সোমবার ১লা জুন ২০২০ |
করোনা মহামারি

সময় দ্রুত হারিয়ে ফেলছি

 রবিবার ২২শে মার্চ ২০২০ রাত ১০:১৫:৩২
সময়

আমি শুধু সময়ের দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। প্রতি মুহূর্তে যেন আমরা সুযোগ হারিয়ে ফেলছি। এখনো বিষয়টা বুঝে উঠতে পারলে আমাদের সামনে যে রকমের যুদ্ধ আমরা সে রকমের প্রস্তুতি নিতে পারতাম। যুদ্ধটার চেহারাটা যেন আমরা কেউ দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারছি না। চেহারাটা পরিষ্কার বুঝতে পারলে  সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম যে জীবনের ওপরেই যখন হামলা, জীবন বাজি রেখেই এখন লড়াইতে নামবো। আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ এখানে নেই।

করোনা রোগের বিস্তারের গতি দেখলে যে কোনো মানুষ থ হয়ে যাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেজিং অফিসকে চীন একটা অজানা রোগের কথা জানিয়েছিল ডিসেম্বরের ৩১ তারিখে। আজ মার্চের ২২ তারিখ। 

অর্থাৎ ৮২ দিন আগে। এই ৮২ দিনে কিন্তু এই রোগ সারা দুনিয়া তছনছ করে ফেললো। তার মোকাবিলার জন্য এখন সেনাবাহিনী তলব করতে হচ্ছে। সমস্ত কিছু অচল করে মানুষকে ঘরের ভেতর দিনরাত কাটাতে বাধ্য করছে। সরকার তার মোকাবিলার জন্য ট্রিলিয়নকে ট্রিলিয়ন ডলার বরাদ্দের ঘোষণা দিচ্ছে। সরকার প্রধানরা সারাক্ষণ টেলিভিশনের সামনে এসে মানুষকে প্রতিটি পদক্ষেপ ব্যাখ্যা করছে। পার্লামেন্টে সকল দল একমত হয়ে আইন পাস করছে। দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করছে। সারা দুনিয়া ক্রিকেটের স্কোর বোর্ডের মত করোনার স্কোর বোর্ড দেখছে। অতীতে কোনো বিশ্বযুদ্ধও মানুষকে এত ভাবিয়ে তুলতে পারেনি। অথচ মাত্র ৮২ দিনের ব্যাপার। দুনিয়ার এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত সে বিস্তৃত হয়ে কোটি কোটি মানুষকে কাবু করে ফেলেছে। সে যে দেশেই ঢুকছে সে দেশকেই নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছে।

আমাদের কপাল ভালো এই ৮২ দিনের মহামূল্যবান অভিজ্ঞতা আমরা অন্য দেশগুলোর কাছ থেকে পেয়ে গেছি। এই অভিজ্ঞতা যদি আমরা কাজে না লাগাই তাহলে আমরা আমাদের কপালকে দূষতে পারবো না। দূষতে হবে আমাদের নির্বুদ্ধিতাকে, বালিতে আমাদের মাথা গুঁজে রাখাকে।

একটা দেশে ঢোকার পরপর সে কত শতাংশ মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয় সেটা জার্মানীর চ্যান্সেলরের ভাষণ থেকেই বুঝা যায় স্পষ্টভাবে। জার্মানীর মানুষ যখন করোনার চেহারার সঙ্গে পরিচিত হতে পারেনি, এমন এক সময়ে চ্যান্সেলর মার্কেল জাতিকে জানালেন যে এই রোগ শিগগিরই ৭০ শতাংশ জার্মান নাগরিকের মধ্যে সংক্রমিত হবে। কী সাহসী এবং স্পষ্ট বক্তব্য। মার্চ ২০ তারিখে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর তার ভাষণে জনগনকে জানিয়ে দিলেন যে আগামী দু’মাসে ক্যালিফোর্নিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা ২.৫ কোটিতে পৌঁছাবে। অর্থাৎ তার রাজ্যের ৫৬% মানুষ ২ মাসের মধ্যে আক্রান্ত হবে। ক্যালিফোর্নিয়াতে প্রথম রোগী শনাক্ত হয়েছিল জানুয়ারির ২২ তারিখে। মাত্র দু’মাস আগে। মাত্র চার মাসে একজন রোগী থেকে আড়াই কোটি রোগীতে গিয়ে পৌঁছাবে। প্রচণ্ড তার গতি। এই তার ধর্ম। তার গতিপথ পাল্টানোর কোনো ব্যবস্থা এখনো কেউ করতে পারেনি। আমাদের লড়াই হবে তার গতিপথ থেকে নিজেকে আড়াল করা। যারা যত সফলভাবে তা করতে পারবে তারা তত আঘাত কমাতে পারবে।

সবচাইতে সফলভাবে একাজটা করতে পেরেছে এশিয়ারই কয়েকটি দেশ। চীন একাজ পেরেছে, সেখানে এরোগের সূত্রপাত হয়েছিল ৮২ দিন আগে। এখন সেখানে এরোগকে থামিয়ে দেয়া হয়েছে। তারপর সফল হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান, হংকং, এবং সিঙ্গাপুর। সফল দেশগুলোর কৌশল ছিল একটাই। যে যখনই আক্রান্ত হচ্ছে তাকে চিহ্নিত করো। তাকে আলাদা যায়গায় রাখো। তাহলে সংক্রমণ থেকে অন্যরা রেহাই পাবে। সংক্রমণ থামাতে পারলেই রোগের বিস্তার হতে পারবে না। একজন থেকে ২ জনও যদি সংক্রমিত হয় তাহলে হু হু করে সংখ্যা বেড়ে যায়। একটা পরিসংখ্যান দিচ্ছি, একজন যদি প্রতি ৫ দিনে ২.৫ জনকে আক্রান্ত করে তাহলে ৩০ দিনে সে একাই ৪০৬ জনকে আক্রান্ত করবে।

