পাসপোর্ট বিড়ম্বনা দূর হইল না

প্রবাসী বাংলাদেশিরা পাসপোর্ট পাইতে বিড়ম্বনার শিকার হইতেছেন বলিয়া খবর পাওয়া যাইতেছে। বিশেষত মালয়েশিয়া প্রবাসীরা এই মুহূর্তে পড়িয়াছেন বিপদে। নিয়মকানুন মানিয়া আবেদন করিলেও তিন মাসের পূর্বে পাসপোর্ট পাইতেছেন না।

যেই পাসপোর্ট মাত্র ১৫ দিনে দেওয়া সম্ভব, তাহাই পাইতে কেন তিন-চার মাস লাগিবে তাহা লইয়া প্রশ্ন উঠিয়াছে। ভুক্তভোগীরা বলিতেছেন, তাহারা কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে ১২০ রিঙ্গিত দিয়া পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। এই আবেদন ঢাকায় পাঠানো হয়। ইহার পর ঢাকা হইতে পাসপোর্ট প্রিন্ট হইয়া মালয়েশিয়ায় যাইতে বিলম্ব হয়।

দূতাবাসে খোঁজ নিলে দেখা যায় ‘পাসপোর্ট নট ফাউন্ড’। দুই সপ্তাহের মধ্যে বারকোড দেওয়ার কথা থাকিলেও ইহা পাইতে মাত্রাতিরিক্ত বিলম্ব হয়। ডেলিভারি স্লিপ নম্বরেও থাকে ভুল-বিভ্রান্তি।

পাওয়া যায় না সিরিয়াল অনুযায়ী পাসপোর্টও। অপরদিকে মালয়েশিয়ার পুলিশকে সময়মতো পাসপোর্ট দেখাইতে না পারায় অনেকে গ্রেফতারের শিকার হইতেছেন। তাহাদেরকে পাসপোর্টের আবেদন স্লিপ দেখাইয়াও কোনো লাভ হয় না। রেমিট্যান্সযোদ্ধা প্রবাসী বাংলাদেশিদের এই দুঃখ-দুর্ভোগ মানিয়া লওয়া যায় না।

শুধু মালয়েশিয়া নহে, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসীরা পাসপোর্ট লাভের ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হইতেছেন। সিঙ্গাপুরে কয়েক মাস পূর্বে সময়মতো পাসপোর্ট না পাওয়ায় ভিসা নবায়ন করা লইয়া দেখা দিয়াছিল জটিলতা।

ভিসা নবায়নের সুযোগ না পাইলে প্রবাসীদের কর্মহীন হইয়া পড়িবার আশঙ্কা থাকে। মালয়েশিয়ায় যে সংকট চলিতেছে তাহার মূল কারণ হইল—এখনো মালয়েশিয়ায় ই-পাসপোর্ট চালু না করা, কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশ দূতাবাসে পাসপোর্ট শাখায় জনবলের ঘাটতি, ঢাকা হইতে সঠিক সময়ে ডেলিভারি দিতে না পারা ইত্যাদি। তবে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলিতেছেন ভিন্ন কথা।

তাহার মতে, কেহ যদি দালালের মাধ্যমে আবেদন করে এবং ঐ দালাল যদি আবেদন জমা দিতে বিলম্ব করে, তাহা হইলে তাহার দায় পাসপোর্ট অধিদপ্তর নিবে কেন? আবার নাম-ঠিকানা, বয়স, পিতা-মাতার নাম, জন্মতারিখ, জন্মস্থান ইত্যাদিতে কোনো পরিবর্তন থাকিলে পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য অতিরিক্ত সময় লাগিতে পারে। আসলে আমরা যে কোনো কাজের দ্রুত সমাধান পাইতে চাই। স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করিয়া হইলেও তাড়াতাড়ি নিজের কার্যসিদ্ধি হাসিলে ব্যস্ত হইয়া পড়ি।

দালালরা হয়তো ইহারই সুযোগ গ্রহণ করিয়া থাকে। যথেষ্ট সময় লইয়া আবেদন করিলে এই সংকট তেমন থাকে না। আবার দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতির অভাবেও যে কালক্ষেপণ হয়, সেই কথাও আমাদের মানিয়া লইতে হইবে।মালয়েশিয়ায় আমাদের ১০ লক্ষ প্রবাসী রহিয়াছেন। সেখানকার দূতাবাসের পাসপোর্ট শাখায় কাজ করেন মাত্র দুই জন। সেইখানে প্রবাসীদের সেবায় যেখানে ৫০টি হটলাইন থাকা দরকার, সেইখানে আছে মাত্র একটি। অন্যান্য দেশে অবস্থিত দূতাবাসের ক্ষেত্রেও এইরূপ দৈন্যদশা বিরাজমান।

বাংলাদেশে পাসপোর্ট প্রক্রিয়া পূর্বের তুলনায় অনেক আধুনিক হইয়াছে। ভোগান্তিও কমিয়াছে। তবে এখনো পাসপোর্ট অফিস দালালমুক্ত হয় নাই। শুধু বিদেশ নহে, বাংলাদেশে থাকিয়াও পাসপোর্ট পাইতে বিলম্ব হইতেছে। বিশেষ করিয়া পাসপোর্ট সংশোধন করিতে যাইয়া দীর্ঘ ভোগান্তিতে পড়িতে হইতেছে। নির্ধারিত সময়ে পাসপোর্ট না পাইয়া অনেকের বিদেশযাত্রা বাতিল হইতেছে।

চিকিত্সা ও ব্যবসায়-বাণিজ্যের জন্য লোকেরা বিদেশ যাইতে পারিতেছেন না। হজ ও ওমরা গমনেচ্ছুরাও পড়িতেছেন বিপাকে। ইহার মূল কারণ যে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বা জনসেবার সম্প্রসারণে যে পরিমাণ দক্ষ জনবল দরকার, আমরা তাহা সঠিকভাবে প্রাক্কলন করিতে পারিতেছি না।

২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসাবে বাংলাদেশ চালু হয় মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট; কিন্তু এই সেবাকে আন্তর্জাতিক মানে লইয়া যাইতে হইলে প্রযুক্তিগত দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য জনবল প্রয়োজন। প্রয়োজন সফটওয়ার হালনাগাদসহ প্রযুক্তিগত ত্রুটি দূর করা। কাজের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় পাসপোর্ট অফিসের কার্যাবলী ডিসেন্ট্রালাইজেশন তথা বিকেন্দ্রীকরণ করাও জরুরি।

Loading...
,