মঙ্গলবার ১১ই ডিসেম্বর ২০১৮ |

২০১৭ : উত্তেজনায় ভরা একটি বছর

 সোমবার ২৫শে ডিসেম্বর ২০১৭ দুপুর ১২:০৬:৫০
২০১৭

বিদায়ের পথে ২০১৭ সাল। এ বছরটি বিশ্ববাসীর জন্য রেখে গেছে অনেক আলোচিত ঘটনা। ঐতিহাসিক অনেক পর্ব রচিত হয়েছে এ বছরেই। তার মধ্যে অন্যতম হলো মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসা। জিম্বাবুয়ের প্রায় ৪০ বছরের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে ক্ষমতা হারিয়েছেন।

তিনি হিরো থেকে ভিলেনে পরিণত হয়েছেন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছেদ ঘটাতে বৃটেন সক্রিয় করেছে অনুচ্ছেদ ৫০। সৌদি আরবে ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছে গেছেন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। বিস্ময়করভাবে চীনা ক্ষমতায় আসন আরো পাকা করেছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বিশ্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে উত্তর কোরিয়া। জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে একতরফাভাবে ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তা নিয়ে সারা বিশ্বে তোলপাড় চলছে। এর বাইরে রয়েছে অসংখ্য ঘটনা। এসবের চুম্বক অংশ পাঠকের জন্য তুলে ধরা হচ্ছে:

রোহিঙ্গা সংকট

২৫শে আগস্ট মিয়ানমারের উত্তর রাখাইনে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ৩০টি পোস্টে হামলা চালায় আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা)। এ হামলায় সেনা সদস্যসহ ১১ জন নিরাপত্তা রক্ষী নিহত হন। এর জবাবে সেনাবাহিনী, নিরাপত্তারক্ষী ও তাদের দোসররা রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর চালায় ভয়াবহ নৃশংস নির্যাতন। গণহারে তারা নারী, পুরুষ ও শিশুদের হত্যা করতে শুরু করে। করা হয় গণধর্ষণ।

শিশু থেকে শুরু করে অন্তঃসত্ত্বা নারী- কেউ রক্ষা পায়নি তাদের পৈশাচিকতা থেকে। ভাইয়ের সামনে বোনকে, মায়ের সামনে মেয়েকে, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণ করে উল্লাস করেছে তারা। গ্রামের পর গ্রাম আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছে। এপাড় বাংলাদেশ থেকেও রাখাইনে রোহিঙ্গাদের গ্রাম জ্বলার দৃশ্য দেখা গেছে। জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা। মানবাধিকার সংস্থা, বিদেশি সরকারগুলো এর নিন্দা জানিয়েছে। তারা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এই নৃশংসতাকে জাতি নিধন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সেনাবাহিনী যখন নৃশংস নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছিল তখন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া, মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেল অং সান সুচি ছিলেন নীরব। নৃশংসতার প্রায় এক মাস পরে তিনি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সুর মিলান। এতে তার বিরুদ্ধে সারা বিশ্ব থেকে নিন্দার ঝড় ওঠে। তিনি মানবাধিকারের পক্ষে, গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করে যে সম্মান অর্জন করেছিলেন তার সবটাই হারিয়ে ফেলেন এই সমালোচনায়। তাকে দেয়া বিভিন্ন পুরস্কার, পদক কেড়ে নেয় বৃটেনের বিভিন্ন সিটি কাউন্সিল ও বিশ্ববিদ্যালয়। রোহিঙ্গা ইস্যু জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ পর্যন্তও যায়। অবশেষে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়া নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে গত ২৩শে নভেম্বর একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর অধীনে জানুয়ারি মাস শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। তবে এটা স্পষ্ট নয়, কি পরিমাণ রোহিঙ্গা এর আওতায় ফিরে যেতে পারবেন।

ট্রাম্পের এক বছর

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ২০১৬ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও ক্ষমতা বুঝে নেন ২০১৭ সালের ২০শে জানুয়ারি। এ সময় থেকেই তার ক্ষমতার মেয়াদ হিসাব করা হবে। তিনি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে এনে প্রচারণা চালিয়েছেন। অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নির্বাচনী প্রচারণার সময়। হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করেই তিনি ২৭শে জানুয়ারি প্রথমে ৭টি মুসলিম দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে সফরে নিষেধাজ্ঞা দেন। তা নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জে হেরে গিয়ে তিনি নতুন নির্দেশ দেন। তাতে শুধু ইরাককে বাদ রেখে ৬টি মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেন। বার বার আদালত তা আটকে দিয়েছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপে (টিপিপি) যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ বাতিল করেন।

