ভারতে অ্যাপে মুসলিম নারীদের ‘বিক্রির’ বিজ্ঞাপন

গত সপ্তাহে ভারতের অর্ধশত মুসলিম নারী জানতে পারেন যে অনলাইনে বিক্রির জন্য পণ্য হিসেবে তাদের বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে। ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিমদের হয়রানির নতুন ও বিস্ময়কর এ পন্থার খবর প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

জানা গেছে, ‘শালি ডিলস’ নামের একটি অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে বিভিন্ন নারীর ছবিসহ প্রোফাইল তৈরি ও প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে নারীদের বিশেষায়িত করা হয়েছে ‘ডিলস অফ দ্য ডে’ বলে।

পেশায় বাণিজ্যিক বিমানচালক হানা খান নামের এক নারী এ তালিকায় তার নাম ওঠার কথা জানতে পারেন এক বন্ধুর সাবধানবাণীর মাধ্যমে।

ওই বন্ধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারের একটি পোস্ট পাঠান হানা খানকে। টুইটে ক্লিক করে হানা যে লিংকে প্রবেশ করেন, সেখানে অপরিচিত এক নারীর ছবি দেখতে পান তিনি। পরের দুই পেইজে নিজের বান্ধবীদের ছবি দেখে চমকে ওঠেন।

এর পরের পেইজে গিয়েই নিজের ছবি দেখে হতবাক হয়ে পড়েন হানা।

তিনি বলেন, ‘আমি ৮৩টা নাম গুণেছি। আরও অনেক থাকতে পারে। তারা টুইটার থেকে আমার ছবি ও ইউজার নেইম নিয়েছে। ২০ দিন ধরে অ্যাপটি চলছে আর আমরা কিছু জানতেও পারিনি। বিষয়টা প্রথম যখন বুঝতে পারি, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল আমার।’

ভারতে কট্টর হিন্দুরা মুসলিম নারীদের প্রতি অসম্মানসূচক ও তাচ্ছিল্যপূর্ণ শব্দ হিসেবে ‘শালি’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন।

বিবিসির প্রতিবেদনে জানানো হয়, ‘শালি ডিলস’ নামের অ্যাপে ব্যবহারকারীদের ‘শালি’ কেনার যে সুযোগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে, তা মূলত প্রতীকী। সত্যিকারের কোনো কেনাবেচা নেই অ্যাপটিতে। মুসলিম নারীদের অসম্মান ও অপদস্থ করাই অ্যাপটির উদ্দেশ্য।

হানা খান জানান, নিজের ধর্মবিশ্বাসের কারণে লক্ষ্যে পরিণত হয়েছেন তিনি।

হানা বলেন, ‘আমি মুসলিম নারী, এমন একজন যার পরিচয় আছে, যার কথার গুরুত্ব আছে। তারা চায় আমাদের মতো মানুষদের চুপ করিয়ে দিতে।’

ওপেন সোর্স অ্যাপটি চলছিল ওয়েব প্ল্যাটফর্ম গিটহাবের মাধ্যমে। অভিযোগ পেয়েই দ্রুত শালি ডিলস বন্ধ করে দিয়েছে গিটহাব।

বিবৃতিতে গিটহাবের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি খতিয়ে দেখেছি আমরা। আমাদের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক সব অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছি।’

কিন্তু অপমানজনক এই অভিজ্ঞতা গেঁড়ে বসেছে ভুক্তভোগী নারীদের মনে। অনেকেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছেন। অনেকে ভবিষ্যতে এমন আরও হয়রানির শিকার হতে পারেন বলে উদ্বিগ্ন।

অ্যাপটিতে যেসব নারীকে ‘বিক্রি’র তালিকায় তোলা হয়েছিল, তারা সবাই মুসলিম এবং অধিকারের বিষয়ে সোচ্চার। এদের প্রায় সবাই পেশায় সাংবাদিক, অধিকারকর্মী, শিল্পী বা গবেষক।