এশিয়ার এ সকল দেশগুলো তার সমস্ত শক্তি দিয়ে আক্রান্তদের শনাক্ত করেছে এবং তাদেরকে অন্যদের থেকে দূরে রেখেছে। এর ফলে তাদের দেশের বেশি লোক আক্রান্ত হবার সুযোগ পায়নি। এখন এসব দেশে করোনার উৎপাত থেমে গেছে।

যারা একাজে গাফিলতি করে ভীষণ বিপদে পড়েছে তারা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, এবং সুইজারল্যান্ড। এখন তাদের অবস্থা সামালের বাইরে।

আমরা কোন দলে?

এই মহূর্তে যদি জাতি সমস্ত সরকারি, বেসরকারি, সামাজিক, আন্তর্জাতিক শক্তি নিয়ে এগিয়ে না-আসে, কোনো বিবেচনায় বিলম্ব করে, তাহলে এরোগের বিপুল প্লাবণকে বাঁধ দিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে পারবো না। জোয়ারের ঠেলায় সবকিছু ভেসে যাবে।

মহাপ্লাবণ কী আসছে?

অবশ্যই আসছে। প্রায় দ্বারপ্রান্ত্তে। আমরা বরং দেরি করে ফেলছি। আর দেরি করার সুযোগ নেই।

জোয়ার ঠেকাতে হলে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে পরীক্ষা, পরীক্ষা, পরীক্ষা। যতজনকে পরীক্ষা করার সামর্থ্য আমাদের আছে ততজনকে পরীক্ষা। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ঠিক একথাই বারবার আমাদের বলে যাচ্ছে। পরীক্ষা। পরীক্ষা। পরীক্ষা। চিহ্নিত করো। আলাদা করো। চিহ্নিত করো। আলাদা করো।

এটা সোজা হিসাব। এই শিক্ষা আমরা ‘জুতা আবিষ্কারের’ কাহিনী থেকে অনেক আগেই পেয়েছি। আমি যদি ধুলা থেকে নিজের পা-কে মুক্ত রাখতে চাই তাহলে সারা দেশ থেকে ধুলা পরিষ্কার করার কাজে লাগতে পারি, অথবা নিজের পায়ে জুতা পরতে পারি। আক্রমণ থেকে বাঁচতে হলে এক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সকলের কাছ থেকে দূরে রাখতে পারি, অথবা আমরা সবাই তার ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে পারি। প্রথমটাই সোজা কাজ, যখন আক্রান্ত ব্যক্তি মাত্র কয়েকজন, আর আক্রান্ত হতে পারে যারা তাদের সংখ্যা কয়েক কোটি। কয়েকজনকে পৃথক করে রাখতে পারলে কয়েক কোটি লোক বেঁচে যায়।

যদি আক্রান্তদের চিহ্নিত করার যন্ত্রপাতির অভাব থাকে তাহলে যেটুকু সামর্থ্য আছে তা-দিয়ে শুরু করতে পারি। তাদেরকে আলাদা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষ জানবে প্রতিদিন কতজন আক্রান্ত ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে। মানুষ উৎসাহিত হবে এবং আক্রান্ত লোকের থেকে সাবধান হবে। যে ক’টা যন্ত্র আছে সে ক’টার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার করতে হবে। মানুষকে তার ফলাফল জানতে দিতে হবে। আরো যন্ত্র কখন ক’টা আসছে সেই তথ্য জানাতে হবে। একজনকেও যদি চিহ্নিত করতে পারি এবং তাকে আলাদা রাখতে পারি তাহলে তার থেকে হাজার মানুষকে আমরা রক্ষা করতে পারলাম। পরীক্ষার গুরুত্ব কোনোভাবে কোনো সময় খাটো করা যাবে না। পরীক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

এরোগ বিদেশ থেকে এসেছে। যখন এটা ঠেকানো খুবই সহজ ছিল সেটা আমরা করতে পারিনি। এখন এই দৈত্য বোতল থেকে বেরিয়ে গেছে। জাতির সবকিছু দিয়ে একে ঠেকাতে হবে।

আমরা জানি একে কীভাবে ঠেকাতে হয়। কিন্তু আমাদের মধ্যে এখনো কোনো গরজ আসছে না। আমরা জানি এটা কী, কিন্তু আমরা হৃদয়ঙ্গম করছি না। আমরা বলছি শারীরিক দূরত্বই এরোগ থেকে নিজে বাঁচা এবং অন্যকে বাঁচানোর একমাত্র পথ। সেকথা বলার জন্যই আমরা একটা সম্মেলন করার ব্যবস্থা করে ফেলতে পারি অতি উৎসাহে! অর্থাৎ কী বলছি আর কী করছি তার মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। এখনো বিষয়টা কথা বলাবলি, কাগজে লেখালেখি, টিভির টক শো’র আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছি। আমি আমার আচরণের কারণে কিছুদিনের মধ্যে, দু-তিন মাসের মধ্যে আমারই বাবা-মা, স্ত্রী, কিংবা দাদা-দাদি, কিংবা চাচা-চাচি, কিংবা বন্ধুবান্ধবের মৃত্যুর কারণ হতে যাচ্ছি এটা কিছুতেই মনে আসছে না।

