সৌদি-আমিরাত সম্পর্কে ফাটল: অস্থির তেলের বাজার

সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের দীর্ঘদিনের সম্পর্কে ফাটল ধরেছে।

তেল উৎপাদনের কোটা নিয়ে তাদের মধ্যে গত সপ্তাহে প্রকাশ্যে তিক্ত মতবিরোধের পর বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক প্লাসের আলোচনা স্থগিত হয়ে গেছে। এর ফলে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং তেলের দাম ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

ওপেকের মূল সদস্য এবং এদের বাইরে রাশিয়া, ওমান, বাহরাইনের মতো আরও ১০টি তেল উৎপাদনকারী দেশ নিয়ে গঠিত হয়েছে ওপেক প্লাস।

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে গত দেড় বছর যাবৎ বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছে এই জোট। কিন্তু এর দুই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ সৌদি ও আমিরাতের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়ায় এখন ওপেক প্লাস টিকবে কিনা তা নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছে।

গত সপ্তাহে ওপেক প্লাসের নেতা সৌদি আরব এবং রাশিয়া তেল উৎপাদনের মাত্রা কম রাখার মেয়াদ আরও আট মাস বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। কিন্তু এতে বিরোধিতা করে সংযুক্ত আরব আমিরাত।

এ থেকেই সমস্যার শুরু। আমিরাত চায়, উৎপাদনের যে মাত্রাকে এখন মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হচ্ছে, তা পুনর্নির্ধারণ হোক। অর্থাৎ, উৎপাদন কতটা কমানো বা বাড়ানো হবে তা হিসাব করার জন্য যে মাত্রাকে ভিত্তি ধরা হচ্ছে, তা বাড়ানো হোক, যাতে তেলের উত্তোলন বাড়ানোর ব্যাপারে দেশগুলোর স্বাধীনতা থাকে।

কিন্তু সৌদি আরব ও রাশিয়া এই দাবির বিপক্ষে। ঘনিষ্ঠ দুই মিত্র- সৌদি ও আমিরাতের জ্বালানি মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে এ নিয়ে মতভেদ ব্যক্ত করলে ওপেক প্লাসের আলোচনায় অস্বাভাবিক মোড় নেয়।

ওয়াশিংটনে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশানাল স্টাডিসের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বেন কাহিল বিবিসি’কে বলেন, তাদের এই মতভেদ সবাইকে চমকে দিয়েছে, যদিও এই বিভেদটা হয়তো অবশ্যসম্ভাবী ছিল।

তিনি বলেন, ওপেক যে কোটা বেঁধে দিয়েছে তা আমিরাতের উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আবুধাবি তার তেল উৎপাদন শিল্পে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। এখন চাহিদাও আবার বাড়তে শুরু করেছে। ফলে দেশটি তাদের উৎপাদন বাড়াতে না পেরে গত বছর হতাশ হয়েছে।

দুই যুবরাজের বন্ধন
বহু বছর ধরে আরব বিশ্বে ভূ-রাজনীতির রূপরেখা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখে আসছে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্ধুত্ব। আর তাদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং আবুধাবির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন জায়েদের মধ্যকার ব্যক্তিগত বন্ধনেরও।

এ দুই যুবরাজই মূলত তাদের দেশ শাসন করেন এবং তাদের লক্ষ্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী। এ কারণে বহু বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত বিষয়ে গভীর সহযোগিতা বজায় ছিল।

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়তে ২০১৫ সালে একটি সামরিক জোট গঠন করে সৌদি ও আমিরাত। ২০১৭ সালে তারা একসঙ্গে কাতারের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

সম্পর্কে ফাটল
বছর দুয়েক আগে ইয়েমেন থেকে নিজেদের বেশিরভাগ সেনা প্রত্যাহার করে নেয় আমিরাত। এতে ক্ষুব্ধ হয় সৌদি আরব। সেই থেকে দুই যুবরাজের মধ্যে সম্পর্কেও ফাটল ধরে।

গত জানুয়ারিতে কাতারের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ায় সৌদির নেতৃত্বে যে চুক্তি হয়, আমিরাত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তা মেনে নিয়েছিল। একইভাবে, গত বছর আমিরাত যখন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সৌদি আরবও সন্তুষ্ট হয়নি।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এই ফাটল আরও গভীর হতে শুরু করে। সৌদি সরকার বহুজাতিক সংস্থাগুলোকে আল্টিমেটাম দিয়েছে, তারা যদি উপসাগরীয় এলাকার আঞ্চলিক সদরদফতরগুলো ২০২৪ সালের ভেতর সৌদি আরবে স্থানান্তর না করে, তাহলে তাদের সঙ্গে আর কোনো সরকারি চুক্তি হবে না।

ওই এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র দুবাই এই হুমকি ভালো চোখে দেখেনি। তারা এটিকে আমিরাতের ওপর পরোক্ষ হামলা বলে মনে করছে।

ওদিকে, ওপেক প্লাসের প্রস্তাবে বাধা পাওয়ার প্রতিশোধ নিতে সম্প্রতি আমিরাতে বিমান চলাচল স্থগিত করেছে সৌদি আরব। অবশ্য এর কারণ হিসেবে তারা করোনাভাইরাসের ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে উদ্বেগের কথা বলছে। তবে ঈদুল আজহার ছুটি সামনে রেখে এই সিদ্ধান্তের কারণ শুধু করোনাভাইরাস কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সৌদি আরব আরও ঘোষণা করেছে, তারা মুক্ত বাণিজ্য এলাকা থেকে বা অন্য যেসব উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের বাণিজ্যিক শুল্ক সুবিধার চুক্তি রয়েছে, সেসব দেশে থেকে পণ্য আমদানি করবে না। এটিও আমিরাতের বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে একটি বড় ধাক্কা।

রয়েছে অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা
সৌদি-আমিরাত সম্পর্কে এই টানাপোড়েনের অন্যতম কারণ ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। দুই দেশই তেল রফতানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তাদের অর্থনীতিকে অন্য খাত-নির্ভর করে তুলতে চায়।

মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে সৌদি আরব তাদের অর্থনৈতিক কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনছে। এখন তারা পর্যটন, আর্থিক সেবা এবং প্রযুক্তি খাতে প্রতিযোগিতার জন্য বাজার গড়ে তুলছে।

লন্ডনে চ্যাটাম হাউসের বিশ্লেষক নিয়েল কুইলিয়াম বলেন, ওই এলাকায় সৌদি আরব একটি বৃহৎ দেশ এবং এখন তারা জেগে উঠছে। এটি আমিরাতের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে।

সৌদি যদি আগামী ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে একটি গতিশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়, তাহলে সেটি আমিরাতের অর্থনীতির মডেলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

অবশ্য সৌদি বিশ্লেষক আলী শিহাবি মনে করেন, দুই দেশের এই মতবিরোধ দীর্ঘমেয়াদী হবে না। তার কথায়, দেশ দুটির মধ্যে অতীতে আরও বড় মতভেদ দেখা গেছে। প্রত্যেক সম্পর্কেই উত্থান-পতন রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের মধ্যেও সম্পর্কে টানাপোড়েন হয়েছে। কিন্তু এ দুটি দেশের (সৌদি-আমিরাত) সম্পর্কের মূল ভিত্তি আসলেই অনেক জোরালো। ফলে এই জোটের স্থায়ী কোনো ক্ষতি হবে না।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

,