের পরিচিত নাম হ্যাকিং লেয়ার। এরপরই যে চক্র আছে, তাদের কাজ কথাবার্তা বলা। সবশেষ দলটির কাজ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করা। কাজ অনুসারে প্রতিটি ভাগের জন্য টাকার পরিমাণও ঠিক করা আছে। প্রতিদিন একটি দল ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করে।

যাঁরা ধরা পড়েছেন:

গত ২৫ মে র‍্যাব-৫-এর নাটোর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মির্জা সালাহ উদ্দিনের নেতৃত্বে ইমো হ্যাকার চক্রের ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই দলে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মোহরকয়া গ্রামের মো. পাপ্পু আলী (১৯), চকবাদকয়া গ্রামের মো. অন্তর উদ্দিন ওরফে বিল্লু (১৮), উত্তর লালপুর পুরোনো বাজার গ্রামের মো. আশিকুর রহমান বিন্টু (২২), রামকৃষ্ণপুর গ্রামের মো. মহিন (২১)। ৮ জুন গ্রেপ্তার হন লালপুরের মাসুদ রানা। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ রানা স্বীকার করেন, একসময় তিনি দিনমজুর ছিলেন। এখন ইমো প্রতারণার কাজ করেন। দুই বছর ধরে তিনি এ কাজ করে আসছেন। তাঁর নিজের ২১টি সিমকার্ড আছে, যার একটিরও রেজিস্ট্রেশন নেই। প্রতারণার জন্য তাঁর নয়টি মোবাইল ফোনসেট আছে।

ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া পলাশ পেশায় টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। এ কাজের আগে তিনি একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। এখন সব ছেড়ে প্রতারণা শুরু করেছেন। তাঁর সঙ্গে ধরা পড়া সাব্বির স্কুলে পড়ে। তাঁরা দুজনে দুই বছর ধরে এ কাজ করে আসছেন।

গত ১১ জুন র‍্যাবের হাতে ধরা পড়েন ছয়জন। এদের দলনেতা মোহরকয়া গ্রামের আব্দুল আল মামুন এক বছর ধরে প্রতারণা করে আসছিলেন। লালপুরের পাশের উপজেলা রাজশাহীর বাঘার চণ্ডীপুর গ্রামের মো. মাজেদুল ইসলাম (২৪), বানিয়াপাড়া গ্রামের মো. জিসান আহমেদকেও প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ২০ আগস্ট গ্রেপ্তার হওয়া আশিক ও সাগর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে স্বীকার করেন খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার বিকাশ এজেন্ট ইনসান তালুকদারের কাছ থেকে তাঁরা ৪৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

জানতে চাইলে খুলনার দিঘলিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রিপন কুমার সরকার বলেন, এ রকম অনেক ঘটনা তাঁরা আগেও ঘটিয়েছেন।

জানতে চাইলে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জেনিফার আলম বলেছেন, যেকোনো তথ্য নিরাপদ এবং অন্যের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখার জন্য মোবাইল বা ডিজিটাল ডিভাইসে ‘টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন’ চালু রাখা উচিত। তাহলে আপনার অনুমতি ছাড়া আইডিতে প্রবেশ করা যাবে না। তা ছাড়া জিমেইল আইডি, পাসওয়ার্ড এবং ওটিপি নম্বর যদি কেউ শেয়ার না করেন, তাহলে কখনোই প্রতারণার শিকার হবেন না।

,