মধ্যপ্রাচ্যের রেমিট্যান্সে হুন্ডির চোখ

১৯৭৬ সালে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, বাহরাইন ও লিবিয়ায় ৬ হাজার ৮৭ জনকে পাঠানোর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবাসী কর্মসংস্থানের যাত্রা শুরু।

ওই সময় থেকেই প্রবাসী আয়ের প্রধান অঞ্চল হিসেবে ধরা হয় মধ্যপ্রাচ্যকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পর প্রবাসী আয়ের গতিপথে পরিবর্তন দেখা দিয়েছে।

কাতারের সব খবর সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে এখানে ক্লিক করুন

এখন ওই জায়গা দখলে নিচ্ছে পশ্চিমা কিছু দেশ। আর হুন্ডির থাবায় প্রতিনিয়তই কমছে মধ্যপ্রাচ্যের রেমিট্যান্সপ্রবাহ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রায় দশ বছর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকেন কুমিল্লার রুবেল আহমেদ। সেখানে একটি দোকানে কাজ করেন তিনি। মাসে বেতন পান দুই হাজার দিরহাম।

মাঝেমধ্যে ওভার টাইমও করেন। সব মিলিয়ে বাড়িতে প্রতি মাসে প্রায় ১ হাজার ৫০০ দিরহাম পাঠান এই প্রবাসী।

কীভাবে টাকা পাঠান জানতে চাইলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাঝেমধ্যে ব্যাংকে পাঠানো হয়। তবে বেশির ভাগ সময়ই হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠান তিনি।

শুধু রুবেলই নন, দেশ রূপান্তরের সঙ্গে এ রকম বেশ কয়েকজন প্রবাসীর কথা হয়েছে। যাদের বেশির ভাগই হুন্ডিতে দেশে টাকা পাঠান।

সময় বাঁচাতে তারা হুন্ডির আশ্রয় নিলেও শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। পাশাপাশি দেশের টাকা পাচারেও সহায়ক হচ্ছেন এসব প্রবাসী।

মালয়েশিয়া প্রবাসী লক্ষীপুরের জামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সকালে ডিউটিতে যাই, আর আসি রাতে।

যে কারণে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠানো হয় না। হুন্ডি এজেন্টরা এসে টাকা নিয়ে যায়। আবার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়িতে টাকা পেয়ে যায় পরিবার।

সৌদি আরব প্রবাসী আবদুস সাত্তার বলেন, আমি বেশির ভাগ সময়েই টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠাই। তবে যদি বাড়িতে জরুরি টাকার প্রয়োজন হয় তাহলে হুন্ডির আশ্রয় নেই।

তবে এখানে অনেক অবৈধ বাংলাদেশি রয়েছেন। যাদের আকামা (লেবার কার্ড) নেই। এ কারণে তাদের বৈধপথে টাকা পাঠানোর সুযোগও কম। যারা প্রায় সবাই হুন্ডির মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা চাঁদপুরের রাসেল আহমেদ বলেন, বর্তমানে ব্যাংকে সব মিলে দিরহাম প্রতি ২৯ টাকা ৬০ পয়সা করে পাই।

অথচ হুন্ডির মাধ্যমে আমরা ১ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বেশি পাই। আমি প্রতি মাসে প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার দিরহাম বাংলাদেশে পাঠাই।

হুন্ডি আমাকে প্রতি দিরহামে ১ টাকা ৩০ পয়সা দিলেও বাড়িতে আড়াই হাজার টাকা বেশি পাচ্ছে পরিবার। তাহলে আমি ব্যাংকে কেন পাঠাব।

বিষয়টি রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতির এমনটা জানেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার এই কয় টাকায় রাষ্ট্রের বড় কোনো ক্ষতি হবে না। তবে দেশের যারা দুর্নীতি করছে তাদের বিরুদ্ধে লেখেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স সংগ্রহ করা দেশ সৌদি আরব। দেশটি থেকে গত এক বছরে রেমিট্যান্স কমেছে ২০ দশমিক ২২ শতাংশ।

গত অর্থ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩১১ কোটি ডলার। আর চলতি অর্থ বছরের একই সময় রেমিট্যান্স এসেছে ২৪৮ কোটি ডলার।

একই অবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ ওমানে। বছরের ব্যবধানে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে ২৮ শতাংশ।

গত অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল ৬১ কোটি ডলার। আর চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এসেছে মাত্র ৩৮ কোটি ডলার।

রেমিট্যান্স কমেছে বাহরাইনেও। দেশটি থেকে প্রবাসী আয় আসা কমেছে ১২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৩২ কোটি ডলার।

আগের বছর একই সময়ে এসেছিল ৩৬ কোটি ডলার। এ ছাড়া কুয়েত থেকেও ৭ শতাংশ রেমিট্যান্স কমেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানোর পরিবেশ রয়েছে।