দায়িত্ব পালনের খাতিরে অনেক উপদেশ দেয়া হচ্ছে কিন্তু সে উপদেশ যারা দিচ্ছেন তারা নিজেরা মানছেন কিনা, অন্যরা মানছেন কিনা এটা নিয়ে চিন্তিত হবার কারো গরজ কোথাও নজরে পড়ে না।

জাতির এই কঠিনতম সময়ে যেরকম নিদ্রাহীন, আহারহীনভাবে দিনরাত প্রস্তুতির কথা ছিল সেটা এখনো দেখা যাচ্ছে না। মহাপ্লাবন আসছে, বাঁধ রক্ষার যে শপথ চায় সে শপথের ডাক এখনো আসছে না।

কী কাজ করতে হবে সেটা আমরা জেনে গেছি। সকল মানুষের কাছ থেকে দূরত্ব রাখতে হবে। ঘন ঘন হাত ধুতে হবে।

উপদেশ দেয়া এক জিনিস আর উপদেশ পালন করার জন্য দেশব্যাপী প্রচণ্ড তাগিদ সৃষ্টি তা আরেক জিনিস। আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি না। আমার নিজেকে বাঁচানোর, আমার পরিবারের সদস্যদের বাঁচানোর, আমার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের বাঁচানোর প্রতি কি আমরা এতই অনাগ্রহী? নাকি আমরা যা কিছু আমাদের চারপাশে ঘটছে সব কিছুকে ‘ফেইক নিউজ’ ধরে নিয়ে স্বস্তি অনুভব করতে চাচ্ছি।

আশা করি দেশের তরুণরা দেশের এই মহাদুর্যোগের দিনে কারো দিকে না-তাকিয়ে নিজ নিজ উদ্যোগে এগিয়ে আসবে। তরুণরা নিজেদের সংগঠন তৈরি করে মানুষকে বাঁচানোর জন্য শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে এগিয়ে আসবে। যেরকম তারা সব সময় সব প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এগিয়ে এসেছে। এবার এটা কোনো স্থানীয় সুর্যোগ নয়। দেশব্যাপী এবং সব মানুষের দুর্যোগ।

তরুণরা এই কথাগুলো মানুষকে বুঝিয়ে বলে নিজ নিজ বাড়িতে থাকার জন্য বলতে পারে। যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাড়িতে বাড়িতে তরুণরা নিজেদের নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করে সবাই যার যার পরিবারকে বাড়িতে রাখা নিশ্চিত করবে। নিজ নিজ এলাকাকে মুক্ত এলাকা ঘোষণার চেষ্টায় থাকবে। যাদের জীবিকা বন্ধ হবে তাদের খাবারের ব্যবস্থার জন্য অন্য লোকের সহায়তা চাইতে পারে। বুঝাতে হবে যে গরিব যদি রোজগারের জন্য আবার পথে ঘাটে বের হয় তাহলে তারা অন্য সবাইকে আক্রান্ত করবে। তাদেরকে বাঁচার ব্যবস্থা করলে অন্যরা বাঁচতে পারবে।

স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অত্যন্ত সঠিক কাজ হয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা আগামী কয়েক মাস শুধু মানুষকে বাঁচানোর জন্য নিজেদের নিয়োজিত রাখবে। তাদের একমাত্র কাজ হবে মানুষকে বাঁচানো। পরিস্থিতি ক্রমে কঠিন থেকে কঠিনতর হবে। একমাত্র তরুণরাই এই কঠিন সময়ে মানুষকে সঙ্গ দিতে পারে। সাহস দিতে পারে। পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করতে পারে, সারা দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে।

তরুণরা শুরু করবে নিজ নিজ প্রস্তুতি নিয়ে, সংগঠন তৈরি করে, করণীয় কাজের তালিকা বানিয়ে, সম্ভাব্য সব পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা নিয়ে।

শুরুতে তাদের কাজ হবে এলাকার সকল পরিবারকে নিজ নিজ বাড়িতে থাকতে উদ্বুদ্ধ করা নিয়ে। পরিবারের সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজে দেয়া। এলাকার মানুষকে এক জায়গায় একত্র হতে নিরুৎসাহিত করা, দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য এলাকার মানুষকে প্রস্তুত করা। দুর্যোগকালীন সকল নিয়ম কঠিনভাবে মেনে চলার জন্য নিজেদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রাখতে হবে। তারা নিজেরা নিয়ম মানলে তখন এলাকার মানুষ তাদের নির্দেশিত নিয়মাবলীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে।

তরুণরা নিজেদের মধ্যে দেশব্যাপী যোগাযোগ রাখবে, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রাখবে- একে অপরকে উৎসাহিত করার জন্য।

সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তারা সকল তথ্য ও নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করবে। পরস্পরের মধ্যে পরামর্শ এবং উৎসাহ বিনিময় করবে।

এরকম কাজে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কিংবা পৃথকভাবে তরুণগোষ্ঠী, এনজিও-রা, সামাজিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানসমূহও এগিয়ে আসতে পারবে।

