বঙ্গোপসাগরের ছোট দ্বীপ কোকোতে নজর সব পরাশক্তির

বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে গড়ে উঠেছে কোকো আইল্যান্ডস বা কোকো দ্বীপপুঞ্জ। ব্রিটিশরা এ অঞ্চল ত্যাগ করার সময় দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা হস্তান্তর করেছিল মিয়ানমারের কাছে।

দাবি করা হয়, গত শতকের শেষ দশকে অনেকটা গোপনেই চীনের কাছে দ্বীপপুঞ্জটি ইজারা দিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগে রয়েছে ভারত।

তবে বর্তমানে এ উদ্বেগ আরো বাড়ছে বলে দাবি করছে ভারতীয় পর্যবেক্ষক সংস্থা ও গণমাধ্যম। তাদের ভাষ্যমতে, কোকো আইল্যান্ডসে সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলার পাশাপাশি গোয়েন্দা প্রযুক্তি স্থাপন করছে চীন। সেখানে বেইজিংয়ের উপস্থিতির কথা সরাসরি স্বীকার না করলেও বিষয়টি নিয়ে বেশ ভালোভাবেই সচেতন রয়েছে নয়াদিল্লি।

শুধু ভারত নয়, উদ্বেগ বাড়ছে ইন্দোপ্যাসিফিকে চীনকে মোকাবেলায় বদ্ধপরিকর প্রতিটি পরাশক্তিরই। এরই মধ্যে চতুর্দেশীয় জোট কোয়াড্রিলেটারাল ইনিশিয়েটিভকে সক্রিয় করে তুলেছে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া।

দেশগুলো এখন ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যৌথ মহড়ার পাশাপাশি নানা সামরিক তত্পরতার উদ্যোগ নিচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশগুলোর যাবতীয় তত্পরতায় একিলিস হিল (ব্যাপক শক্তিমত্তা সত্ত্বেও চূড়ান্ত বিপর্যয়ের কারণ হয়ে ওঠার মতো দুর্বল স্থান) হয়ে উঠতে পারে কোকো দ্বীপপুঞ্জের সর্ববৃহৎ দ্বীপ গ্রেট কোকো আইল্যান্ডস।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর দাবি, আয়তনে ছোট এ দ্বীপটিকে কেন্দ্র করে আন্দামান অঞ্চলে গোয়েন্দা তত্পরতা চালাচ্ছে চীন। কোকো দ্বীপে স্থাপিত গোয়েন্দা প্রযুক্তি দিয়ে বেইজিং শ্রীলংকা থেকে মালাক্কা প্রণালি পর্যন্ত ভারত মহাসাগরের বড় অঞ্চলজুড়ে নজরদারি চালাতে সক্ষম।

এছাড়া সেখানে যুদ্ধবিমান অবতরণের উপযোগী এয়ারস্ট্রিপসহ অন্যান্য স্থাপনাও নির্মাণ করছে চীন। যদিও বেইজিং ও নেপিদো বরাবরই এসব বক্তব্যকে অস্বীকার করে এসেছে।

ভারত নিয়ন্ত্রিত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের একেবারেই কোলঘেঁষে অবস্থান কোকো আইল্যান্ডসের। কোকো আইল্যান্ডসকে বর্তমানে ভূরাজনৈতিক কৌশলগত দিক থেকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন পর্যবেক্ষকরা।

দ্বীপগুলো গড়ে উঠেছে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের মিলনস্থলে। সামরিক দিক থেকেও মালাক্কা প্রণালির সঙ্গে এ অঞ্চলের বাণিজ্যিক নৌপথে নজরদারির জন্য দ্বীপগুলোকে আদর্শ স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে ভারতীয় ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গণমাধ্যমের জন্য আরো উদ্বেগের জায়গা হলো পাশেই আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে প্রথম ত্রিমাত্রিক সামরিক কমান্ড (নৌ, বিমান ও স্থলবাহিনীকে যুক্ত করে) গড়ে তুলেছে ভারত।

গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌঘাঁটির পাশাপাশি সেখানে মিসাইল উেক্ষপণ কেন্দ্রও স্থাপন করা হয়েছে। কোকো আইল্যান্ডস থেকে আন্দামান ও নিকোবরে ভারতের সামরিক কার্যকলাপের ওপর খুব সহজেই একেবারে কাছ থেকে নজরদারি চালাতে পারে চীন।

কোকো আইল্যান্ডস মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন প্রশাসনিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। যদিও ইয়াঙ্গুন থেকে দ্বীপগুলোর দূরত্ব প্রায় ৪২৫ কিলোমিটার। পাঁচটি দ্বীপ নিয়ে গড়ে উঠেছে কোকো আইল্যান্ডস। এর মধ্যে চারটি দ্বীপ অবস্থিত গ্রেট কোকো রিফের ওপর। আরেকটি গড়ে উঠেছে লিটল কোকো রিফে।

