মরুর বুকে বিশ্বকাপ উন্মাদনা আজ শুরু

করোনাভাইরাসের চোখ রাঙানি ভুলে এখন ক্রিকেট উৎসবে মাতার সময়। গত বছর বিশ্বকাপ আসর জমেনি এই মহামারীর জন্য। অস্ট্রেলিয়ার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পিছিয়ে হবে আগামী বছর।

আজ থেকে শুরু হচ্ছে ভারতের অধীনে থাকা আসরটি। তাও কি স্বস্তি ছিল! মূল ভেন্যু ভারতে না হয়ে করোনার কারণে তা সরে এলো আরব আমিরাতে। খুশির খবর হলো, বাধা পেরিয়ে টি-টোয়েন্টির বিশ্ব আসর মাঠে গড়াচ্ছে। খালি গ্যালারিতে নয়, ৭০ শতাংশ দর্শক নিয়ে যা বিশ্বকাপের আনন্দ বাড়িয়ে দিচ্ছে আরও। ক্রিকেটও ফিরছে তার চেনা রূপে।

টি-টোয়েন্টির সপ্তম বিশ্ব আসরের মূল পর্বে প্রথম দিন দুই ম্যাচ। আবুধাবিতে বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪টায় উদ্বোধনী ম্যাচে নামছে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা।

দুবাইয়ে রাত ৮টায় দ্বিতীয় ম্যাচে মুখোমুখি গত আসরের ফাইনালিস্ট উইন্ডিজ ও ইংল্যান্ড। ‘হাই স্কোরিং’ ম্যাচ কতটা হয় সেটা ভাবনার বিষয়। কদিন আগেই তো আইপিএলের খেলাগুলোয় রান হয়নি তেমন। অতি ব্যবহারের উইকেটে হওয়া আসর না আবার ‘লো স্কোরিং’ বিশ্বকাপ হয়ে যায়!

প্রথম পর্ব দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে আগেই। ওমানে প্রথম পর্বে ক্রিকেট উৎসবের সবই ছিল উপস্থিত। মাঠে দর্শক, অঘটন, উত্তেজনা, সমীকরণের হিসাব ও বাংলাদেশের কঠিন অবস্থা থেকে ফিরে মূল পর্ব নিশ্চিত করা।

তবুও কেমন একটা শূন্যতা ছিল। ক্রিকেটের সেরা দলগুলোকে না পাওয়ার শূন্যতা। ভারত, পাকিস্তান, উইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ছাড়া ক্রিকেট যেন পূর্ণতা পায় না। মূল পর্ব দিয়ে সেই পূর্ণতা হচ্ছে আজ থেকে।

উপমহাদেশের মতো ক্রিকেটের আমেজটা ওমানের মতো আরব আমিরাতেও নেই তেমন। তবে যাদের নিয়ে খেলা তারা প্রস্তুত দর্শক। দুবাই বিমানবন্দর বিশ্বে ব্যস্ততম। যাত্রীদের ভিড় লেগে থাকে বরাবরই। তবে শুক্রবার সকালে সাধারণ যাত্রীর পাশাপাশি বিশ্বকাপের যাত্রীরাও ছিলেন।

দুবাইতে ভারতীয়রা সংখ্যাগরিষ্ঠ, এখানে হিন্দি ভাষাও চলে দ্বিতীয় ভাষার মতো। কেরালার সুনাথান আইয়ের সনু বুর দুবাইতে পরিবার নিয়েই থাকেন। নিজের হোটেল ব্যবসা আছে শহরটিতে। ছুটি কাটাতে দেশে ফিরলেও ফিরে এসেছেন বিশ্বকাপ উপলক্ষে।

দেখবেন ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ। আইপিএল দেখেননি, এতদিন পর মাঠে বসে খেলা দেখার সুযোগ ছাড়তে চান না। ফাইনালের চেয়েও তার আগ্রহ আগামীকালের ম্যাচ নিয়ে। এদিকে স্কটল্যান্ড থেকে আসা টিমোথি পল এসেছেন একাই। নিজের দেশ তো মূল পর্বে উঠেছেই, ইংল্যান্ডকেও সমর্থন করবেন এই তরুণ।

