সিডনির আকাশে বাতাসে আবার আনন্দ

ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন

সাবেক কাতার প্রবাসী ও বর্তমান অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী লেখক, শিল্পী, গীতিকার ও সুরকার

একটানা ১০৬ দিনের সর্বাত্মক লকডাউন শেষ করে অবশেষে মুক্তির করিডোরে পা রাখলো সিডনীবাসী। আকাশে, বাতাসে, আহা কি আনন্দ! বাবা, মা, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু মহলেরর অনেকের সাথেই দেখা হয়নি কারো এই তিনটি মাস। এতোদিনের বন্দী দশা থেকে মুক্তি পেয়ে বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ¡াসে যেনো মেতে উঠেছে সবাই।

গত সোমবার ছিল লকডাউন থেকে মুক্তির দিন অর্থাৎ ফ্রিডম ডে। এর বেশ ক’দিন আগে থেকেই সিডনীবাসীরা ফ্রিডম ডে পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। অনেকে আবার কাজ থেকে ছুুটি নিয়ে পুরো সপ্তাহ জুড়ে ফ্রিডম উইক পালন করছে।

গত রোববার মধ্যরাত্রি থেকেই খুলে দেয়া হয়েছিল সেলুন, রেস্তারাঁ ও বিয়ার পানশালায় দরজা। মাথার উপর গজে উঠা এতোদিনের জঞ্জাল সরাতে দেরী না করে মধ্যরাত্রি থেকেই গ্রাহকরা ভীড় জমাচ্ছিল স্থানীয় সেলুনে। আর কে-মার্ট, মায়ারের মত বড় বড় সপিং সেন্টারগুলোর ভীড় দেখে মনে হচ্ছিল যেন আগাম শুরু হয়ে গেছে বড়দিনের কেনাকাটা।

সিডনীর বাঙালিরাও পিছিয়ে নেই। বার্বিকিউ, ক্যাম্পিং, ও ঘরোয়া দাওয়াত সব মিলিয়ে আগামী একমাসের সাপ্তাহিক দিনগুলোর পরিকল্পনা এখনই শেষ।

নিউসাউথ ওয়েল্স রাজ্যে দুই ডোজ টিকা নেয়া মানুষের সংখ্যা এখন ৭৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। প্রথম দিকে কিছুটা নির্লিপ্ত থাকলেও এখন মানুষ যেভাবে টিকা নিতে শুরু করেছে সেজন্য সবাইকে পুরস্কৃত করার জন্য রাজ্য সরকার বেশ কিছু বিধি নিষেধও শিথিল করে দিয়েছে। এই হারে টিকা নেয়া চললে আগামী সপ্তাহের মধ্যে ৮০ শতাংশ টিকা নেয়া হয়ে যাবে। আর এই মাইলস্টোন অর্জিত হলে কোভিড বিধিনিষেধ পুরোপুরি তুলে দেবার কথাও বলছে সরকার।

কাতারে তৃতীয় অর্থ্যাৎ বুস্টার ডোজ দেয়া শুরু হয়েছে বেশ আগে। তবে অস্ট্রেলিয়ায় এ নিয়ে এখনো কথা হচ্ছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বুস্টার ডোজ চালু হবে।

অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, সব কিছু খুলে দেয়া পর অসচেতনতার সুযোগে কোভিড সংক্রমন হঠাৎ করে বেড়ে যায়। সিডনী ও আশে পাশের এলাকায় কোভিড সংক্রমনের সংখ্যা কমে আসলেও নিউ সাউথ ওয়েল্স রাজ্যের দক্ষিণে ভিক্টোরিয়া রাজ্যে সংক্রমণের হার রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ভয়টা এখানেই। তাই সবাইকে ধীরে চলার পরামর্শ দিচ্ছে রাজ্যের প্রধান স্বাস্থ্য পরামর্শক।

কোনো অঘটন না ঘটলে ডিসেম্বরের মধ্যে আভ্যন্তরীণ ও আর্ন্তজাতিক ফ্লাইট চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে আর্ন্তজাতিক রুটে প্রবাসে আটকে পড়া অস্ট্রেলিয়ান নাগরিকরাই আগে অস্ট্রেলিয়ায় ঢোকার সুযোগ পাবেন। প্রবাসী শিক্ষার্থী ও যারা ভিসিট ভিসায় এখানে আসতে চান তাদের জন্য দরজা এখন খুলছেনা।

কোভিড লকডাউনের মধ্যে গত দু’সপ্তাহ আগে হঠাৎ করে নিউ সাউথ ওয়েল্স রাজ্যের প্রিমিয়ার গøাডিস বেরেজিক্লিয়ানের পদত্যাগ সবাইকে চমকে দিয়েছে। বিশেষ করে কোভিডের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি সমুখে থেকে যেভাবে লড়ছিলেন সেজন্য তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বি। দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযোগের সূত্র ধরে নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্য প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন গ্ল্যাডিস। তিনি শুধু প্রিমিয়ারের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন না, সংসদ-সদস্য পদও ছেড়ে দিচ্ছেন। গ্ল্যাডিসের পদত্যাগের দু’দিনের মধ্যেই প্রিমিয়ারে দায়িত্ব নিয়েছেন বর্তমান ট্রেজারার ডমিনিক পেরোটে।

গ্ল্যাডিস চাইলে আরো কটা দিন ক্ষমতায় থাকতে পারতেন। কিন্তু গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর যাতে জনগনের আস্থা অটুট থাকে সেজন্য দুর্নীতি কমিশন তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করবে এই ঘোষণা দেয়ার এক ঘন্টার মধ্যেই তিনি প্রিমিয়ারের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। সরকার ও নেতা নয়, জনগনই যে ক্ষমতার উৎস তার অকাট্য প্রমান হল গ্ল্যাডিসের এই পদত্যাগ।

পশ্চিমা বিশ্বের গনতন্ত্র হচ্ছে একটা বিভ্রম, এই বলে অনেকে শোর তুলছে। এ নিয়ে আমি বিতর্কে জড়াতে চাইনা। তবে সবকিছু বাদ দিয়ে কেবল গ্ল্যাডিসের পদত্যাগের এই উদারহরণটি যদি আমাদের রাজনৈতিক এলিটরা গ্রহন করতে পারতেন, তাহলে আমাদের পৃথিবীটা হয়ত অন্যরকম হত।

লেখকের আগের লেখা: সিডনি থেকে বলছি: অস্ট্রেলিয়ায় ডেল্টার থাবায় বন্দী জীবন

,