বুধবার ২১শে অক্টোবর ২০২০ |

মধ্যপ্রাচ্যের দরদি অভিভাবক কুয়েতের আমির শেখ সাবাহ

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর |  মঙ্গলবার ২৯শে সেপ্টেম্বর ২০২০ বিকাল ০৫:৩৭:২৪
মধ্যপ্রাচ্যের

কুয়েতের আমির শেখ সাবাহ

২৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার বিকেলে ইন্তেকাল করেছেন কুূয়েতের আমির শেখ সাবাহ আলজাবের। তাঁর মৃত্যুতে উপসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যসহ পুরো বিশ্বের আরব, মুসলিম এবং অন্যান্য দেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।  

গালফবাংলার পাঠকদের জন্য আমরা এই নেতার সংক্ষিপ্ত জীবন ও কর্ম তুলে ধরছি-

২০০৬ সালের ১৫ জানুয়ারি মারা গেলেন কুয়েতের তৃতীয় আমির জাবের আল-আহমাদ আল-সাবাহ। তাঁর ‍মৃত্যুর পর রাজপরিবারের নিয়ম অনুযায়ী ১৬ জানুয়ারি দাওলাত আল-কুয়েতের চতুর্থ আমির হলেন ক্রাউন প্রিন্স সাদ আল-সালিম আল-সাবাহ। একই সময় নতুন ক্রাউন প্রিন্স ঘোষণা করা হলো পূর্ববর্তী প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী সাবাহ আল-আহমাদ আল-জাবেরকে। 

রাজপরিবারে কাউকে ক্রাউন প্রিন্স ঘোষণা করা মানে, পরবর্তী আমির তিনিই হবেন। সে হিসেবে নতুন আমির সাদ আল-সালিমের পর আমির হবেন সাবাহ আল-আহমাদ। তবে সেই সৌভাগ্যের জন্য খুব বেশি অপেক্ষা করতে হলো না সাবাহ আল-আহমাদকে।

নতুন আমির সাদ আল-সালিমের বয়স তখন ৭৯। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নানা প্রকার অসুস্থতায় ভুগছিলেন। হুইলচেয়ার ছাড়া চলতে পারতেন না এবং শ্বাসকষ্টের দরুণ খুব বেশি কথাও বলতে পারতেন না। তার শারীরিক অপারগতার কথা চিন্তা করে কুয়েতের ন্যাশনাল এসেম্বলির সদস্যগণ তাঁকে আমিরের পদ থেকে অব্যাহতি নেয়ার সুপারিশ করেন। 

এসেম্বলির পরামর্শে আমির সাদ আল-সালিম ক্ষমতাগ্রহণের এক সপ্তাহ পর ২৩ জানুয়ারি আমিরের পদ থেকে অব্যাহতি নেন। ২৪ জানুয়ারি কুয়েতের নতুন আমির ঘোষণা করা হয় ৮০ বছর বয়স্ক ক্রাউন প্রিন্স সাবাহ আল-আহমাদকে।

দাওলাত আল-কুয়েতের নতুন আমির সাবাহ আল-আহমাদ আল-জাবেরের বয়স ৮০ হলেও শারীরিকভাবে তিনি বেশ সুস্থ ছিলেন এবং রাষ্ট্রপরিচালনায় তাঁর ছিল দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ১৯৬৩ সাল থেকে একাধারে ৪০ বছর তিনি কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। 

এছাড়াও ১৯৬১ সালে কাতার স্বাধীন হওয়ার পর থেকে তিনি কুয়েতের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কমিটিতে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। বিশেষত, একজন আন্তর্জাতিক কুটনীতিক হিসেবে তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ-আমেরিকায় সমানভাবে সমাদৃত ছিলেন।