এমনই আরেক নারী বলেন, ‘আপনি যতোই শক্তিশালী হোন না কেন, আপনার ছবি ও অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত হয়ে গেলে সেটা আপনাকে আতঙ্কিত, ক্ষুব্ধ করবেই।’

বেশ কয়েকজন নারী অবশ্য উল্টো প্রতিক্রিয়াও দেখিয়েছেন। শালি ডিলসে তাদের তথ্য প্রকাশ করে দেয়ার ঘটনায় জড়িতদের ‘বিকৃতমস্তিষ্ক’ আখ্যা দিয়েছেন তারা; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছেন এই ‘বিকৃতমস্তিষ্ক’দের বিরুদ্ধে লড়াই করার।

হোয়াটসঅ্যাপে এরই মধ্যে একটি গ্রুপ খুলেছেন তারা এবং ঐক্যবদ্ধভাবে অভিযোগ করেছেন পুলিশের কাছে। এদেরই একজন হানা খান।

এই হয়রানির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন ভারতের সুশীল সমাজের অনেক সদস্য, কর্মী ও নেতারা।

এ বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানালেও অ্যাপটির সঙ্গে জড়িতদের সম্পর্কে তথ্য প্রকাশে অস্বীকৃতি জানিয়েছে পুলিশ।

ভুয়া পরিচয়ে অ্যাপটি তৈরি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমবিষয়ক সমন্বয়ক হাসিবা আমিনের অভিযোগ, অনেক অ্যাকাউন্ট থেকে মুসলিমদের, বিশেষ করে মুসলিম নারীদের নিয়মিত আক্রমণ করা হয়। কট্টর ডানপন্থি, তথা ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদীদের সমর্থনে এসব হয়ে আসছে বলেও দাবি তার।

ভারতে অ্যাপে মুসলিম নারীদের ‘বিক্রির’ বিজ্ঞাপন
অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, ভারতে অনলাইনে সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হন ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও দলিত বর্ণের নারীরা। ছবি: এএফপি

হাসিবা বলেন, ‘এভাবে মুসলিম নারীদের হয়রানি করার এটা প্রথম ঘটনা নয়। গত ১৩ মে যখন মুসলিমরা তাদের ধর্মীয় উৎসব ঈদ উদযাপন করছিলেন, তখন ইউটিউবে ‘ঈদ স্পেশাল’ নামের একটি সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানে ভারত ও পাকিস্তানের নারীদের রীতিমতো ‘নিলামে তুলে বিক্রির’ তাচ্ছিল্য করা হচ্ছিল।’

তিনি আরও জানান, ওই নিলামে অংশ নেয়া ব্যক্তিরা নারীদের দাম ঘোষণা করছিলেন পাঁচ বা ১০ রুপি করে। নারীদের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে, ধর্ষণের হুমকি দিয়ে, যৌন কার্যকলাপের বর্ণনা দিয়ে তাদের দাম নির্ধারণ করা হচ্ছিল।

এমনকি টুইটারে একটি অজ্ঞাত অ্যাকাউন্ট থেকে কংগ্রেস নেতা হাসিবা আমিনকেও ‘নিলামে বিক্রির জন্য তোলা হয়’।

চ্যানেলটি বন্ধ করে দিয়েছে ইউটিউব।

হানা খান জানান, বেশ কয়েকটি টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে তাকে দৈহিক গঠনের কথা উল্লেখ করে অপমানসূচক কথা বলা হচ্ছিল, নোংরা ভাষায় যৌন কার্যকলাপের বর্ণনা দিয়ে তাকে গালি দেয়া হচ্ছিল।

এসব অ্যাকাউন্টের একটি- @sullideals101 অ্যাকাউন্টটি এরই মধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

হানা মনে করেন, শালি ডিলস অ্যাপ ও ইউটিউবের ওই চ্যানেলটি যারা তৈরি করেছে, তারাই নারীদের নিলামে তোলার চেষ্টা করেছে।

