সিডনি থেকে বলছি: অস্ট্রেলিয়ায় ডেল্টার থাবায় বন্দী জীবন

লেখক: ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন

সিডনী শহরে মাস্ক ছাড়া রাস্তায় বেরুলে ৫০০ ডলার অর্থাৎ ৩০ হাজার টাকা জরিমান! আর সরকারী স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করলে দিতে হবে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ডলার জরিমানা।

স্বাস্থ্যসেবাকর্মী ছাড়া কেউ জরুরী কাজ না থাকলে বাড়ীর বাইরে যেতে পারবেন না। বাড়ী ছেড়ে আবার পাঁচ কিলোমিটারের বেশী দূরেও যাওয়া যাবেনা।

এই হল লকডাউনে অবরুদ্ধ সিডনী শহরের হালের অবস্থা। অবশ্য সপ্তাহে যারা ২০ ঘন্টারও বেশী কাজ হারিয়েছেন তারা প্রতি সপ্তাহে বাড়ীতে বসে পাবেন ৭৫০ ডলার।

সিডনি স্টেডিয়ামে লেখক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন

অথচ মাত্র ৩/৪ মাস আগে ডেল্টা ভাইরাস বিশ্বে যখন চালাচ্ছে তান্ডব, সিডনী শহরে বসে তা বোঝার কোনো উপায় ছিলনা। সবকিছু চলছিল আগের মত।

কারো মুখে কোনো মাস্ক নেই। রেস্তোরা, ক্লাবে গ্রাহকের ভীড়। বড় বড় ভেন্যুতে হচ্ছে বিয়ে শাদী। একবারতো আমি নিজেই গিয়েছি সিডনী অলিম্পিক পার্কে রাগবী খেলা দেখতে। তখন বৃহত্তর সিডনী শহরে কোডিভ আক্রান্তের সংখ্যা ছিল শূণ্যের কোঠায়।

করোনা টিকা নেয়ার ব্যাপারে মানুষের উদাসীনতা ছিল লক্ষ্যণীয়। সরকারের পক্ষ থেকেও টিকা দেয়ার ব্যপারে কোনো রকমের উদ্যোগ না দেখে রীতিমত বিস্মিত হই। তবে আমি দেরী না করে নিজ উদ্যোগে টিকা নিয়ে নেই। এ নিয়ে আমাকে অনেকে একটু ঠাট্টা মস্করা করতেও ছাড়েনি।

কিন্তু গত জুন মাসে সিডনীবাসীর আনন্দ মুখর দিনগুলোতে হঠাৎ বিষাদের কালো রং ঢেলে দেয় ডেল্টা নামের কোভিড ভাইরাস। ফলে সরকার লকডাউন আরোপ করতে বাধ্য হন। লকডাউন ঘোষনা করার পর সিডনী, মেলবোর্ন সহ অস্ট্রেলিয়ার বড় বড় শহরে কিছু বিক্ষোভকারী লকডাউন বিরোধী মিছিলও বের করে।

সিডনিতে লকডাউনবিরোধী বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তি

তবে পুলিশ হার্ডলাইনে গেলে বিক্ষোভকারীরা আর রাস্তায় নামতে সাহস।এখন নিউ সাউথ ওয়েল্স রাজ্যে প্রতিদিনই তিনশ থেকে চারশ মানুষ কোভিডে আক্রান্ত হচ্ছেন। দু’একজন করে মারা যাচ্ছে বিভিন্ন বয়সী রোগী। পরিসংখ্যানে দেখা দেখা গেছে, ডেল্টা ভইরাসে আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষই টিকা নেয়নি।

ডেল্টার মরণ কামড় খেয়ে মনে হচ্ছে এখন মানুষের হুশ ফিরেছে। সরকারও নড়ে চড়ে বসেছে। প্রতিদিন টিকা নেয়ার জন্য উদগ্রীব মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করছে লাইনে। সরকার ও নাগরিকদের মধ্যে এই সচেতনতা ক’মাস আগে আসলে হয়তো এই পরিস্থিতি আমাদের দেখতে হতনা। অবশ্য এর দায় সরকার ও কর্তৃপক্ষকে কিছুুটা হলেও নিতে হবে।

তবে সবকিছুর সূচনা হয় একজন মাস্কবিহীন ক্যাব চালকের মাধ্যমে, গত ১১ জুন। একজন কোভিড পজিটিভ আমেরিকার বিমান পাইলট ডেল্টা ভাইরাস বয়ে নিয়ে আসেন সিডনীতে। আর এই পাইলটকে সিডনী বিমান বন্দর থেকে তুলে নিয়ে যাবার সময় কোভিড আক্রান্ত হন ক্যাব চালক। যার মাধ্যমে ডেল্টা ভাইরাস সিডনীর কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়ে।

গত দু’মাস ধরছে চলছে কড়া লকডাউন। আমরা সবাই গৃহবন্দি। রীতিমত হাপিয়ে উঠেছি সবাই।খাদ্রসামগী কেনা ও অত্যন্ত জরুরী কোনো কাজ ছাড়া কোথাও কিংবা কারো বাড়ী যাওয়াও নিষিদ্ধ। আত্মীয়-স্বজন কিংবা বন্ধু-বান্ধবদের মুখ দেখছিনা বহুদিন পার হয়ে গেলো। এক অসহ্য মানসিক চাপের মধ্যে কাটছে দিন।

লকডাউন জারি রাখতে পুলিশের সাথে এখন সিডনীতে মাঠে নেমেছে সেনা বাহিনী। যারা নিয়ম ভাঙ্গছে তাদের জরিমান করা হচ্ছে। গত ঈদে, নিজ বাড়ী থেকে বাব-মার সাথে দেখা করতে যাবার সময় রাস্তায় পুলিশের জেরার মুখে আমার এক ভাগ্নেকে ১১০০ ডলার জরিমানা গুনতে হয়েছে।

গত এপ্রিল মাস থেকে এ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় চাকরী হারিয়েছে প্রায় ৮লক্ষ মানুষ। ব্যবসা বানিজ্যের অবস্থাও তথৈবচ। সেবামূলক দাতব্য সংগঠনগুলো অভাবী মানুষের বাড়ীতে খাদ্য সরবরাহ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।

করোনায় অস্ট্রেলিয়ায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ শগর হলনিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের রাজধানী সিডনী। তবে এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে সহসা উত্তরোণের কোনা পথ দেখছিনা। সরকার বলছে ৮০ শতাংশ মানুষ টিকা নিলে তবেই লকডাউন ও বিধিনিষেষ শিথিল করা হবে।

টিকার জন্য অপেক্ষমান মানুষের সারি

অস্ট্রেলিয়ায় দুটো টিকা নেয়া মানুষের সংখ্যা মাত্র ২০ শতাংশ। অন্যদিকে টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছে মাত্র ৪৪ শতাংশ মানুষ। তবে টিকা নেয়ার হার দ্রুত গতিতে বেড়ে চলেছে। এই গতিতে চললে, এ বছরের শেষের দিকে লকডাউন শিথিল হতে পারে। তার মানে দিল্লী এখনো বহুদূর।

,