আমরা একটা জাতীয় দুর্যোগের মুখোমুখি। এই মহা দুর্যোগ আমাদের জাতীয় জীবনের সবকিছু তছনছ করে দিয়ে যেতে পারে। করোনার আক্রমণ যদি অন্যান্য দেশের তো মহা দুর্যোগে পরিণত না-ও হয় তাহলেও আমাদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রস্তুতি না নেয়ার কোনো সুযোগ আমাদের কাছে নেই।

প্রস্তুতি নিতে হবে, এবং সেটা চরম দুর্যোগকে কল্পনা করে নিতে হবে। কোনো পর্যায়ে যেন আমাদেরকে অপ্রস্তুত হতে না হয়।

আরেকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করি। যুদ্ধের সময় যেমন সারা দেশব্যাপী যুদ্ধ হয় তখন কোথাও কোথাও শত্রুকে পরাভূত করে ‘মুক্ত এলাকা’ সৃষ্টি করা হয়। করোনার যুদ্ধেও আমরা এরকম ‘করোনামুক্ত’ এলাকা তৈরি করতে পারি। সেটা একটা পাড়া হোক, একটা গ্রাম হোক, কিংবা আরো বড় এলাকা হোক। যাদের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটা করা হবে এলাকাবাসী তো বটেই, জাতি তাদের চিরদিন স্মরণ রাখবে।

দেশের প্রতিটি গ্রামে এনজিও-দের কর্মসূচি আছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ঋণের কর্মসূচি আছে। ক্ষুদ্রঋণের ঋণগ্রহীতারা শৃঙ্খলাবদ্ধতার সঙ্গে সকল দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য প্রশিক্ষণ প্রাপ্তই শুধু নয়, তারা একাজে বিশেষভাবে অভিজ্ঞ। তাদের শৃঙ্খলাবদ্ধতা, এবং অভিজ্ঞতাকে আসন্ন দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য কাজে লাগানোর প্রস্তুতি নিতে হবে। তাদেরকে নতুন নীতিমালা তৈরি করে দিতে হবে। তারা কীভাবে নিজ নিজ বাড়িতে থাকবে, ভাইরাসের আক্রমণের হাত থেকে কীভাবে নিজ পরিবারকে এবং গ্রামকে রক্ষা করবে এই নীতিমালায় তা পরিষ্কার করে দেয়া হবে। কারো বাড়িতে করোনার আক্রমণ দেখা দিলে সে ব্যাপারে তাদের করণীয় পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করে দিতে হবে। 

বলে দিতে হবে তারা তাদের স্বামী সন্তানদের কীভাবে বাড়িতে থাকতে উদ্বুদ্ধ করবে, সামনের মহাপ্লাবন কত বড় হবে, কতদিন এই প্লাবনে আমাদের ভুগতে হবে, এর মোকাবিলার জন্য আমাদের প্রধান অস্ত্রগুলো কি, প্রয়োজনে কার কাছে পরামর্শ ও সহায়তা পাওয়া যাবে, ইত্যাদি। তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে যে সাহস ও শৃঙ্খলা থাকলে যেকোনো শত্রুর মোকাবিলা করা যায়। এই মহাপ্লাবনের মোকাবিলায়ও আমরা শক্তি, সাহস, এবং শৃঙ্খলা দিয়ে জয় করবো। মহাপ্লাবন যত শক্তিশালীই হোক- এটা ক্ষণস্থায়ী। আমরা চিরস্থায়ী। আমাদেরকে তারা পরাজিত করতে পারবে না।

দেশের আরো বহু সরকারি, বেসরকারি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান আছে। গ্রামে গ্রামে তাদের অনেক কর্মী আছে। সকল প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের এই দুর্যোগরোধে নামিয়ে দিতে পারে।

মহা দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে জান বাঁচালাম কিন্তু বাঁচতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হলাম। পথের ভিখারী হলাম। যা কিছু পুঁজি সব গেল- তার উপায় হবে কী?

দেশের সাধারণ মানুষ বাঁচবে কী করে। দেশের অর্থনীতি দুমড়ে মুচড়ে পড়বে। তার কী হবে? যারা দিন এনে দিন খায় দুর্যোগ চলাকালে তাদের কী হবে?

সারা পৃথিবীর অর্থনীতি প্রায় ধসে পড়তে শুরু করেছে। এর শেষ কোথা পর্যন্ত গড়াবে? মাঝখানে বাংলাদেশের অর্থনীতি উঠে দাঁড়াবার কোনো শক্তি পাবে কিনা।

এখন থেকে এসব নিয়ে আমাদের চিন্তা শুরু করতে হবে। করোনা-পর্বের শেষে পৃথিবী পুনঃজন্ম হবে। বর্তমান এ পৃথিবীর সঙ্গে তার বোধহয় খুব বেশি একটা মিল থাকবে না। এই পুনঃজন্মের পৃথিবীতে বাংলাদেশের স্থান কোন স্থানে নির্ধারিত হবে।

করোনার দৈত্য বোতল থেকে বের হয়ে গেছে। এই দৈত্য কি পৃথিবী খাবে? তাকে যখন বোতলে ভরা হবে অথবা সে স্বেচ্ছায় বোতলে ফিরে যাবে তখন পৃথিবীর যাত্রা, বাংলাদেশের যাত্রা কোথা থেকে শুরু হবে।