যে কারণে হুন্ডির পরিমাণ বাড়ছে। এতে দেশে রেমিট্যান্স কমতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের আয় কম।

বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠালে তারা ১০৭-৯ টাকা পাচ্ছে। অথচ হুন্ডিতে পাঠালে পাচ্ছে ১১৫-১৮ টাকা। তাই তারা হুন্ডিতে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত হচ্ছে।

পশ্চিমা দেশগুলো থেকে রেমিট্যান্স বাড়ার কারণ জানতে চাইলে সাবেক গভর্নর বলেন, পশ্চিমা দেশগুলোতে কেউ হঠাৎ করে অনেক ডলারের মালিক হয়ে গেলে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

এতে সেখানে হুন্ডির কারবারিরা সুবিধা করতে পারছে না। এ ছাড়া ওই দেশগুলোতে যাওয়া বাংলাদেশিদের অধিকাংশই শিক্ষিত ও সচেতন। তাই তারও রেমিট্যান্স হুন্ডিতে কম পাঠান।

অসমর্থিত সূত্রমতে, অর্থ পাচারকারীরা হুন্ডির মাধ্যমেই পাচার করছে দেশের অর্থ। এ জন্য তারা মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে হুন্ডি এজেন্ট নিয়োগ দিয়েছে।

এমনকি কয়েকটি বেসরকারি খাতের ব্যাংকের নিয়োগ করা রেমিট্যান্স কর্মকর্তারাও হুন্ডি এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২১ সালের শেষে প্রবাসী বাংলাদেশির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৩৩ লাখ ১২ হাজার ১৯২ জন।

২০২২ সালে গিয়েছেন ১১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৭৩ কর্মী। আর গত ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) গিয়েছেন ৫ লাখ ২০ হাজার ৩৫৫ জন।

করোনার কারণে ২০২১ সালে অনেক দেশে কর্মী পাঠানো বন্ধ ছিল। বিপরীতে বিপুলসংখ্যক কর্মী দেশে ফিরেছে। গত বছর আবারও প্রচুর পরিমাণ জনশক্তি বিদেশে গেলেও প্রবাসী আয়ে এর প্রভাব পড়েনি।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, করোনা চলাকালে হুন্ডিসহ অবৈধ লেনদেনের সুযোগ কমে যাওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়েই বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন।

কিন্তু গেল বছর করোনার প্রকোপ না থাকায় আবারও অবৈধ অর্থ লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ কারণে দেশে প্রবাসী আয় কমে যাচ্ছে।

তবে সরকার ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোরতায় হুন্ডি কিছুটা কমেছে। এতে বাড়ছে প্রবাসী আয়।

ব্যাংকিং খাতে রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে হুন্ডির এজেন্টরা খুবই শক্তিশালী।

তারা শ্রমিকদের কাছে কাছে গিয়ে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করছে। এ কারণে মানুষ হুন্ডিতে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত হচ্ছে। এটা ঠেকাতে হলে ব্যাংকগুলোকে বিদেশে তৎপরতা বাড়াতে হবে বলেও মনে করেন এই ব্যাংকার।

জানতে চাইলে সৌদি আরবে অবস্থান করা কুমিল্লার হুন্ডি এজেন্ট শাকিল আহমেদ (ছদ্মনাম) দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখানে যারা অবৈধ শ্রমিক আমরা তাদের থেকেই বেশি রেমিট্যান্স সংগ্রহ করি।

এ ছাড়া বৈধ শ্রমিকদের কেউ কেউ আমাদের মাধ্যমে টাকা পাঠায়। বেশি দামে কীভাবে বিদেশি মুদ্রা (রিয়াল) কেনেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে বেশ কিছু এক্সচেঞ্জ হাউজের সঙ্গে আমাদের চুক্তি রয়েছে।

তারা আমাদের থেকে বেশি দামে রিয়াল কিনে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় বিভিন্ন দেশের বড় ব্যবসায়ীরা রয়েছেন বলেও জানান তিনি।

অসমর্থিত সূত্র মতে, হুন্ডি এজেন্টদের থেকে বেশি দামে বিদেশি মুদ্রা কেনেন অর্থ পাচারকারীরা।

আবার কোনো কোনো সময় আন্ডার ইনভয়েসিং (পণ্যমূল্য কম দেখিয়ে আমদানি) করা ব্যবসায়ীরাও এসব এজেন্ট থেকে ডলার কিনে তাদের পণ্যমূল্য পরিশোধ করেন। এ ক্ষেত্রে দুই পক্ষই হুন্ডি এজেন্টকে দেশে টাকায় তাদের অর্থ পরিশোধ করেন।

আরও পড়ুন:

গালফ বাংলা

Loading...
,