ভুয়া সনদে বিমানে পাইলট নিয়োগের অভিযোগ

যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করে ‘অযোগ্য পাইলট’ নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিরুদ্ধে। জাল শিক্ষা সনদ দিয়ে নিয়োগের ঘটনাও রয়েছে। দক্ষতা ও যোগ্যতা-সংক্রান্ত বিষয়ে যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগের ফলে ঝুঁকিতে রয়েছে নিরাপদ যাত্রী পরিবহন।

জানা গেছে, বোয়িং-৭৭৭ উড়োজাহাজের জন্য আট ক্যাপ্টেন ও ছয় ফার্স্ট অফিসার পাঁচ বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য ২০২১ সালের ২৩ নভেম্বর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। সেখানে প্রাথমিকভাবে কয়েকজনকে নির্বাচন করা হয়, যাদের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কাতারে চাকরি খুঁজছেন? এখানে ক্লিক করুন

এর মধ্যে একজন বিজ্ঞান বিভাগে না পড়েও জাল শিক্ষাসনদ জমা দিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। অন্য একজন জাল এয়ারলাইন ট্রান্সপোর্ট পাইলট লাইসেন্স জমা দিয়েছিলেন।

বেসামরিক বিমান চলাচল আইন অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি শিক্ষাসনদ, নিবন্ধন সনদ, লাইসেন্স বা পারমিট জাল বা পরিবর্তন করেন বা করার চেষ্টা করেন, তাহলে অনধিক পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।

সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক বাছাই শেষে সাদিয়া আহমেদ নামে এক ফার্স্ট অফিসার হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য চুক্তি করে বিমান। তবে তিনি যে সনদ বিমানে দিয়েছেন, তা জাল। সাদিয়া আহমেদ বিমানে যে সার্টিফিকেট জমা দিয়েছেন, সেটি অনুযায়ী, তিনি ২০০১ সালে আনোয়ার গার্লস কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। তার রোল নম্বর ৩০০১০৬, রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৯৯৯৫৯১।

কাতারের সব খবর হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন

শিক্ষা বোর্ডে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, তিনি শহীদ আনোয়ার গার্লস কলেজ থেকে মানবিক শাখা থেকে দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেছিলেন। অথচ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী, পাইলট হতে গেলে পদার্থবিজ্ঞান, গণিতসহ এইচএসসি বা সমমানের সনদ থাকতে হবে।

সূত্র জানায়, সাদিয়া আহমেদ বিমানের চিফ অব ট্রেনিং ক্যাপ্টেন সাজিদ আহমেদের স্ত্রী। তার চাকরিজীবন শুরু হয় জিএমজি এয়ারলাইনসের একজন কেবিন ক্রু হিসেবে। পরবর্তীকালে রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও ইউএস বাংলায় ফার্স্ট অফিসার হিসেবে নিয়োগ পেলেও বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি, দুর্ঘটনা ও অদক্ষতার কারণে তাকে চাকরি হারাতে হয়।

সাদিয়ার সঙ্গে বিমানের চুক্তিতে বলা হয়েছে, তার মূল বেতন এক লাখ ৭০ হাজার টাকা, বাড়িভাড়া হিসেবে পাবেন ৮৫ হাজার টাকা। এছাড়া বার্ষিক দুটি মূল বেতনের সম-পরিমাণ অর্থ উৎসব ভাতা এবং ২০ শতাংশ মূল বেতনের সম-পরিমাণ অর্থ বৈশাখী ভাতা হিসেবে প্রাপ্য হবেন।

কর্তৃপক্ষ ন্যূনতম ফ্লাইং আওয়ার করাতে না পারলে প্রকৃত ঘণ্টার ভিত্তিতে আনুপাতিক হারে ফ্লাইং অ্যালাউন্স প্রাপ্য হবেন। আউটস্টেশনে অবস্থানকালের ভিত্তিতে ঘণ্টাপ্রতি ২ দশমিক ৫ ডলার হারে প্রাপ্য হবেন।