মাত্র অল্প সময়ের মধ্যে সবকিছু আমাদের নির্ধারণ করতে হবে।

কোনোভাবেই সময় কিন্তু খুব বেশি আমাদের হাতে নেই। 

আমি শুধু সময়ের দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। প্রতি মুহূর্তে যেন আমরা সুযোগ হারিয়ে ফেলছি। এখনো বিষয়টা বুঝে উঠতে পারলে আমাদের সামনে যে রকমের যুদ্ধ আমরা সে রকমের প্রস্তুতি নিতে পারতাম। যুদ্ধটার চেহারাটা যেন আমরা কেউ দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারছি না। চেহারাটা পরিষ্কার বুঝতে পারলে  সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম যে জীবনের ওপরেই যখন হামলা, জীবন বাজি রেখেই এখন লড়াইতে নামবো। আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ এখানে নেই।

করোনা রোগের বিস্তারের গতি দেখলে যে কোনো মানুষ থ হয়ে যাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেজিং অফিসকে চীন একটা অজানা রোগের কথা জানিয়েছিল ডিসেম্বরের ৩১ তারিখে। আজ মার্চের ২২ তারিখ। 

অর্থাৎ ৮২ দিন আগে। এই ৮২ দিনে কিন্তু এই রোগ সারা দুনিয়া তছনছ করে ফেললো। তার মোকাবিলার জন্য এখন সেনাবাহিনী তলব করতে হচ্ছে। সমস্ত কিছু অচল করে মানুষকে ঘরের ভেতর দিনরাত কাটাতে বাধ্য করছে। সরকার তার মোকাবিলার জন্য ট্রিলিয়নকে ট্রিলিয়ন ডলার বরাদ্দের ঘোষণা দিচ্ছে। সরকার প্রধানরা সারাক্ষণ টেলিভিশনের সামনে এসে মানুষকে প্রতিটি পদক্ষেপ ব্যাখ্যা করছে। পার্লামেন্টে সকল দল একমত হয়ে আইন পাস করছে। দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করছে। সারা দুনিয়া ক্রিকেটের স্কোর বোর্ডের মত করোনার স্কোর বোর্ড দেখছে। অতীতে কোনো বিশ্বযুদ্ধও মানুষকে এত ভাবিয়ে তুলতে পারেনি। অথচ মাত্র ৮২ দিনের ব্যাপার। দুনিয়ার এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত সে বিস্তৃত হয়ে কোটি কোটি মানুষকে কাবু করে ফেলেছে। সে যে দেশেই ঢুকছে সে দেশকেই নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছে।

আমাদের কপাল ভালো এই ৮২ দিনের মহামূল্যবান অভিজ্ঞতা আমরা অন্য দেশগুলোর কাছ থেকে পেয়ে গেছি। এই অভিজ্ঞতা যদি আমরা কাজে না লাগাই তাহলে আমরা আমাদের কপালকে দূষতে পারবো না। দূষতে হবে আমাদের নির্বুদ্ধিতাকে, বালিতে আমাদের মাথা গুঁজে রাখাকে।

একটা দেশে ঢোকার পরপর সে কত শতাংশ মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয় সেটা জার্মানীর চ্যান্সেলরের ভাষণ থেকেই বুঝা যায় স্পষ্টভাবে। জার্মানীর মানুষ যখন করোনার চেহারার সঙ্গে পরিচিত হতে পারেনি, এমন এক সময়ে চ্যান্সেলর মার্কেল জাতিকে জানালেন যে এই রোগ শিগগিরই ৭০ শতাংশ জার্মান নাগরিকের মধ্যে সংক্রমিত হবে। কী সাহসী এবং স্পষ্ট বক্তব্য। মার্চ ২০ তারিখে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর তার ভাষণে জনগনকে জানিয়ে দিলেন যে আগামী দু’মাসে ক্যালিফোর্নিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা ২.৫ কোটিতে পৌঁছাবে। অর্থাৎ তার রাজ্যের ৫৬% মানুষ ২ মাসের মধ্যে আক্রান্ত হবে। ক্যালিফোর্নিয়াতে প্রথম রোগী শনাক্ত হয়েছিল জানুয়ারির ২২ তারিখে। মাত্র দু’মাস আগে। মাত্র চার মাসে একজন রোগী থেকে আড়াই কোটি রোগীতে গিয়ে পৌঁছাবে। প্রচণ্ড তার গতি। এই তার ধর্ম। তার গতিপথ পাল্টানোর কোনো ব্যবস্থা এখনো কেউ করতে পারেনি। আমাদের লড়াই হবে তার গতিপথ থেকে নিজেকে আড়াল করা। যারা যত সফলভাবে তা করতে পারবে তারা তত আঘাত কমাতে পারবে।

সবচাইতে সফলভাবে একাজটা করতে পেরেছে এশিয়ারই কয়েকটি দেশ। চীন একাজ পেরেছে, সেখানে এরোগের সূত্রপাত হয়েছিল ৮২ দিন আগে। এখন সেখানে এরোগকে থামিয়ে দেয়া হয়েছে। তারপর সফল হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান, হংকং, এবং সিঙ্গাপুর। সফল দেশগুলোর কৌশল ছিল একটাই। যে যখনই আক্রান্ত হচ্ছে তাকে চিহ্নিত করো। তাকে আলাদা যায়গায় রাখো। তাহলে সংক্রমণ থেকে অন্যরা রেহাই পাবে। সংক্রমণ থামাতে পারলেই রোগের বিস্তার হতে পারবে না। একজন থেকে ২ জনও যদি সংক্রমিত হয় তাহলে হু হু করে সংখ্যা বেড়ে যায়। একটা পরিসংখ্যান দিচ্ছি, একজন যদি প্রতি ৫ দিনে ২.৫ জনকে আক্রান্ত করে তাহলে ৩০ দিনে সে একাই ৪০৬ জনকে আক্রান্ত করবে।