তার বিশ্বকাপ দেখতে আসার দুটি কারণ, বিশ্বকাপের জন্য বুকিং ডটকমের অফিসিয়াল মডেল হয়েছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক ইয়ন মরগ্যান। তার ছবিসহ বুকিং ডটকমের বিজ্ঞাপন ইংল্যান্ডের সর্বত্র। তা দেখেই বুকিং ডটকমে সার্চ দিয়ে খেয়ালবশত দুবাইয়ের হোটেল বুক করে ফেলেন। এরপর চলে এলেন দেশের বাইরে প্রথম বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতা নিতে।

গত কয়েক বিশ্বকাপের মতো এবারও রোমাঞ্চ ছড়াবে ভারত-পাকিস্তান লড়াইয়ের উত্তেজনা। কাল দুবাইতে মুখোমুখি হচ্ছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। বিশ্বকাপে দুই দলের মহারণ মানেই ভারতের জয়। সেই অতীত এবারও ফিরবে না বদলে যাচ্ছে, তা দেখতে উৎসুক গোটা ক্রিকেটবিশ্ব।

পাকিস্তান অধিনায়ক বাবর আজম রাখঢাক না রেখেই বলেছেন তারাই জিতবেন। বাবরের স্বপ্নে বাধা হয়ে আসছে অতীত। একজন সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীর মতোই বিশ্ব আসরে পাকিস্তানের জয় নিয়ে সন্দিহান সাবেক অস্ট্রেলিয়ান চায়নাম্যান ব্র্যাড হগও। জানালেন, পাকিস্তান সেমিফাইনালে খেলতে পারছে না।

তার কারণ ওই ভারত। যদি প্রথম ম্যাচেই ভারতের সঙ্গে হারে তবে আর সবুজ জার্সিদের শেষ চারে যাওয়ার সুযোগ দেখেন না হগ। আবার যদি ভারতের সঙ্গে জিতে যায় তবে সেই সুযোগ পুরোপুরি থাকছে। বি গ্রুপ থেকে অবশ্যই ভারতকে সেমিফাইনালে দেখছেন হগ। আর এ গ্রুপ থেকে ইংল্যান্ড ও উইন্ডিজকে সেমিফাইনালে আশা করছেন সাবেক অস্ট্রেলিয়ান স্পিনার।

এদিকে ভারতের সেমিফাইনাল তো বটেই বিশ্বকাপ জয়েরও সম্ভাবনা দেখছেন যুবরাজ সিং। বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ম্যাচে দুই প্রবল প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিয়েছে ভারত। ইংল্যান্ডকে হারিয়েছে ৭ উইকেটে আর অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে।

অবশ্য প্রস্তুতি ম্যাচের হার-জিতে কোনো দলকেই তুলনা করা চলে না। যুবরাজ সিং এটা মেনে নিয়ে ভিন্নভাবে সম্ভাবনার কথা বললেন। তার কারণ মহেন্দ্র সিং ধোনি। যুবরাজের মতে দলে ধোনির মেন্টর হিসেবে অন্তর্ভুক্তি ভারতের টিম ম্যানেজমেন্টকে খুব শক্তিশালী করেছে।

ড্রেসিংরুম থেকেই জয়ের ছকটা তৈরি হয়ে আসবে বলে মনে করছেন যুবরাজ। সঙ্গে ধোনির তুখোড় চিন্তাশক্তিতে যেকোনো ম্যাচে ভারতের এগিয়ে থাকা নিশ্চিত দেখছেন এই অলরাউন্ডার।

যুবরাজের মতো সাবেক অজি পেসার ব্রেট লিও শিরোপার পথে সবচেয়ে এগিয়ে রাখছেন ভারতকে। তার কারণ আইপিএল অভিজ্ঞতা। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই তো ভারত দলের সবাই দুবাই, আবুধাবি ও শারজার পিচে খেলে গেছেন।

যে অভিজ্ঞতা বিরাট কোহলি-রোহিত শর্মাদের করছে শিরোপার দাবিদার। ব্রেট লি অবশ্য আরেকটি দিকেও নজর দিয়েছেন, এই আইপিএলেই খেলেছেন অন্য দলগুলোর সেরা ক্রিকেটাররা। অস্ট্রেলিয়া, উইন্ডিজ, ইংল্যান্ড বা দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটাররাও খেলেছেন আইপিএলে।

মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে শেষ হওয়া টুর্নামেন্টের রেশ কাটেনি তাদেরও। নিজেদের অভিজ্ঞতা দলের বাকিদের ভাগাভাগি করে নেবেন সবাই, যা ভারতের পাশাপাশি বাকি দলগুলোকেও শিরোপার দাবিদার করে তুলবে নিশ্চিত।

২০১১ বিশ্বকাপের পর থেকে ভারত তো শিরোপা জিততে ব্যর্থ। প্রতিবারই অমিত সম্ভাবনা আর প্রবল শক্তি নিয়ে শুরু করা দলটি থেমে যাচ্ছে উইন্ডিজ-ইংল্যান্ডদের কাছে। তাই শক্তিতে ও সম্ভাবনায় যতই পাল্লা ভারী থাকুক এবারও ভারত একক শিরোপার দাবিদার হতে পারছে কই।

বড়দের ভিড়ে বাংলাদেশ, চমকে দেওয়া নামিবিয়া বা স্কটল্যান্ড কতদূর এগোতে পারে সেটা দেখা যাবে আগামী ক’দিনে।

এবার সেরা ১২’র চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের : বিশ্বকাপ শুরুর আগে প্রথম পর্বের গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ধরা হয়েছিল বাংলাদেশকে। বি-১ হয়ে মাহমুদউল্লাহরা মূল পর্বে যাবেন। সেখানে গ্রুপ বি-তে ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো টি-টোয়েন্টিতে এশিয়ান শক্তিদের সঙ্গে লড়াই। কিন্তু তেমনটা হয়নি।

স্কটল্যান্ডের কাছে হারায় বাংলাদেশ গ্রুপে হয়েছে দ্বিতীয়। তাই খেলতে হচ্ছে উইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও প্রথম পর্ব থেকে ওঠা শ্রীলঙ্কার সঙ্গে। সম্ভাবনার বিচারে দুই গ্রুপই বাংলাদেশের জন্য কঠিন।

গতকাল সন্ধ্যায় ওমান থেকে আমিরাতে এসে দুবাইয়ে হোটেলে উঠেছেন মাহমুদউল্লাহরা। এখান থেকেই গ্রুপ পর্বে শারজা-আবুধাবিতে দুটি করে চারটি এবং দুবাইয়ে এক ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ।

আসর শুরুর আগে বাংলাদেশের সুবিধা নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল। বলেছিলেন, সুপার টুয়েলভে গ্রুপ ২-তে পড়াটাই ভালো মাহমুদউল্লাহদের জন্য। কারণ এই গ্রুপে সব এশিয়ান প্রতিপক্ষ।

যারা এমনিতেই স্পিনে ভালো বা আরব আমিরাতের কন্ডিশনে ভালো। এই দলগুলোর বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের চ্যালেঞ্জটা বেশি। কিন্তু ১ নম্বর গ্রুপের দলগুলো স্পিনে বরাবর দুর্বল। তারা আমিরাতের কন্ডিশনের সঙ্গে ভারত-পাকিস্তানের বা আফগানদের মতো পরিচিত নয়।

তাই অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রুপটাই তুলনামূলক সহজ হয় বাংলাদেশের জন্য। অবশ্য মাহমুদউল্লাহ পিএনজির বিপক্ষে জয়ের পর বলছিলেন, ‘প্রতিপক্ষ কে থাকছে বা কোন গ্রুপে পড়লে কতটুকু সুবিধা এসব নিয়ে আমরা মোটেও ভাবছি না। দুবাই গিয়ে পরেরটা ভাবা যাবে।’

দলের সঙ্গে যাওয়া নির্বাচক হাবিবুল বাশার বলছেন কোনো গ্রুপই সহজ নয়। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে সব দলই কঠিন প্রতিপক্ষ, ‘মূল রাউন্ডে যে গ্রুপেই পড়তাম কঠিন হতো। আসলে কোনো গ্রুপই সহজ নয়। সবাই ভালো দল।

