শনিবার ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২০ |

বাংলাদেশে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদে থাকলো না

বাংলাদেশ ব্যুরো অফিস |  সোমবার ৩রা জুলাই ২০১৭ সন্ধ্যা ০৬:৫০:০০
বাংলাদেশে

অনেক জল্পনা-কল্পনা ও অপেক্ষাশেষে বাংলাদেশে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা অবশেষে উচ্চ আদালতই ফিরে এলো। বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধন বাতিল করে দেওয়া হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। দেশের প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ আজ সোমবার (৩ জুলাই) এ রায় ঘোষণা করেন। হাইকোর্টের রায়ের কিছু পর্যবেক্ষণ ‘এক্সপাঞ্জ’ করে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল ‘সর্বসম্মতভাবে’ খারিজ করার রায় ঘোষণা করেন প্রধান বিচারপতি। রিটকারী আইনজীবী মনজিল মোরসেদ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আজকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে ঐতিহাসিক রায়। বিচারকদের অপসারণ সংক্রান্ত বিষয়ে এ মামলা। যে আইন করে সংসদের কাছে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল সেটি আজকে বেআইনি ও বাতিল হলো।’


চূড়ান্তভাবে ষোড়শ সংশোধন বাতিলে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট এবং বামঘরানার দলগুলো সুপ্রীম কোর্টের এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। পাশাপাশি সরকারের সমালোচনা করেছে, সরকার বিচারবিভাগকে হস্থগত করতে পারেনি। যদিও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা রায়ের পর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানালেও দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ নিয়ে চুপ থাকতেই পরামর্শ দিয়েছেন তার মন্ত্রীদের। ঢাকার অনলাইন দৈনিক বাংলা ট্রিবিউনের বরাতে জানা যায়, সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে অনির্ধারিত আলোচনাকালে বৈঠকে একজন প্রতিমন্ত্রী বিষয়টি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিচার বিভাগ স্বাধীন। তাই এই রায়ের বিরুদ্ধে কোনও ধরনের বিরূপ মন্তব্য করা যাবে না।’ তিনি  মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের এই নির্দেশ দেন।


রায়ের পরপর বিএনপি জানিয়েছে, ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে বিচারপতিদের অপসারণ করার ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে নেয়ার সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করাকে জনগনের বিজয়। সোমবার সকালে রায় ঘোষণা হওয়ার পর ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিং এ দলটির সিনিয়রনেতা রুহুল কবির রিজভী বলেন, এই সিদ্ধান্ত জনগণের বিজয়। সরকার বিচার বিভাগকে করায়াত্ত করার যে দূরভিসন্ধি করেছিল আজ সর্বোচ্চ আদালতে সিদ্ধান্তে সেই চক্রান্ত ব্যর্থ হলো। ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণায় সুপ্রীম কোর্টের সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।


এদিন সন্ধ্যায় বামপন্থী দল সিপিবি ও বাসদ জানিয়েছে, সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার যে নীতি উল্লেখ আছে, এই রায়ের ফলে সেই নীতিকে রক্ষা ও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এই রায়ই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার একমাত্র রক্ষাকবচ নয়। এই রায় ইতিবাচক, তবে যথেষ্ট নয়। সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও বাসদ সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান যৌথ বিবৃতিতে এ কথা বলেন।  



২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা আইনপ্রণেতাদের হাতে ফিরিয়ে দিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধন বিল পাস হলে এই সংশোধনী বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ওই বছরের ৫ নভেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ১০ মার্চ চূড়ান্ত শুনানি শেষে ৫ মে মামলার রায় দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করা হয়।


পরবর্তীতে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলের শুনানি নিয়ে সর্বোচ্চ আদালত সোমবার এই রায় ঘোষণা করলেন। এদিন কার্যতালিকায় ১ নম্বরে ছিল এই রায়টি। সকাল ৯টায় আদালত বসার কথা থাকলেও বিচারকরা এজলাসে আসেন প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা দেরিতে। পরে সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে রায় ঘোষণা করেন প্রধান বিচারপতি।


এর আগে গত ৮ মে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি শুরু হয়। মোট ১১ দিন শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় শুনানিতে অ্যামিক্যাস কিউরি তাদের মতামত জানান।


আদালতে শুনানির সময়ে অভিমতদাতা ১০ অ্যামিক্যাস কিউরির মধ্যে ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর পক্ষে মত দিয়েছেন। বাকি ৯ অ্যামিক্যাস কিউরি ড. কামাল হোসেন, এম আই ফারুকী, আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, প্রাক্তন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ এম হাসান আরিফ, ব্যারিস্টার এম আমিরুল ইসলাম, বিচারপতি টি এইচ খান, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, ফিদা এম কামাল, এ জে মোহাম্মদ আলী সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর বিপক্ষে তাদের অভিমত দেন।


এই সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া রায়ের পর্যবেক্ষণে ছিল, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আইনসভার কাছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা রয়েছে। দেশের সংবিধানেও শুরুতে এই বিধান ছিল। তবে সেটি ইতিহাসের দুর্ঘটনা মাত্র।’


রায়ে আরও বলা হয়, ‘কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর ৬৩ শতাংশের অ্যাডহক ট্রাইব্যুনাল বা ডিসিপ্লিনারি কাউন্সিলরের মাধ্যমে বিচারপতি অপসারণের বিধান রয়েছে।’


আদালত রায়ে আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদের ফলে দলের বিরুদ্ধে সংসদ সদস্যরা ভোট দিতে পারেন না। তারা দলের হাইকমান্ডের কাছে জিম্মি। নিজস্ব কোনও সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা নেই। ৭০ অনুচ্ছেদ রাখার ফলে সংসদ সদস্যদের সবসময় দলের অনুগত থাকতে হয়। বিচারপতি অপসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তারা দলের বাইরে যেতে পারেন না। যদিও উন্নত অনেক দেশে সাংসদদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা আছে।


এস/

গালফবাংলায় প্রকাশিত যে কোনো খবর কপি করা অনৈতিক কাজ। এটি করা থেকে বিরত থাকুন। গালফবাংলার ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন।
খবর বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন: editorgulfbangla@gmail.com

সংশ্লিষ্ট খবর