এশিয়ার এ সকল দেশগুলো তার সমস্ত শক্তি দিয়ে আক্রান্তদের শনাক্ত করেছে এবং তাদেরকে অন্যদের থেকে দূরে রেখেছে। এর ফলে তাদের দেশের বেশি লোক আক্রান্ত হবার সুযোগ পায়নি। এখন এসব দেশে করোনার উৎপাত থেমে গেছে।

যারা একাজে গাফিলতি করে ভীষণ বিপদে পড়েছে তারা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, এবং সুইজারল্যান্ড। এখন তাদের অবস্থা সামালের বাইরে।

আমরা কোন দলে?

এই মহূর্তে যদি জাতি সমস্ত সরকারি, বেসরকারি, সামাজিক, আন্তর্জাতিক শক্তি নিয়ে এগিয়ে না-আসে, কোনো বিবেচনায় বিলম্ব করে, তাহলে এরোগের বিপুল প্লাবণকে বাঁধ দিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে পারবো না। জোয়ারের ঠেলায় সবকিছু ভেসে যাবে।

মহাপ্লাবণ কী আসছে?

অবশ্যই আসছে। প্রায় দ্বারপ্রান্ত্তে। আমরা বরং দেরি করে ফেলছি। আর দেরি করার সুযোগ নেই।

জোয়ার ঠেকাতে হলে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে পরীক্ষা, পরীক্ষা, পরীক্ষা। যতজনকে পরীক্ষা করার সামর্থ্য আমাদের আছে ততজনকে পরীক্ষা। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ঠিক একথাই বারবার আমাদের বলে যাচ্ছে। পরীক্ষা। পরীক্ষা। পরীক্ষা। চিহ্নিত করো। আলাদা করো। চিহ্নিত করো। আলাদা করো।

এটা সোজা হিসাব। এই শিক্ষা আমরা ‘জুতা আবিষ্কারের’ কাহিনী থেকে অনেক আগেই পেয়েছি। আমি যদি ধুলা থেকে নিজের পা-কে মুক্ত রাখতে চাই তাহলে সারা দেশ থেকে ধুলা পরিষ্কার করার কাজে লাগতে পারি, অথবা নিজের পায়ে জুতা পরতে পারি। আক্রমণ থেকে বাঁচতে হলে এক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সকলের কাছ থেকে দূরে রাখতে পারি, অথবা আমরা সবাই তার ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে পারি। প্রথমটাই সোজা কাজ, যখন আক্রান্ত ব্যক্তি মাত্র কয়েকজন, আর আক্রান্ত হতে পারে যারা তাদের সংখ্যা কয়েক কোটি। কয়েকজনকে পৃথক করে রাখতে পারলে কয়েক কোটি লোক বেঁচে যায়।

যদি আক্রান্তদের চিহ্নিত করার যন্ত্রপাতির অভাব থাকে তাহলে যেটুকু সামর্থ্য আছে তা-দিয়ে শুরু করতে পারি। তাদেরকে আলাদা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষ জানবে প্রতিদিন কতজন আক্রান্ত ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে। মানুষ উৎসাহিত হবে এবং আক্রান্ত লোকের থেকে সাবধান হবে। যে ক’টা যন্ত্র আছে সে ক’টার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার করতে হবে। মানুষকে তার ফলাফল জানতে দিতে হবে। আরো যন্ত্র কখন ক’টা আসছে সেই তথ্য জানাতে হবে। একজনকেও যদি চিহ্নিত করতে পারি এবং তাকে আলাদা রাখতে পারি তাহলে তার থেকে হাজার মানুষকে আমরা রক্ষা করতে পারলাম। পরীক্ষার গুরুত্ব কোনোভাবে কোনো সময় খাটো করা যাবে না। পরীক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

এরোগ বিদেশ থেকে এসেছে। যখন এটা ঠেকানো খুবই সহজ ছিল সেটা আমরা করতে পারিনি। এখন এই দৈত্য বোতল থেকে বেরিয়ে গেছে। জাতির সবকিছু দিয়ে একে ঠেকাতে হবে।

আমরা জানি একে কীভাবে ঠেকাতে হয়। কিন্তু আমাদের মধ্যে এখনো কোনো গরজ আসছে না। আমরা জানি এটা কী, কিন্তু আমরা হৃদয়ঙ্গম করছি না। আমরা বলছি শারীরিক দূরত্বই এরোগ থেকে নিজে বাঁচা এবং অন্যকে বাঁচানোর একমাত্র পথ। সেকথা বলার জন্যই আমরা একটা সম্মেলন করার ব্যবস্থা করে ফেলতে পারি অতি উৎসাহে! অর্থাৎ কী বলছি আর কী করছি তার মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। এখনো বিষয়টা কথা বলাবলি, কাগজে লেখালেখি, টিভির টক শো’র আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছি। আমি আমার আচরণের কারণে কিছুদিনের মধ্যে, দু-তিন মাসের মধ্যে আমারই বাবা-মা, স্ত্রী, কিংবা দাদা-দাদি, কিংবা চাচা-চাচি, কিংবা বন্ধুবান্ধবের মৃত্যুর কারণ হতে যাচ্ছি এটা কিছুতেই মনে আসছে না।