টুইটারে বেশ কয়েকটি অ্যাকাউন্ট থেকে অজ্ঞাত ব্যবহারকারীরা অ্যাপটি তৈরিতে নিজেদের জড়িত বলে দাবি করেছে এবং খুব শিগগিরই আবার ফিরে আসার ঘোষণা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহে এরকম বেশ কয়েকটি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে টুইটার কর্তৃপক্ষ।

এসব অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ব্যক্তিদের অভিযোগ, অনলাইনে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, ভয় দেখানো, অশালীন আচরণ করার লক্ষ্য হলো নারীদের মুখ বন্ধ করে দেয়া।

গত সপ্তাহে সারা বিশ্বের দুই শতাধিক অভিনয়শিল্পী, সুরকার, সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তা ফেসবুক, গুগল, টিকটক ও টুইটারের প্রধান নির্বাহীদের কাছে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন। নারীদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানানো হয় চিঠিটিতে।

তারা লেখেন, ‘একবিংশ শতাব্দীতে যোগাযোগের কেন্দ্রই ইন্টারনেট। এখানেই এখন বিতর্ক হয়, যোগাযোগের মাধ্যম তৈরি হয়, পণ্য কেনাবেচা হয় এবং মানুষের ভাবমূর্তিও এই মঞ্চেই তৈরি হয়।

‘কিন্তু অনলাইনে যে হারে হয়রানি বেড়েছে, এর অর্থ হলো, এই ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার কেন্দ্রে নারীরা নিরাপদ নেই।’

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ভারতে অনলাইনে হয়রানিবিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ করে গত বছর।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, নারীরা যত বেশি সোচ্চার, তারা তত বেশি হয়রানির শিকার। যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের মতোই ভারতেও ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও দলিত বর্ণের নারীরা হয়রানির সহজ লক্ষ্যবস্তু।

অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়ার সাবেক মুখপাত্র ও লেখক নাজিয়া ইরাম বলেন, ‘ভারতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করা মুসলিম নারীর সংখ্যা হাতে গোণা। তারাও দিনের পর দিন হয়রানির শিকার হয়ে আসছেন।

‘এসব সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত হামলার লক্ষ্য হলো শিক্ষিত মুসলিম নারীদের মতপ্রকাশে বাধা দেয়া এবং মুসলিমবিদ্বেষের বিরুদ্ধে তাদের কথা না বলতে দেয়া। তাদেরকে লজ্জা দিয়ে মুখ বন্ধ করার এবং সমাজে তাদের অবস্থান নড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়।

কংগ্রেস নেত্রী হাসিবা আমিন বলেন, ‘যারা এসব হয়রানির হোতা, তারা নির্ভয়েই এসব অপকর্ম করে। কারণ তারা জানে যে তাদের কোনো বিচার হবে না, তারা পার পেয়ে যাবে।’

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন হাসিবা, যেখানে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অরাজকতা উসকে দিয়েছে ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপির সমর্থকরা।

উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন মুসলিম হত্যার অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত আট হিন্দুকে ফুলের মালা দিয়ে এক মন্ত্রীর শুভেচ্ছা জানানোর খবর। গত বছর প্রকাশ্য জনসমাবেশে মুসলিমদের গুলি করার কথা বলা ভারতের নতুন তথ্যমন্ত্রীর একটি ভাইরাল ভিডিওর কথাও জানান হাসিবা।

এমন পরিস্থিতিতে শালি ডিলস অ্যাপে যে নারীদের পরিচয় ও তথ্য চুরি করে প্রকাশ করা হয়েছে, তাদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন ও দীর্ঘ লড়াইয়ের বিষয়। কিন্তু ন্যায়বিচার পেতে সর্বোচ্চ শক্তিতে লড়াই করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তারা।

হাসিবা বলেন, ‘নারীদের অনলাইনে নিলামে তোলার ঘটনায় জড়িতদের যদি পুলিশ চিহ্নিত না করে, আমি আদালতে যাব। শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাব।’

,