প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। পারমাণবিক বাধ্যবাধকতা ইরান মেনে চলছে- এমনটা স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে বছরের শেষের দিকে এসে তিনি গত ৬ই ডিসেম্বর জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। তার এই ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে মুসলিম বিশ্ব। জরুরি বৈঠক করেছে আরব লীগ এবং ওআইসি। তুরস্কের আহ্বানে ট্রাম্পের ঘোষণাকে বাতিল করার প্রস্তাবে ভোট হয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে। সেখানে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে ওই প্রস্তাব পাস হয়নি। এর পরে ২১শে ডিসেম্বর একই প্রস্তাবে ভোট হয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে। এতে প্রস্তাবের পক্ষে ১২৮ ভোট, বিপক্ষে ৯ ভোট পড়ে। ভোটদানে বিরত থাকে ৩৫টি দেশ। এর ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষণা প্রত্যাখ্যাত হয় জাতিসংঘে। ভোটের আগে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট না দিতে সরাসরি হুমকি দেন ট্রাম্প। কিন্তু তার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ১২৮টি দেশ তাদের বিবেকের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। এতে লজ্জাজনক অবস্থায় পড়ে ট্রাম্প প্রশাসন। এমনকি মুসলিম নয়, এমন অনেক শক্তিধর দেশও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কারণ, তার সিদ্ধান্ত মানলে ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা দৃশ্যত অসম্ভব। ফলে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী ঘোষণা করেছেন। একই ঘোষণা দিয়েছে ওআইসি। তবে ট্রাম্প এখনও নির্বাচনী প্রচারণায় দেয়া প্রতিশ্রুতির অনেকটাই বাস্তবায়ন করেননি। আফগানিস্তান থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরিবর্তে তিনি সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের অবস্থান সুসংহত করেছেন। নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ ইস্যুতে অনেকটাই জটিল অবস্থায় রয়েছেন তিনি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকজন শীর্ষ স্থানীয় কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন তিনি। তাতেও রক্ষা পাচ্ছেন না। রাশিয়া কানেকশন নিয়ে এফবিআইসহ বিভিন্ন পর্যায়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

মুগাবে হিরো নাকি ভিলেন!

প্রায় ৪০ বছর জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রবার্ট মুগাবে। কোনো একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে কি হিরো এবং ভিলেন হতে পারেন? এমন প্রশ্ন শুধু তাকে ঘিরেই উঠেছে। রবার্ট মুগাবেকে ঘিরে এমন প্রশ্নের উত্তর হলো- হ্যাঁ। একই সঙ্গে একই ব্যক্তি হিরো এবং ভিলেন হতে পারেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রয়াত নেলসন ম্যান্ডেলা যেমনটা লড়াই করে ক্ষমতায় এসেছিলেন, অনেক বছর জেল খেটেছেন, ঠিক একই ভাবে জেলে ছিলেন রবার্ট মুগাবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গরা তখন দেশ শাসন করছিল। ওই সময়ে জিম্বাবুয়ের নাম ছিল রোডেশিয়া। বর্তমানে তা জিম্বাবুয়ে। এই অবস্থায় উত্তরণের জন্য যে কৃতিত্ব তার পুরোটাই যায় ওই রবার্ট মুগাবের রেকর্ডে। কিন্তু পরে তিনি আর নেলসন ম্যান্ডেলার মতো থাকতে পারেননি। মুগাবে কখনো ভাবেননি ক্ষমতার চেয়ে গণতন্ত্র বড়। তিনি জিম্বাবুয়েকে শাসন করেছেন ৩৭ বছর। আরও সময় ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা করেছিলেন। তাতে যদি অর্থনীতি ধসে মাটিতে গড়াগড়ি যায় তাতেও তার কোনো ক্ষতি নেই। তিনি ক্রমাগত বেপরোয়া হয়ে ওঠেন ক্ষমতা নিজের হাতে রাখতে। এ জন্য নিজের স্ত্রী গ্রেসি মুগাবেকে প্রেসিডেন্ট পদে আনার জন্য তাকে পদ দেন।

