বৃহঃস্পতিবার ৪ঠা জুন ২০২০ |

সিঙ্গাপুরে বিদেশী শ্রমিকদের পাশে বাঙালি মেডিকেল বিশেষজ্ঞ

 রবিবার ৩রা মে ২০২০ সকাল ১০:২০:১০
সিঙ্গাপুরে

সিঙ্গাপুরের অভিবাসী শ্রমিকরা কভিড-১৯ রোগের কবলে পড়েছেন সবচেয়ে ভয়াবহভাবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, দেশটির ১৬ হাজার ১৬৯ জন আক্রান্ত রোগীর মধ্যে ১৩৮৪২ জনই হলেন ডরমেটরিতে বসবাসকারী অভিবাসী শ্রমিক। অর্থাৎ দেশটির ৮৫.৬ শতাংশ করোনা রোগীই এই অভিবাসীরা। তাদের সহায়তা দিতে অনেক স্বাস্থ্যসেবা কর্মী এখন এসব ডরমেটরি বা আশেপাশেই তাদের সেবা দিচ্ছেন। 

দেশটির বিশ্ববিখ্যাত ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থা (এনইউএইচএস) থেকে ৮০০ মেডিকেল কর্মী এখন স্বেচ্ছায় এসব ডরমিটরিতে বসবাসরতদের সেবা দিচ্ছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির অধ্যাপক জুবাইর আমিন। তিনি নিজের নিয়মিত কর্মঘণ্টার বাইরে সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে ১৪ ঘণ্টা করে এই সেবা দিচ্ছেন। এ খবর দিয়েছে মাদারশিপ নামে সিঙ্গাপুরের একটি সংবাদ মাধ্যম।

খবরে বলা হয়, বাংলাভাষী জুবাইর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের নেওন্যাটোলোজি বিভাগের প্রধান।

তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির মেডিকেল অনুষদে শিশুরোগ বিষয়ে অধ্যাপনা করান। গত তিন সপ্তাহ ধরে দিনে ৭ ঘণ্টা করে সপ্তাহান্তে ১৪ ঘণ্টা করে স্বেচ্ছাসেবা দিচ্ছেন তিনি। তিনি মূলত আস্তানা গেঁড়েছেন সুংগেই টেনগাহ লজে, যেটি সিঙ্গাপুরের সর্ববৃহত ডরমিটরি। এখানে ২৫ হাজার কর্মীর থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।

এই বৃহদাকার ডরমিটরিতে একটি মেডিকেল পোস্টে একদল ডাক্তার, নার্স, প্যারামেডিকস, ফার্মাসিস্ট ও অন্যান্য কর্মী কাজ করছেন। এই দলে ৪-৬ জন ডাক্তার থাকেন। জুবাইর বলেন, এই ৪ জন মিলে প্রতিদিন ১৫০ জন করে রোগী দেখছেন তারা। তিনি বলেন, “এক ধরণের মানসিক চাপ রয়েছে। কারণ প্রতিদিন আপনি প্রচুর সংখ্যক রোগী দেখতে হচ্ছে।”

জুবাইর এখন যেখানে কাজ করছেন, সেটির সঙ্গে তার গতানুগতিক কাজের আকাশ পাতাল তফাত। শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি ছোট শিশু ও অপরিপক্ক শিশুদের নিয়ে কাজ করেন। হাসপাতালে বা ক্লিনিকে। কিন্তু এই ডরমেটরিতে স্বেচ্ছাসেবার ডাক যখন এলো, তিনি রাজি হলেন। তিনি স্বীকার করছেন যে, নিয়মিত চাকরির চেয়ে এই স্বেচ্ছাসেবার ব্যবধান ব্যপক। তিনি বলেন, “এখানকার সাংগঠনিক অবস্থা ও পরিবেশ হাসপাতালের চেয়ে একেবারেই আলাদা। হাসপাতালে অনেক সরঞ্জাম থাকে। সেখানে একেবারে অ্যাডভান্সড পর্যায়ের সেবা দেওয়া হয়। আর এখানে আমাদের ভিন্ন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে। আমরা একেবারে মৌলিক সেবায় চলে যাচ্ছি। খুবই ঝুঁকিপূর্ণ কিছু রোগীকে সেবা দিচ্ছি।”

খোলা আকাশের নিচে এসব মেডিকেল পোস্টে নেই কোনো এয়ার কন্ডিশনার। সারাদিন পিপিই পরে থাকতে হয়। প্রচণ্ড গরম, আর ঘাম—এই যেন সম্বল হয়ে উঠেছে তার। তবুও তার ভাষ্য, “এটি খুবই ভিন্ন ধরণের পরিবেশ। কিন্তু আমি আবারও বলি, খুবই সন্তুষ্টি পাই এই কাজ করে।”

অধ্যাপক জুবাইর স্মরণ করেন, এক বাঙালি শ্রমিকের সঙ্গে তার কথোপকথনের কথা। তিনি বলেন, এক বাঙালি তাকে বলেছিলেন, “শুধু আপনার সাথে [বাংলায়] কথা বলতে পেরেই আমার অনেক সুস্থ লাগছে।”

তিনি বলেন, ডাক্তার হিসেবে আমরা প্রায়ই রোগীর কথা শোনা, তাকে আশ্বস্ত করার গুরুত্বকে পাত্তা দিই না। এই ধরণের পরিস্থিতিতে এটি আসলে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সত্যিকার অর্থে, যেকোনো কিছুর চেয়েই এখন এটি গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য কিছু স্বস্তির শব্দই বিরাট পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

খুব অল্প সময়ের মধ্যেই চিকিৎসা দিতে হয় বলে শ্রমিকদের ভাষায় কথা বলতে পারেন এমন স্বেচ্ছাসেবী থাকলে অনেক উপকার হয়।

এসব ছাড়াও, একজন মুসলমান হিসেবে রমজানে মানুষের সেবা করার মধ্যেও পরিতৃপ্তি পান জুবাইর। কিন্তু আবার এ-ও বলতে ভুললেন না, রমজান হোক আর না হোক, এই ধরণের পরিস্থিতিতে ডাক আসা মানে দায়িত্বের ডাক। স্বেচ্ছাসেবা হলেও এই ধরণের দায়িত্বের ডাক এড়ানো যায় না। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, আর কতদিন এভাবে এই ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিয়ে যাবেন অচেনা বিদেশি শ্রমিকদের? উত্তরে তিনি বললেন, “যতদিন প্রয়োজন হয়। এর কোনো শেষ নেই। আর যতদিন আমি পারি।”

গালফবাংলায় প্রকাশিত যে কোনো খবর কপি করা অনৈতিক কাজ। এটি করা থেকে বিরত থাকুন। গালফবাংলার ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন।
খবর বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন: editorgulfbangla@gmail.com

মানবজমিন

সংশ্লিষ্ট খবর