রবিবার ৬ই ডিসেম্বর ২০২০ |
শনিবারের বিশেষ লেখা

দোহা টু সিডনি: কালের ডায়েরি ০১

ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন |  শুক্রবার ২৩শে অক্টোবর ২০২০ সন্ধ্যা ০৬:৩৭:৪৯
দোহা

লেখক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন

কাতারের ছেড়ে বহুদূরে চলে গেলেও দোহা শহরেকে ঘিরে আমার ভালোলাগার যে শেকড়  বিস্তার করেছে তা কখনোই উপড়ে ফেলা যাবে না। 

তাই তো কাতার প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথে সখ্যের বন্ধন অটুট রাখার জন্য  গালফবাংলার ভার্চুয়াল পাতায় এই ধারাবাহিক লেখার প্রচেষ্টা।

দোহা টু সিডনি: কালের ডায়েরি ০১

অস্ট্রেলিয়ার সিডনী শহর ছেড়ে মরুর দেশ কাতার পাড়ি দিয়েছিলাম ২০০৮ সালের ৩০ জুন। দীর্ঘ এক যুগ পর ২০২০ সালের প্রায় একই সময় কাতারের পাট চুকিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ফিরে যাবার ডাক শুনতে পেলাম। এ বছরই ফিরে যেতে হবে অস্ট্রেলিয়া।

যদিও দীর্ঘ বারোটি বছর পেরিয়ে গেছে, তবুও নস্টালজিয়ার অলি-গলিতে হাঁটতে গিয়ে মনে হয় কাতারে এলাম এইতো সেদিন। পেছনে ফিরে তাকালে ফেলে আসা দিনগুলো গোধূলি বেলার এক চিলতে আলো হয়ে বুকের গভীরে বার বার পরশ বুলিয়ে যায়। আসা-যাওয়া, এতো প্রকৃতিরই নিয়ম। আমরা সবাই যেনো যাযাবর। মরুর বেদুঈনের মত ছুটে যাচ্ছি এক গন্তব্য থেকে অন্য গন্তব্যস্থলে। সব খেলা সাঙ্গ হলে একদিন পাড়ি জমাবো পরপারে।

কাতারের বহতা দিনগুলোতে পেয়েছি মানুষের নিরন্তর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। মিলেছে বহু আলোকিত ও ভালো মানুষের সন্ধান। পেয়েছি অনেক অকৃত্রিম বন্ধুর সান্নিধ্য। স্বজনহীন প্রবাসে আনন্দ বেদনার সাথী হয়ে ছায়ার মতো এরাই ছিলেন আমার ও আমার পরিবারের পাশে।

কাতারে গত একযুগের পথ চলায় প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজের বহু মানুষের সাথে মিশেছি। বহু সামাজিক, পেশাদার সংগঠনের সাথে কাজ করার ও নেতৃত্ব দেয়ার যেমন সুযোগ হয়েছে তেমনি চারপাশের মানুষ থেকে শিখেছিও অনেক কিছু। সত্যি বলতে কি, সুখ-দুঃখ মিলিয়ে কাতারে কাটানো এক যুগ আমার জীবনের সেরা সময়ের অংশ হয়ে থাকবে।

কাতারের ছেড়ে বহুদূরে চলে গেলেও দোহা শহরেকে ঘিরে আমার ভালোলাগার যে শেকড় বিস্তার করেছে তা কখনোই উপড়ে ফেলা যাবেনা। তাইতো কাতার প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথে সখ্যের বন্ধন অটুট রাখার জন্যই  মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় পোর্টাল গাল্ফ বাংলার ভার্চুয়াল পাতায় এই ধারাবাহিক লেখার প্রচেষ্টা।

কাতার ছেড়ে যাবার দিনক্ষণ ঠিক হল অবশেষে। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে কাতার এয়ারওয়েজে টিকিট বুকিং দিলাম। করোনাকালের এই লকডাউনের মধ্যে বাড়ীভর্তি মালামাল ও গাড়ী বিক্রি করে সারকারী বাড়ী বুঝিয়ে দেয়াটাই ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ।

