সোমবার ১লা জুন ২০২০ |
ম্যাথু উইলস । অনুবাদ: হাসান তানভীর

সমসাময়িক প্রতিবেদনে ‘স্প্যানিশ ফ্লু’

 মঙ্গলবার ১৪ই এপ্রিল ২০২০ বিকাল ০৫:৫৩:০২
সমসাময়িক

১০০ বছর আগে স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীটি ব্ল্যাক ডেথের পর সবচেয়ে মারাত্মক বৈশ্বিক রোগের প্রাদুর্ভাব হিসেবে হাজির হয়েছিল। মানুষ তখন কী ভাবছিল?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যত মানুষ মারা গিয়েছিল, ১৯১৮-১৯ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ মহামারীর কারণে তার চেয়ে বেশি লোক মারা গিয়েছিল। সারা বিশ্বে মৃতের সংখ্যা ছিল ২০-৪০ মিলিয়ন থেকে এর দ্বিগুণ। ফ্লুর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছিল; মারা গিয়েছিল প্রায় ৬ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ। এটি ছাড়া একমাত্র আমেরিকার গৃহযুদ্ধেই এর চেয়ে বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল।

সে সময় চিকিৎসা বিভাগ এ রোগ এবং এর বিস্তার মোকাবেলায় হিমশিম খেয়ে গিয়েছিল। এক শতাব্দী আগের চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক জার্নালগুলো পর্যালোচনা করলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিপর্যয় থেকে সৃষ্ট বিশ্বব্যাপী চিকিৎসা সংকটের অদ্ভুত একটি দিক চোখে পড়ে।

ইংরেজি ভাষাভাষীরা প্রথমে মহামারীটিকে ‘স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা’ বা ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ হিসেবে জানত। নিরপেক্ষ স্পেনে যুদ্ধকালীন সংবাদপত্রে কোনো সেন্সরশিপ ছিল না। তাই স্বাধীন সংবাদপত্র দেশে ফ্লু ছড়িয়ে পড়ার সংবাদ এমনভাবে প্রকাশ করে, যাতে জাতি অন্যদের চেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে এমন ভাব প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু আসলে এমন ছিল না। ‘ইনফ্লুয়েঞ্জা’ শব্দটি ইতালীয় ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘প্রভাব’। সংক্ষিপ্ত ‘ফ্লু’ শব্দটি বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে বেশি ব্যবহূত হয়েছে। ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ‘গ্রিপ’ (মূলত ফরাসি শব্দ, ইংরেজিতে এখনো কিছুটা প্রচলন আছে) সম্পর্কে মেরিল্যান্ড জরিপ যে প্রমাণ পেশ করেছিল তা নিচে আলোচনা করা হলো।

১৯১৮ সালের অক্টোবরে কানাডিয়ান পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশনের ‘পাবলিক হেলথ জার্নাল’ শিকাগোর স্বাস্থ্য কমিশনার ও আমেরিকান সার্জন জেনারেলের একটি পত্রিকা পুনর্মুদ্রণ করে, যার লক্ষ্য ছিল এ রোগ সম্পর্কে ‘প্রত্যেক পুরুষ, মহিলা এবং শিশু’কে অবহিত করা। এতে এমন কিছু ছিল না, যা বর্তমানে অদ্ভুত লাগতে পারে—‘আপনি অসুস্থ হলে বিছানায় থাকুন এবং প্রচুর পরিমাণে তরল গ্রহণ করুন; অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসা নিন।’ বেশির ভাগ লোক অবশেষে তিন-চারদিন পর সুস্থ হয়ে যায়। মৃত্যু হয় সাধারণত জটিলতা থেকে, যেমন নিউমোনিয়া। সংক্রামক ব্যাধি হওয়ায় কেবল হালকা লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছিল এমন কারো থেকে জীবাণু ছড়িয়ে গিয়ে তীব্র আকার ধারণ করতে পারত। (আপনার নাক ঢেকে রাখুন এবং থুথু ফেলবেন না) এখানে পারিভাষিক শব্দটি হলো ‘জার্ম’ বা ‘জীবাণু’। আধুনিক ভাইরাস শব্দটি ১৮৯২ সালে দিমিত্রি ইভানোভস্কি ব্যবহার করেছিলেন। তবে সে সময় শব্দটি সাধারণত প্রচলিত ছিল না বলে মনে হয়। ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ ১৯১৮ সালের নভেম্বর সংখ্যায় এ রোগ সম্পর্কে অনেক প্রশ্নের তালিকা তৈরি করেছিল, যার উত্তর এখনো দেয়া সম্ভব হয়নি। এটি শুরু হয়েছিল নাটকীয়ভাবে:

