ধারাবাহিকভাবে কেন কমছে টাকার দাম?

আমদানি ব্যয় মেটাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করেই চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের মুদ্রাবাজার স্বাভাবিক রাখতে রিজার্ভ থেকে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের সাড়ে ১০ মাসে ৫১০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সবশেষ গত বৃহস্পতিবারও ৩ কোটি ডলার বিক্রি করা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এত ডলার বাজারে ছাড়া হয়নি।

এরপরও বাজারের অস্থিরতা কাটছে না। শক্তিশালী হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলারের দর। দুর্বল হচ্ছে টাকা। গত কয়েক মাসে ডলারের দাম বেড়েছে ৭০ পয়সা।

গত সোমবার আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে এক ডলারের জন্য ৮৬ টাকা ৭০ পয়সা খরচ করতে হয়। তবে ব্যাংকগুলো আমদানিকারকদের থেকে প্রতি ডলারের বিপরীতে ৯২-৯৩ টাকা আদায় করছে

৯৫ টাকা নেয়ার কথাও জানিয়েছেন অনেকেই। খোলাবাজার বা কার্ব মার্কেটে ডলার বিক্রি হচ্ছে আরও বেশি দরে।

এ কারণে ব্যয় বাড়ছে আমদানি পণ্যের। যার প্রভাব পড়ছে ভোগ্যপণ্যের দামে। ভোক্তাদের বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। ওদিকে কমছে বিদেশি মুদ্রার সঞ্চায়ন বা রিজার্ভ।

এ জন্য বিলাসী পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ, দেশে যে রিজার্ভ রয়েছে, তা দিয়ে ভবিষ্যতের ৬ মাসের আমদানি ব্যয় পরিশোধ করা যাবে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি বাড়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের দাম বাড়ছে। এজন্য রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বাড়াতে বড় উদ্যোগ নিতে হবে।

আর খোলাবাজারে সংকট কাটাতে কেউ যাতে সীমার বেশি নগদ ডলার বিদেশে নিতে না পারে, তার তদারকি জোরদার করতে হবে।

আর অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, আমদানি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা বাড়ায় বাজারে ডলারের সংকট দেখা দিয়েছে। আমদানির লাগাম টেনে ধরা ছাড়া ডলারের বাজার স্বাভাবিক হবে না বলে মনে করেন তারা।

জানা গেছে, করোনা মহামারি পরবর্তী আমদানি বাণিজ্য বাড়ায় ডলারের ব্যাপক চাহিদা বেড়েছে। অন্য দেশের সঙ্গে মিলিয়ে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমাচ্ছে বাংলাদেশ। এতে দাম বাড়ছে ডলারের।

এ ছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও সংকট তৈরি করেছে। বিপরীতে টাকার মান ক্রমাগত কমছেই। করোনার পরে বিদেশে যাওয়া বেড়ে গেছে, এর ফলে চাহিদাও বেড়েছে। তবে বিদেশি পর্যটক ও নগদ ডলার দেশে আসছে কম। এতেই বাড়ছে ডলারের দাম।

মানি চেঞ্জাররা জানিয়েছেন, খোলাবাজারে ডলার কেনাবেচার হস্তক্ষেপ নেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। অনেকেই বড় অঙ্কের ডলার সংগ্রহ করছেন।

আবার বিদেশে যাওয়ার চাপ বেড়েছে। সেই পরিমাণ ডলার বিদেশ থেকে আসছে না। এ কারণে সংকট। নগদ ডলারের একমাত্র উৎস বিদেশ থেকে সঙ্গে নিয়ে আসা। সেটাও হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের ৫ই আগস্ট আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলার ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় বিক্রি হয়। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এই একই জায়গায় ‘স্থির’ ছিল ডলারের দর।

এরপর থেকেই বাড়তে থাকে ডলারের দর। দেখা গেছে, এই ৯ মাসে বাংলাদেশি মুদ্রা টাকার বিপরীতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলারের দর বেড়েছে প্রায় ২.২৪ শতাংশ।

এর আগে জানুয়ারি মাসের শুরুতে ডলারের বিনিময়মূল্য ২০ পয়সা বাড়িয়ে ৮৬ টাকা করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২৩শে মার্চ ২০ পয়সা বাড়িয়ে ৮৬ টাকা ২০ পয়সা করা হয়।

এরপর কয়েক দফায় দাম বাড়ানো হয়। আর গত সোমবার তা বাড়িয়ে ৮৬ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। তবে ব্যাংকগুলো আমদানিকারকদের থেকে প্রতি ডলারের বিপরীতে ৯২-৯৩ টাকা আদায় করছে।

যদিও ব্যাংকগুলোর ঘোষিত দামে তা উল্লেখ নেই। অগ্রণী ও ইস্টার্ন ব্যাংকের আমদানিকারকদের থেকে ঘোষিত ডলারের দাম ছিল ৮৬ টাকা ৭৫ পয়সা।