এ নিয়ে দ্বন্দ্বে তিনি বরখাস্ত করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট এমারসন মনাঙ্গাগওয়াকে। এখানেই তিনি সবচেয়ে বড় ভুল করেন। ফার্স্ট লেডি গ্রেসি মুগাবে জিম্বাবুয়ের মানুষের কাছে ‘গুসি মুগাবে’ হিসেবেই বেশি পরিচিত। দেশে যখন মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকট তখন তিনি সরকারি বিমানে করে বিদেশে যান কেনাকাটা করতে। দেশের দারিদ্র্য তাকে স্পর্শ করতে পারে না। এ ছাড়া তার কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও ছিল না। এমন অবস্থায় জিম্বাবুয়ের মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল না বললেই চলে। অন্যদিকে বরখাস্ত করা ভাইস প্রেসিডেন্ট এমারসন মনাঙ্গাগওয়ার প্রতি সেনাবাহিনীর ছিল অকুণ্ঠ সমর্থন। এমন অবস্থায় সেনাবাহিনী দৃশ্যত সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়। সেনারা অবশ্য একে সামরিক অভ্যুত্থান বলতে অস্বীকৃতি জানান। উল্টো তারা নেপথ্যে থেকে ক্ষমতার পালাবদলে ভূমিকা রাখে। প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবেকে গৃহবন্দি করা হয়। পালিয়ে যান গ্রেসি মুগাবে। দেশে ফিরে যান এমারসন মনাঙ্গাগওয়া। চাপের কাছে বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেন রবার্ট মুগাবে। নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন এমারসন। তিনি দাযিত্ব নিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আগামী বছর নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠেয় নির্বাচন দেবেন তিনি। তবে রবার্ট মুগাবে ও তার মধ্যে ব্যবধান খুবই কম।

ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া শুরু

২০১৬ সালের জুনে ব্রেক্সিট গণভোটের পর এ বছরের ২৯শে মার্চ ব্রেক্সিট বিষয়ক লিসবন চুক্তির ৫০ নম্বর অনুচ্ছেদ সক্রিয় করেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে। একে বৃটেনের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় হিসেবে দেখা হয়। ওই অনুচ্ছেদ সক্রিয় করতে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর হাতে সময় আছে ২০১৯ সালের ২৯শে মার্চ পর্যন্ত। এর মধ্যে তাকে অবশ্যই ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বৃটেনকে বের করে আনতেই হবে। তবে কোনো বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে যদি এ সময়সীমা বৃদ্ধি করা হয় তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। তবে এরই মধ্যে তিন দফা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন তেরেসা। প্রথমত পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়াই অনুচ্ছেদ ৫০ সক্রিয় করার এক্তিয়ার প্রধানমন্ত্রীর নেই বলে আদালতে মামলা ঠুকে দেন ব্যবসায়ী নারী গিনা মিলার। সে মামলায় হেরে যান তেরেসা। এরপর জাতীয় নির্বাচনে তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। বিরোধী লেবার দলে দেখা দেয় উল্লাস। আর সর্বশেষ গত সপ্তাহে পার্লামেন্টে তার নিজের দলের বিদ্রোহী এমপিদের তোপের মুখে পড়েন। এতে ব্রেক্সিট চূড়ান্ত করার আগে এ বিষয়ে পার্লামেন্টকে জানাতে ব্রেক্সিট বিল সংশোধন করার প্রস্তাব পাস হয়। এরপর তেরেসা মে ব্রেক্সিট আলোচনা নিয়ে ছুটে যান ব্রাসেলসে। তবে খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারছেন না। ডিসেম্বরের শুরুতে বৃটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি চুক্তিতে আসতে সম্মত হয়েছে। এতে রয়েছে প্রাথমিক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। যার অন্যতম হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়তে হলে ৪০০০ থেকে ৬০০০ কোটি ইউরো ক্ষতিপূরণ দিতে হবে বৃটেনকে। এরপরও আলোচনা চলছে।

মোহাম্মদ বিন সালমানের উত্থান

মধ্যপ্রাচ্যে বছরের বহুল আলোচিত ব্যক্তিত্ব সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। বাদশা সালমানের ছেলে তিনি। খুব তাড়াতাড়ি উঠে এসেছেন ক্ষমতার কেন্দ্রে। জুনে ৩২ বছর বয়সী এই যুবককে তার পিতা বাদশা সালমান তার উত্তরসূরি হিসেবে ঘোষণা দেন। তা করতে গিয়ে নিজের ভাতিজা ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফকে বরখাস্ত করেন। তার পদে বসানো হয় মোহাম্মদ বিন সালমানকে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি ক্ষমতায় এসেই সৌদি আরবের অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রকে আধুনিকায়নে হাত দেন। ঘোষণা করেন ভিশন-২০৩০। আর আওতায় বলা হয়, শুধু তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে।

