মধ্যপ্রাচ্যে বিপাকে ভারতের কূটনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক

ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র নূপুর শর্মা গত সপ্তাহে এক টেলিভিশন বিতর্কে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও তার স্ত্রী হজরত আয়েশাকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

এরপর বিজেপির দিল্লি শাখার গণমাধ্যম প্রধান নবীন কুমার জিন্দাল একটি টুইট করলে অনেকে ক্ষুব্ধ হন। পরে টুইটটি মুছে ফেলেন জিন্দাল। বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন নূপুর শর্মাও।

এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে।

কুয়েতের একটি সুপারমার্কেটের ব্যবসায়ীরা তাক থেকে ভারতীয় পণ্য সরিয়ে ফেলেছেন। দেশটির আল-আরদিয়া কো-অপারেটিভ সোসাইটি মার্কেটের কর্মীরা ‘অবমাননাকর’ মন্তব্যের প্রতিবাদে ভারতের চা ও অন্যান্য পণ্য তাক থেকে নামিয়ে ট্রলিতে স্তূপ করে রেখেছেন।

কুয়েত সিটির কাছের ওই সুপারমার্কেটের চালের বস্তা, মসলা ও মরিচের প্যাকেট প্লাস্টিক দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। প্লাস্টিকের ওপরে আরবি ভাষায় লিখে রাখা হয়েছে, আমরা ভারতীয় পণ্য সরিয়ে ফেলেছি।

আল-আরদিয়া কো-অপারেটিভ সোসাইটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসের আল-মুতাইরি জানান, ভারতীয় পণ্য কোম্পানিভিত্তিক বর্জনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

ভারত সরকারের আশঙ্কা, মহানবী (সা.)-কে নিয়ে বিজেপি নেতা-নেত্রীর মন্তব্যে আরব বিশ্বের সঙ্গে দিল্লির কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

কেননা এসব দেশে ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দেয়া হয়েছে। অনেক বিপণিবিতান থেকে ভারতীয় পণ্য সরিয়ে ফেলেছেন ব্যবসায়ীরা। মধ্যপ্রাচ্যে ৬৫ লাখ ভারতীয় কাজ করেন।

এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের প্রতিবছর ৯০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়। দূরত্ব তৈরি হলে এসব মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বাণিজ্যে প্রভাব পড়বে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর জোট গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যচুক্তি রয়েছে। জিসিসিভুক্ত বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ২০২০-২১ সালে ৯ হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়।

ভারতীয় প্রবাসী কর্মীদের প্রধান গন্তব্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অন্তত এক কোটি ৩৫ লাখ ভারতীয় প্রবাসী রয়েছেন।

এর মধ্যে ৮৭ লাখ প্রবাসীই মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছেন। এই কর্মীরা কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠান ভারতে। ভারতের সবচেয়ে বেশি জ্বালানি আমদানিও হয় এসব দেশ থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ অবশ্য ভারতীয় পণ্যের বড় আমদানিকারক। কুয়েতের খাদ্যপণ্যের প্রায় ৯৫ শতাংশ ভারত থেকে আমদানি করা হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ভারত একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে, ব্যাপক বাণিজ্য চুক্তির জন্য জিসিসির সঙ্গে তাদের আলাপও চলছে। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে ভারতকে যে কূটনৈতিক মূল্য দিতে হবে, তাতে উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের স্বার্থের বিশাল ক্ষতি হতে পারে বলে মনে করেন কূটনীতিকরা।

কাতারের কর্তৃপক্ষ জানায়, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা হলে এর প্রভাব সরাসরি অর্থনৈতিক চুক্তিতে পড়বে। কুয়েতের মতো কাতারও কয়েকটি সুপারমার্কেটে ভারতের পণ্য বয়কট করেছে।

তবে ২০১৭ সাল থেকে সন্ত্রাসবাদে মদত দেয়ার অভিযোগে প্রতিবেশী তিন দেশ সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও বাহরাইন কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে। এরপর খাদ্য সংকটে ভোগা দেশটিকে সহায়তা করে আসছে ভারত।

নূপুর ও জিন্দালের মন্তব্য ও টুইট নিয়ে সৌদি আরব, ইরান, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, পাকিস্তান প্রভৃতি মুসলিম দেশ তীব্র নিন্দা জানায়।

নিন্দা জানিয়েছে অরগানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি)। সমালোচনার মুখে নূপুরের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেয় বিজেপি। তাকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।

নূপুরের বিরুদ্ধে বিজেপির নেয়া পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে দুটি দেশ। তবে উপসাগরীয় ও এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ এ মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর সঙ্গে নয়াদিল্লির সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকায় ভারতীয় কূটনীতিকরা পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করলেও ঝড়ের যে আরও অনেক বাকি, তা টের পাওয়া যাচ্ছে বলে এক প্রতিবেদনে জানায় বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

গালফ বাংলার হোয়াটসঅ্যাপে এড হোন এখানে ক্লিক করে

আজকের আরও খবর

শেয়ারবিজ

Loading...
,