দায়িত্ব পালনের খাতিরে অনেক উপদেশ দেয়া হচ্ছে কিন্তু সে উপদেশ যারা দিচ্ছেন তারা নিজেরা মানছেন কিনা, অন্যরা মানছেন কিনা এটা নিয়ে চিন্তিত হবার কারো গরজ কোথাও নজরে পড়ে না।

জাতির এই কঠিনতম সময়ে যেরকম নিদ্রাহীন, আহারহীনভাবে দিনরাত প্রস্তুতির কথা ছিল সেটা এখনো দেখা যাচ্ছে না। মহাপ্লাবন আসছে, বাঁধ রক্ষার যে শপথ চায় সে শপথের ডাক এখনো আসছে না।

কী কাজ করতে হবে সেটা আমরা জেনে গেছি। সকল মানুষের কাছ থেকে দূরত্ব রাখতে হবে। ঘন ঘন হাত ধুতে হবে।

উপদেশ দেয়া এক জিনিস আর উপদেশ পালন করার জন্য দেশব্যাপী প্রচণ্ড তাগিদ সৃষ্টি তা আরেক জিনিস। আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি না। আমার নিজেকে বাঁচানোর, আমার পরিবারের সদস্যদের বাঁচানোর, আমার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের বাঁচানোর প্রতি কি আমরা এতই অনাগ্রহী? নাকি আমরা যা কিছু আমাদের চারপাশে ঘটছে সব কিছুকে ‘ফেইক নিউজ’ ধরে নিয়ে স্বস্তি অনুভব করতে চাচ্ছি।

আশা করি দেশের তরুণরা দেশের এই মহাদুর্যোগের দিনে কারো দিকে না-তাকিয়ে নিজ নিজ উদ্যোগে এগিয়ে আসবে। তরুণরা নিজেদের সংগঠন তৈরি করে মানুষকে বাঁচানোর জন্য শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে এগিয়ে আসবে। যেরকম তারা সব সময় সব প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এগিয়ে এসেছে। এবার এটা কোনো স্থানীয় সুর্যোগ নয়। দেশব্যাপী এবং সব মানুষের দুর্যোগ।

তরুণরা এই কথাগুলো মানুষকে বুঝিয়ে বলে নিজ নিজ বাড়িতে থাকার জন্য বলতে পারে। যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাড়িতে বাড়িতে তরুণরা নিজেদের নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করে সবাই যার যার পরিবারকে বাড়িতে রাখা নিশ্চিত করবে। নিজ নিজ এলাকাকে মুক্ত এলাকা ঘোষণার চেষ্টায় থাকবে। যাদের জীবিকা বন্ধ হবে তাদের খাবারের ব্যবস্থার জন্য অন্য লোকের সহায়তা চাইতে পারে। বুঝাতে হবে যে গরিব যদি রোজগারের জন্য আবার পথে ঘাটে বের হয় তাহলে তারা অন্য সবাইকে আক্রান্ত করবে। তাদেরকে বাঁচার ব্যবস্থা করলে অন্যরা বাঁচতে পারবে।

স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অত্যন্ত সঠিক কাজ হয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা আগামী কয়েক মাস শুধু মানুষকে বাঁচানোর জন্য নিজেদের নিয়োজিত রাখবে। তাদের একমাত্র কাজ হবে মানুষকে বাঁচানো। পরিস্থিতি ক্রমে কঠিন থেকে কঠিনতর হবে। একমাত্র তরুণরাই এই কঠিন সময়ে মানুষকে সঙ্গ দিতে পারে। সাহস দিতে পারে। পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করতে পারে, সারা দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে।

তরুণরা শুরু করবে নিজ নিজ প্রস্তুতি নিয়ে, সংগঠন তৈরি করে, করণীয় কাজের তালিকা বানিয়ে, সম্ভাব্য সব পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা নিয়ে।

শুরুতে তাদের কাজ হবে এলাকার সকল পরিবারকে নিজ নিজ বাড়িতে থাকতে উদ্বুদ্ধ করা নিয়ে। পরিবারের সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজে দেয়া। এলাকার মানুষকে এক জায়গায় একত্র হতে নিরুৎসাহিত করা, দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য এলাকার মানুষকে প্রস্তুত করা। দুর্যোগকালীন সকল নিয়ম কঠিনভাবে মেনে চলার জন্য নিজেদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রাখতে হবে। তারা নিজেরা নিয়ম মানলে তখন এলাকার মানুষ তাদের নির্দেশিত নিয়মাবলীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে।

তরুণরা নিজেদের মধ্যে দেশব্যাপী যোগাযোগ রাখবে, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রাখবে- একে অপরকে উৎসাহিত করার জন্য।

সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তারা সকল তথ্য ও নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করবে। পরস্পরের মধ্যে পরামর্শ এবং উৎসাহ বিনিময় করবে।

এরকম কাজে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কিংবা পৃথকভাবে তরুণগোষ্ঠী, এনজিও-রা, সামাজিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানসমূহও এগিয়ে আসতে পারবে।

আমরা একটা জাতীয় দুর্যোগের মুখোমুখি। এই মহা দুর্যোগ আমাদের জাতীয় জীবনের সবকিছু তছনছ করে দিয়ে যেতে পারে। করোনার আক্রমণ যদি অন্যান্য দেশের তো মহা দুর্যোগে পরিণত না-ও হয় তাহলেও আমাদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রস্তুতি না নেয়ার কোনো সুযোগ আমাদের কাছে নেই।

