রবিবার ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২০ |

ছেলের ভয়ে দেশে ফিরতে পারছেন না প্রবাসী বাবা

 শনিবার ১লা ফেব্রুয়ারি ২০২০ সন্ধ্যা ০৭:৫৪:৫১
ছেলের

দীর্ঘ দিন প্রবাসে থেকে নিজের সন্তানদের জন্য কষ্টার্জিত টাকায় উত্তরায় একটি বাড়ি করেছিলেন লন্ডন প্রবাসী কাজী নাজিম উদ্দিন। জীবনের বেশির ভাগ সময় লন্ডনে কাটালেও শেষ বয়সে দেশের মাটিতে বসবাস করবেন বলে স্বপ্ন দেখেছিলেন এই প্রবীণ প্রবাসী।

কিন্তু নিজের বানানো বাড়িটিই এখন দেশে ফেরার পথে বাঁ’ধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তার। প্রবাসী কাজী নাজিম উদ্দিনের সেই বাড়িটি এখন অন্যের দখলে। আর দেশে ফিরে ওই বাড়িতে উঠলে তাকে প্রাণে মে’রে ফেলা হবে বলেও নিয়মিত হুমকি দেওয়া হচ্ছে।তবে সব চেয়ে দুঃখের বিষয় হলো তার বাড়ি দখলকারী এবং প্রাণনাশের হুমকি প্রদানকারী আর অন্য কেউ নন তার নিজেরই ছেলে কাজী জাবের উদ্দিন। এসব কাজে নিয়মিত ছেলের বউ কামরুন নাহার লিপিও সহযোগিতা করছেন বলে অ’ভিযোগ তার।

সব মিলিয়ে নিজের ঔরসজাত ছেলে ও ছেলের বউয়ের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছেন প্রবাসী বাবা কাজী নাজিম উদ্দিন। নিজের নিরাপত্তা এবং বাড়ি দখলের বিষয়টি নিয়ে প্রথমে লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাসে একটি লিখিত অ’ভিযোগ দায়ের করেন তিনি। পরবর্তীতে উত্তরা পশ্চিম থানায় ছেলে এবং ছেলের বউয়ের এসব অ’পকর্মের কথা তুলে ধরে তাদের বিরুদ্ধে থা’নায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

এ ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম ও ধানমন্ডি থানায় দায়ের করা একাধিক অভিযোগপত্র, লন্ডনের দূতাবাসে দায়ের করা অভিযোগের কপি এবং মা’মলা সংশ্লিষ্ট সকল কাগজপত্র দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনের হাতে রয়েছে।

ছেলের বিরুদ্ধে করা জিডিতে যেসব অ’ভিযোগ বাবার

২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর উত্তরা পশ্চিম থানায় ছেলে এবং ছেলের বউয়ের বি’রুদ্ধে কাজী নাজিম উদ্দিন ওই জিডি দায়ের করেছেন। জিডি নম্বর- ২১০৪।

জিডিতে তিনি লিখেছেন, বিবাদীদ্বয় আমার ছেলে কাজী জাবের উদ্দিন এবং ছেলের স্ত্রী কামরুন নাহার লিপি। তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে আমার কষ্টার্জিত টাকায় ৭নং সেক্টরে ৩৫নং রোডের ১৯নং প্লটে নির্মিত ৬তলা বাসার বৈধ ভাড়াটিয়া উচ্ছেদপূর্বক অবৈধভাবে দখল করিয়াছে। আমি এ বিষয়ে বিবাদীদ্বয়ের (ছেলে-ছেলের বউ) সঙ্গে কথা বললে বিবাদীদ্বয় আমাকে প্রাণনাশ ও বিভিন্ন ধরনের গালিগালাজসহ হুমকি প্রদান করে।

তিনি জিডিতে আরও লিখেছেন, ২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর আমি বিবাদীদ্বয়কে অবৈধ দখল হতে চলে যেতে বললে তারা স’ন্ত্রাসী ও অসামাজিক কার্যক্রম করবে বলে জানায়। এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর বিবাদী আমার আত্মীয়ের মাধ্যমে আমাকে উল্লেখিত ঠিকানার বাসায় যাইতে বলে। বিষয়টি আমা’র নিকট পরিকল্পিত মনে হচ্ছে এবং বিবাদীদ্বয় আমার ক্ষতি করতে পারে এরূপ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে এসেছিল চিঠিও

নিজের বাড়িটি দখলমুক্ত করতে লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাসে যে আবেদন করেছিল পিতা কাজী নাজিম উদ্দিন। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে ২০১৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টদের বরাবরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। ওই চিঠিতে রাজউক, পুলিশ ও প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

শুধু বাবাই নয়, প্রতারণার শিকার ভাইও

শুধু বাবাই নয়। কাজী জাবেরের প্রতারণার শি’কার হয়েছেন তার আপন ভাই কাজী জাফর উদ্দিনও। তিনিও জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে থানায় একটি জিডি দায়ের করেছেন। ২০১৯ সালের ১১ এপ্রিল উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের করা জিডি নম্বর-৭৮৩।

ভাইয়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা জিডিতে তিনি লিখেছেন, আমরা দুই সহোদর ভাই। আমাদের বাবা এবং মা দুজনই জীবিত আছেন। আমার বড় ভাই একজন অর্থলোভী, স্বার্থপর ও সন্ত্রাসী টাইপের লোক। ছোটবেলা থেকেই আমি লন্ডনে লেখাপড়া ও চাকরি করছি। বছরে দুই চার মাস আমি দেশে থাকি। আর বাকি সময়ে লন্ডনে থাকি।