ওদিকে আগামীতে ডলারের বিপরীতে টাকার আরও দরপতন ঘটতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো এক প্রতিবেদনে এই সতর্কবার্তা দেয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বাংলাদেশের ওপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে এই প্রতিবেদন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে উপস্থাপন করা হয়। আর প্রতিবেদনটি নিয়ে সংসদীয় কমিটিতেও আলোচনা হয়।

জানা গেছে, ধারাবাহিকভাবে ডলারের দাম বেড়ে চলার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমদানিতে। বাড়ছে আমদানি পণ্যের ব্যয়। বিদেশ যেতে যাদের নগদ ডলারের প্রয়োজন তাদেরও গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, করোনা মহামারির কারণে ২০২০-২১ অর্থবছর জুড়ে আমদানি বেশ কমে গিয়েছিল। কিন্তু প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ে উল্লম্ফন দেখা যায়।

সে কারণে বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়ে যায়। সে পরিস্থিতিতে ডলারের দর ধরে রাখতে গত অর্থবছরে রেকর্ড প্রায় ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তারই ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও ২০ কোটি ৫০ লাখ ডলার কেনা হয়। কিন্তু আগস্ট মাস থেকে দেখা যায় উল্টো চিত্র।

করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করায় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে আমদানি। রপ্তানি বাড়লেও কমতে থাকে রেমিট্যান্স। বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভও কমতে থাকে।

বাজারে ডলারের চাহিদা বেড়ে যায়; বাড়তে থাকে দাম। বাজার স্থিতিশীল রাখতে আগস্ট থেকে ডলার বিক্রি শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, ডলারের সংকট শিগগিরই কমার কোনো লক্ষণ নেই। কোভিড মহামারি পরবর্তী আমদানি বাড়তে থাকার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত ডলার ব্যয় হচ্ছে।

সবমিলিয়ে এসবের প্রভাব দেখা যাচ্ছে মুদ্রাবাজারে। এ সংকটের প্রভাব পড়ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গচ্ছিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ডলারের বাজারের চরম অস্থিরতা কোথায় গিয়ে শেষ হবে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে প্রচুর ডলার বিক্রি করেও বাজার স্বাভাবিক রাখতে পারছে না। এভাবে হস্তক্ষেপ করে বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে না।

কেননা সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ব্যাপক তফাত। যে করেই হোক আমদানি কমাতেই হবে। আর যদি এটা করা না যায়, তাহলে রিজার্ভের ওপর চাপ আরও বাড়বে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে রপ্তানি আয় বাড়ছে না। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়িয়ে তুলেছে।

এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বাড়ানোর প্রচেষ্টার পাশাপাশি দেশের মুদ্রাকে স্থিতিশীল রাখতে শক্তিশালী বৈদেশিক বিনিয়োগ জরুরি।

আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য ও জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় (জুলাই-মার্চ সময়ে) আমদানি খরচ বেড়ে গেছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। তবে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩৩ শতাংশ।

আবার প্রবাসী আয় যা আসছে, তা গত বছরের চেয়ে ১৭ শতাংশ কম। এর সঙ্গে রয়েছে সরকারি-বেসরকারি খাতের বড় অঙ্কের বিদেশি ঋণ পরিশোধ। ফলে আয়ের চেয়ে প্রতি মাসে প্রায় ২০০ কোটি বেশি ডলার খরচ হচ্ছে। এ কারণে বাড়ছে দাম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) ২.২৪ বিলিয়ন (২২৪ কোটি) ডলারের আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ দেড় বছর পর ৪২ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে।

গত বৃহস্পতিবার দিন শেষে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪১.৯০ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের ২৪শে আগস্ট এই রিজার্ভ অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে দেশ।

গত তিন মাস ধরে (জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ) প্রতি মাসে ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য আমদানি হচ্ছে দেশে। এ হিসাবে এই রিজার্ভ দিয়ে ৫ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।

ডলারের দাম বাড়ায় ও রিজার্ভে টান পড়ায় এখন বিলাসপণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করতে শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য গাড়ি ও ইলেকট্রনিক পণ্যের ঋণপত্র খোলার সময় নগদ জমার পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, সরবরাহ বাড়াতে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একইসঙ্গে বিলাসবহুল পণ্য আমদানিকে কিছুটা নিরুৎসাহিত করতে নেয়া পদক্ষেপসহ আরও কিছু উদ্যোগের কথা জানান তিনি। ফলে ডলারের চাহিদাও কমানো যাবে।

উদ্যোক্তারা জানান, ডলারের চরম সংকট। আমাদের বড় বড় পেমেন্টের জন্য পর্যাপ্ত ডলার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পাচ্ছি না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে যে পরিমাণে ডলারের চাহিদা দিচ্ছি তার অর্ধেক পরিমাণও পাওয়া যাচ্ছে না, এতে মার্কেট থেকে ডলার কিনতে গিয়ে অতিরিক্ত পাঁচ/ছয় টাকা বেশি খরচ করতে হচ্ছে।

গালফ বাংলার হোয়াটসঅ্যাপে এড হোন এখানে ক্লিক করে

আজকের আরও খবর

মানবজমিন

Loading...
,