এদিকে ফার্স্ট অফিসার হিসেবে নির্বাচিত আল মেহেদী ইসলাম জমা দিয়েছেন জাল এয়ারলাইন ট্রান্সপোর্ট পাইলট লাইসেন্স (এটিপিএল)। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ফ্লাইট সেফটি বিভাগের সহকারী পরিচালকের স্বাক্ষর জাল করে তিনি এ সার্টিফিকেট জমা দেন।

সূত্র জানায়, রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থার নজরে বিষয়টি এলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিমানে নির্ধারিত শর্ত পূরণ ব্যতীত বিতর্কিত ও অযোগ্য ব্যক্তিদের পাইলট ও কো-পাইলট নিয়োগের বিষয়ে ছয় পাতার প্রতিবদেনসহ ২০২২ সালের ৪ এপ্রিল বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেয়া হয়।

চিঠিতে বলা হয়, প্রতিবেদনের আলোকে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে জানাতে নির্দেশ দেয়া হয়। বিমানের ক্যাপ্টেন, পাইলট ও ফার্স্ট অফিসার নিয়োগের ক্ষেত্রে উপযুক্ত জ্ঞান, দক্ষতা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা প্রভৃতি প্রয়োজনীয় সূচক যাচাই-বাছাই করে ত্রুটিমুক্ত প্রক্রিয়ায় নিয়োগ প্রদানের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।

এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জানিয়েছে, বোয়িং-৭৭৭ উড়োজাহাজের জন্য আট ক্যাপ্টেন ও ছয় ফার্স্ট অফিসার চুক্তিভিত্তিক (পাঁচ বছর) নিয়োগের জন্য ২০২১ সালে ২৩ নভেম্বর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। আবেদনকারীদের মধ্য থেকে নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণপূর্বক আট ক্যাপ্টেন ও ছয় ফার্স্ট অফিসারকে শর্তসাপেক্ষে প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়।

এরই মধ্যে চার ক্যাপ্টেন ও এক ফার্স্ট অফিসার প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে ফ্লাইট পরিচালনা করছেন। বাকি পাইলটদের মধ্যে একজন পদত্যাগ করেছেন, একজন প্রশিক্ষণে অংশ নেননি এবং ছয়জন প্রশিক্ষণরত। একজনের সার্টিফিকেট যথাযথ না হওয়ায় বিমান কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে প্রাথমিক তদন্ত করেছে এবং প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

বিমানের বক্তব্যের মধ্যেই নিয়োগের অনিয়মের বিষয়টি উঠে এসেছে। বিমান বলছে, আট ক্যাপ্টেন ও ছয় ফার্স্ট অফিসারকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়। বিমানের নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী অযোগ্যতা ও জাল সার্টিফিকিট দেয়ার পরও কীভাবে তারা প্রাথমিকভাবে নির্বাচত হলেন, সেই উত্তর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।

পাইলট নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলেছেন বিমানের পাইলটরাও। বিমানের পাইলটদের সংগঠন বাংলাদেশ এয়ারলাইন পাইলট অ্যাসোসিয়েশন (বাপা) ২০২২ সালের আগস্টে লিখিতভাবে বিমানে পাইলট নিয়োগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইন লঙ্ঘন হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন।

তারা বলেছেন, বিমানের কর্মকর্তাদের স্বজনরা নিয়োগের ক্ষেত্রে সুবিধা পেয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহাবুব আলী বলেন, যে অভিযোগ আছে, সে জায়গাগুলো খতিয়ে দেখা হবে।

একটা অভিযোগ যখন আসে, তখন তার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আইন অনুযায়ী একটা তদন্ত কমিটি করতে হয়। অভিযোগগুলোর বিষয়ে আমাদের তদন্ত কমিটি রয়েছে। কমিটি যে সুপারিশ করবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। কেউ কিন্তু ব্যবস্থার ঊর্ধ্বে নেই। তদন্ত কমিটি হবে এবং ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আরো পড়ুন

Sharebiz

Loading...
,