কাতারের করোনা রোগীরর সংখ্যা তখন প্রতিদিনই ছিল বাড়তির দিকে। মার্চ মাস থেকে একরকম গৃহবন্দী হয়ে ছিলাম। বাসা থেকেই অফিস করছিলাম। কিন্তু  এখন বাড়ী থেকে বের হতেই হবে ভেবে শঙ্কিত হয়ে পড়ছিলাম। প্রায় প্রতিনিই ছাড়পত্র নেয়ার জন্য বিভিন্ন অফিস ও মন্ত্রণালয়ে যেতে হচ্ছিল। সবখানেই হরেক রকম মানুষের সংষ্পের্শে আসতে হচ্ছিল। এক পর্যায়ে করোনাভাইরাসকে ফাঁকি দিয়ে সুস্থ শরীর নিয়ে সিডনী পাড়ি দিতে পারবো কিনা সে ভাবনায় শঙ্কিত হয়ে পড়ছিলাম।

মধ্যপ্রাচ্যে সরকারী চাকুরীতে ঢোকার চেয়ে চাকরী ছাড়া যে কত কঠিন তা এবার হাঁড়ে হাঁড়ে টের পেলাম। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে ছাড়পত্র নিতে গিয়ে হল বিচিত্র অভিজ্ঞতা। সরকারী আবাসন, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে সব মিলিয়ে আটটি ছাড়পত্র নিতে হল। কিছু মন্ত্রণালয়ে গিয়ে কেরানীদের যে দৌরাত্ব দেখলাম তাতে আমি হতবাক।  অনেক সময় তারা কথাই বলতে চাইতোনা। ছাড়পত্র ছাড়া কাতার হামাদ বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশান যে আমরা পার হতে পারবোনা যে কথা তাদের জানা। তাই যে যেভাবে পারে তার সুযোগ  নিল।

কুরবানী ঈদের বন্ধ শুরু হবে জুলাইয়ের শেষের দিকে। ঈদের বন্ধের মধ্যেই পড়ে গেলো আমার যাবার দিন, যা আগে ভেবে দেখা হয়নি। টেনশানে পড়ে গেলাম। ঈদের বন্ধে শুরু হবার আগে সব কাজ সারতে পারবো কিনা সে নিয়ে ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলাম। এরই মধ্যে কাতার এয়ারওয়েজের পাঠানো ইমেইল পড়ে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো।  আমার টিকেট আগস্টের ২ তারিখ থেকে পিছিয়ে ১৬ তারিখ করা হয়েছে।

ইতিমধ্যে কাতারের রেসিডেন্ট পারমিট বাতিল হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম বাড়ী থেকে সরাসরি বিমান বন্দরে চলে যাবো। কিন্তু তা আর হলনা। সরকারী বাসা ছেড়ে দিতে হবে ক’দিনের মধ্যে। কাছের বেশ কিছু বন্ধু তাঁদের বাড়ীতে উঠার জন্য অনুরোধ করছিলেন। কিন্তু এই করোনাকালে বাড়ী ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে বেশ অস্বস্তিবোধ করছিলাম।

অবশেষে মুগোলিনাতে আমার একজন অগ্রজ পারিবারিক বন্ধুর বাড়ী গিয়ে উঠলাম। বন্ধুর পরিবার পরম আন্তরিকতার সাথে যে ধরণের আতিথেয়তা দেখালেন সেই ভালোবাসার ঋণ হয়তো কোনাদিন শোধ করতে পারবোনা। এরপরও প্রতিটি দিন আর প্রতিক্ষার প্রহরগুলো আমার কাছে মনে হচ্ছিল দীর্ঘ বছর। কাতার ছেড়ে যাবার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হবার পরও যেতে না পারার কষ্ট ও এক ধরণের অসহায়ত্ববোধ কুরে কুরে খাচ্ছিল ভেতরটা।