সাবাহ আল-আহমাদ কুয়েতের আমির হওয়ার পর আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে গভীর সুসম্পর্ক গড়ে তুলেন। ৪০ বছর পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে তাঁর তেমন বেগ পেতে হয়নি। ফলে বিদেশি বিনিয়োগ টানতে এবং নিজ দেশের ব্যবসায়ীদের বিদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে তিনি সফলতা অর্জন করেন। সুসম্পর্কের দরুণ আমেরিকার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বরাবরই ছিল উষ্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে একযোগে কাজ করে চলছিলেন। 

এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর নেতাদের কাছে তিনি সকলের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব পালন করেন। যেকোনো সংকট ও সমস্যায় আরব নেতারা অভিভাবক হিসেবে সাবাহ আল-আহমাদের শরণাপন্ন হন। অনেক সময় তিনি নিজ উদ্যোগেই সমস্যা নিরসনে উদ্যোগী হতেন।

২০১৩ সালে কুয়েতের আমির সিরিয়া ও ইরাকি শরণার্থীদের সহযোগিতায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার দান করেন এবং ২০১৫ সালে দান করেন ৫০০ মিলিয়ন ডলার। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তার এ সহযোগিতা-অর্থায়ন সর্বোচ্চ। 

মানবতার সেবায় তাঁর এ অনন্য অংশগ্রহণের জন্য ২০১৪ সালে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন তাঁকে সম্মানজনক ‘এক্সামপ্লারি হিউম্যানিট্যারিয়ান অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করেন। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে এ সম্মাননা প্রদান করা হয়।

১৯৬৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সাবাহ আল-আহমাদ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি বড় বড় সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। ১৯৮০ সালে শুরু হওয়া ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধে তিনি ছিলেন সক্রিয়। ১৯৮৮ সালে দুই দেশের যুদ্ধ বন্ধ হলে ইরাক বিশাল ঋণের ফাঁদে আটকা পড়ে। 

এ সময় কুয়েত ইরাকের ৬৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ মওকুফ করে। অথচ দুই বছর পর ১৯৯০ সালের আগস্ট মাসে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন মিথ্যা যুক্তি দিয়ে কুয়েত আক্রমণ করেন এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালান। কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সাবাহ আল-আহমাদ এ সময় কুয়েতকে রক্ষা করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান এবং তাঁর কূটনৈতিক তৎপরতায় ছয় মাসের মাথায় ইরাকি বাহিনী কুয়েত ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।

২০১৭ সালে যখন সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের চারটি দেশ কাতারের বিরুদ্ধে বয়কটের ঘোষণা দেয় তখন কুয়েত নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে। 

শুধু তাই নয়, বয়োবৃদ্ধ আমির এই সংকট নিরসনে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেন এবং বয়কট তুলে নেয়ার ব্যাপারে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালান। কিন্তু, তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সৌদি আরব, আরব আমিরাত, মিশর, বাহরাইন মধ্যপ্রাচ্যের সৌহার্দ্য বিনষ্ট করে বয়কট অব্যাহত রাখে। ভ্রাতৃপ্রতীম আরব দেশগুলোর এমন হঠকারী সিদ্ধান্তে হতবাক হয়ে যায় পুরো মুসলিমবিশ্ব।

পারস্য উপসাগরের পশ্চিম কোলঘেঁষা মাত্র ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটারের ছোট্ট এক দেশ কুয়েত। জনসংখ্যা সব মিলিয়ে ৪৪ লাখ। অথচ সম্পদের হিসেবে পৃথিবীর অষ্টম দেশ। মাথাপিছু আয় ২৮ হাজার ডলারেরও বেশি। কুয়েতের রাজধানী কুয়েত সিটি পৃথিবীর আধুনিক এবং সুন্দর শহরগুলোর একটি। 

তেল সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং যোগ্য নেতৃত্বের ফলে খুব দ্রুত কুয়েত বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। আরববিশ্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং ব্যবহারে কুয়েত সবার চেয়ে এগিয়ে। ইউরোপ-আমেরিকার অনেক মানুষ এখন ছুটি কাটাতে অন্য কোথাও না গিয়ে কুয়েতে আসে।

