মঙ্গলবার ১লা ডিসেম্বর ২০২০ |

করোনা: সংকট কী শুধুই চিকিৎসা ব্যবস্থায়?

শায়রুল কবির খান |  রবিবার ৩রা মে ২০২০ সন্ধ্যা ০৬:১৫:১৯
করোনা:

শায়রুল কবির খান


করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে আজ বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রই মহামারির মধ্যে পতিত হয়েছে। সংক্রমণের ধরন সহজে দৃশ্যমান না হওয়ায় অস্থিরতার মধ্য দিয়ে অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হচ্ছে। কিন্তু এই সংগ্রাম কতদিনের, এ ব্যাপারে কারও কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই। করোনাভাইরাস অর্থাৎ কোভিড-১৯ ইস্যুতে ইতোমধ্যে বিশ্বের পরাশক্তিদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, এর দায় কার এবং এর সমাধান কোথায়— এসব নিয়ে বিশ্বনেতাদের বাকযুদ্ধ চলছে।

এদিকে বাংলাদেশেও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে দোষারোপের রাজনীতি শুরু হয়েছে। অবশ্য তার যৌক্তিক কারণও আছে।

পর্যবেক্ষক করলে দেখা যায়— স্বাস্থ্যসেবা খাত নিয়ে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ছোট্ট দ্বীপ রাষ্ট্র ‘মালদ্বীপ’, দেশটি তার জিডিপির ৯.০৩ শতাংশ ব্যয় করে জনস্বাস্থ্য খাতে। ৫.৫৫ শতাংশ ব্যয় নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে নেপাল। ভারতের চেয়ে শ্রীলংকার ব্যয় বেশি,  ৩.৮১ শতাংশ। ভারতের ব্যয় ৩.৫৩ শতাংশ।

সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা বাংলাদেশে। জিডিপির মাত্র ২.২৭ শতাংশ ব্যয় করা হয় আমাদের স্বাস্থ্যসেবা খাতে। পাকিস্তানের ব্যয়ও ২.৯০ শতাংশ।

আমাদের সরকার প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন। মন্ত্রী এমপি মহোদয়রা গলার আওয়াজ উঁচু করে বলে বেড়ান— গত বছর এত লক্ষ কোটি টাকার বাজেট ছিল,  এবছর আমরা এত লক্ষ কোটি টাকার বাজেট দিয়েছি। এই হলো আমাদের উন্নয়ন।

বিগত ১২ বছরে যত উন্নয়নের আওয়াজ, বাস্তবে তার সামান্য গুণগত পরিবর্তনও হয়নি। এর বড় প্রমাণ হলো বর্তমানের চালচিত্র, বাস্তব চিত্রটা নাগরিকরা এখন উপলব্ধি করছেন। কিছুদিন আগেও দেখেছেন ডেঙ্গু মশার সংক্রমণ রোধে চিকিৎসা ব্যবস্থার হালচাল। কিন্তু নাগরিকদের যে কয়টি মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের কথা রাষ্ট্রের, তার মধ্যে অন্যতম হলো খাদ্য ও চিকিৎসা। খাদ্যের অভাবেে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, অতীতেও ছিল। চিকিৎসার অভাবে রোগ জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে মহামারি সৃষ্টি হয়।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের চিকিৎসা নিয়ে নানাভাবে দোষ দেওয়া হচ্ছে ডাক্তারদের, নার্সদের। কিন্তু দোষটা আসলে রাষ্ট্রের অর্থাৎ সরকারের ব্যবস্থাপনার। ২৭ এপ্রিল বিবিসি বাংলার অনলাইন এডিশনে লিড নিউজের শিরোনাম ছিল ‘সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশে এত বিব্রান্তি কেন’, বিবিসি বাংলার এই শিরোনাম থেকেই সরকার ও নাগরিকের সম্পর্ক পরিষ্কার বুঝতে পারা যায়। সরকার বিনা ভোটে রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।  তারপরও এখনো সময় আছে, বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর দমন-পীড়ন বাদ দিয়ে জাতীয় সংকটে জাতীয় ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা করুন।    

এক ও অদ্বিতীয়, এই বিশ্ব মণ্ডলের যিনি একমাত্র মালিক, তিনি তার বান্দার পরীক্ষা নিচ্ছেন? রাষ্ট্রনীতিকদের নিষ্ঠুর শাসন ব্যবস্থার পরিণতি? নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দের দ্বায়িত্ববোধ হারিয়ে যাওয়ার বহিঃপ্রকাশ? নাকি সাধারণ নাগরিকরা নিজের স্বার্থে জীবন ও জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় রাজনীতির সেনসিবিলিটি হারিয়েছে? এর উত্তর একটি লেখার মধ্যে দিয়ে খুঁজে পাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আর হয়তো তা আমার দ্বায়িত্বও নয়। দ্বায়িত্বটা যাদের, আশাকরি তারা খুঁজবেন।

বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্রে বিভিন্নরকম সংকট আসে, যে কোনো সংকট আসুক, সংকট ঘনীভূত হওয়ার পূর্বেই তা মোকাবিলা করে সমাধানের জন্য রাজনৈতিক ঐক্যমতের বিকল্প নেই। কিন্তু একটি সংকট জন্ম নেওয়ার পর থেকে সংকট ঘনীভূত হওয়া পর্যন্ত আমাদের দেশের সচেতন নাগরিক সমাজের নেতৃত্বের অংশটি বেশির ভাগ সময়েই সংকটকে প্রধান দুই দলের মতাদর্শগত সংঘাত হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। সরকার আর বিরোধী দলের মতাদর্শগত সংঘাতের মধ্যে যৌক্তিক কথাটা তুলে ধরতে পারেন নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দরা। নিপীড়নমূলক সমাজের মধ্যেও নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দদেরই মান-অভিমান ভুলে এই সংকটে এগিয়ে আসতে হবে।

গোটা দেশে এখন সামগ্রিক সংকট মোকাবিলার সময়েও জনগণের কোনো অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়নি। জনগণের ন্যায্য অধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো কতটুকু মনযোগী? ক্ষমতাশীন দল জাতীয় সংকটের মধ্যেও বিরোধী দলকে দমন-পীড়ন ও দোষারোপের চক্রে রেখে ক্ষমতায় টিকে থাকবার কৌশলেই ব্যস্ত। ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মৌখিক দাবি পাশ কাটিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং তাদের অশুভ কর্মতৎপরতা জনগণের নামে চালালেও তাতে জনগণের সত্যিকারের আকাঙ্ক্ষার বাস্তব প্রতিফলন নেই। দিনে দিনে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে সংকট আরো ঘনীভূত হতে চলছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে— ক্ষমতার উৎস জনগণ। জনগণকে ভুলে যাওয়ার পরিণতি কখনোই ভালো হয় না, অতীতের অভিজ্ঞতাও তাই বলে।

যে কোনো সংকটে সাধারণ নাগরিকদের দায় কম। নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার মধ্যে দিয়ে চলতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ের দুটো উদাহরণই যথেষ্ট। করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রকাশের পর লকডাউন ঘোষণা না করে ছুটির ঘোষণা করা হলো। মানুষ দল বেধে ঈদের ছুটির মতো বাড়িতে ফিরে গেলেন। কয়েকদিন পর ফের গার্মেন্টস চালু হওয়া এবং বেতনের খবর শুনে শ্রমিক ভাই-বোনেরা পায়ে হেঁটে দল বেঁধে রাজধানীতে আসলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে আবারও শ্রমিকদের গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে হলো। এই দায় কার? সাধারণ নাগরিকদের নাকি রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার?

সাধারণ নাগরিকরা উদ্বুদ্ধ হন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে। প্রধান-প্রধান রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নাগরিকরা তাদের কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু জনগণের আকাঙ্ক্ষা যখন হারিয়ে যায়, ক্ষমতাশীন দল ক্ষমতায় টিকে থাকবার জন্য  অকৌশলের পথ যখন প্রস্থ করেন, তখন সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে তৈরি হয় অস্থিরতা। সেই সময়টাতেই নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দের এগিয়ে আসার প্রয়োজন হয়।  তখন যদি তারা এগিয়ে না আসেন, তাহলে রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকদের সংযোগের দ্বায়িত্বটা কে পালন করবেন?


আমাদের সমাজে যে সব প্রতিষ্ঠানে নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দেরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তারা হয় সরকারের অনুগত, না হলে কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়ে পরিণত হয়েছেন। এদের মধ্যে অন্যতম হলো: ব্যবসায়ী সমাজ, সাংবাদিক সমাজ, শিক্ষক সমাজ, চিকিৎসক সমাজ, আইনজীবীসহ প্রায় সর্বস্তরেই একই পরিস্থিতি। কিন্তু তাদের তো উচিত রাষ্ট্রের অসংলগ্ন বিষয়গুলো সাদা চোখে রাষ্ট্রনীতিকদের কাছে তুলে ধরা।

দেশের জাতীয় সংকটে, বিশেষ করে আজকের সংকটে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে বস্তুনিষ্ঠভাবে নাগরিকদের সমস্যা তুলে ধরতে উদ্যোগ গ্রহণ করলেই এই সমস্যার অন্তর্নিহিত কারণ অনেকাংশে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে। আজ আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের এই  অসহায়ত্ব থেকে পরিত্রাণ দেওয়ার জন্য আপনারা উদ্যোগ গ্রহণ করুন। তবেই সাধারণ নাগরিকরা হয়তো আশার আলো দেখতে পাবেন। সময় খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে। কিন্তু সংকট মোকাবিলায় বিরোধীদলগুলোর কোনো বক্তব্যকেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না।              

গালফবাংলায় প্রকাশিত যে কোনো খবর কপি করা অনৈতিক কাজ। এটি করা থেকে বিরত থাকুন। গালফবাংলার ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন।
খবর বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন: editorgulfbangla@gmail.com

লেখক: শায়রুল কবির খান

মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক কর্মী। সহ-সভাপতি, জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)।

সংশ্লিষ্ট খবর