করোনা মহামারী আমাদের জীবন-যাপনের দৃষ্টিভঙ্গী বদলে দিয়েছে। শিখিয়েছে মানুষের সাথে সম্পর্কের মূল্য। করোনা যেমন মানুষকে আরো বিনয়ী এবং সহানুভ’তিশীল হতে শিখিয়েছে, তেমনি করোনকাল মানুষের ভেতরের তমসাচ্ছন্ন দিকটার মুখোশও খুলে দিয়েছে। 

কাতারের গৃহবন্দি দিনগুলোতে আমার শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে যে ধরণের সহমর্মিতা পেয়েছি তা ভোলার নয়। যাদের কাছ থেকে কোনো কিছুই আশা করিনি তাদের অনেকের সহানুভ’তি যেমন আমাকে বিস্মিত করেছে তেমনি দীর্ঘদেিনর জানাশোনা কিছু বন্ধুর উদাসীনতা করেছে মর্মাহত। করোনাকাল না আসলে এই সত্যটা কখনোই জানা হতনা।

এভাবে কেটে গেলো আরো দশটি দিন। ইমইেল খুলে দেখি আবারও দুঃসংবাদ। আমার ১৬ আগস্টের টিকিটও বাতিল করা হয়েছে। দিশাহারা হয়ে কাতার এয়ারওয়েজের অফিসে ছুটে গেলাম। ২৭ সেপ্টেম্বর একটা সিট পাওয়া গেলেও ফ্লাইটের কোনো নিশ্চয়তা তারা দিতে পারলোনা। 

কাতারের বেশ কিছুু অস্ট্রেলিয়ানদের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, ইকনমি যাত্রীদের টিকিট বার বার বাতিল করা হচ্ছে। তাই বিজনেস ক্লাসে টিকিট কাটলে ফøাইটে উঠার কোনো সম্ভাবনা নেই। এজন্য কাতার এয়ারওয়েজকে অভিসম্পাত দিচ্ছিলাম। কিন্তু বিষয়টা খতিয়ে দেখি সমস্যাটা তৈরী কেরছে খোদ অস্ট্রেলিয়া।

প্রতিদিন মাত্র ৩৫০ জন যাত্রী সিডনী বিমান বন্দরে প্রবেশ করতে পারবে বলে নির্দেশনা জারী করেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। ফলে এয়ারলাইনসগুলো প্রতি ফ্লাইটে ৩০-৪০ জনের বেশী যাত্রী নিতে পারছেনা। ভেবে দেখুন প্রায় পাঁচ শতাধিক যাত্রী ধারণক্ষমতার এয়ারবাস এ৩৮০ মাত্র ৪০ জন যাত্রী নিয়ে আকাশে উড়ে কিভাবে?  

খরচ পোষাবার জন্য তাই কেবল বিজনেস ক্লাস যাত্রীদের অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে ২৭, ৫০০ রিয়াল দিয়ে দোহা-সিডনী একমুখো বিজনেস ক্লাসের টিকেট কাটলাম। এবার সিডনীগামী ফ্লাইটের নতুন তারিখ নির্ধারিত হল ২৬ আগস্ট।

(চলবে)

গালফবাংলায় প্রকাশিত যে কোনো খবর কপি করা অনৈতিক কাজ। এটি করা থেকে বিরত থাকুন। গালফবাংলার ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন।
খবর বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন: editorgulfbangla@gmail.com

ড. মামুন,ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন,দোহা,সিডনি,প্রবাসীর লেখা,সাহিত্য,প্রবাসী সাহিত্য,কাতার,অস্ট্রেলিয়া

ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন

সাবেক কাতার প্রবাসী ও বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত প্রকৌশলী

সংশ্লিষ্ট খবর