দেশে কঠোর রক্ষণশীলতা শিথিল করতে হবে। তার আগে ক্ষমতায় থাকা যুবরাজ নায়েয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সাউদিয়া আরামকো-কে বেসরকারি খাতে ছেয়ে দেয়া। কিন্তু বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স চাইছেন নারীদের গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে অনুমোদন দিতে। এসবের মাধ্যমে তিনি দ্রুততার সঙ্গে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। দুর্নীতির অভিযোগে যুবরাজসহ তার ১১ জন কাজিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের রাখা হয় রিটজ-কার্লটন হোটেলের জেলে। ক্রাউন প্রিন্সের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। শুধু দেশের ভিতরেই ঝড় সৃষ্টি করেছেন এমন নয়। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ইস্যুতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি আঞ্চলিক ইস্যুতে ইরানের প্রভাবকে মোকাবিলা করতে নিয়েছেন আগ্রাসী পদক্ষেপ। ২০১৫ সালে ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করে সৌদি আরব। সেখানেও তার বড় ভূমিকা রয়েছে। এ ছাড়া এই গ্রীষ্মে কাতারের বিরুদ্ধে উপসাগরীয় বেশ কতগুলো দেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এতে নেতৃত্বে ছিল সৌদি আরব। আর মূল কলকাঠি নেড়েছেন মোহাম্মদ বিন সালমান- এমনটা বিশ্বাস করা হয়। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সৌদি আরবকে অনেক বেশি উদার ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মোহাম্মদ বিন সালমান হলেন উত্তম পছন্দ। তবে অন্যরা তার বেপরোয়া গতিতে উদ্বিগ্ন।

উত্তর কোরিয়াকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি

যুক্তরাষ্ট্রে পর্যায়ক্রমে যেসব প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় এসেছেন তাদের বেশির ভাগই উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রে সমৃদ্ধ হওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছেন। এক্ষেত্রে তারা আরোপ করেছেন অবরোধ। বার বার হুমকি দিয়েছেন সামরিক হামলার। কিন্তু এসব অবরোধ বা হুমকিকে থোড়াই কেয়ার করে উত্তর কোরিয়া। তারা কর্ণপাতও করেনি এসব হুমকির। সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে উত্তর কোরিয়া সাম্প্রতিক সময়ে ছয়টি পারমাণনিক পরীক্ষা চালায়।

এর তিনমাস পরে তারা ব্যাপক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। এ ক্ষেপণাস্ত্রটি এতটাই শক্তিশালী যে, তা যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো শহরে আঘাত করতে সক্ষম এমনটা বলা হয়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি উত্তর কোরিয়াকে থামাবেন। তা জবাব হবে এমন আগুনে যা বিশ্ববাসী কোনোদিন দেখেনি। টুইটে তিনি বলেন, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে এখন সামরিক অভিযানই পূর্ণ সমাধান হতে পারে। এ বিষয়ে প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। অস্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তিনি এ সময় উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে ‘লিটন রকেট ম্যান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলে পাঠানো হয় যুদ্ধবিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ। যেকোনো সময় যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়। এ সময় সমস্যা সমাধানে হঠাৎ করে চীনের দ্বারস্থ হন ট্রাম্প। ফলে মাঠে নেমে পড়ে চীন। তারা সংকট সমাধানে চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের কথায় উত্তর কোরিয়া বেঁকে যাবে এমনটা ভাবার কোনোই কারণ নেই। এক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়াকে তার অবস্থানের পরিবর্তনের জন্য শুধু সামরিক অভিযানকেই উপায় হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সেই সামরিক অভিযানের ঝুঁকি হতে পারে ভয়ানক। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রে সমৃদ্ধ হতে দিলে তাও হবে আরো ভয়াবহ। এ অবস্থায় ওয়াশিংটন, বেইজিং, সিউল ও টোকিও প্রবেশ করছে নতুন বছর ২০১৮ সালে।

শি জিনপিং

চীনে বিরল সম্মান পেয়েছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দেশটিতে মাও সেতুং যেমন সম্মানের অধিকারী, যেমন পদবির অধিকারী সেই স্থানে নিজেকে নিয়ে গিয়েছেন জিনপিং। ফলে তাকে ‘কিং অব চায়না’ বলে আখ্যায়িত করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মাও সেতুংয়ের পর চীনের সবচেয়ে শক্তিধর নেতা এখন শি জিনপিং।

মোহাম্মদ আবুল হোসেন

মানবজমিন

সংশ্লিষ্ট খবর