প্রস্তুতি নিতে হবে, এবং সেটা চরম দুর্যোগকে কল্পনা করে নিতে হবে। কোনো পর্যায়ে যেন আমাদেরকে অপ্রস্তুত হতে না হয়।

আরেকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করি। যুদ্ধের সময় যেমন সারা দেশব্যাপী যুদ্ধ হয় তখন কোথাও কোথাও শত্রুকে পরাভূত করে ‘মুক্ত এলাকা’ সৃষ্টি করা হয়। করোনার যুদ্ধেও আমরা এরকম ‘করোনামুক্ত’ এলাকা তৈরি করতে পারি। সেটা একটা পাড়া হোক, একটা গ্রাম হোক, কিংবা আরো বড় এলাকা হোক। যাদের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটা করা হবে এলাকাবাসী তো বটেই, জাতি তাদের চিরদিন স্মরণ রাখবে।

দেশের প্রতিটি গ্রামে এনজিও-দের কর্মসূচি আছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ঋণের কর্মসূচি আছে। ক্ষুদ্রঋণের ঋণগ্রহীতারা শৃঙ্খলাবদ্ধতার সঙ্গে সকল দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য প্রশিক্ষণ প্রাপ্তই শুধু নয়, তারা একাজে বিশেষভাবে অভিজ্ঞ। তাদের শৃঙ্খলাবদ্ধতা, এবং অভিজ্ঞতাকে আসন্ন দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য কাজে লাগানোর প্রস্তুতি নিতে হবে। তাদেরকে নতুন নীতিমালা তৈরি করে দিতে হবে। তারা কীভাবে নিজ নিজ বাড়িতে থাকবে, ভাইরাসের আক্রমণের হাত থেকে কীভাবে নিজ পরিবারকে এবং গ্রামকে রক্ষা করবে এই নীতিমালায় তা পরিষ্কার করে দেয়া হবে। কারো বাড়িতে করোনার আক্রমণ দেখা দিলে সে ব্যাপারে তাদের করণীয় পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করে দিতে হবে। 

বলে দিতে হবে তারা তাদের স্বামী সন্তানদের কীভাবে বাড়িতে থাকতে উদ্বুদ্ধ করবে, সামনের মহাপ্লাবন কত বড় হবে, কতদিন এই প্লাবনে আমাদের ভুগতে হবে, এর মোকাবিলার জন্য আমাদের প্রধান অস্ত্রগুলো কি, প্রয়োজনে কার কাছে পরামর্শ ও সহায়তা পাওয়া যাবে, ইত্যাদি। তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে যে সাহস ও শৃঙ্খলা থাকলে যেকোনো শত্রুর মোকাবিলা করা যায়। এই মহাপ্লাবনের মোকাবিলায়ও আমরা শক্তি, সাহস, এবং শৃঙ্খলা দিয়ে জয় করবো। মহাপ্লাবন যত শক্তিশালীই হোক- এটা ক্ষণস্থায়ী। আমরা চিরস্থায়ী। আমাদেরকে তারা পরাজিত করতে পারবে না।

দেশের আরো বহু সরকারি, বেসরকারি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান আছে। গ্রামে গ্রামে তাদের অনেক কর্মী আছে। সকল প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের এই দুর্যোগরোধে নামিয়ে দিতে পারে।

মহা দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে জান বাঁচালাম কিন্তু বাঁচতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হলাম। পথের ভিখারী হলাম। যা কিছু পুঁজি সব গেল- তার উপায় হবে কী?

দেশের সাধারণ মানুষ বাঁচবে কী করে। দেশের অর্থনীতি দুমড়ে মুচড়ে পড়বে। তার কী হবে? যারা দিন এনে দিন খায় দুর্যোগ চলাকালে তাদের কী হবে?

সারা পৃথিবীর অর্থনীতি প্রায় ধসে পড়তে শুরু করেছে। এর শেষ কোথা পর্যন্ত গড়াবে? মাঝখানে বাংলাদেশের অর্থনীতি উঠে দাঁড়াবার কোনো শক্তি পাবে কিনা।

এখন থেকে এসব নিয়ে আমাদের চিন্তা শুরু করতে হবে। করোনা-পর্বের শেষে পৃথিবী পুনঃজন্ম হবে। বর্তমান এ পৃথিবীর সঙ্গে তার বোধহয় খুব বেশি একটা মিল থাকবে না। এই পুনঃজন্মের পৃথিবীতে বাংলাদেশের স্থান কোন স্থানে নির্ধারিত হবে।

করোনার দৈত্য বোতল থেকে বের হয়ে গেছে। এই দৈত্য কি পৃথিবী খাবে? তাকে যখন বোতলে ভরা হবে অথবা সে স্বেচ্ছায় বোতলে ফিরে যাবে তখন পৃথিবীর যাত্রা, বাংলাদেশের যাত্রা কোথা থেকে শুরু হবে।

মাত্র অল্প সময়ের মধ্যে সবকিছু আমাদের নির্ধারণ করতে হবে।

কোনোভাবেই সময় কিন্তু খুব বেশি আমাদের হাতে নেই। 

গালফবাংলায় প্রকাশিত যে কোনো খবর কপি করা অনৈতিক কাজ। এটি করা থেকে বিরত থাকুন। গালফবাংলার ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন।
খবর বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন: editorgulfbangla@gmail.com

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস

বাংলাদেশী নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদ।

সংশ্লিষ্ট খবর