এই সুযোগে আমার বাবার সম্পত্তিসহ ওই বাড়িটি আমার ভাই একাই ভোগ করেন। আমাকে আমার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে, আমাকে আমার বাড়িতে ঢুকতে দেয় না, বাড়ির টাকার অংশও বুঝিয়ে দেয় না। বরং বিভিন্ন সন্ত্রাসী লোক দিয়ে আমাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। জীবননাশের হুমকি দিয়ে বাসায় ঢুকতে বাঁধা প্রধান করে।

বাবা-ভাই নয়, অন্যের প্রতারণার মা’মলায় গ্রেপ্তার তিনি

শুধুমাত্র বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে নয় অনেক মানুষের সঙ্গে কাজী জাবের প্রতারণা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি জালিয়াতি করে এক প্রবাসীর এক কোটি ৯৫ লাখ টাকা আত্মসাতের মা’মলায় কাজী জাবেরকে গ্রেপ্তার করেছে ধানমন্ডি থানা পু’লিশ। মামলার বাদী লন্ডন প্রবাসী আরেক রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী ড. মো.হারুন কাদী।

তার রেস্টুরেন্টের এক ওয়েটারের বন্ধু হিসেবে রেস্টুরেন্টে আসা যাওয়া শুরু করেছিলেন কাজী জাবের। তিনি নিজেকে দূতাবাসের একজন বড় কর্মকর্তা হিসেবে ভুয়া পরিচয় দেন। এ ছাড়াও বাংলাদেশের কোনো মন্ত্রী, এমপি লন্ডনে সফরে গেলে সবার সঙ্গে ছবি তুলে তা হারুন কাদীকে দেখাতেন তিনি। এভাবেই ড. হারুন কাদীর কাছে তিনি বিশ্বস্ততা অর্জন করেন। পরে প্রতা’রণা করে হাতিয়ে নেন প্রায় দুই কোটি টাকা।

ড. হারুন কাদীর দায়ের করা মামলা সূত্রে জানা যায়, কাজী জাবের উদ্দিন বাংলাদেশে ঢাকার উত্তরায় একটি পারিবারিক মালিকানাধীন হোটেল বিক্রি করার কথা বলে ২০১৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর হারুন কাদিকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। এরপর বায়না বাবদ ৫ জানুয়ারি জাবেরের নামে স্ট্যান্ডার্ড চার্টাড ব্যাংকের একটি চেকে (নম্বর ০০০৭০৯০৭৬৩) এক কোটি ৯৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। যা ৮ জানুয়ারি তার ব্র্যাক ব্যাংক উত্তরা শাখা থেকে জাবেরের অ্যাকাউন্টে (নম্বর ১৫১০১০২১০৮২৭৮০০১) ক্যাশ করে নেয়।

কিন্তু পরে তিনি জানতে পারেন হোটেলটি জাবেরদের পারিবারিক ব্যবসা, তার এককভাবে বিক্রি করার কোনো এখতিয়ার নাই। যদিও কাজী জাবের ভু’য়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেখিয়েছিলেন। মূলত লন্ডনে প্রতা’রণা করাই তার মূল পেশা। তাই টাকা ফেরত চাইতে গেলে নানা রকম টালবাহানা শুরু করেন এবং হোটেল বিক্রির ঘটনা অস্বীকার করেছেন।

এই ঘটনায় দায়ের করা মা’মলায় ২৫ জানুয়ারি কাজী জাবেরকে গ্রে’প্তার করে ধানমন্ডি থা’না পু’লিশ। এরপর আ’দালতে পাঠিয়ে তাকে পাঁচ দিনের রি’মান্ডেও চেয়েছিল পু’লিশ।

আরও একাধিক মা’মলার আ’সামি তিনি

শুধু এই ব্যক্তির দায়ের করা মা’মলা নয়। এমন একাধিক মা’মলার আ’সামি কাজী জাবের। ২০১৮ সালের ২০ জানুয়ারি উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের হওয়া এফআই আর নং ২৪/২৪ এবং ২০১৯ সালে নারী ও শি’শু নি’র্যাতন দমন আ’ইনে দায়ের হওয়া একটি মা’মলারও আ’সামি কাজী জাবের।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে লন্ডনে অবস্থানকারী ভুক্তভোগী প্রবাসী কাজী নাজিম উদ্দিন দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে বলেন, ‘ওকে (কাজী জাবের) আমা’র ছেলে হিসেবে পরিচয় দিতেও লজ্জাবোধ হয়। ওর জন্য আজ আমা’র এই দুরবস্থা।’

কাজী নাজিম উদ্দিনের অ’ভিযোগ ও ড. হারুন কাদীর দায়ের করা মা’মলার বিষয়ে জানতে কাজী জাবেরের স্ত্রী’ কাম’রুন নাহার লিপির সঙ্গে একাধিক বার মুঠোফোনে কল দিয়েও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

পরে এ বিষয়ে জানতে চাইলে মা’মলার ত’দন্তকারী কর্মক’র্তা ধানমণ্ডি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নাজমুল হুদা দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে বলেন, ‘প্রতারণা ও জালিয়াতির মা’মলায় তাকে গ্রে’প্তার করা হয়েছে। আ’দালতে তার পাঁচ দিনের রি’মান্ডের আবেদন করা হয়েছিল। পরে আ’দালত তাকে জে’লগেটে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অনুমতি দিয়েছেন।

গালফবাংলায় প্রকাশিত যে কোনো খবর কপি করা অনৈতিক কাজ। এটি করা থেকে বিরত থাকুন। গালফবাংলার ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন।
খবর বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন: editorgulfbangla@gmail.com

সংশ্লিষ্ট খবর