২০০৪ সালে সাবাহ আল-আহমাদ কুয়েতের প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় এক দুঃসাহসী উদ্যোগ হাতে নেন। কুয়েতের দক্ষিণ অংশে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এক বিলাসবহুল নগরী নির্মাণের প্রকল্প উদ্বোধন করেন তিনি। এই কৃত্রিম শহরে সরাসরি সাগর থেকে অসংখ্য ছোট ছোট খাল কেটে এনে পুরো এলাকাকে দ্বীপের আবহে তৈরি করা হচ্ছে। 

এই আবহ সৃষ্টি করতে পরিকল্পিতভাবে নতুন করে ২০০ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। ২৫ বছর মেয়াদী এই প্রকল্পের কাজ শেষ হতে আরও প্রায় ৮ বছর সময় লাগবে। বিলাসী এ নগরী নির্মাণ শেষ হলে এখানে বসবাস করতে পারবে আড়াই লাখ মানুষ। পৃথিবীর সর্বাধুনিক বাসস্থান এবং সর্বোচ্চ বিলাসের ব্যবস্থা করা হবে এখানে। মধ্যপ্রাচ্যের ধনী শেখরা বিনোদনের জন্য ইউরোপ-আমেরিকা গিয়ে অর্থ খরচ না করে নিজেদের অঞ্চলে অর্থব্যয় করে, এ কথা চিন্তা করেই এ বিলাস নগরী গড়ে তোলা হচ্ছে।

কুয়েত প্রথম আরব দেশ যারা সর্বপ্রথম নারীদের ভোটাধিকার প্রদান করে। কুয়েতের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বর্তমান আমির সাবাহ আল-আহমাদের নেতৃত্বে এমন যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২০১৪-১৫ সালের আন্তর্জাতিক নানা পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আরববিশ্বের মধ্যে সবচে কম লিঙ্গবৈষম্য কুয়েতে। নারীর অধিকার রক্ষায় সবসময় সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছেন বর্তমান আমির।

কুয়েতে রয়েছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও চিকিৎসাসেবা সম্বলিত ১৪টি সরকারি হাসপাতাল। এমনকি আরব বিশ্বের সবচে বড় হাসপাতাল নির্মিত হয়েছে কুয়েত সিটিতে। বিগত ১৫ থেকে ২০ বছরে কুয়েত মধ্যপ্রাচ্যের রোগীদের জন্য চিকিৎসাসেবার অভয়াশ্রয় হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। আমির সাবাহ আল-আহমাদ সম্প্রতি নতুন আরও কয়েকটি হাসপাতাল নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন।

কুয়েতের সঙ্গে বাংলাদেশেরও রয়েছে গভীর সম্পর্ক। আশির দশক থেকে দেশটি নির্মাণে অংশগ্রহণ করে আসছে হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক। সাধারণ শ্রমিক থেকে শুরু করে প্রকৌশলী, ডাক্তার, শিক্ষক এবং অন্যান্য পেশার কয়েক লাখ বাঙালি কাজ করে কুয়েতে। কুয়েতের অনন্য সফলতার পেছনে তাদেরও রয়েছে অসামান্য অবদান। সকল সমস্যা কাটিয়ে ভবিষ্যতে এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও গভীর হবে, আমরা এমনটিই বিশ্বাস করি।

গালফবাংলায় প্রকাশিত যে কোনো খবর কপি করা অনৈতিক কাজ। এটি করা থেকে বিরত থাকুন। গালফবাংলার ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন।
খবর বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন: editorgulfbangla@gmail.com

কাতার,কাতারের খবর,দোহা,দোহার খবর,প্রবাসী,কাতার প্রবাসী,প্রবাসীর খবর,Qatar,Doha,Qatar News,Doha News,কুয়েত,কুয়েত আমির,কুয়েতের আমির,কুয়েতের খবর,Kuwait,Kuwait Amir,Kuwait News

গালফ বাংলা

সংশ্লিষ্ট খবর