মহামারীর মতো দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ায় এবং এর বহুরূপী বৈশিষ্ট্যের কারণে একে ভয়ংকর বলে বিবেচনা করা হয়েছিল। এটি তথাকথিত ‘স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা’ নামে শতাব্দীকালব্যাপী পরিচিত ছিল, যা এখনো রহস্যময় রোগ হিসেবে রয়ে গেছে। চিকিৎসকরা আমাদের নিশ্চিত করেছেন যে একটি হালকা এবং প্রায়ই অচেনা রোগ আকারে এটি সর্বদা আমাদের সঙ্গে থাকে। তাহলে কেন হঠাৎ এটি একটি বিশাল বিস্ফোরণের মতো জ্বলে উঠল, যা বিশ্বের বৃহত্তর অংশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল?

‘পাবলিক হেলথ রিপোর্টস’ ১৯১৯ সালের মার্চ সংখ্যায় মেরিল্যান্ড অংশে এ রোগের প্রাথমিক মহামারীসংক্রান্ত গবেষণার বিবরণ দেয়া হয়েছিল। তাতে উল্লেখ ছিল, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ অংশে এ রোগের প্রতিবেদন দেয়ার প্রয়োজন ছিল না এবং চিকিৎসকরা জরুরি ত্রাণকাজে ব্যস্ত ছিলেন।’ সাধারণ পদ্ধতিতেই রোগের লক্ষণ গ্রহণ করা হতো। মহামারী প্রতিরোধের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থাপনা ছিল না।

মার্কিন জনস্বাস্থ্য পরিষেবা (১৭৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত) বাল্টিমোর এবং রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলে ‘মহামারীটির প্রথম ধাক্কা অনুভূত হওয়ার পর’ ঘরে ঘরে জরিপ চালিয়েছে। অন্যান্য অনুসন্ধানের মধ্যে সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ছোট শিশুদের মধ্যে ফ্লুর প্রকোপ খুব বেশি, তবে তাদের মৃত্যুর হার অপ্রত্যাশিতভাবে কম। মৃত্যুর হার ‘২০-৪৪’ বছর বয়সীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। বার্ষিক ফ্লুর প্রকোপ সাধারণত একটি জনসংখ্যার সবচেয়ে কম বয়সী এবং সবচেয়ে বয়স্ক (এবং কম প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন) সদস্যদের সবচেয়ে বেশি আঘাত করে। মেরিল্যান্ডের ডাটা এ মহামারীর বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছিল, যা তরুণ ও মধ্যবয়সীদের মধ্যে অস্বাভাবিক উদ্বেগ তৈরি করে, যেন যুদ্ধ শুরু হয়েছে।

এ নিবন্ধগুলো থেকে বোঝা যায়, ফ্লু যত ভয়াবহভাবে আঘাত করেছিল, জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা তাদের কাজগুলো সে অনুপাতে যথাসম্ভব যথাযথভাবে করেছিলেন। সাধারণ সতর্কতা জারি, জনসাধারণের মধ্যে যত্রতত্র থুথু ফেলার বিরুদ্ধে প্রচারণা এবং জনগণ ও অঞ্চলে রোগের গতিপথ নির্ণয় করে তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে মহামারী শুধু মেডিকেল চ্যালেঞ্জ নয়, সামাজিক চ্যালেঞ্জও বটে।

ভাইরাসগুলো ক্রমান্বয়ে পাখি, শূকর ও মানব উপাদানের সঙ্গে মিশে যায়। এরপর আমাদের ইমিউন সিস্টেম আগে কখনো দেখেনি এমন নতুন প্রতিলিপি তৈরি করে। এভাবে বিস্তৃত মহামারীটি পৃথিবীর জন্য বিরাট এক ঝুঁকি হিসেবে থেকে যায়। সর্বোপরি ‘মহামারী’র ইংরেজি প্রতিশব্দ প্যান্ডেমিক, যা গ্রিক ভাষা থেকে এসেছে। এর অর্থ ‘সমস্ত মানুষ’।


গালফবাংলায় প্রকাশিত যে কোনো খবর কপি করা অনৈতিক কাজ। এটি করা থেকে বিরত থাকুন। গালফবাংলার ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন।
খবর বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন: editorgulfbangla@gmail.com

ম্যাথু উইলস: প্রাকৃতিক ইতিহাসবিষয়ক লেখক

সংশ্লিষ্ট খবর