সুদানে যুদ্ধবিমান বিক্রি বন্ধ হলেও লিবিয়ায় ৫ কার্গো অস্ত্র পাঠাল পাকিস্তান

Loading...

সুদানে যুদ্ধবিমান বিক্রি বন্ধ হলেও লিবিয়ায় ৫ কার্গো অস্ত্র পাঠাল পাকিস্তান

পাকিস্তান লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের সামরিক শাসক খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে কিছু অস্ত্র সরবরাহ করেছে। এই চুক্তির অর্থায়ন করেছে সৌদি আরব। এমনটাই জানিয়েছেন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত পশ্চিমা ও আরব কর্মকর্তারা মিডল ইস্ট আইকে এই তথ্য জানিয়েছেন।

মার্চ মাসে পাকিস্তান থেকে অন্তত পাঁচ কার্গো বিমান অস্ত্র নিয়ে বেনগাজি বিমানবন্দরে অবতরণ করে এবং সেগুলো খালাস করা হয়। এসব সরবরাহ প্রত্যক্ষ করা এক কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে এ তথ্য জানান। আরেক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন যে, পাকিস্তান থেকে অস্ত্রের চালান গেছে। তবে কী ধরনের অস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে, তা তিনি উল্লেখ করেননি।

এর আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছিল, হাফতারের পূর্বাঞ্চলীয় সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে ৪০০ কোটি ডলারের একটি অস্ত্রচুক্তি করেছে, যা দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুক্তি। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ডিসেম্বর মাসে বেনগাজি সফরের পর এই চুক্তি চূড়ান্ত হয়।

লিবিয়ায় পাকিস্তানি অস্ত্র পৌঁছানোর বিষয়টি আগে প্রকাশ পায়নি। তবে এটি এমন এক প্রেক্ষাপটে ঘটছে, যেখানে আফ্রিকায় পাকিস্তানের অন্যান্য অস্ত্রচুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে। রয়টার্স সোমবার জানায়, সুদানের সরকারের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি অস্ত্রচুক্তি স্থগিত হয়ে গেছে। কারণ সৌদি আরব ওই কেনাকাটার অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

কিছু আরব ও পশ্চিমা সূত্র মিডল ইস্ট আইকে জানান, মার্চ মাসে পাকিস্তান থেকে হাফতারের বাহিনীর জন্য পাঠানো অস্ত্র সরবরাহে সৌদি আরবই সহায়তা করেছে। তাদের মতে, সৌদি আরব হাফতারের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে এবং দীর্ঘদিন ধরে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রভাব সরিয়ে দিতে চায়। তবে এ পরিকল্পনা কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক লিবিয়ান সূত্র। তিনি বলেন, হাফতার পরিবার এখনো আমিরাতে বিপুল সম্পদ ও সম্পত্তির মালিক।

এক আরব কর্মকর্তা বলেন, ‘এই চুক্তি করা হয়েছে হাফতারকে আমিরাতের প্রভাব থেকে দূরে ঠেলতে। সৌদি আরব এখন মধু ব্যবহার করছে, বলছে—আমরাই তোমাদের পৃষ্ঠপোষক হতে পারি।’

৮২ বছর বয়সী খলিফা হাফতার এবং তাঁর ছেলে ও সম্ভাব্য উত্তরসূরি সাদ্দাম হাফতার ফেব্রুয়ারির শুরুতে ইসলামাবাদ সফর করেন। সেখানে তারা পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেন। এক আরব কর্মকর্তা জানান, মার্চে সরবরাহ করা অস্ত্রের শর্তাবলি ওই সফরের সময়ই নির্ধারিত হয়। মিডল ইস্ট আই এ বিষয়ে জানতে ওয়াশিংটনে সৌদি ও পাকিস্তানি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পায়নি।

পশ্চিমা ও আরব কর্মকর্তারা আরও বলেন, সৌদি আরব চায় হাফতার যেন দক্ষিণ-পূর্ব লিবিয়া থেকে সুদানের র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) কাছে অস্ত্র যাওয়া বন্ধ করে। লিবিয়ার ওপর জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে তাতেও দেশটিতে বাইরের শক্তিগুলোর অস্ত্র সরবরাহ থামানো যায়নি। বর্তমানে লিবিয়া দুই ভাগে বিভক্ত। ত্রিপোলিতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি সরকার রয়েছে, যার প্রধান প্রধানমন্ত্রী আবদুল হামিদ দিবেইবা। আর পূর্বাঞ্চলে হাফতারের নিয়ন্ত্রিত সরকার রয়েছে।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, সৌদি আরব হাফতারের বাহিনীকে ত্রিপোলির প্রশাসনের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে একীভূত করার প্রক্রিয়াতেও সমর্থন দিচ্ছে। মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ফ্লিন্টলক সামরিক মহড়ায় দুই পক্ষ একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। এছাড়া তারা একটি যৌথ সামরিক কমিটিও গঠন করেছে। এক পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেন, ‘একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে সৌদি আরব নতুন অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে হাফতারের সহযোগিতা কিনে নিচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘লিবিয়ার সামরিক বাহিনীর একীকরণ সুদান ইস্যুতে আমিরাতের স্বার্থের বিরুদ্ধে যাচ্ছে।’

একসময় সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। তারা যৌথভাবে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে হুথিদের ক্ষমতা থেকে সরানোর চেষ্টা করেছিল এবং ২০১৯ সালে ত্রিপোলি দখলের ব্যর্থ অভিযানে হাফতারকে সমর্থন দিয়েছিল। তবে পরে সুদানের যুদ্ধ নিয়ে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বিশেষ করে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আমিরাতের আরএসএফ-সমর্থনের বিরুদ্ধে লবিং করেন।

ডিসেম্বরে সৌদি আরব ইয়েমেনে আমিরাত-সমর্থিত মিলিশিয়াদের ওপর হামলা চালালে উত্তেজনা আরও বাড়ে। তবে এই টানাপোড়েনের মধ্যেও উভয় পক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছে। ফেব্রুয়ারিতে মোহাম্মদ বিন সালমান আমিরাতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা তাহনুন বিন জায়েদের কাছে একটি চিঠি পাঠান, যেখানে রিয়াদের অভিযোগ তুলে ধরার পাশাপাশি মধ্যস্থতার আহ্বান জানান।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ কিছু বিশ্লেষকের মধ্যে ধারণা তৈরি করেছিল যে, রিয়াদ ও আবুধাবি নিজেদের মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে রাখবে। কিন্তু বাস্তবে এই সংঘাত তাদের বিভাজন আরও বাড়িয়েছে। সৌদি আরব একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও আকাশসীমায় প্রবেশাধিকার বাড়ানোর অনুরোধ মেনে চলার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের জন্যও চাপ দিচ্ছে।

অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান আরও জোরদার করেছে এবং ওয়াশিংটনের তেহরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে—যে আলোচনায় পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে।

Loading...

Loading