দ্বীপপুঞ্জটিতে চীনের উপস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর দাবি, সেখান থেকে অনেকদিন ধরেই আন্দামানে ভারতীয় সামরিক কার্যকলাপের ওপর নজর রাখছে চীন। এজন্য ১৯৯২ সালে সেখানে সিগইন্ট (সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স বা সামরিক সিগন্যালে আড়ি পাতার মাধ্যমে নজরদারি কার্যকলাপ) ফ্যাসিলিটি স্থাপন শুরু করে চীন। ১৯৯৩ সালের মাঝামাঝি এজন্য নতুন রাডার স্থাপন করা হয়। ১৯৯৪ সালের মধ্যেই সেখান থেকে পুরো মাত্রায় নজরদারি কার্যকলাপ শুরু করে চীন। এছাড়া ১৯৯৪ সালে সেখানকার পাঁচটি দ্বীপের মধ্যে দুটি চীনকে ইজারা দিয়েছে মিয়ানমার।

তবে চীন ও মিয়ানমার শুরু থেকেই এ দাবি অস্বীকার করে এসেছে। এমনকি নয়াদিল্লি বা যুক্তরাষ্ট্রও বিষয়টি সরাসরি স্বীকার করেনি এখনো। ২০০৫ সালে ভারতের তত্কালীন নৌপ্রধান বলেছিলেন, ভারতের কাছে নিশ্চিত তথ্য রয়েছে কোকো আইল্যান্ডসে চীনের কোনো লিসেনিং পোস্ট, রাডার বা সার্ভিল্যান্স স্টেশন নেই। ২০১৪ সালে আন্দামান ও নিকোবর কমান্ডের প্রধান এয়ার মার্শাল পিকে রায় বলেছিলেন, চীন সেখানে একটি রানওয়ে বানাচ্ছে, তবে তা বেসামরিক প্রয়োজনে। সেখানে চীনের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতিকে মোটেও উদ্বেগজনক বলা যায় না।

তবে সম্প্রতি ওপইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে দাবি করা হয়, কোকো আইল্যান্ডসে চীনের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সম্পর্কে ভারতীয় সামরিক মহল বেশ ভালোভাবেই ওয়াকিবহাল রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভালোমতোই জানেন, সেখানে চীনের শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। সেখানে সিগইন্ট ফ্যাসিলিটির পাশাপাশি নৌঘাঁটি ও রাডার সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ওপর নজরদারি করছে বেইজিং।

অন্যদিকে এয়ার মার্শাল পিকে রায় উল্লিখিত বিমানবন্দরের রানওয়েটি সম্পর্কে ওপইন্ডিয়ায় বলা হয়, গ্রেট কোকো আইল্যান্ডসে (কোকো দ্বীপপুঞ্জের বৃহত্তম দ্বীপ) আগে বেসামরিক উড়োজাহাজ চলাচলের কাজটি দীর্ঘদিন একটি এক হাজার মিটার দৈর্ঘ্যের ছোট এয়ারস্ট্রিপ দিয়েই চলেছে। কিন্তু চীনারা বর্তমানে এটিকে আড়াই হাজার মিটার দৈর্ঘ্যের রানওয়ে বানিয়ে তুলেছে। এত বিশাল রানওয়ে শুধু সামরিক উড়োজাহাজের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়। উপরন্তু সেখানে এখন আর কোনো বেসামরিক উড়োজাহাজ অবতরণ করে না।

একই কথা বলেছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা বিনায়ক ভাটও। কয়েক বছর আগে তার একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে দিল্লিভিত্তিক ওআরএফ ফাউন্ডেশন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, গত এক দশকে কয়েক দফায় সম্প্রসারণের মাধ্যমে কোকো আইল্যান্ডসের এয়ারস্ট্রিপের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে আড়াই হাজার মিটার করা হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ দিকের এক হাজার মিটার বানানো হয়েছে পাহাড় কেটে। সেখান থেকে সরিয়ে নেয়া মাটি সম্ভবত দ্বীপের কিনারে সাগর ভরাটের কাজে ব্যবহূত হয়েছে।

তিনি জানিয়েছিলেন, স্যাটেলাইট থেকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেও সেখানে একটি রাডার স্টেশনের উপস্থিতি দেখা গিয়েছে। রাডার স্টেশনে অন্তত তিনটি শোরাড (স্বল্পপাল্লার বিমানবিধ্বংসী প্রতিরক্ষা) গান মোতায়েনকৃত অবস্থায় ছিল। এছাড়া রাডার স্টেশনের নির্মাণশৈলী বলছে, এটি চীনাদেরই বানানো অথবা তাদের সহায়তা নিয়ে নির্মিত।

ওই সময়ে কোকো আইল্যান্ডসের চলমান নির্মাণকাজ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, বড় এয়ারস্ট্রিপটি সামরিক উড়োজাহাজ উড্ডয়ন-অবতরণের উপযুক্ত। এছাড়া রাডার স্টেশনটি শ্রীলংকা থেকে মালাক্কা প্রণালি পর্যন্ত ভারতের প্রতিটি কার্যকলাপের ওপর নজরদারি করতে সক্ষম। সেক্ষেত্রে এ নতুন হুমকির বিষয়টিকে সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে ভারতের।

,