রবিবার ৬ই ডিসেম্বর ২০২০ |

প্রবাসীর স্ত্রীকে মেরে ব্যাংক কর্মকর্তার বাহাদুরি

মামলার চার্জ গঠনের আদেশ আদালতের |  বুধবার ১৮ই নভেম্বর ২০২০ সকাল ০৮:৪৭:৫৫
প্রবাসীর

প্রবাসীর পরিবারকে তাদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে হবে— তাই তাদের ঘরের দরজার সামনেই বানানো হল টয়লেট। তবুও তারা ঘর ছেড়ে না যাওয়ায় তাদের ওর করা হয় হামলা। চালানো হয় লুটপাট। অবাক করা বিষয় হল, মূল হামলাকারী রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের চট্টগ্রামের মুরাদপুর শাখার অ্যাসিস্টেন্ট ম্যানেজার নজরুল ইসলাম শিকদার।

তার লাথিতে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন প্রবাসীর স্ত্রী সুমাইয়া (ছদ্মনাম)। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, পেটে দেওয়া লাথিতে সুমাইয়ার জরায়ুতে লেগেছে আঘাত।

এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার চার্জশিট জমা দেয় চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানার পুলিশ। মঙ্গলবার (১৭ নভেম্বর) চট্টগ্রাম জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট-৫ আদালতের বিচারক জিহান সানজিদা জনতা ব্যাংক কর্মকর্তাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে দেওয়া এ চার্জশিট গ্রহণ করেন। আগামী ২৩ ডিসেম্বর এ মামলার চার্জ গঠন করার দিন ধার্য করেছেন আদালত।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম আদালতে সাতকানিয়া থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত জিআরও মো. হানিফ বলেন, ‘প্রবাসীর স্ত্রীর ওপর হামলার মামলায় আদালত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চার্জশিট আমলে নিয়েছেন। ২৩ ডিসেম্বর চার্জ গঠনের দিন ধার্য করা হয়েছে।’

পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে, জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা নজরুল থাকেন চট্টগ্রাম শহরেই। কিন্তু তার বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার ছদাহা ইউনিয়নে। তার ঘরের পাশেই থাকেন তার প্রবাসী বড় ভাইয়ের স্ত্রী ও তিন শিশু সন্তান।

তাদের ঘর থেকে উচ্ছেদ করতে ব্যাংক কর্মকর্তা আঁকলেন এক ছক। সন্তানসম্ভবা সুমাইয়া যখন বাবার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন, তখন রাতারাতি তাদের ঘরের দরজার সামনেই টয়লেট বানান ব্যাংক কর্মকর্তা নজরুল। পরবর্তীতে স্বামীর বাড়িতে ফিরে এলে টয়লেটের গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে স্বামীর ঘর ছেড়ে স্ত্রী সুমাইয়া তার দুই শিশু সন্তানসহ আশ্রয় নেন তার বাবার বাড়িতে।

ঘটনাটি এখানেই শেষ নয়। জানা গেছে, কয়েকদিন পর সুমাইয়ার কোলজুড়ে জন্ম নেয় কন্যাসন্তান। এরপর তিনি আবার স্বামীর ঘরে চলে আসেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন ব্যাংক কর্মকর্তা নজরুল। শহর থেকে দুই সহযোগীকে নিয়ে হামলা চালান প্রবাসীর স্ত্রীর ঘরে। সন্তান জন্মদানের ২০ দিনের মাথায় নজরুলের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হন সুমাইয়া। তার মারধরের হাত থেকে রেহাই মেলেনি সুমাইয়ার ১০ বছর বয়সী শিশুটিরও। এ সময় ভাঙচুর চালানো হয় প্রবাসীর ঘরেও। শুধু তাই নয়, নজরুলের মারধরে সুমাইয়া আঘাতপ্রাপ্ত হন জরায়ুতে।

এ ঘটনায় আদালতের নির্দেশে সাতকানিয়া থানায় দায়ের হয় নিয়মিত মামলা। তদন্ত শেষে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সাতকানিয়া থানা পুলিশ চার্জশিট প্রদান করে। চার্জশিটে উঠে আসে প্রবাসীর স্ত্রীকে ব্যাংক কর্মকর্তা নজরুলের নির্যাতনের আদ্যোপান্ত।

প্রবাসীর স্ত্রী সুমাইয়ার অভিযোগ, তার স্বামীর ঘরের দরজার সামনে টয়লেট স্থাপন করেন নজরুল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে আপোস-মীমাংসার মাধ্যমে এ টয়লেটটি ভেঙে ফেলা হয়।