আমাদের সেরা ক্রিকেট খেলেই জিততে হবে।’ তবে একটি বিষয়ে সুবিধা দেখছেন বাশার। তা হলো দিনের ম্যাচ। এ গ্রুপে বাংলাদেশের সব ম্যাচই স্থানীয় সময় বিকেল ৪টায়। ফলে রাতের ম্যাচে পরে বল নিয়ে শিশিরের কারণে পিচ্ছিল বলের অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে না।

কারণ তখন বল গ্রিপ করা কঠিন হয়, বোলারদের ধারও কমে আসে। হাবিবুল বাশার সকালে ম্যাচ হওয়ায় স্পিনারদের বা মোস্তাফিজের স্লোয়ারে কার্যকরী হওয়ার উপায় দেখছেন। এ ছাড়া সুপার টুয়েলভে ভালো করার ব্যাপারে সাবেক অধিনায়ক বলেন, ‘প্রথম পর্বে আমাদের প্রথম ম্যাচটা বাজে ছিল।

কিন্তু পরের দুই ম্যাচে জিতে আমরা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছি। এখন এই পর্ব ভালোভাবে শুরু করা যাবে। তবে ভালো করব কিনা বা কতটুকু সম্ভাবনা সেটা নির্ভর করছে এখন আমরা পরিকল্পনা অনুযায়ী কতটুকু খেলতে পারি তার ওপর।’

অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বিশ্বকাপে আগে চারবার দেখা। চারবারই হার। ২০০৭, ২০১০, ২০১৪, ২০১৬। তবে আগস্টে নিজেদের মাঠে অজিদের ৪-১ ব্যবধানে সিরিজে হারিয়েছে বাংলাদেশ।

অবশ্য বিশ্বকাপের ম্যাচের সঙ্গে ওই সিরিজের কোনো তুলনাই চলে না। তা ছাড়া অজিরা এবার পূর্ণশক্তির দল, তাই জয়ের উচ্চাভিলাষী স্বপ্নটা পারফরম্যান্সের বিচ্ছুরণের আগে সম্ভবও নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে বাংলাদেশ ২০০৭-এ প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে হেরেছে।

এর বাইরে পরের পাঁচ ম্যাচ অবশ্য ছিল দ্বিপক্ষীয় সিরিজে। তাতে কোনো সাফল্য নেই বাংলাদেশের। উইন্ডিজের বিপক্ষে টাইগারদের লড়াই মোট ১২ ম্যাচে। এর মধ্যে ২০০৭ ও ২০১৪ আসরের দুটি বিশ্বকাপ ম্যাচে হার-জিত একটি করে। একটি হয়েছে পরিত্যক্ত। বাকি ৯ ম্যাচের পাঁচটি জিতেছে উইন্ডিজ ও বাকি চারটিতে বাংলাদেশ।

উইন্ডিজের সঙ্গে অতীত বিবেচনায় জয়ের স্বপ্নটা দেখতে পারেন মাহমুদউল্লাহরা। তবে ভয় হলো টি-টোয়েন্টিতে বিশ্বসেরা ক্যারিবিয়ানরা। হার্ডহিটারে ভরপুর দলটিকে হারাতে হলেও যে টাফ টি-টোয়েন্টি খেলতে হবে বাংলাদেশকে।

আসরের প্রথম পর্বে সেই প্রমাণ তো দিতে পারেননি সাকিব-মাহমুদউল্লাহরা। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে মোট ১১ টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের ব্যর্থতার পাল্লা ভারী। ৭ ম্যাচে হার আর জয় ৪টিতে।

সেমিফাইনালে খেলার স্বপ্ন নিয়ে এবার বিশ্বকাপে যায় বাংলাদেশ। সেই স্বপ্ন শুরুতেই জোড়া ধাক্কা খায় স্কটল্যান্ডের কাছে হেরে। অবশ্য পরের দুই জয় দলকে কক্ষপথে তুলেছে অনেকটা। তাই সাকিব আল হাসানের কথামতো সেমিফাইনাল স্বপ্নটা এখনও টিকে আছে।

,