আপোষ-মীমাংসার মাধ্যমে টয়লেট ভাঙা হলেও আদালতে সুমাইয়ার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন নজরুল। আদালত বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেয় জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশকে। ডিবির এসআই সেলিম মিয়া এ মামলা তদন্ত করে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। নজরুলের দায়ের করা মামলার তদন্তেও উঠে আসে ব্যাংক কর্মকর্তা নজরুলের অপকর্মের ফিরিস্তি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নজরুলের পিতা মনির আহমদ সিকদারের রেখে যাওয়া সম্পত্তি মৌখিক আপোসে ৬ ভাইয়ের মধ্যে বণ্টন হয়। নজরুলের প্রবাসী বড় ভাই নিজের অংশে একটি পাকা ঘর নির্মাণ করেন। বাড়ি নির্মাণ করে তিনি পুনরায় বিদেশ চলে যান। এ মামলার বাদি নজরুল চট্টগ্রাম শহরে সপরিবারে বসবাস করার পরও তার বড় ভাইয়ের পাকা বাড়ির দরজার সামনে পাকা এটাচড বাথরুম ও টয়লেট নির্মাণ করেন।

যা খুবই ঘৃণ্যকর কাজ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিবাদীকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার প্রাথমিক ব্যবস্থা বলে প্রতীয়মান হয়। প্রতিনিয়ত উক্ত টয়লেটের মলমূত্রের গন্ধে বসবাস করতে বেশ কষ্ট হওয়ায় প্রবাসীর পরিবার প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলে অভিযোগ করেন। পরে স্থানীয় ইউএনওর হস্তক্ষেপে আপোষ- মীমাংসার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হলেও নজরুল বিজ্ঞ আদালতে মামলা দায়ের করেন।

চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়, গত ১৫ অক্টোবর সকাল ৯টায় প্রবাসীর স্ত্রীর বাড়িতে রড-লাঠিসোটা নিয়ে সশস্ত্র হামলা চালান নজরুল ছাড়াও তার দুই সহযোগী জহির ও ইসহাক। এ সময় নজরুল নিজে সুমাইয়ার পেটে সজোরে লাথি দেন। এতে সুমাইয়া অজ্ঞান হয়ে পড়ে। এই সুযোগে তারা ঘরে লুটপাটও চালান। পরে আশপাশের লোকজন এসে উদ্ধার করে সুমাইয়াকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

চার্জশিটের সাথে থাকা ডাক্তারি সনদপত্রে দেখা যায়, আঘাতের ফলে সুমাইয়ার জরায়ুতে সমস্যা হয়।

জানা গেছে, থানায় মামলা না নেওয়ায় সুমাইয়া বাদি হয়ে আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন। আদালত সাতকানিয়া থানাকে এ অভিযোগ নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করার আদেশ দেন। গত ২৪ অক্টোবর মামলা হিসেবে রুজু হয়।

এর আগে গত ১১ মার্চ ও ২৫ সেপ্টেম্বর দুই দফা নজরুল ও তার সহযোগীরা সুমাইয়াকে হুমকি দেন। এ ঘটনায় সাতকানিয়া থানায় জিডি করেন তিনি। ২৫ সেপ্টেম্বর সুমাইয়াকে বাড়ি ছাড়তে এক মাসের আল্টিমেটাম দেন বলেও অভিযোগ উঠে জনতা ব্যাংক কর্মকর্তা নজরুলের বিরুদ্ধে।

এছাড়া জনতা ব্যাংক কর্মকর্তা নজরুল, জহির ও ইসহাকের বিরুদ্ধে সুমাইয়া আক্তারের প্রবাসী স্বামী পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের প্রবাসী সহায়তা ডেস্কের মাধ্যমে পুলিশ সুপার বরাবর আবেদন করেন। এ আবেদনের প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নিতে সাতকানিয়া থানার ওসিকে নির্দেশ দেন পুলিশ সুপার।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘নজরুল কয়েক বছর ধরে কয়েকবার আমাকে নানা ধরনের হুমকি দিচ্ছে। গত ১৫ আগস্ট সে ও তার দলবল আমার ওপর হামলা করে। এখন জামিন নিয়ে এসে সে আমাকে স্বামীর ঘর ছাড়তে আল্টিমেটাম দিচ্ছে। নিজেকে জনতা ব্যাংকের বড় অফিসার দাবি করে আমার সাথে যে নোংরা নির্যাতনগুলো করেছে তা আমি একজন নারী হিসেবে ভাষায়ও প্রকাশ করতে পারছি না।’

 গুরুত্বপূর্ণ কিছু খবর

গালফবাংলায় প্রকাশিত যে কোনো খবর কপি করা অনৈতিক কাজ। এটি করা থেকে বিরত থাকুন। গালফবাংলার ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন।
খবর বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন: editorgulfbangla@gmail.com

কাতার,কাতারের খবর,কাতার প্রবাসী,দোহা,দোহার খবর,আজকের কাতার,আজকের দোহা,কাতারের দোহা,দোহার নিউজ,কাতারের সংবাদ,কাতার প্রবাসীদের খবর,Qatar,Doha,Qatar News,Doha News,Today Qatar News,Qatar Bangladesh,Qatar Bangla News,Doha Bangla News,প্রবাস,প্রবাসীর খবর,প্রবাসের খবর

চট্টগ্রাম প্রতিদিন

সংশ্লিষ্ট খবর